পর্ব-১
পটভূমি : কলকাতা মুর্শিদাবাদ কলকাতা
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্বখেলাপি কর্মকর্তা জব চার্নক ঢাকার সুবাদার শায়েস্তা খানের গ্রেপ্তার এড়াতে ১৬৮৭ সালে হুগলি থেকে পালিয়ে নবদ্বীপের কলকাতা গ্রামে আশ্রয় নেন। তখনকার কলকাতা ছিল ‘দশ-বারো ঘর কৃষক ও জেলের কয়েকটি কুঁড়েঘর নিয়ে’ গঙ্গাতীরের জলা-জঙ্গল আকীর্ণ স্যাঁতসেঁতে এক অখ্যাত ক্ষুদ্র গ্রাম। পূর্ব বাংলা ও পুণ্ড্রের সাংস্কৃতিক আবহ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং অনেকটাই বিহার ও উড়িষ্যা বা পাটলিপুত্র ও কান্যকুব্জমুখী। নবদ্বীপ ষোলো শতকে চৈতন্যের মুসলিম শাসনবিরোধী তৎপরতার ঘাঁটিতে পরিণত হয়।
সতেরো শতকের শেষ দিকে কলকাতা ছিল ‘সংস্কৃত পাণ্ডিত্যের কেন্দ্রভূমি’ নবদ্বীপের জমিদার কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের অধীন একটি গ্রাম। এই জায়গাটি কৌশলগত কারণে জব চার্নকের দারুণ পছন্দ হয়। তিনি ১৬৯০ সালের ২৪শে আগস্ট তৃতীয়বারের মতো ‘বন-জঙ্গল, ধানক্ষেত, কলাবাগান, জলাভূমি’ অধ্যুষিত কলকাতায় নোঙর করেন। তখন থেকে গঙ্গাতীরের কলকাতার নতুন যাত্রা শুরু হয় একদল লোভী ও লুটেরা, নীতি-নৈতিকতাহীন ‘নাবিক, সৈনিক ও লোফার’ ইংরেজের হাতে।
সতেরো সাল থেকে ইউরোপীয়রা এদেশে আসেন উইলিয়াম হান্টারের ভাষায় ‘এক হাতে বাইবেল আর অন্য হাতে তলোয়ার’ নিয়ে। তারা বণিক বেশে ছিলেন টেম্পলার-ক্রুসেডার। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বণিক ও তাদের রাইটার-ফ্যাক্টর-সেমি মার্চেন্ট প্রভৃতি শ্রেণির কর্মচারীরা স্বদেশে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ৩০০ বছরের ক্রুসেডের পটভূমিতে ছিলেন কট্টর মুসলিমবৈরী মানসিকতার অধিকারী। এদেশে তাদের সঙ্গীসাথি বাছাই কিংবা কেন্দ্র ও কুঠির স্থান নির্বাচনে সেই মানসিকতার প্রকাশ ঘটে। ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেকর্ড অনুযায়ী ১৭৩৬ থেকে ১৭৪০ সালের মধ্যে কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়োগ করা ব্যবসায়ীরা সবাই ছিলেন বর্ণহিন্দু।
ইংরেজ বণিকরা বাংলায় এসে প্রথমে বাণিজ্য কুঠি নির্মাণ করেন হুগলি ও কাসিমবাজারে। নবদ্বীপকেন্দ্রিক বাঙালি হিন্দুদের মধ্য থেকেই তারা ‘বেনিয়ান’ নিযুক্ত করেন। এই বাঙালি বেনিয়ানরাই প্রথম যুগের ইংরেজদের দোভাষী, বাণিজ্য প্রতিনিধি, হিসাবরক্ষক এমনকি মহাজন ছিলেন। ব্যবসায়ের মূলধন নিয়োগ থেকে পণ্য সরবরাহ পর্যন্ত প্রায় সব ব্যাপারে এই বেনিয়ানদের ওপর ইংরেজরা নির্ভর করতেন। ইংরেজদের তারা দ্রুত টাকা কামাইয়ের নানা প্রতারণা-কৌশল শিখিয়ে অবৈধ পথঘাট চিনিয়ে দেন এবং নানা অনৈতিক কাজে সহযোগিতা করেন।
