হোম > ফিচার > নারী

শীতলপাটি বুনেই চলে সংসার

ডিঙ্গাপোতার ‘পাটিয়াল’

জায়েদ হাসান

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙ্গাপোতা হাওড়পাড়। ভোরের আলো ফোটার আগেই এখানকার শত শত নারীর হাতে উঠে আসে বেতের ছাল বা বেত। যুগ যুগ ধরে পাটি বুনে তারা সংসারের চাকা সচল রাখছেন। হাতনী, জৈনপুর, কেন্দুয়া, রঘুরামপুর, ভাটাপাড়া, নোয়াগাঁও ও তাহেরপুর—এই সাত গ্রামের প্রতিটিতেই অর্ধেকের বেশি নারী পাটি ও বাঁশ-বেতের কাজ করে সংসার চালান। এই ‘পাটিয়াল’ নারীদের হাতের তৈরি পাটির সুনাম এখন দেশজুড়ে।

স্থানীয়ভাবে যারা পাটি বোনেন, তাদের বলা হয় ‘পাটিয়াল’ বা ‘পাটিকর’। আর পাটির প্রধান কাঁচামাল ‘মুর্তা’ বা ‘পাটিবেত’ জন্মে এই হাওড় অঞ্চলেই।

সংসার-সন্তান সামলে বুননের কাজ

সরেজমিনে দেখা যায়, রান্নাবান্না, ছেলেমেয়ের দেখাশোনা শেষ করেই নারীরা বসে যান উঠানে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে বুননের কাজ। পুরুষদের তুলনায় নারীরাই এই কাজে বেশি নিপুণ। গ্রামগুলোয় গিয়ে দেখা যায়, প্রতি দুই ঘরের মধ্যে এক ঘরের নারীই এ পেশার সঙ্গে যুক্ত।

পাটি তৈরির কারিগর কেন্দুয়া গ্রামের সুজলা রানী, চম্পা রানী, মনবালা রানী কর, দীপালি রানী কর, আরতি রানী কররা জানান, পাটি তৈরি করেই তাদের সংসার চলে। একটি সাধারণ পাটি বুনতে সময় লাগে কমপক্ষে সাত-আট দিন। কাঁচামাল কিনতে খরচ ৪০০-৫০০ টাকা। বিক্রি হয় ৯০০-১০০০ টাকায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকাররা বাড়ি থেকেই পাটি কিনে নিয়ে যান।

জৈনপুর বাজারে প্রতি সোম ও শুক্রবার বসে পাটির হাট। সেখানকার মূল বিক্রেতাও এই নারী কারিগররা।

জৈনপুর-কাশিপুরের কারিগরদের কথা

৩ নম্বর তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের জৈনপুর গ্রামের নারীরাও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাটি ও বাঁশ-বেতের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এই গ্রামের অর্ধেকের বেশি পরিবারই সরাসরি এই কাজের ওপর নির্ভরশীল। কারিগরদের মধ্যে রয়েছেন আলিয়া বানু, স্বামী কৃষক চান মিয়া; জাহেরা বানু, স্বামী জাহিদ মিয়া; সারমা বানু, স্বামী স্বপন মিয়া; সাফিয়া বানু, স্বামী মৃত সুমান মিয়া; মাজমিনা বানু, স্বামী রিপন মিয়া; জোসনা বানু, স্বামী কাইয়ুম মিয়া; আয়শা বানু, স্বামী মালু মিয়া; মনোয়ারা বেগম, স্বামী মালেক মিয়া; তোফা বানু, স্বামী নুরুজ্জামান মিয়া; রেণু বানু, স্বামী মৃত রফিজ মিয়া; সাবিনা বানু, স্বামী রুহুল আমিন মিয়া; রাহিমা বানু, স্বামী রহমত আলী মিয়া; এবং লাকী বানু, স্বামী রতন মিয়া।

