হোম > সাহিত্য সাময়িকী > প্রবন্ধ

নতুন যুগে কাজী নজরুল

আবু সাইদ কামাল

বাংলার ইতিহাসে ঔপনিবেশিক সময় ছিল গভীর সামাজিক রূপান্তরের সময়। বিশিষ্ট চিন্তাবিদ আহমদ শরীফ মনে করেন, ইংরেজ শাসকরা তাদের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে বিজিত মুসলমানদের দুর্বল করে এবং হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে শিক্ষা ও প্রশাসনিক সুবিধা দিয়ে শক্তিশালী করেছিল। এর ফলে বাংলার সামাজিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন ঘটে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব শুধু সাহিত্যিক ঘটনা নয়; এটি ছিল এক সাংস্কৃতিক ও মানসিক বিপ্লব।

নজরুলের আবির্ভাবের সময়টি ছিল রাজনৈতিক দাসত্ব, সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং বাঙালি মুসলমান সমাজের সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদতার যুগ। শিক্ষায়, সাহিত্যে ও আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় মুসলমান সমাজ তখন অনেকাংশে পিছিয়ে। এই প্রেক্ষাপটে পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজের জন্য নজরুলের সাহিত্য হয়ে ওঠে এক ধরনের জাগরণী শঙ্খধ্বনি। তিনি অতীতের গৌরব স্মরণ করিয়ে বর্তমানের অবক্ষয়কে প্রশ্ন করেছেন এবং ভবিষ্যতের আত্মমর্যাদাশীল জাতির স্বপ্ন দেখিয়েছেন।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মুসলিম চেতনা, সাম্যবাদী মানবতাবোধ এবং বিপ্লবী আত্মমর্যাদার যে সম্মিলিত কণ্ঠস্বর প্রথম সুসংহত রূপ লাভ করে, তার প্রধান রূপকার কাজী নজরুল ইসলাম। তার সাহিত্য একটি সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ, আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান এবং নিপীড়িত মানুষের মুক্তির আহ্বান।

তিনি উপমহাদেশের অবহেলিত, লাঞ্ছিত ও নির্যাতিত মানুষকে জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন। বিশেষত ইংরেজ শাসন আমলে পিছিয়ে পড়া বাঙালি মুসলিম সমাজকে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর জন্য নিরন্তর প্রেরণা দিয়ে গেছেন। তিনি ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর তোষণের পরিবর্তে তাদের সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। স্বীয় সমাজ ও হিন্দুসমাজের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বরাবরই উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। রাষ্ট্রশক্তি বা কোনো শক্তির কাছে মাথা না নোয়ানোর শিক্ষা তিনি ইসলাম থেকেই পেয়েছিলেন। এ কারণেই তার কবিতায় সেই পরাক্রমশালী শক্তির উন্মেষ ঘটিয়েছেন, তার তুলনা বাংলা সাহিত্যে তো নাই-ই; বিশ্বসাহিত্যেও কম।

বিশ্বকবি যখন রচনা করেন, ‘মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ-ধুলার তলে।’

সংগত কারণে জাতীয় কবি কাজী নজরুল বলে ওঠেন, ‘বলো বীর, চির উন্নত মম শির...’

কবিতা, গান, নিবন্ধ, প্রবন্ধ, নাটক, গল্প, উপন্যাস প্রভৃতি সব রচনাতেই কবি তার বাণীকে উচ্চকিত করার চেষ্টা করেছেন। এই উপমহাদেশের তাজহারা নিরুদ্যম মুসলিম জাতিকে অতীতের গৌরবময় ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ফের শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞান-বিজ্ঞানে ও কর্মশক্তিতে বলীয়ান হওয়ার ডাক দিয়েছিলেন তিনি। তাই তিনি ‘চল চল চল’ কবিতায় লিখেছিলেন—

‘ঊর্ধ্বে আদেশ হানিছে বাজ,

শহীদী ঈদের সেনারা সাজ,

দিকে দিকে চলে কুচকাওয়াজ

খোলরে নিদমহল।’

নজরুলের সাহিত্যিক লক্ষ্য ছিল দ্বিমুখী—একদিকে মুসলিম সমাজকে আত্মপরিচয়ের আলোয় উদ্ভাসিত করা, অন্যদিকে মানবজাতির সর্বজনীন মুক্তির দর্শন প্রতিষ্ঠা করা।

বাঙালি মুসলমানের জাগরণের অগ্রনায়ক কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তার সম্পর্কে আবুল মনসুর আহমদ বলেন, ‘নজরুলের আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের মুসলিম লেখকরা ছিল কোণঠাসা, অপাঙ্‌ক্তেয়, দুর্বল, অসন্তুষ্ট—Defensive minority। নজরুলের আবির্ভাব এক পর্যায়ে তাদের করে তোলে আত্মবিশ্বাসী, অভিজাত—Offensive minority। নজরুল ইসলাম একদিন বিনা নোটিশে ‘আল্লাহু আকবর’ হায়দারী হাঁক মেরে ঝড়ের বেগে বাংলা সাহিত্যের দুর্গ জয় করে বসলেন। মুসলিম বাংলার ভাঙা কিল্লায় নিশান উড়িয়ে দিলেন। অতি দ্রুতই দূর করে দিলেন মুসলিম বাংলার ভাঙা ও ভাবের হীনম্মন্যতা। মনের দিক থেকে জাতীয় জীবনে এটা একটা বিপ্লব। এ বিপ্লবের একমাত্র ইমাম নজরুল ইসলাম।’