সতেরো শতকের শেষ দশক থেকে ‘বৈদেশির ফরমায়েশে’ সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলকাতা-চিতপুর-বিরজি-চক্রবেড়িয়া গ্রামের ধানক্ষেত, কলাবাগান ও জলাভূমি থেকে ‘শৌখিন ফুলের মতো’ কলকাতা শহর গড়ে ওঠার সূচনা হয়। ইংরেজদের দেশীয় সহযোগী জুনিয়র পার্টনার শ্রেণিটি তখন ইংরেজদের পাশে কলকাতায় জড়ো হয়। ১৮ শতকে ইংরেজদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তারা অনেকে এক পুরুষের দেওয়ানি করে বিপুল বিত্ত সঞ্চয় করেন। রাতারাতি কাড়ি কাড়ি টাকার মালিক হয়ে তারা কলকাতা শহরে আভিজাত্যের ভিত গড়েন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজ খ্রিষ্টান বণিকদের ক্রুসেডীয় চেতনা আর আর্য-ব্রাহ্মণ্য মুসলিম শাসনবৈরী মনস্তত্ত্ব নবদ্বীপের কলকাতার এক মোহনায় মিলিত হয়। নারায়ণ দত্তের ভাষায় তখনকার কলকাতার সেই ‘অস্বাস্থ্যকর জলাভূমিতে’ মিলিত হওয়া মানুষগুলো ‘এক অসুস্থ খেলা’য় মেতেছিলেন। সেখানে ‘স্বার্থবুদ্ধিই একমাত্র বুদ্ধি, দুর্নীতিই একমাত্র নীতি, ষড়যন্ত্রের চাপা ফিসফিসানিই একমাত্র আলাপের ভাষা।’ সাত দশকের কম সময়ের নিবিড় জানাজানির ভেতর দিয়ে ইংরেজদের ক্ষাত্রতেজ আর সংস্কৃত পাণ্ডিত্যের কেন্দ্রভূমি নবদ্বীপের অধীন কলকাতায় জড়ো হওয়া বর্ণহিন্দু শ্রেণিটির চাণক্য চাতুর্যের মিলনে মুসলমান বাদশাহদের হটিয়ে ইংরেজ খ্রিষ্টানদের বাংলার মসনদে বসানোর লক্ষ্যস্থির হয়। তখন পলাশীর যুদ্ধপ্রহসনের কদিন আগে প্রথমে ইয়ার লতিফ, পরে মীর জাফরকে কৌশলগত প্রয়োজনে শিখণ্ডী হিসেবে ব্যবহারের জন্য তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
নির্বোধ মীর জাফর ইংরেজদের এগারো দফা শর্ত মেনে সুবা বাংলার পুতুল নবাব হতে রাজি হন। মীর জাফর মসনদে বসে রাজস্বভান্ডার উজাড় করে ইংরেজদের লোভের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হন। তখন ১৭৬০ সালের অক্টোবরে মীর কাসিমকে মসনদে বসানো হয়। মীর কাসিম দ্রুত হুঁশে ফিরে স্বাধীনভাবে শাসন পরিচালনার সংকল্প নিয়ে রাজধানী মুঙ্গেরে সরিয়ে নেন। ইংরেজরা ১৭৬৩ সালের জুলাইতে মীর জাফরকে ফের মুর্শিদাবাদের মসনদে বসিয়ে মীর কাসিমের বিরুদ্ধে দমনের জন্য তারা কাটোয়া, মুর্শিদাবাদ, গিরিয়া, সুতি, উদয়নালা ও মুঙ্গের রণাঙ্গনে যুদ্ধ বাধায়।
১৭৬৪ সালে দিল্লির সম্রাট শাহ আলম ও অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলার সঙ্গে মিলে বাংলার মসনদহারা নবাব মীর কাসিম বক্সারে ইংরেজদের পলাশী ষড়যন্ত্রের পুরাবৃত্তির শিকার হয়ে বাংলার আজাদি পুনরুদ্ধারের শেষ সুযোগ হারান। সম্রাট শাহ আলম ১৭৬৫ সালের ১২ আগস্ট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে সুবাহ বাংলার দেওয়ান বা রাজস্ব কর্মকর্তার দায়িত্ব দিয়ে ফরমান জারি করে সুবা বাংলার শাসনব্যবস্থায় দ্বৈত শাসন মেনে নেন। আর মসনদহারা নবাব মীর কাসিম আলী খান দীর্ঘ প্রায় এক যুগ মধ্যভারতে ঘুরে ঘুরে সেনাবাহিনী সংগঠিত করার চেষ্টা করেন। তবে তার এ সময়ের তৎপরতার বিস্তারিত কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না। ১৭৭৭ সালের ৮ মে দিল্লির আজমিরী দরওয়াজার বাইরে অজানা পথচারী হিসাবে ইন্তেকালের পর তার মাথার নিচে একটি পুঁটলিতে রাখা চাদরে সোনার জরিতে লেখা ছিল—‘নাসিরুল মুলক ইমতিয়াজ-উদ-দৌলাহ নসরত জঙ্গ মীর কাসেম আলী খান বাহাদুর।’
