হোম > সাহিত্য সাময়িকী > প্রবন্ধ

জুলাই ও ইকবাল

আবদুল কাদের জিলানী

‘খুদী কো কর বুলন্দ ইতনা,

কে হার তকদির সে পেহলে,

খোদা বান্দা সে খোদ পুছে,

বাতা তেরা রেজা কেয়া হায়।’

তোমার ব্যক্তিত্বকে এমন বুলন্দ করো

ভাগ্য লেখার আগে যেন খোদাও

তোমার কাছে জানতে চান,

বান্দা, বলো তুমি কী চাও?

আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল (১৮৭৭-১৯৩৮) শিল্প-সাহিত্য, দর্শন ও রাজনীতিতে বিংশ শতাব্দীর প্রধান চিন্তক। ইকবালের চিন্তা ও কাব্য পারস্য, মিসর, আরব এবং অন্যান্য মুসলিম সমাজে পুনর্জাগরণের প্রেরণা জুগিয়েছিল। ‘ভারতের নাইটিঙ্গেল’ নামে পরিচিত সরোজিনী নাইডু (১৮৭৯-১৯৪৯) ইকবালকে এশিয়ার কবি হিসেবে বিবেচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১), জওহরলাল নেহরু (১৮৮৯-১৯৬৪), মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ-সহ (১৮৭৬-১৯৪৮) অনেকেই ইকবালকে কবি, বুদ্ধিজীবী ও দার্শনিক হিসেবে পরিচিত করেছেন। আমরা যদি ইকবালের চিন্তা-কর্ম গভীরভাবে পাঠ করি, তাহলে তার কবিত্ব ও দার্শনিকতা থেকে বিপ্লবের অনুপ্রেরণা লাভ করি। ইকবালের দার্শনিক মন কাব্যশক্তির মাধ্যমে আদর্শভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রের কথা বলেছিল; আর সেই সমাজ অথবা রাষ্ট্র, যেখানে ইসলাম কর্তাসত্তার ভূমিকায় থাকবে। ইকবালের লড়াইটা ছিল সত্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লড়াই। তিনি ‘Art for Art's Sake’-এর কল্পনায় না গিয়ে ‘Art for Life's Sake’-এর বাস্তব জীবনের প্রয়োজনে করণীয় বিষয় নিয়েই ভেবেছেন।

ইকবাল ছিলেন জীবনদর্শনের কবি। তার শিল্পসাহিত্য, দর্শন ভাবনা ও রাষ্ট্রচিন্তা বাস্তব জীবন ও সমাজ গঠনে অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। ইকবাল বিশেষ করে উপমহাদেশের মুসলিমদের জন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে মুসলিম সম্প্রদায় স্বাধীন, নিরাপদ ও বৈষম্যহীন জীবন যাপন করবে। তাই ইকবালের জীবন দর্শন বুঝতে হলে তার রাজনৈতিক চিন্তাধারা গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। ইকবাল প্রাচ্য থেকে অর্থাৎ জালালুদ্দীন রুমি (১২০৭-১২৭৩), ইমাম গাজালি (১০৫৮-১১১১), ইবনে রুশদ (১১২৬-১১৯৮), ইবনে খালদুন (১৩৩২-১৪০৬), আল রাজি (৮৬৩-৯২৫) ও ইবনে হাজমের (৯৯৪-১০৬৪) চিন্তা দ্বারা যেভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন; তেমনি পাশ্চাত্যের প্লেটো (খ্রিষ্টপূর্ব ৪২৭ – খ্রিষ্টপূর্ব ৩৪৮), অ্যারিস্টটল (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৮৪ – খ্রিষ্টপূর্ব ৩২২), হেনরি বার্গসোঁ (১৮৫৯-১৯৪১), মেকিয়াভেলি (১৪৬৯-১৫২৭), গ্যোটে (১৭৪৯-১৮৩২), ফ্রিডরিখ নিটশে (১৮৪৪-১৯০০), ইমানুয়েল কান্ট (১৭২৪-১৮০৪) ও জঁ-জাক রুশোর (১৭১২-১৭৭৮) চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। বিশেষ করে ইকবাল তার খুদী দর্শনের উপাদান সংগ্রহে নিটশে, ইয়োহান গটলিব ফিখটে (১৭৬২-১৮১৪) এবং বার্গসোঁর চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।

