কত দিন সমুদ্র দেখা হয়নি—এই না-পাওয়ার হাহাকারটা মনের ভেতর জমে জমে এক ধরনের নীরব অস্থিরতায় রূপ নিয়েছিল। নোনাজলের স্পর্শের জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকা মনটা যেন সময়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে এক কোণে আফসোসের নীরব বাসা বেঁধেছিল।
হঠাৎ এক পারিবারিক প্রয়োজনে ঢাকায় যাওয়া আর সেই সুযোগটাই আনন্দে ভরিয়ে তোলার এক অদম্য ইচ্ছা। যতটুকু সময় পেয়েছি, প্রতিটি মুহূর্তকে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছি। ঠিক তখনই যেন হাওয়া বদলের মতো একটি সিদ্ধান্ত—‘চলো মাওয়া যাই!’ ভাবনা আর কাজের মধ্যে কোনো ফারাক রইল না; গভীর রাতে ছুটে চলা শুরু হলো।
গাড়ির ভেতর হাসি, গান আর উচ্ছ্বাসের ঢেউ; একের পর এক গানের সুরে সবাই মেতে উঠেছে, আমিও হারিয়ে গেছি সেই সুরের ভেলায়। জানালার কাচ নামিয়ে দিলাম—হাইওয়ের স্নিগ্ধ বাতাস এসে গাল ছুঁয়ে দিল, যেন সুরের সঙ্গে মিশে এক অনির্বচনীয় প্রশান্তি তৈরি করল। সেই অনুভূতি—ভাষা যেন সেখানে অক্ষম হয়ে পড়ে।
রাত দেড়টার দিকে মাওয়ায় পৌঁছানো। পদ্মার বিস্তীর্ণ জলরাশি অন্ধকারে এক রহস্যময় সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিশাল ঢেউ না দেখলেও, ছোট ছোট ঢেউয়ের মৃদু ছোঁয়ায় যেন মনের গভীরে জমে থাকা সমুদ্রের অপূর্ণতা কিছুটা হলেও প্রশমিত হলো। পাড় ধরে হাঁটা, পা ডুবিয়ে রাখা—মনে হলো, এই জলই যেন দূরের সেই কাঙ্ক্ষিত সমুদ্রেরই কোনো দূত।
পদ্মার বাতাসে এক অদ্ভুত ঘ্রাণ—যেন ইতিহাস, প্রকৃতি আর স্বাদের এক অপূর্ব মিশেল। আর পদ্মা মানেই তো ইলিশের গল্প। তাই মাওয়া এসে ইলিশ না খাওয়া যেন এক অসম্পূর্ণতা! ভোররাত ৩টায় গরম ভাত, ইলিশ ভাজা আর ভর্তা—ক্ষুধা আর আনন্দ একসঙ্গে মিশে গোগ্রাসে খেয়ে নিলাম। সেই মুহূর্ত—পদ্মা, ইলিশ আর গভীর রাত—এক অনন্য সমন্বয়, যেন স্মৃতির অ্যালবামে সোনালি অক্ষরে লেখা হয়ে থাকার মতো।
রাত যত গভীর, মানুষের আনাগোনা ততই বাড়ছে। অচেনা মানুষগুলোর মধ্যেও এক অদ্ভুত প্রাণচাঞ্চল্য—সবাই যেন নিজ নিজ গল্পে বুঁদ হয়ে আছে। চারপাশে জীবন তার নিজস্ব ছন্দে বয়ে চলেছে।
ফেরার সময় এসে গেল; কিন্তু মন যেন বারবার টানছে—‘আরেকটু থাকি…’। এক কাপ চায়ের উষ্ণতায় বিদায়ের প্রস্তুতি নিলেও, হৃদয়টা রয়ে গেল সেই পানির ধারে।
মধ্যরাতের চাঁদ, পদ্মার ঢেউ আর প্রিয় মানুষগুলোর সান্নিধ্য—সব মিলিয়ে যেন এক স্বর্গীয় অনুভূতি। মনে হচ্ছিল, যদি এই মুহূর্তগুলো কোনো বাক্সে ভরে চিরদিনের জন্য রেখে দেওয়া যেত!
শেষমেশ মন শুধু এটুকুই বলে—
‘ইচ্ছে করে বারবার ছুটে যাই সেই পানির কাছে, হারিয়ে যাই তার গভীরতায়… যেখানে বাস্তব আর অনুভূতির সীমারেখা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।’