মীর কাসিমের আজাদি পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ের প্রায় অভিন্ন সময়ে ইংরেজ কোম্পানি ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে গ্রামবাংলায় জনবিদ্রোহের সূচনা করেন ফকির মজনু শাহ। ১৭৬৩ সালে ইংরেজদের ঢাকা কুঠি দখলের মধ্য দিয়ে তার বিদ্রোহের প্রকাশ ঘটে। কৃষক-প্রজা, চাকরিহারা নবাব বাহিনীর সদস্যসহ জনগণের অংশগ্রহণের ফলে মজনু শাহর বাহিনীতে সদস্যসংখ্যা মাত্র এক হাজার থেকে বেড়ে ৪০ হাজারে দাঁড়ায়। এই জনবিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। ঔপনিবেশিক শাসকরা আতঙ্কিত হয়ে জনবিদ্রোহ মোকাবিলার উপায় খোঁজেন। মজনু শাহ ১৭৮৬ সালে ইংরেজদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে আহত হয়ে ১৭৮৭ সালে ইন্তেকাল করেন। কিন্তু তার শুরু করা মুক্তিসংগ্রাম জারি রাখেন তার উত্তরসূরিরা।
দ্বৈত শাসন থেকে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর
১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধের পর ১৭৬৫ সালে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ান বা রাজস্ব কর্মকর্তার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এটি ছিল দ্বৈত শাসনের নামে ইংরেজ কোম্পানি বণিকদের ঔপনিবেশিক ক্ষমতা লাভের প্রথম আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ। সুবে বাংলার দেওয়ানি বা রাজস্ব শাসনের দায়িত্ব নিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি খাজনা আদায় বাড়াতে রায়তদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। ১৭৬৮ সালে ইংরেজরা দেওয়ানি দফতর মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় সরিয়ে নিয়ে বাংলার সম্পদ ভান্ডারের ওপর ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে।
মোগল আমলে জমিদাররা জমির মালিক বা স্বত্বাধিকারী ছিলেন না; তারা ছিলেন ফৌজদারের অধীনে খাজনা আদায়কারী সরকারি কর্মকর্তা। তারা সাধারণত স্থানীয় লোকালয়ে বাস করে জমির মালিক রায়ত বা চাষিদের সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক লেনদেনে যুক্ত থাকতেন। খাজনা আদায় ছাড়াও তাদের বিবিধ জনকল্যাণকর দায়িত্ব পালন করতে হতো—ক. রায়তদের কাছ থেকে গ্রাম পঞ্চায়তের মাধ্যমে খাজনা আদায় করে তারা রাজকোষে জমা দিতেন; খ. এলাকার ছোট ছোট ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার ফয়সালা করতেন; গ. এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জননিরাপত্তা ও সুশাসনের কিছু দায়িত্ব পালন করতেন; ঙ. পতিত বা বনজঙ্গলের জমি উদ্ধার করে দাতব্য ও ধর্মীয় ওয়াকফ বা দেবোত্তর কাজে ব্যবহারের সাথেও যুক্ত ছিলেন; চ. ফৌজদাররা জমিদার ও রায়তদের মাঝে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করতেন। রায়তদের ওপর জুলুম বা বেইনসাফি হলে ফৌজদাররা জমিদারি বাতিলসহ আইনি ব্যবস্থা নিতে পারতেন।