হোম > সাহিত্য সাময়িকী > বাংলার ইতিহাস

সুলতানি ও মোগল আমলে ওয়াকফ ব্যবস্থাপনা

বাংলায় ওয়াকফ সম্পত্তি

ড. খোন্দকার আলমগীর

বড় কাটরার রক্ষণাবেক্ষণ ও দরিদ্রদের কল্যাণে ব্যয় করার জন্য পাশের ২২টি দোকান ওয়াকফ করা হয়েছিল

আওকাফ হলো আরবি ওয়াকফ শব্দের বহুবচন। অভিধান অনুযায়ী, ওয়াকফ মানে হলো—‘একটি অবিচ্ছেদ্য বা হস্তান্তর অযোগ্য উত্তরাধিকার বা উপহার’। ওয়াকফ হলো ‘কোনো মুসলিম কর্তৃক ধর্মীয়, শিক্ষামূলক বা দাতব্য উদ্দেশ্যে করা কোনো দান’। পবিত্র কোরআনে ওয়াকফ সম্পর্কে সরাসরি কোনো নির্দেশ নেই; এটি বেশ কয়েকটি হাদিস থেকে উদ্ভূত হয়েছে। তবে কোরআনে সদকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ওয়াকফ হলো একধরনের সদকা। সম্পত্তি, ব্যবসা বা নগদ অর্থ ওয়াকফ করা যেতে পারে। যিনি এ ধরনের দান করেন, তাকে ওয়াকিফ বলা হয়। খ্রিষ্টান বিশ্বে এটিকে ‘উত্তরাধিকার দান’ (bequest) এবং হিন্দুরা একে ‘দেবোত্তর’ সম্পত্তি বলে।

সুলতানি ও মোগল আমলে বাংলায় ওয়াকফ

মুসলিম শাসনের সময়ে বাংলায় ওয়াকফ সম্পত্তির ইতিহাস আলোচনার জন্য উপমহাদেশের ওয়াকফ সম্পত্তির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস জানা প্রয়োজন। দিল্লির সুলতানরা অনেক ওয়াকফ সৃষ্টি করেছিলেন। ইতিহাসের সূত্রে জানা যায়, সুলতান মুইজউদ্দিন মুহাম্মদ সাম ঘুরি মুলতানের জামে মসজিদের জন্য দুটি গ্রাম দান করেছিলেন এবং এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব শায়খুল ইসলামকে দিয়েছিলেন। অন্য একটি ওয়াকফ করেছিলেন সুলতান জালালউদ্দিন খিলজি (১২৯০-৯৬) তালবিনা মসজিদের জন্য। তারিখে ফিরোজশাহীতে ওয়াকফের উল্লেখ পাওয়া যায়। ভারতে ওয়াকফ প্রতিষ্ঠায় সুফিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। খিলজিদের পর পরবর্তী রাজবংশের সুলতানরাও ওয়াকফ হিসেবে সম্পত্তি দান করেন। লোদি সুলতানরা ব্যতিক্রমীভাবে দানশীল ছিলেন এবং তারা এই জমির প্রশাসকদের অধিকারের ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন।

মোগল শাসকরাও জ্ঞানী ও ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের জনহিতকর উদ্দেশ্যে অনুদান দিতেন। এগুলো নগদে (ওয়াজিফা) বা খাজনামুক্ত (লা খিরাজ) জমি (সুয়ুরগল, মিলক বা মদদে মাআশ) হিসেবে দেওয়া হতো। যদি প্রশাসকদের উত্তরাধিকারীরা জ্ঞানী ও ধর্মপ্রাণ হতেন, তবে এই জমিগুলো বংশানুক্রমিক হয়ে যেত। এই জমিগুলো জায়গির থেকে আলাদা ছিল। ইরফান হাবিবের মতে, এই ওয়াকফগুলোর সুবিধাভোগী কোনো ব্যক্তি ছিলেন না, বরং প্রতিষ্ঠান ছিল। মাজার ও মাদরাসার রক্ষণাবেক্ষণ এবং কর্মচারীদের জীবিকা নির্বাহের জন্য নির্দিষ্ট জমির রাজস্ব স্থায়ীভাবে ওয়াকফ হিসেবে বরাদ্দ করা হতো।

