হোম > ফিচার > আমার জীবন

আখাউড়ার পথে-প্রান্তরে

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম

সাতসকালেই বন্ধু নাজমুল হোসেন বিবেকের কল—‘দোস্ত রেডি?’

‘আবার জিগায়!’

বিমানবন্দর স্টেশন থেকে বেলা ২টা ৪০ মিনিটে ট্রেন। মায়ের হাতের সাদা পোলাও খেয়েই ভোঁ-দৌড়। ঠিক সময়েই পৌঁছে যাই রেলস্টেশনে; কিন্তু বিধি বাম! ট্রেন লেট। কী আর করা, দুই দোস্ত স্টেশনের ভেতর ঘুরতে থাকি। কত ট্রেন আসে, কত ট্রেন যায়। নানা রঙের মানুষেরও দেখা পাই। যেই ট্রেন ছাড়ে, আর অমনি দৌড়ে গিয়ে ওঠে। জনৈক মহিলা তো অল্পের জন্য চাকার তলে পড়ি-পড়ি করেও পড়েননি।

ঠিক এক ঘণ্টা দেরিতে হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন স্টেশনে ঢোকে। ট্রেন থামার আগেই দোস্তের দৌড়। আমিও ওর পেছন পেছন দৌড়াতে থাকি। ওই মানুষকে জিগাইতে থাকে টাকার ‘ট’ কোন দিকে। যাক বাবা, ট-বগি মিলে গেল। গেটে হুলুস্থুল করে ট্রেনে চড়লাম। নিয়মের কোনো বালাই নেই। তাপানুকূল বগি হলেও তাপানুকূল অনুপস্থিত। মানুষের ভিড় ঠেলেঠুলে নির্দিষ্ট সিটে গিয়ে দেখি, বসে আছেন দুজন। ভয়ে আঁতকে উঠলেও চোখে-মুখে তা ফুটে উঠতে দিইনি। কারণ ভ্রমণবন্ধু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পোলা। ট্রেনটিও যাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

বড় কোনো বাতচিত ছাড়াই তারা সিট ছাড়লেন। আসন গ্রহণ করে বুকভরা নিশ্বাস নিই।

মারামারিতে ভাইরাল জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া। কিন্তু এই জেলার পরতে পরতে রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিসহ নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের প্রকৃতির ভান্ডার। আমি কোথাও ভ্রমণে গেলে প্রকৃতি, সঙ্গে সেইসব অঞ্চলের মানুষের আবেগ, ভালোবাসা, আতিথেয়তা ও তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করি। আমার দৃষ্টিতে একটি সার্থক ভ্রমণের মানে এটাই। আরেকটি কথা না বললেই নয়—অন্যান্য যানবাহনের চেয়ে ট্রেনভ্রমণ আপনার কাছে ভালো-মন্দ মিলিয়ে স্মরণীয় হয়েই থাকবে। পরবর্তীকালের মনে রাখার মুহূর্তগুলো ধারণ করতে করতেই ট্রেন পৌঁছে যায় গন্তব্যস্থল আখাউড়া জংশন। শুরুতেই আমাদের জন্য মোগরা বাজারে অপেক্ষায় ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা সাইফুল তানশেন। দেখা হতেই একগাল হেসে, ধরে নিয়ে গেলেন পোড়া রুটি আর মালাই চা খাওয়াতে। বিদায় নিয়ে ছুটলাম মূল গন্তব্যে।

যেতে যেতে তুলাই শিমুল গ্রামে বেকিনগর জুলাই শহীদ জাবিরের ইব্রাহিমের দাদাবাড়ি পৌঁছি। বিশাল বাড়িটির এক কোণে পুরোনো একটি মাটির ঘর। পরিবারটির সঙ্গে পূর্বপরিচয় থাকায় মাটির ঘরটিতে থাকার সুযোগ হলো। মাটির ঘর হওয়াতে শহীদ জাবিরের ছোট চাচা বেশ ইতস্তত। কিন্তু আমি তো মনে মনে বিরাট খুশি। বলা যায়, বাড়িটি একরকম পরিত্যক্ত। ভ্রমণে গিয়ে এমন বাড়িতে রাতযাপন করা বাড়তি পাওনা।

রাত গভীরে নূপুরের আওয়াজ কিংবা টেনে বাথরুমে নিয়ে যাওয়ার অনুভূতি। পুরাই হরর মুভি। ওরকম কিছুরই আশায় অনেক রাত অবধি উঠানে বসে থাকলাম। নিরাশ হয়ে যখন ঘরে ঢুকে ঘুমের প্রস্তুতি নিতে থাকি, ঠিক তখনই হাঁপাতে হাঁপাতে নাজমুল এসে বলে, ‘দোস্ত কী জানি আসছে।’

‘বলিস কী দোস্ত! চল্‌ চল্‌।’ টর্চের আলো ফেলতেই দেখি, কাঁঠালতলায় পাতিশিয়াল দৌড়ায়। হা-হা-হা! ‘যাহ্‌ বেটা, ঘুমের মুডটাই নষ্ট করে দিলি।’

এবার ওকে সঙ্গে নিয়েই ঘুমাতে যাই। মজার ব্যাপার আমকাঁঠাল-পাকা গরমেও লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুম। মাটির ঘরের এটাই হয়তো বৈশিষ্ট্য।