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি বা রাজস্ব প্রশাসনের দায়িত্ব নিয়ে শুরুতেই মোগল আমলের ভূমি ব্যবস্থায় আঘাত করল। খাজনা আদায় পদ্ধতির খোলনলচে পাল্টে দিল। পঞ্চায়তের বদলে রায়তদের কাছ থেকে সরাসরি খাজনা আদায় চালু করল। উৎপাদিত ফসল নয়, জমির পরিমাণকে খাজনার পরিমাণের ভিত্তি বানিয়ে নগদ অর্থে খাজনা আদায় চালু করল। রাতারাতি খাজনার পরিমাণ বাড়ল। তারা প্রথম বছরেই আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ খাজনা আদায় করল। এরপর প্রতি বছর এই হার বাড়তে থাকল। কৃষকরা এই চাপের মুখে খাজনার নগদ অর্থ জোগাড় করতে বছরের সঞ্চিত খাদ্য-ফসল কম দামে বাজারে বেচতে বাধ্য হলেন।
রায়তদের এই দুরবস্থা ইংরেজ বণিকদের অর্থ কামাইয়ের নতুন মওকা এনে দিল। তারা এদেশীয় কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙালি দোভাষী-বেনিয়ান সহযোগীদের পরামর্শে কোম্পানির গভর্নর থেকে কেরানি পর্যন্ত সব কর্মচারী বাংলা-বিহারের নানা জায়গায় অসংখ্য ক্রয়কেন্দ্র খুললেন। নতুন ফসল ওঠার সঙ্গে সাথে কৃষকদের সব ধান-চাল কম দামে কিনে তারা গুদামে মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করলেন। ধান-চালের দাম বহুগুণ বাড়িয়ে দিলেন। কৃষকরা জীবন রক্ষার তাগিদে তাদের বেচে দেওয়া ফসল এখন বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন।
লোভী ইংরেজ আর তাদের সহযোগীদের তৈরি এটি ছিল ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদ। তারা মৃত্যুব্যবসায়ে ফাঁদ তৈরির ফলে ১৭৬৯ খ্রিষ্টাব্দে (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) হিন্দুস্তানের খাদ্যভান্ডার হিসাবে পরিচিত বাংলায় এবং বিহার ও উড়িষ্যায় মানব ইতিহাসের ভয়াবহতম দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এই দুর্ভিক্ষ ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত হয়। ১৫ বছর ধরে এই দুর্ভিক্ষের জের চলে। বাংলার জনগণ অতীতে কখনো এ ধরনের মৃত্যুক্ষুধার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। অভূতপূর্ব পরিস্থিতির আচমকা ধাক্কায় কৃষকরা হালের গরু-বাছুর, লাঙল-জোয়াল ও যন্ত্রপাতি বিক্রি করেন। বীজধান খেয়ে শেষ করেন। গাছের লতাপাতা আর মাঠের ঘাস খেয়ে বাঁচার চেষ্টা করেন। শেষে ছেলেমেয়েদের বাজারে বিক্রি করেন। ১৭৭০ সালের জুন নাগাদ জীবিত মানুষ মরা মানুষের গোশত খাওয়ার তথ্য রেকর্ড করা হয়। শহরের পথে পথে আধমরা ও মরা মানুষের বিশৃঙ্খল স্তূপ জমা হয়, লাশ ও মুমূর্ষু মানুষে নদীর তীর ছেয়ে যায়; ‘প্রাচ্যের ঝাড়ুদার’ শিয়াল-শকুন-কুকুরেরা লাশ সাফাইয়ে বিতৃষ্ণ হয় এবং পচা-গলা লাশ জমে নাগরিক অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে।