রিচার্ড এম ইটন বলেন, ‘এই অনুদানগুলোয় ইসলামি ওয়াকফ এবং ব্যক্তিগত অনুদান, উভয়েরই উপাদান লক্ষ করা যায়। নীতিগতভাবে ওয়াকফ ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ও স্থায়ী; অন্যদিকে ইনআম বা মাদাদে মাআশের মতো অনুদানগুলো ছিল ব্যক্তিগত ও পরিবর্তনযোগ্য (প্রত্যাহারযোগ্য)। ...সুতরাং, আমরা যে অনুদানগুলো বিবেচনা করছি, সেগুলো প্রাতিষ্ঠানিক ও স্থায়ী প্রকৃতির দিক থেকে ওয়াকফ অনুদানের সদৃশ ছিল এবং গ্রহীতার বংশধরদের মাধ্যমে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়ার দিক থেকে ইনআম বা মাদাদে মাআশ অনুদানের মতো ছিল।

ফজলে রাব্বী বলেন, ‘মুসলিম শাসনামলে প্রথাটি এমন ছিল যে, উচ্চপদস্থ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং নগদ অর্থ ও ভাতার পরিবর্তে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের রাষ্ট্র কর্তৃক জায়গির, তামগা, আইমা এবং মাদাদে মাআশ প্রদান করা হতো। নিয়ম অনুযায়ী, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের জায়গির ও তামগা দেওয়া হতো; আর পণ্ডিত, আধ্যাত্মিক নেতা এবং সম্ভ্রান্ত বংশীয় ব্যক্তিদের আইমা ও মাদাদে মাআশ দেওয়া হতো। ...প্রধানত উচ্চবংশীয় এবং ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের চিরস্থায়ীভাবে আইমা ও মাদাদে মাআশ দেওয়া হতো। এই অনুদানগুলো ছাড়াও, পবিত্র মাজার, মসজিদ এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে লা খিরাজ জমি বরাদ্দ করা হতো।’

সম্রাট আকবর (১৫৫৬-১৬০৫) আজমীরে খাজা মঈনউদ্দিন চিশতির দরগাহর জন্য ১৮টি গ্রাম ওয়াকফ করেছিলেন। ১৫৭৭ সালে তিনি কনৌজে মাহমুদ বুরাকির মাজার শরিফের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অনুদান দেন। এছাড়া আকবর একটি মাদরাসার শিক্ষকদের ভাতা মেটানোর জন্য দুটি গ্রাম ওয়াকফ করেন। শাহজাহানের আমলে তাজমহলের ব্যয় নির্বাহের জন্য ৩০টি গ্রামের রাজস্ব, তৎসংলগ্ন দোকানপাট এবং এর কাছাকাছি নির্মিত সরাইখানার সম্পত্তি ওয়াকফ করা হয়েছিল।

মুসলিম-পূর্ব আমলের বাংলা থেকে জমি অনুদান সম্পর্কিত অনেক প্রাচীন শিলালিপি পাওয়া গেছে। এগুলোকে ‘দেবোত্তর’ বলা হতো।

বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা থেকেই ওয়াকফ সম্পত্তির মাধ্যমে পরিচালিত মসজিদ, মাদরাসা এবং খানকার মতো অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। শাসকরা ধর্মীয় ব্যক্তিদের জমি অনুদান দিতেন, যার উদ্দেশ্য ছিল তাদের জীবিকা নির্বাহ এবং শিক্ষামূলক ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের রক্ষণাবেক্ষণ। বাংলার প্রথম (কিংবা দ্বিতীয়) শিলালিপিটি হলো সুলতান গিয়াসউদ্দীন ইওয়াজ খিলজির (১২১২-২৭) বীরভূমের সিয়ান শিলালিপি (১২২১), যা আহলুস সুফফা বা সুফি তরিকার মানুষদের খানকার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। জেড এ দেশাইয়ের মতে, শুধু বীরভূমের সিয়ান শিলালিপিতেই খানকার উল্লেখ পাওয়া যায়, তবে ড. আবদুল করিম এই মতটিকে ভুল মনে করেন এবং অভিমত দেন, নওগাঁর শীতলমট শিলালিপিও (সুলতান মুগিসউদ্দীন ইউজবকের আমল, ১২৫০-৫৭) একটি পবিত্র ভবন বা খানকাকে নির্দেশ করে।