পরদিন সকালে তুলাই শিমুল গ্রামটা ঘুরতে বের হই। হাঁটতে হাঁটতে বইস খেলার মাঠে। একপাশে বিলের পানি। আরেক পাশে বিশালাকার মাঠ। রয়েছে পুরোনো গাবগাছ। ঝিরঝির বাতাস বয়ে যায়। কথিত আছে, একসময় এখানে মহিষের খেলা হতো। কালের পরিক্রমায় নামের বিবর্তনে সেটাই এখন বইস নামে পরিচিত। নামধাম যা-ই হোক না কেন, বইস খেলার মাঠের চারপাশের প্রকৃতি অত্যন্ত চমৎকার। প্রথম দর্শনেই মনে হবে—প্রকৃতির কোলে একটুকরো সবুজ এঁটে রয়েছে। মাঠের পাশের বিলে ভরা বর্ষায় পদ্ম ফুটে জায়গাটা আরো বেশি নয়নাভিরাম হয়ে ওঠে।

এবার যাই খড়কুট গ্রামে। সীমান্ত রেললাইন ধরে হাঁটতে থাকি। ওপারে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা। তাদের রেলস্টেশনটা এপার থেকেও দৃশ্যমান। যেতে যেতে আগরতলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের মাটিতে। মনে পড়ে গেল আগরতলা ষড়যন্ত্রের ইতিহাস। নাম নিশ্চিন্তপুর হলেও আমাদের মাথায় দুশ্চিন্তা ভর করল। তাই আর সময়ক্ষেপণ না করে নিজভূমেই ফিরে আসি। চোখ বুলিয়ে দেখি বাংলার আবহমান গ্রামীণ সৌন্দর্য।

প্রকৃতির সঙ্গে সখ্য গড়তে গড়তে চলে যাই গঙ্গাসাগর দীঘি। প্রথম দর্শনেই চোখ ছানাবড়া। শতবর্ষী বৃক্ষের ছায়াঘেরা দীঘির টলটলে পানি। পাশেই নান্দনিক ডিজাইনের গঙ্গাসাগর রেলস্টেশন। সাড়ে চার একরের দৃষ্টিনন্দন গঙ্গাসাগর দীঘিটি প্রায় ১ হাজার ৫০০ বছর আগে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের তৎকালীন রাজা বীর বিক্রম ঈশ্বরচন্দ্র মাণিক্য বাহাদুর প্রজাদের সুপেয় পানির প্রয়োজনে দীঘিটি খনন করিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন প্রজাহিতৈষী। তৎকালীন সময় রাজা এই অঞ্চলে খাজনা আদায়ের জন্য এলে গঙ্গাসাগর দীঘির ঘাটে বসে বিশ্রাম নিতেন। দীঘির পাশেই রয়েছে একটি জীর্ণশীর্ণ কাচারি ঘর, যা কালের সাক্ষী হয়ে আজও টিকে রয়েছে।

এবার যাই দরুইন গ্রামে। সেখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন দেশের গর্বিত সন্তান বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি মোস্তফা কামাল। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে ১৮ এপ্রিল পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন। ভোলা জেলার সন্তান শহীদ মোস্তফা কামাল। কিন্তু তিনি এখানে শহীদ হলে স্থানীয় গ্রামবাসীরা তাকে দরুইন গ্রামেই কবর দেন। কবরটি ফুল গাছের ছায়ায় ঘেরা, যার দেখভাল করেন বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোস্তফা কামালের মায়ের অনুরোধে স্থানীয় জনৈকা মহিলা।

সমাধিস্থলে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে যাই তুলাই শিমুল দক্ষিণপাড়া। সেখানে রয়েছে একজন বুজুর্গ ব্যক্তির মাজার শরিফ। মাজার ঘিরে লোকমুখে নানা মিথ চালু রয়েছে। আমিও তা পরখ করতে মাজারের ভেতর যাই। এরপর উত্তর পাড়ার দিকে যেতে থাকি। সঙ্গে জুটল স্থানীয় যুবক মহসিন। যেতে যেতে পাড়ার এক তন্বী তরুণীর সঙ্গে চোখে চোখ পড়ে। আরে এই তো দেখছি ভাইরাল গানের সেই গুলবাহার। নামধাম তার সব জানা হলো। পানও করলাম তার হাতে তৈরি চিনিমিশ্রিত লেবুর শরবত। মনের মধ্যে তখন গুলবাহার গানটা বেজেই চলল। কিন্তু বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের মতো মায়াবিনী মুখ দেখলেই জাতপাতের কোনো তোয়াক্কা না করে কখনো কারো প্রেমে পড়ার সাহস হয়নি। নাম ছিল তার গুলবাহার। অর্থবহ শ্রুতিমধুর গানটির মোহ কাটতেই, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার ঢাকামুখী ট্রেন ধরতে সোজা রেলস্টেশনে।

যাবেন কীভাবে : ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ও সিলেটের যেকোনো ট্রেনে চড়ে আখাউড়া জংশন।

থাকা-খাওয়া : মোগরা বাজারে থাকা-খাওয়ার জন্য মধ্যম মানের হোটেল-রেস্টুরেন্ট রয়েছে।

ছবি : দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ

দুপুরে ছোট মাছের কয়েক পদ

বাহারি কাটে সালোয়ার

তীব্র গরমে ঘর ঠান্ডা রাখার উপায়

ইংল্যান্ডের চেস্টার শহর

মাংসের পিঠা-পুলি

মাংসের মজাদার চার পদ

চাঁদ ও মোটরসাইকেল

ঈদের প্রস্তুতি ও কেনাকাটা

উৎসব দিনের সাজ

কোরবানি ঈদে মাংসের ভূরিভোজ