১৭৭০ সালের এপ্রিল-মে-জুন নাগাদ ওয়ারেন হেস্টিংস প্রতি ১৬ জনে ছয়জন মানুষ না খেয়ে মারা যাওয়ার কথা স্বীকার করেন। এই পরিস্থিতিতেও তারা মৃত্যুপথযাত্রীদের কাছ থেকে খাজনা আদায় শিথিল করেননি। ১৭৬৮ সালের তুলনায় ১৭৭১ সালের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পায়। খোদ ওয়ারেন হেস্টিংস দুর্ভিক্ষের মধ্যে সর্বশক্তি দিয়ে অমানবিক নিষ্ঠুরতার সঙ্গে রাজস্ব আয় বাড়াতে পারার কৃতিত্বের কথা ইংল্যান্ডে কোম্পানির পরিচালকদের ১৭৭২ সালের রিপোর্টে গর্বের সঙ্গে লিখে জানান। দুর্ভিক্ষ শুরুর প্রথম ১৫ বছরে জনসংখ্যার অর্ধেক মানুষ মারা যায়। ফলে বিরাট জেনারেশন গ্যাপ তৈরি হয়। বহু জমি অনাবাদি হয়ে পড়ে। যারা বেঁচে ছিলেন তাদের অনেককে খাজনা দিতে না পারায় কলকাতার ঋণগ্রস্তদের কারাগারে বন্দি করা হয়।
এ দেশের মানুষের প্রতি ইংরেজ বণিকদের বিশেষ আগ্রহ ছিল বলে মনে হয় না। তারা বাংলাকে দেখেছেন লোভনীয় ও লুণ্ঠনযোগ্য বিশাল সম্পদভান্ডার হিসাবে। তাদের আগ্রহ ছিল বিশাল এই গুদামখানার প্রতি। এডমন্ড বার্ক ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এই শাসনকে ‘মানবসভ্যতার ইতিহাসে নিকৃষ্টতম নিষ্ঠুরতা’ এবং ‘মৃত্যুর ও নেকড়ের শাসন’ বলেছেন। ইংরেজ বণিক শাসনের উৎকট ও বীভৎস রূপ দেখে অ্যাডাম স্মিথ বলেছেন, কোনো ব্যবসায়ী কোম্পানির একচেটিয়া শাসন ‘দুনিয়ার সব ধরনের শাসনের মধ্যে নিকৃষ্টতম।’ ইংরেজদের মৃত্যুব্যবসায়ে এই ভয়ংকর ফাঁদকে ইয়ং হাসব্যান্ড দেখেছেন ‘দেশীয় জনশত্রুদের সহযোগিতায় একচেতিয়া শোষণের বর্বর মনোবৃত্তির অনিবার্য পরিণতি’ হিসেবে। তিনি এ পরিস্থিতিকে ‘ব্যবসা-নীতির নিষ্ঠুরতম উদ্ভাবনী শক্তি’র ‘কালোত্তীর্ণ নিদর্শন’ হিসেবে চিহ্নিত করে লিখেছেন—‘অর্থলালসা কতটা উৎকটভাবে মানবাধিকারের পবিত্রতম ও অলঙ্ঘনীয় নীতিকে গভীর ও নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করতে পারে, ছিয়াত্তরের মন্বন্তর মানবসমাজের অস্তিত্বকালব্যাপী তার সাক্ষ্য দিয়ে যাবে।’
ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময়ে ইংরেজ খ্রিষ্টান বণিক কোম্পানির পাঁচ-দশ পাউন্ড বার্ষিক মাইনের খুদে ইংরেজ কর্মচারীরাও বিপুল বিত্ত সঞ্চয় করে একদিকে কলকাতায় নতুন সৌভাগ্যের প্রাসাদ গড়েন, আর সে সম্পদের একাংশ ইংল্যান্ডে পাচার করে সে দেশেও ধনীর তালিকায় নাম লেখান। তাদের দুই-চার-পাঁচ টাকা বেতনের এদেশীয় দোভাষী-বেনিয়ান সহযোগীরাও দুর্ভিক্ষের সময়ে বিপুল ধন-সম্পদের মালিক হয়ে কলকাতার ‘নব্য রঈস’-এ পরিণত হন।
ছিয়াত্তরের মন্বন্তর সুবা বাংলার চেহারা সম্পূর্ণ বদলে দেয়। দুর্ভিক্ষের সময়ই ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস মুর্শিদাবাদের নামেমাত্র নবাবকে হটিয়ে ঔপনিবেশিক শাসনের পূর্ণ কর্তৃত্বের সূচনা করেন। ১৭৭৪ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে তিনি কলকাতায় সুপ্রিম কোর্ট উদ্বোধন করে কলকাতাকে ঔপনিবেশিক রাজধানী ঘোষণা করেন।