ব্যক্তি তার স্বতন্ত্র সত্তাকে সংগ্রাম, প্রেম ও আত্মশক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করবে। সমাজ গড়ে ওঠার পূর্বশর্তই হলো শক্তিমান স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা। ইকবাল খুদী অর্থাৎ ব্যক্তিসত্তাকে সমাজ গঠনে সহায়ক হিসেবে দেখেছেন। ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে; তাই সমাজ কেমন হবে সেটা নির্ভর করছে ব্যক্তির ওপর। ইকবালের খুদী ব্যক্তিজীবনে নৈতিক, সৎ, সাহসী এবং ব্যক্তিত্ববান হবে। ব্যক্তি আত্মচেতনার মাধ্যমে সমাজে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত হবে। ইকবালের খুদী স্বাধীন এবং ব্যক্তিজীবনে সে আইনকানুন ও শৃঙ্খলা মেনে চলে। জীবনের যেমন ব্যক্তিগত দিক রয়েছে, তেমনি সামাজিক ও রাষ্ট্রকেন্দ্রিক দিক রয়েছে। ইকবাল এখানে নিয়ম ও শৃঙ্খলার যে ইঙ্গিত দিয়েছেন সেটা আল্লাহর কানুন। তিনি এই কানুনের ওপরই একটি ইনসাফ ও সাম্যের রাষ্ট্রকল্পের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে ব্যক্তি সমাজের জন্য এবং সমাজ ব্যক্তির জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠবে।

খুদী চিন্তা ব্যক্তিত্ব গঠনে যেমন শক্তিশালী ভূমিকা রাখে, তেমনি রাষ্ট্র গঠনেও কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। খুদী যেমন ব্যক্তিসত্তার আত্মপ্রতিষ্ঠা ও আত্মবোধ তৈরিতে ভূমিকা রাখে, তেমনি সমাজতাত্ত্বিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণে উপযোগী করে তোলে। ইকবাল মুসলিমদের কর্মী হয়ে উঠতে বলেছিলেন; কারণ ভাগ্যের কাছে অসহায়ত্ব বরণের মধ্যে কোনো প্রাপ্তি নেই। ইকবালের কাব্য সৃষ্টির প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল মুসলিম যুবকদের হৃদয়ে আজাদির চেতনা জাগিয়ে তোলা। ইকবাল মুসলিম যুবকদের হতাশা ও কর্মহীনতার পরিবর্তে উদ্যমী, কর্মী ও আশাবাদী হিসেবে দেখতে চেয়েছেন।

ইকবাল মুসলিম বিশ্বের পুনর্জাগরণের কবি হয়ে উঠেছিলেন। তার দার্শনিক ভাবনা সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে বড় ভূমিকা তৈরি করেছিল। ইকবালের ইসলাম বোঝাপড়া ও পরবর্তী স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্র ভাবনা প্রথমত বাঙালি মুসলমান কবুল করেছিল। তবে ১৯৭১-পরবর্তী বাংলার মুসলিম জনগোষ্ঠী একটি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ড লাভ করে, যেখানে ইকবালকে গ্রহণ করা হয় না। বাঙালি উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তি ইকবালের বিরুদ্ধে হিংসা ও ঘৃণা ছড়িয়ে দেয় এবং ইকবাল চর্চার পক্ষের শক্তিকে দেশবিরোধী এবং বিপক্ষের শক্তিকে দেশপ্রেমিক—এই ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়, যার ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক ও চিন্তার জগতে ইকবাল দর্শন গ্রহণ ও বর্জনের প্রকাশ হতে দেখা যায়। পাকিস্তান ভেঙে পড়ার দায় ইকবালের কাঁধে দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার নামে নির্মিত হলের নামও পরিবর্তন করা হয়। পাকিস্তানের কলুষিত রাজনীতি ও রাজনীতিবিদের কর্মের বলি হতে হয় ইকবালকে।

