‘আমার কালের কথা’
বর্তমান বিশ্বে প্রায় সকল দেশে পারিপার্শ্বিক অবস্থার চাপে এবং বিভিন্ন কারণে পরিস্থিতির ক্রমাগত পরিবর্তন হচ্ছে। পরিবর্তিত হচ্ছে মন-মানসিকতা এবং জীবনের মূল্যবোধের। এই পরিবর্তনের গোড়ায় নাড়া দিয়ে সহজাত প্রবৃত্তি ও চেতনাকে ফিরিয়ে এনে জাতির গঠন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেন কবি-সাহিত্যিকরা তাদের কবিতা, গল্প ও উপন্যাস রচনার মধ্য দিয়ে, আর শিল্পীরা তাদের শৈল্পিক অবদানের মাধ্যমে। ঐতিহাসিকরা অতীতের কথা তুলে ধরে জাতিগঠনে সাহায্য করেন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাপ্রসূত বিভিন্ন যুগের সমাজচিত্র অঙ্কিত করেন কিছু ব্যক্তি স্মৃতিকথার মাধ্যমে। জাতিগঠনে এসব স্মৃতিকথার মূল্য অপরিসীম।
ভাষাসৈনিক অধ্যাপক আবদুল গফুরের (১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯২৯ – ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪) ‘আমার কালের কথা’ গ্রন্থটি তার স্মৃতি রোমন্থনের প্রথম খণ্ড। ধারাবাহিকভাবে একসময় দৈনিক ইনকিলাব-এ প্রকাশিত হতো। ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১ম খণ্ড গ্রন্থাকারে বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লি. থেকে প্রকাশিত হয়। ২য় খণ্ড আর আলোর মুখ দেখেনি। এ গ্রন্থে পরিবেশিত হয়েছে তার শৈশব থেকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার (১৯৪৭) সময় পর্যন্ত কালের কথা। এই সময়টা ছিল বাংলা-ভারত-পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের যুগ। এই হাওয়া বদলের পালায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লেখক তার স্বভাবসিদ্ধ সরল ভাষায় এ গ্রন্থে যা বর্ণনা করেছেন, তা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী।
তিনি গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে সামাজিক প্রেক্ষাপটের নানা ভিন্নতাকে লক্ষ করতে লাগলেন। তিনি দেখলেন, নগরজীবনে স্থায়ী ভূমিকা রাখতে হলে পুরোনো কথা শোনার প্রয়োজন আছে। কেননা, তার সাহায্যে আমরা আমাদের অতীতকে চিহ্নিত করতে পারি এবং বর্তমানের জন্য মূল্যবোধের পাটাতন নির্মাণ করতে পারি। আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে ব্রিটিশ শাসন থেকে পাকিস্তানি শাসনের উত্তরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল। ব্রিটিশ শাসন চলে যাওয়ার পর ভারতীয় ভূখণ্ডে একটি নতুন অখণ্ড ব্যবস্থাপনা তৈরি হয়নি। ভারত বিভক্ত হয়েছিল এবং আমরা বিভক্ত ভারতের পূর্বাঞ্চলের অধিবাসীরা একটি নতুন প্রত্যাশার মধ্যে জেগেছিলাম, যাকে আমরা বাংলাদেশ বলে জানি। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর নতুন জন্মলগ্নে তার নাম হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান। একটি অপরিসীম বিশ্বাসে আমরা মনে করেছিলাম, আমাদের নতুন জীবনে একটি সমৃদ্ধি আসবে এবং দেশের সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে বসবাস করতে পারবে। আজকে যাদের বয়স আশি কিংবা তারও বেশি, তাদের সবাই একসময় নতুন প্রত্যাশার মধ্যে জেগেছিল; কিন্তু নানা কারণে তাদের প্রত্যাশাগুলো ভেঙে গিয়েছিল এবং তারা যা আশা করেছিল তা পায়নি। এই না পাওয়ার ইতিহাসটি আমাদের জানার প্রয়োজন আছে। আরো জানার প্রয়োজন যে, আমাদের প্রত্যাশা পূর্ণ যে হলো না সেজন্য কে বা কারা দায়ী? আমাদের অহমিকাবোধ ছিল, কিন্তু অহমিকাকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থাপনা আমাদের জানা ছিল না। তাই আমাদের নতুন ইচ্ছার জন্ম হয়েছে; কিন্তু ইচ্ছাটি কখনো সফল হতে পারেনি। এই ইচ্ছার দুটি পর্যায় আছে। একটি হচ্ছে পাক-ভারত ভূমণ্ডলে ব্রিটিশদের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নির্মাণ। দ্বিতীয় হচ্ছে নতুন প্রেক্ষাপট যথার্থরূপে গড়ে ওঠার আগেই নিজেদের মধ্যে বিরোধিতার সূত্রপাত এবং একটি দুঃখজনক অবিশ্বাসের জন্ম। তবে প্রথম পর্বের ইতিহাসটি পুরোপুরি না জানলে পরবর্তী পর্যায়ের নতুন অবস্থাটি অনুভব করা যাবে না। আবদুল গফুরের ‘আমার কালের কথা’ নামক স্মৃতিমূলক গ্রন্থে প্রথম পর্বের ইতিহাসটি ধরা পড়েছে। লেখক তার নিজের শৈশবকালীন পরিবেশ ও জীবনধারা বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেছেন এবং ক্রমেই পাকিস্তান আন্দোলনের পটভূমি বিশ্লেষণ করেছেন। শহরের জীবন, সংকট ও কোলাহল গ্রাম থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তার আলোচনার মধ্যে গ্রামীণ জীবনের স্বভাব, বৈশিষ্ট্য এবং প্রাকৃতিক ঔদার্য যেমন এসেছে, তেমনি আবার নগরের নির্মাণাধীন নতুন বলয়ের মধ্যে অন্য একটি জীবনকে মূর্ত হতে দেখেছেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে নানা ধরনের রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনার জন্ম হতে দেখেছেন। হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্যের অভাব লক্ষ করেছেন এবং সর্বত্র একটি অস্থির প্রপঞ্চ তাকে বিচলিত করেছে। আবদুল গফুর খুব সহজ ও সরল বিশ্বাসে তার বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। তার লেখার মধ্যে একটি সুন্দর গতিধারা পাওয়া যায়। আরো একটি বড় কথা, তার গ্রন্থের মধ্যে তাকে আমরা সমালোচক হিসেবে পাই না, পরিণামদর্শী দর্শক হিসেবে পাই।
অধ্যাপক আবদুল গফুর শতাধিক ছোটখাটো ঘটনার মধ্য দিয়ে তিনি তার সময়-কালের ইতিহাসকে এ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন। ঘটনাগুলো স্মৃতিকথার আলোকে সন্নিবেশন হলেও ইতিহাসের নির্যাস এবং রসদ এর মধ্যে বিদ্যমান। এ গ্রন্থের মাধ্যমে আমাদের জাতীয় জীবনের জন্য যে প্রেক্ষাপট তিনি নির্মাণ করেছেন, তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।