এই শিলালিপিতে পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত সুরা বাকারার ১৮১ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করা হয়েছে। এই শিলালিপিতে আরো বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি এই কাঠামোর ভিত্তি পরিবর্তন করবে বা এটির ক্ষতি করবে, তার ওপর লানত ও অভিশাপ। ইউসুফ সিদ্দিক লক্ষ করেছেন, একই আয়াত গৌড়ের অন্য একটি মসজিদ শিলালিপিতেও (১৪৮৭ সালের) দেখা যায়, যা বর্তমানে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রয়েছে। এছাড়া অন্যত্র আরো বেশ কিছু দান-সংক্রান্ত শিলালিপিতে এই আয়াতটি পাওয়া যায়।

বাংলার মাদরাসাগুলোর সাধারণত মদদে মাআশ (সাহায্য বা জীবিকা নির্বাহের) জমি থাকত। তবে ১৩ শতকে রাজশাহীর মহিসুনের মাওলানা তকিউদ্দীন আরাবি এবং ঢাকার কাছাকাছি সোনারগাঁয়ের মাওলানা শরাফুদ্দীন আবু তাওয়ামার (১৩০০) মাদরাসাগুলোর এ ধরনের জমির ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কিছু জানা যায় না। আব্দুল করিম মনে করেন, তাদেরও সম্ভবত মদদে মাআশ জমি ছিল। খানকাগুলোর সঙ্গে মাদরাসা, হাসপাতাল এবং দরিদ্র ও মুসাফিরদের জন্য মুসাফিরখানা যুক্ত থাকত। উনিশ শতকের অ্যাডাম রাজশাহীর বাঘাতে কয়েকশ বছরের পুরোনো একটি ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান খুঁজে পেয়েছিলেন। পাণ্ডুয়ার শেখ জালালউদ্দীন তাবরিজি (মৃত্যু ১২২৬/১২৪৪) বাংলায় একজন অত্যন্ত ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি তার সম্পত্তি ওয়াকফ করে যান, যা ‘বাইশ হাজারী’ নামে পরিচিত। এস জেড এইচ জাফরি মন্তব্য করেছেন, ‘মালদার পাণ্ডুয়ার বাইশ হাজারী এবং ছয় হাজারী ট্রাস্টগুলো ঔপনিবেশিক আমলের পূর্বে বিদ্যমান বিশাল আওকাফ বা ট্রাস্টগুলোর পরিধি সম্পর্কে ধারণা দেয়। ... বাইশ হাজারী দরগার আয়তন ছিল সাড়ে ১৬ বর্গমাইল বা প্রায় ১ লাখ বিঘা জমি। অন্যদিকে, শশ হাজারী এস্টেটটি ভানসারি পরগনার ৪৭টি গ্রাম নিয়ে গঠিত ছিল।’ জাফরি মনে করেন, এই বিশাল অনুদানগুলো পরবর্তী কর্তৃপক্ষ—অর্থাৎ মোগল শাসক এবং বাংলার নাজিমদের দ্বারা অনুমোদিত ও বহাল রাখা হয়েছিল।

