আজকের নারী ঘর-সংসার সামলাচ্ছেন, পাশাপাশি পেশাগত জীবনে সফলতার জন্য প্রতিদিন লড়ছেন। কর্মজীবী নারী হোন বা গৃহিণী—সবাই নিজের দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত। কিন্তু এই দায়িত্ব পালনের মধ্যেই শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ মেরুদণ্ড বা স্পাইন নীরবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা অনেকেই বুঝতে পারেন না।
মেরুদণ্ড আমাদের শরীরের মূল কাঠামো। এটি শুধু দাঁড়ানো বা হাঁটার শক্তিই দেয় না, বরং শরীরের ভারসাম্য, চলাচল ও স্নায়ুর কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই মেরুদণ্ডের সমস্যা দেখা দিলে পুরো শরীরেই নানা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে, যা নারীদের জীবনের প্রতিটি দিককে প্রভাবিত করে।
নারীদের মধ্যে স্পাইন সমস্যার বৃদ্ধি
গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীরা মেরুদণ্ডের ব্যথায় প্রায় দ্বিগুণ বেশি ভোগেন। এর পেছনে রয়েছে শারীরিক কাঠামোর পার্থক্য, হরমোনের প্রভাব, সন্তান ধারণ ও দৈনন্দিন কাজের ধরন।
বিশেষ করে গৃহিণীদের ক্ষেত্রে ভারী গৃহস্থালি কাজ, বারবার বালতি বা হাঁড়ি তোলা, শিশুকে কোলে নেওয়া, দুধ খাওয়ানো ইত্যাদি কাজের সময় ভুল দেহভঙ্গি কোমরে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। আবার অফিসে কর্মরত নারীরা সারাদিন কম্পিউটারের সামনে বসে থাকেন, যা ঘাড় ও পিঠে ব্যথা এবং অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
নারীদের মেরুদণ্ডের সমস্যার প্রধান কারণ
১. হরমোনের পরিবর্তন : মেনোপজের পর ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে গেলে হাড়ের ঘনত্ব হ্রাস ও অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়ে।
২. ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি : এসব পুষ্টি উপাদানের অভাবে হাড় দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
৩. গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মদান : ওজন ও শরীরের ভারকেন্দ্রের পরিবর্তন এবং শিশুকে কোলে নেওয়ার কারণে কোমরব্যথা হতে পারে।
৪. দীর্ঘক্ষণ একই অবস্থানে থাকা : দীর্ঘসময় বসে বা দাঁড়িয়ে কাজ করলে পিঠ ও কোমরের পেশিতে চাপ পড়ে।
৫. অতিরিক্ত ওজন : স্থূলতা মেরুদণ্ড ও কোমরের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
৬. ভুল দেহভঙ্গি : ঘাড় নিচু করে মোবাইল দেখা বা ঝুঁকে বসার কারণে ঘাড় ও পিঠে ব্যথা হতে পারে।
৭. মানসিক চাপ ও ঘুমের অভাব : এগুলো পেশিতে টান ও ব্যথার অনুভূতি বাড়িয়ে দিতে পারে।
৮. উচ্চ হিলের জুতা : দীর্ঘসময় উঁচু হিল পরলে হাঁটার ধরন ও শরীরের ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে।
৯. ভুলভাবে ভারী জিনিস তোলা : কোমর বাঁকিয়ে ভার তুললে পেশিতে টান ও তীব্র ব্যথা হতে পারে।
১০. ব্যায়ামের অভাব : পিঠ ও পেটের পেশি দুর্বল হলে মেরুদণ্ডের স্থিতিশীলতা কমতে পারে।
১১. অস্টিওপোরোসিস : হাড়ের ঘনত্ব কমে মেরুদণ্ডের কশেরুকা ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
১২. মেরুদণ্ডের ডিস্কের সমস্যা : ডিস্কের ক্ষয় বা হার্নিয়েশনের কারণে কোমরব্যথা ও স্নায়বিক সমস্যা হতে পারে।
১৩. দীর্ঘস্থায়ী রোগ ও বয়সজনিত পরিবর্তন : আর্থ্রাইটিসসহ বিভিন্ন রোগ মেরুদণ্ডে ব্যথা ও চলাচলে অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে।
১৪. অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, জন্মগত ত্রুটি ও মেরুদণ্ডের বক্রতা : ধূমপান, অপুষ্টি ও নিষ্ক্রিয়তা হাড় ও ডিস্কের স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। স্কোলিওসিসসহ মেরুদণ্ডের গঠনগত সমস্যায় পিঠব্যথা ও চলাচলে অসুবিধা হতে পারে।
বিশেষ সতর্কতা : মেরুদণ্ডের ব্যথার সঙ্গে পা দুর্বল হয়ে যাওয়া, কুঁচকির আশপাশ অবশ হওয়া বা প্রস্রাব-পায়খানা নিয়ন্ত্রণে নতুন সমস্যা দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।