একইভাবে ২ নম্বর ইউনিয়নের কাশিপুর গ্রামের নারীরাও শীতলপাটি ও বাঁশের জিনিসপত্র তৈরি করে সংসার চালান। এখানকার অর্ধেকের বেশি নারীই পাটি বুননকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। এই গ্রামের কারিগররা হলেন—৬০ বছরের বৃদ্ধা রক্ষী রানী, সুবর্ণা সরকার, স্মৃতি রানী, বেদনা রানী, কিমুতল রানী, পারুল বালা বিশ্বাস ও সোনালী। তারা জানান, শীতলপাটি দিয়ে মানুষের সেবা করলেও তাদের ভাগ্যের কোনো উন্নতি হয়নি।

পাটির পাশাপাশি বাঁশ-বেতের পণ্য

শুধু পাটিই নয়, এই নারীরা কুলা, চালুনি, টুকরি, ডালা, মাথাল, হাতপাখা, মোড়া ও ধামাও তৈরি করেন। স্থানীয় হাটে বিক্রি করে বাড়তি আয় হয়। তবে পাটির চাহিদা বেশি থাকায় বেশিরভাগ নারীই এখন পাটি বুননকেই প্রধান পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

কাঁচামাল সংকট আর দাদনের বেড়াজাল

স্থানীয়ভাবে মুর্তার চাষ হলেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। পুরুষরা বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে মুর্তা আনলেও টাকার জোগান দিতে হয় নারীদের। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে মুর্তা কিনতে হয়। বছর শেষে ঋণ শোধ করতে গিয়ে তারা দিশেহারা হয়ে যান।

হারিয়ে যাচ্ছে শীতলপাটি

শীতল পাটির কারিগর পারুল বালা বিশ্বাস বলেন, একটি শীতল পাটি বুনতে প্রায় ১১-১২ দিন সময় লাগে। এর কাঁচামালের খরচ ৬০০-৭০০ টাকা। উৎকৃষ্ট মুর্তার দাম বেশি। বিক্রি হয় ১৯০০-২০০০ টাকায়। কিন্তু পরিশ্রমের তুলনায় লাভ খুবই কম। তাই নতুনরা আর এই কাজে আসতে চায় না।

তিনি আরো বলেন, প্রায় ২৫ বছর ধরে শীতলপাটি বুনছি। পঙ্গু স্বামী, দুই ছেলে ও এক মেয়ের সংসারের একমাত্র আমিই উপার্জনক্ষম।

বিশ্ব ঐতিহ্য হয়েও অবহেলিত

শীতলপাটি বাংলার সুপ্রাচীন কুটিরশিল্প। ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেসকো একে বিশ্ব নির্বস্তুক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান দেয়। ‘চন্দনের গন্ধভরা, শীতল করা, ক্লান্তি-হরা’খ্যাত এই শিল্প আমাদের সভ্যতার অংশ।

তবে ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও মাঠপর্যায়ের এই কারিগর নারীরা কোনো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাননি।

সরকারি সহায়তা দাবি করে পারুল বালা বিশ্বাস বলেন, পৃষ্ঠপোষকতা পেলে শীতলপাটি তৈরির উৎসাহ বাড়বে। স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান হবে, নারীদের বেকারত্ব দূর হবে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি সম্ভব।

সাওয়ানার আন্তর্জাতিক রোলার স্কেটিংয়ে গৌরবময় সাফল্য

গরিবের ভরসা রূপা-চায়না দুই বোন

নিরাপদ জীবন ও সুস্বাস্থ্য ডিজিটাল সুরক্ষায় সচেতনতা

বাঁশশিল্পে ৪০ হাজার নারীর জীবন-জীবিকা

আয়েশার স্বপ্নপূরণ

বিষণ্ণতায় নারীরা বেশি ঝুঁকিতে

জীবনের লক্ষ্য ও বাস্তবতা নিয়ে তরুণীদের ভাবনা

আত্মবিশ্বাসেই এগিয়ে যাচ্ছেন নারী চালকেরা

সুঁইয়ের ফোঁড়ে স্বপ্ন বুনছেন আত্মপ্রত্যয়ী ফাতেমা

কর্মজীবী নারীর প্রতিদিনের মানসিক সংগ্রাম