বাগেরহাটে অবস্থিত খান জাহানের মসজিদ (ষাট গম্বুজ মসজিদ) ও নিকটবর্তী মাজার ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা (ইউনেসকো) কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৮০-এর দশকের প্রথম দিক পর্যন্ত এই মসজিদটি ঢাকা ওয়াকফ প্রশাসকের অধীনে একটি ওয়াকফ আলাল আওলাদ (সন্তান ও বংশধরদের কল্যাণে ওয়াকফ) ছিল। পরে এটি সরকারের অধীনে চলে যায় এবং ১৯৮৬ সালে এর দখল প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, এই মসজিদের মালিকরা, মুন্সী মোমিনউদ্দীন এবং অন্যরা ১৯১৬ সালের মে মাসে একটি চুক্তির মাধ্যমে দুই বিঘা আট কাঠা ছয় ছটাক জমিসহ এর মালিকানা সরকারের কাছে হস্তান্তর করেন। এই মসজিদটি সংরক্ষিত ঘোষণার গেজেট বিজ্ঞপ্তিটি পাওয়া গেলেও মূল চুক্তিপত্রটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, এই মসজিদের সংলগ্ন এলাকার কিছু অংশ এখনো ঢাকা ওয়াকফ প্রশাসকের অধীনে রয়েছে এবং বাগেরহাট সদর উপজেলা এর মোতাওয়াল্লি হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশের সিলেটের মোখতারপুর পরগনার অন্তর্গত তিলাপাড়া গ্রামে সুলতান শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহের আমলের একটি শিলালিপি পাওয়া গেছে। এই শিলালিপি অনুযায়ী, ১৪৭৯ সালে তার উজির মালিক সিকান্দার একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই মসজিদের নিজস্ব ওয়াকফ জমি ছিল। শিলালিপিতে বলা হয়েছে, যে কেউ এই মসজিদের ওয়াকফ সম্পত্তি দখল বা আত্মসাৎ করবে, সে মারদুদ (প্রত্যাখ্যাত, অধম, ঘৃণ্য বা জঘন্য) হবে। একই শিলালিপিতে আরো খোদাই করা রয়েছে, যে ব্যক্তি এই ওয়াকফ সম্পত্তি দখল বা আত্মসাৎ করবে, সে পরজন্মে গাধার সন্তান হিসেবে অভিশপ্ত হবে।

সুলতান আলাউদ্দীন হোসেইন শাহর শাসনকালে তিনি ধর্মীয় নেতাদের অনেক নিষ্কর জমি (rent-free lands) বরাদ্দ দিয়েছিলেন। তিনি সম্ভবত হজরত নূর কুতুবুল আলমের দরগাহ শরিফের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য লা খিরাজ সম্পত্তি হিসেবে ৪৭টি গ্রাম দান করেছিলেন। এই ওয়াকফের মূল দলিলটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পরে শাহ সুজা আগের দলিলটিকে বৈধতা দিয়ে নতুন আরেকটি দলিল দেন। শাহ সুজার দেওয়া সেই দলিলের তারিখটি ছিল সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বের ২২তম বছর (১৬৪৮ সাল)।

বাঘা এস্টেটের ওয়াকফটি সম্রাট শাহজাহানের স্বাক্ষরযুক্ত দুটি পৃথক রাজকীয় সনদ বা অনুদানের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছিল। এই সনদগুলোর সময়কাল ১৬৪০ থেকে ১৬৪৬ সালের মধ্যবর্তী। সনদে উল্লিখিত শর্তাবলি থেকে জানা যায়, বাঘা ওয়াকফটি মূলত মসজিদ, মাদরাসা এবং অন্যান্য জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছিল।

আরেকটি ভূমি অনুদানের তথ্য অনুযায়ী, এমনকি ঊনবিংশ শতাব্দীতেও বাংলাদেশের নওগাঁর মাহী সন্তোষে ২,৭৫০ বিঘা জমির আয় থেকে একটি মসজিদ, একটি মাদরাসা এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হতো। বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জের নবগ্রামে সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহর (১৪৩৫-৫৯) আমল থেকে একটি ওয়াকফ এস্টেট ছিল।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের পীর বাহরাম সাক্কার মাজারের জন্য সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬০৬ সালে ‘ফকিরপুর’ গ্রামটি মদদে মাআশ হিসেবে দান করেছিলেন এবং শেখ বখতিয়ারকে এর মোতাওয়াল্লি নিযুক্ত করা হয়েছিল। পরে ব্রিটিশরা এই উৎসর্গী করা বা ওয়াকফ সম্পত্তিটি বাজেয়াপ্ত করে এবং এটি বর্ধমানের মহারাজার জমিদারির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর বিনিময়ে মহারাজা পীর বাহরামের দরগাহর মোতাওয়াল্লিকে ৪১ টাকা, দুই আনা এবং ৪ পয়সা দিতেন।