মুসলিম জাগরণের জন্য নজরুল ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। ‘আমার লীগ, আমার কংগ্রেস’ প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমার কবিতা আমার শক্তি নয়, আল্লাহর দেওয়া শক্তি—আমি উপলক্ষ মাত্র। বাণীর বেণুতে সুর বাজে, কিন্তু বাজান যে গুণী সমস্ত প্রশংসা তারই। আমার কবিতা যারা পড়েছেন, তারাই সাক্ষী; আমি মুসলিমদের সংঘবদ্ধ করার জন্য তাদের জড়ত্ব, আলস্য, কর্মবিমুখতা, ক্লৈব্য ও অবিশ্বাস দূর করার জন্য আজীবন চেষ্টা করেছি। বাংলার মুসলমানকে শির উঁচু করে দাঁড়াবার জন্য, যে শির এক আল্লাহর কাছে ছাড়া কোন সম্রাটের কাছেও নত হয়নি—আল্লাহ যতটুকু শক্তি দিয়েছেন, তাই দিয়ে বলেছি, লিখেছি এবং নিজের জীবন দিয়েও তার সাধনা করেছি।’

নজরুলের ইসলাম উপজীব্য সাহিত্য তিনটি প্রধান ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত—

১. সাম্য ও ন্যায়বিচার : তিনি ইসলামের মূল চেতনা হিসেবে তুলে ধরেছেন সামাজিক সাম্য ও ন্যায়বোধকে। তার কবিতায় ইসলাম কেবল ধর্ম নয়, বরং শোষণবিরোধী এক মানবতাবাদী দর্শন বিদ্যমান।

২. মানবমুক্তির আদর্শ : ইসলামকে তিনি দেখেছেন মুক্তির ধর্ম হিসেবে—যে ধর্ম মানুষকে কুসংস্কার, দাসত্ব ও বৈষম্য থেকে মুক্ত করে।

৩. বিশ্বভ্রাতৃত্ব : জাতি, বর্ণ, ধর্মের ভেদরেখা অতিক্রম করে মানবজাতির ঐক্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন তার ইসলামি সাহিত্যকে বিশ্বজনীন করেছে।

নজরুল ইসলামি ইতিহাসকে কেবল অতীত স্মৃতিচারণ হিসেবে ব্যবহার করেননি; তিনি ইতিহাসকে করেছেন জাগরণের শক্তি। তার কবিতায় মুসলিম বীরদের উপস্থিতি একটি প্রতীকী অর্থ বহন করে—এটি হলো আত্মমর্যাদা ও সংগ্রামের আহ্বান। তিনি ইসলামের ইতিহাস থেকে তুলে এনেছেন—সাহস, আত্মত্যাগ, ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম হিসেবে। এই বীরত্বচেতনা ছিল নিপীড়িত জাতির আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠনের সাহিত্যিক কৌশল। তার দৃষ্টিতে ইসলামের ইতিহাস মানে কেবল বিজয়ের কাহিনি নয়; বরং ন্যায় প্রতিষ্ঠার অবিরাম সংগ্রাম।

নজরুলের সাহিত্য কেবল রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক নয়; এর গভীরে রয়েছে আধ্যাত্মিক প্রেমের ধারা। তিনি ইসলামের আধ্যাত্মিকতাকে মানবিক ভালোবাসার সঙ্গে একীভূত করেছেন। তার সাহিত্যিক উপলব্ধিতে আছে—আল্লাহর প্রতি প্রেম মানে মানবতার প্রতি প্রেম, ইবাদত মানে মানুষের সেবা, ধর্ম মানে মানবকল্যাণ। এই দৃষ্টিভঙ্গি তার সাহিত্যকে সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করেছে এবং দিয়েছে সর্বজনীনতার মাত্রা।

নজরুলের সাহিত্যকে আলাদা করে চিহ্নিত করার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি ইসলামের মধ্যেই খুঁজে পেয়েছেন ধর্মীয় সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার শিক্ষা। তার কাছে ইসলাম বিভেদের নয়, মিলনের শক্তি। তিনি দেখিয়েছেন, ধর্মীয় পরিচয় মানুষকে আলাদা করে না; বরং নৈতিকতা ও মানবিকতা মানুষকে একত্রিত করে। এই ভাবনা তার সাহিত্যকে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে তুলে এনেছে।