ইসলামের পরিবর্তে রবীন্দ্রনাথের মানুষের ধর্মচেতনা উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা প্রতিচিন্তা হিসেবে গ্রহণ করে। ইকবালের বিশ্ব মুসলিম ভাবনা ও স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্র দর্শন উগ্র বাঙালিদের কাছে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। আমরা যদি রবীন্দ্রসাহিত্যের বিষয়বস্তু দেখি, সেখানে মুসলিম সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সাহিত্য ভাবনা নেই। রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন ও সাহিত্য ভাবনা হিন্দু সংস্কৃতি ও হিন্দু সমাজ নিয়ে গড়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথ একজন জমিদার ছিলেন, যেখানে পূর্ব বাংলার মুসলিম কৃষকেরা তার প্রজা মাত্র। রাজার সাহিত্য ও সমাজ সৃষ্টিতে প্রজাকে নিয়ে ভাবনা না হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক। এই সময়ে উগ্র জাতীয়তাবাদীরা সংস্কৃতি চর্চাকে কেন্দ্র করে ভিন্ন ভিন্ন নামে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল। মুখে সংস্কৃতিচর্চার কথা বললেও উগ্র জাতীয়তাবাদী চর্চাই ছিল তাদের প্রধান উদ্দেশ্য। রবীন্দ্রসাহিত্য চর্চার পরিবর্তে রবীন্দ্রদর্শন চর্চা গড়ে উঠেছিল। উগ্র জাতীয়তাবাদীরা রবীন্দ্র কালচার চর্চার মাধ্যমে যে সেকুলার রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল, সেখানে ইকবাল দর্শনকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেছিল।

জুলাইয়ে ফ্যাসিবাদ পতনের পেছনে শক্তি জুগিয়েছে সমন্বিত ইচ্ছা। হাসিনার ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ জাগরণ ফ্যাসিস্ট সরকার সামাল দিতে ব্যর্থ হয়। খুন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ রাজপথে একত্রিত হয়েছিল। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অর্থাৎ ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লড়াই শুরু হয়েছিল। সত্তার সম্মিলিত ইচ্ছার যে জাগরণ ঘটেছিল, সেখানে ভয়ভীতি ও দাসত্ব অনুপস্থিত ছিল। ছাত্ররা শহীদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বুলেটবিদ্ধ হয়েছিল। একদল রাজপথে পুলিশের সঙ্গে লড়াই করেছে, অন্যদল নামাজ পড়েছে। রাতের আঁধারে পুলিশি নিপীড়নের বিরুদ্ধে মসজিদের মাইক থেকে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। আমরা জুলাইয়ে যে ন্যায়বান ব্যক্তিত্বের জাগরণ দেখি, সেখানে পরোক্ষভাবে ইকবালের খুদী দর্শনের অনুপ্রেরণা উপস্থিত ছিল। জুলাইয়ে রাজপথের মিছিলে ইকবালের কবিতা ‘খোদার ফরমান’-এর স্লোগান ফ্যাসিবাদের সামনে উচ্চারিত হতে দেখা যায়। ইকবাল দর্শন শুধু সত্তার ভেতরেই জাগরণ ঘটায়নি, রাজপথে ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা পালন করেছিল।

জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে ইকবাল দর্শন নতুন করে চর্চা হতে দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক বয়ান থেকে যেমন ইকবাল পাঠ হচ্ছে, তেমনি সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় ইকবাল পাঠ হচ্ছে। জুলাই-পরবর্তী ইসলাম ও মুসলিম সংস্কৃতি অপ্রাসঙ্গিক করে রাষ্ট্রের কর্তাসত্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া সম্ভব নয়। ইকবালের দর্শন গড়ে উঠেছিল বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ, ন্যায়বোধ ও ইনসাফের ওপর। ইকবাল উগ্র জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতির সামনে মুসলিম সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য পালনে জোর দেন। আধিপত্যবাদী কালচারের সামনে ইসলামি সংস্কৃতিকে বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করেন। কেবল ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মচর্চা নয়, সামাজিক জীবনে ইসলামি সংস্কৃতি চর্চার কথাও তিনি বলেছেন। ইকবাল দর্শন আধিপত্যবাদী সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির কথা বলে। জুলাই-পরবর্তী মানুষ যে মুক্তির কথা বলছে, যে সাংস্কৃতিক ইনকিলাব চোখে পড়ছে—এই প্রকাশই বলে দেয় বাংলাদেশে ইকবাল দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা।

বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নির্মাণে মুস্তাফা জামান আব্বাসী

পশ্চিমের সংকীর্ণতা ও দ্বিধা

নতুন যুগের আলোয় খুঁজি (শেষ পর্ব)

বাংলার বৈশাখের গান

বাঙালি জাতিসত্তার উপাদান: রাষ্ট্র, সার্বভৌমত্ব, প্রগতি ও ইসলাম

খেলাফতে রাশেদার শাম অভিযান

গালির মনস্তত্ত্ব ও জেন-জির ভাষা-বিদ্রোহ-সংস্কৃতি

নতুন যুগের আলোয় খুঁজি

সোনারগাঁয়ের পানাম সেতু

মোহর আলী ও বাংলার ইতিহাসের পুনর্গঠন