১৭ শতকের শুরুর দিকে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময়ে মাওলানা জিয়াউদ্দীন কর্তৃক সিলেট শহরে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মোগল সম্রাটরা এর জন্য নিষ্কর জমি দান করেছিলেন এবং সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, মুফতি আজিম ছিলেন এই জমির প্রাপক। হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা এখানে পড়াশোনা করত। ফস্টারের স্মৃতিকথায় উল্লেখ রয়েছে, ১৮২৭ সালেও এই মাদরাসাটির অস্তিত্ব ছিল। ১৮৩৬ সালে আদালতে ফারসি ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষা প্রতিস্থাপন করা হয় এবং এর ফলে ১৮৩৭ সালে এই মাদরাসাটি বন্ধ হয়ে যায়। অধিকন্তু মুহম্মদ মোহর আলী লক্ষ করেছেন, বাংলায় মোগলদের আগমনের সময়ে, সেখানে এমন অনেক অযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন, যারা পেনশন এবং মদদে মাআশ জমি ভোগ করছিলেন। মীর জুমলা শুধু সেই পুণ্যবান বা যোগ্য আইমাদার (aimadars), উপবৃত্তিধারী এবং অন্যদের জায়গির বহাল রেখেছিলেন, যারা সরাসরি সম্রাটের কাছ থেকে রাজকীয় ফরমান পেয়েছিলেন; কিন্তু বাদবাকিদের ক্ষেত্রে তিনি প্রধান সদর কাজী রিজভীর পরামর্শে খাসজমি (crown-lands) ও জায়গিরের অন্তর্ভুক্ত তাদের পেনশন এবং মদদে মাআশ অনুদান বাতিল করে দেন।

ঢাকার বড় কাটরাও সুলতান শাহ সুজার একটি ওয়াকফ সম্পত্তি ছিল, যার শাসনকাল ছিল ১৬১৬ থেকে ১৬৬১ সাল পর্যন্ত। আব্দুল করিম লক্ষ করেছেন, ‘শিলালিপির শব্দচয়ন প্রমাণ করে এটি একটি ওয়াকফনামা বা উৎসর্গীকরণ দলিল ছিল।’ একটি ফারসি শিলালিপি থেকে জানা যায়, ‘শুভ কাঠামোর এই ভবনটি, তৎসংলগ্ন ২২টি দোকানসহ এই শর্তে (ওয়াকফ করা হলো) যে, ওয়াকফ পরিচালনাকারীরা এগুলোর ভাড়া থেকে প্রাপ্ত আয় এর মেরামতকাজে এবং দরিদ্রদের কল্যাণে ব্যয় করবেন। যদি কোনো দরিদ্র ব্যক্তি এখানে এসে ওঠেন, তবে তার থাকার জন্য কোনো ভাড়া নেওয়া হবে না।’

ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত কদম রসুল ভবনটি মোগল-পূর্ব আমলের একটি স্থাপনা। ঢাকা কালেক্টরেটে সংরক্ষিত নথিপত্র থেকে জানা গেছে, শাহ সুজা এই মাজারের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৮০ বিঘা জমি বরাদ্দ করেছিলেন। তাইফুর লক্ষ করেছেন, স্যার খাজা আহসানুল্লাহ বাহাদুরের ওয়াকফ এস্টেটের অনুদানের আয় থেকে ঢাকার খাজা আম্বর মসজিদটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো। ঢাকার নবাব স্যার আব্দুল গনি (১৮১৩-৯৬) লালবাগ কেল্লার দক্ষিণ গেটসংলগ্ন ফররুখশিয়ার (২০ আগস্ট, ১৬৮৫—১৯ এপ্রিল, ১৭১৯) মসজিদের ছাদ নির্মাণের জন্য একটি বিশাল অঙ্কের অর্থ দান করেছিলেন।