নজরুল সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন ভাষাগত ও শৈল্পিক নবতর নির্মাণের মাধ্যমে। ভাষার বৈশিষ্ট্য হলো, বাংলা ভাষার সঙ্গে আরবি-ফারসি-উর্দু-তুর্কি শব্দের সৃজনশীল সংমিশ্রণ, নতুন শব্দভান্ডার নির্মাণ, শক্তিশালী ও উদ্দীপনাময় বাক্যগঠন, আবেগ ও যুক্তির সম্মিলন, অলংকারময় অথচ প্রাঞ্জল ভাষা, বিপ্লবী উদ্দীপনা ও আধ্যাত্মিক অনুভূতির সমন্বয় এবং ভাষাশৈলী বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ধারা সৃষ্টি করে।

বাংলার সঙ্গে আরবি-ফারসি-উর্দু-তুর্কি শব্দের ব্যবহার নজরুলই ইতিহাসে শুরু করেননি। বাংলা সাহিত্যের বিকাশের সময়কালে বা মধ্যযুগে এই ধারাই ছিল মেইনস্ট্রিম। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের হিন্দু পণ্ডিত উদ্ভাবিত সংস্কৃত প্রভাবিত যে নতুন ধারার সূচনা করে, তাতে বাঙালি মুসলমান ঐতিহ্যচ্যুত বোধ করে। নজরুল সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার সমন্বয় ঘটান।

নজরুল ইসলামের ধর্মীয় চেতনা সাম্যবাদী মানবতাবাদের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তিনি দেখেছেন, ইসলামের মূল শিক্ষা শোষণবিরোধী। ধনী-দরিদ্র, প্রভু-দাস, উচ্চ-নিম্ন—সব বিভাজনের বিরুদ্ধে তার সাহিত্য প্রতিবাদ করেছে। ফলে তার সাহিত্য ধর্মীয় ও সামাজিক বিপ্লবের মিলিত কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে।

নজরুলের আগে বাংলা ভাষায় বাঙালি মুসলমানের জাতীয় সাহিত্য ছিল সীমিত ও অনুচ্চ। তিনি একে আধুনিকতা দিয়েছেন, উচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন, জনমানসে জনপ্রিয় করেছেন, তার পরবর্তী প্রজন্মের লেখকদের জন্য তিনি পথ নির্মাণ করে দিয়েছেন।

কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য একাধারে জাগরণী, মানবতাবাদী এবং বিপ্লবী। তিনি ইসলামকে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং ন্যায়, সাম্য ও মানবমুক্তির বিশ্বজনীন দর্শনে রূপ দিয়েছেন। বাংলাদেশি বাংলার যে আধুনিক ও প্রাণবন্ত ভাষা আমরা দেখি, তার ভিত্তি স্থাপন করেছেন তিনি। তার সাহিত্য তাই কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট সাহিত্যধারা নয়—বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের পাটাতন।

ইতিহাস সাক্ষী—যখনই অন্যায় ও স্বৈরশাসন মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করতে চেয়েছে, তখনই নজরুলের কবিতা নতুন করে জেগে উঠেছে। জুলাই বিপ্লবে নজরুলের কবিতা ছিল স্বাভাবিকভাবেই অনুপ্রেরণার উৎস।

বর্তমান বাংলাদেশে নজরুল সাহিত্য আরো বেশি প্রাসঙ্গিক। এ সময়ে সমাজে নানা ধরনের বৈষম্য, অন্যায় ও সংকট রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে নজরুল অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে এবং সত্যের পক্ষে আমাদের দাঁড়াতে বলে। তার সাহিত্য আজও নৈতিক সাহস জোগায়। বেকারত্ব, হতাশা ও সামাজিক চাপের মুখে বর্তমান তরুণ সমাজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তখন নজরুলের আদর্শ তরুণদের নিজের শক্তিতে বিশ্বাস রাখার প্রেরণা দেয়।

বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় মেরূকরণ বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে নজরুলের আদর্শে মানবতাই সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য এই দর্শন অত্যন্ত জরুরি। জাতীয় পরিচয় মানে মানবিকতা, সাম্য ও স্বাধীনতা। এই মূল্যবোধ আজও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ভিত্তি।

তথ্যসূত্র

১. আবুল মনসুর আহমদ রচিত ‘আমাদের কালচার’

২. আবুল মনসুর আহমদ রচিত ‘সাহিত্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’

৩. নাসির হেলাল রচিত ‘নজরুল সাহিত্যে ইসলামি সমাজ’

সমকালে কাজী নজরুল

মৃত্যুক্ষুধায় সমাজ ও সংস্কৃতি

ঔপনিবেশিক বাংলার জমিদার ও বাঙালি মুসলমান

মুসলিমদের জ্ঞানচর্চার কাঠামোগত প্রতিষ্ঠা

খালেদ ইবনে ওয়ালিদের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা

মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগে আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থাপনা

জুলাই ও ইকবাল

বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নির্মাণে মুস্তাফা জামান আব্বাসী

পশ্চিমের সংকীর্ণতা ও দ্বিধা

নতুন যুগের আলোয় খুঁজি (শেষ পর্ব)