মানিকগঞ্জের ঔরঙ্গাবাদ বাজারের নয়াবাড়ী গ্রামের কাছাকাছি কোনো এক স্থান থেকে প্রাপ্ত নয়াবাড়ী মসজিদের শিলালিপি (১৫৯৫) থেকে জানা গেছে, হাজি ভাগল খান ঢাকার দোহার মসজিদের জন্য ৫০০ বিঘা (১ বিঘা = ১ হাজার ৬০০ বর্গ গজ) জমি এবং সিলেটের বুড়ারচর মসজিদের জন্য ৫০০ বিঘা জমি দান করেছিলেন (১৫৯১ সালে)। এই দুটি মসজিদের জন্য ওয়াকফ হিসেবে দেওয়া জমির পরিমাণ ছিল ১ হাজার বিঘা (৩২ হাজার বর্গ গজ)। যে কেউ এই মসজিদগুলোর জমি আত্মসাৎ করবে, তার প্রতি এই শিলালিপিতে অভিশাপ দেওয়া হয়েছে। ইউসুফ সিদ্দিক এই শিলালিপিটিকে মোগল আমলে বাংলায় অনুদান করা মদদে মাআশ জমির সবচেয়ে প্রাচীন শিলালিপি রেকর্ড হিসেবে গণ্য করেছেন। তবে আগে উল্লেখ করা হয়েছে, সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৫৬২ সালেই পীর বাহরাম সাক্কার মাজারের জন্য ‘ফকিরপুর’ গ্রামটি মদদে মাআশ হিসেবে দান করেছিলেন।

সূচনালগ্ন থেকেই বিশ্বজুড়ে ওয়াকফ সম্পত্তির অপব্যবহার একটি সাধারণ ঘটনা। একজন গবেষক উল্লেখ করেছেন, ‘শিলালিপিগুলো ওয়াকফ সম্পত্তির অপব্যবহার, আত্মসাৎ এবং শোষণের বিষয়েও অত্যন্ত সোচ্চার।’ বাংলাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। উপরে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলার কিছু ওয়াকফ শিলালিপিতে অভিশাপমূলক বাক্য পাওয়া গেছে। যদিও এগুলো পুণ্য বা সৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছিল, তবু সম্পত্তি (বিশেষ করে ধর্মীয় সম্পত্তি) আত্মসাৎ থেকে রক্ষা করার জন্য অশালীন, নোংরা ও আপত্তিকর শব্দ এবং সেই সঙ্গে জাল বা অপ্রামাণিক হাদিসের ব্যবহার কোনো সঠিক পদ্ধতি নয়। এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলামের একজন লেখক মন্তব্য করেছেন, ‘এসব কিছুও শেষ পর্যন্ত ওয়াকফ এস্টেটগুলোর আত্মসাৎ এবং অপচয় স্থায়ীভাবে রোধ করতে পারেনি।’

পশ্চিম তীরে বাস্তুচ্যুত শতাধিক ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়

চালু হলো পিংক ‘মহিলা বাস’

চিকিৎসা শেষে আর ফেরা হলো না সাতক্ষীরার সাজু ও রেবুতির

দক্ষতা উন্নয়নে গ্রিন ভয়েসের অঙ্গসংগঠন বহ্নিশিখা

ডিম্বাশয়ের সিস্ট : অবহেলা নয় জটিলতা এড়াতে চাই সতর্কতা

‘কথা ছিল ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার হবে, স্বাধীনভাবে সবাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে’

দারিদ্র্যকে হার মানিয়েছে জিপিএ-৫ পাওয়া ফুলবাড়ীর পলাশ

রামচন্দ্র খাঁর রাজবাড়ী: ইতিহাস ও প্রত্নচিহ্নের সন্ধানে

ভোট দিয়েছেন স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতা

ট্রাম্প-কিম বৈঠক এ বছরই, যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কে নতুন মোড়