ধর্মদ্রোহ প্রতিরোধ যুদ্ধ নিয়ে খলিফা আবু বকরের সঙ্গে বিশিষ্ট সাহাবিদের সামান্য মতবিরোধ দেখা দেয়। উমর (রা.) যেহেতু স্পষ্টভাষী ছিলেন, তাই তিনি খলিফার সিদ্ধান্তে জোরালো প্রতিবাদ করেন।
মোটাদাগে মতবিরোধের কয়েকটি কারণ ছিল। পার্শ্ববর্তী গোত্রগুলো মদিনায় প্রতিনিধিদল পাঠায়। তারা জাকাত প্রদান থেকে অব্যাহতি চায়। তারা অন্যান্য বিধান ঠিকই মেনে চলবে; নামাজ পড়বে, রোজা রাখবে, কিন্তু জাকাতের ব্যাপারে তাদের ছাড় দিতে হবে। প্রতিনিধিদল খলিফার কাছে না গিয়ে বিশিষ্ট সাহাবিদের দ্বারস্থ হয়। তাদের খলিফার কাছে সুপারিশের অনুরোধ করে। সাহাবায়ে কেরাম দেখলেন, মুসলমান হিসেবে এই ব্যক্তিরা নতুন, তাই তারা খলিফার কাছে সুপারিশ করে।
সাহাবিদের আপত্তি ছিল, যেহেতু এরা কালিমা পড়েছে, ইসলামের অন্যান্য বিধান মেনে চলছে, কোরআন পাঠ করছে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কেন? সে সময় মদিনার সামগ্রিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে ছিল। তারা মনে করেছিলেন, একসঙ্গে এতগুলো গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ঠিক হবে না। তারা কৌশলে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা করার পক্ষপাতী ছিলেন। এছাড়া কেউ কেউ মত দেন যে, জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আগে মিথ্যা নবুয়তের দাবিদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
খলিফার দৃঢ়তা
সাহাবিদের এই মতামত খলিফা মেনে নিলেন না। তিনি ধর্ম ও রাষ্ট্রদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অনড় অবস্থানে রইলেন। ফলে প্রতিনিধিদল ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেল।
সাহাবিদের বিরোধী মতামতের উত্তরে সেদিন খেলাফত রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী আবু বকর (রা.) বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কসম! যে ব্যক্তি নামাজ ও জাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে, আমি অবশ্যই তাকে প্রতিহত করব। কারণ জাকাত হলো সম্পদের ওপর ধার্যকৃত আল্লাহর হক। আল্লাহর কসম! যদি তারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে জাকাত হিসেবে একটি মেষ শাবক দিয়ে থাকে আর এখন তা দিতে অস্বীকার করে, তবু আমি তাদের প্রতিহত করব।’ (সহিহ বুখারি।)
দূরদর্শী পরিকল্পনা
জাকাত অস্বীকারকারী লোকরা যখন বুঝতে পারল, জাকাতের বিষয়ে কোনো আপস করে খলিফা সিদ্ধান্ত বদলাবেন না, তখন তারা খেলাফতের কেন্দ্র মদিনা আক্রমণের পরিকল্পনা করল। তাদের ধারণা ছিল, ওসামা (রা.)-এর বাহিনী ফিলিস্তিন অভিযানে যাওয়ায় মদিনা অরক্ষিত আছে।
খলিফা আবু বকর (রা.) তাদের এই কুমতলব বুঝতে পেরে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন।
মদিনার অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা : জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সুবিধার জন্য তিনি মদিনার অধিবাসীদের মসজিদে অবস্থান করার নির্দেশ দেন। তিনি মদিনার প্রবেশপথগুলোতে পাহারার ব্যবস্থা করেন এবং বিশিষ্ট সাহাবিদের নেতৃত্বে ইউনিট গঠন করেন।
অনুগত গোত্রগুলোর সহায়তা গ্রহণ : মদিনার আশপাশে থাকা ইসলামে অবিচল গোত্রগুলোর কাছে তিনি সাহায্যের আহ্বান জানান। তারা বিপুলসংখ্যক সৈন্য ও রসদ নিয়ে মদিনায় উপস্থিত হয়।
দূরবর্তী অঞ্চলের জন্য নির্দেশনা : যেসব অঞ্চল মদিনা থেকে দূরে এবং যেখানে ধর্মত্যাগীদের প্রভাব বাড়ছে, সেখানে তিনি সেখানকার মুসলিম গভর্নরদের কাছে চিঠি পাঠান। এর মাধ্যমে তিনি স্থানীয় মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার অনুপ্রেরণা দেন।
নিকটবর্তী শত্রুদের সরাসরি মোকাবিলা : মদিনার খুব কাছে থাকা ‘আবস’ ও ‘জবইয়ান’ গোত্র যখন নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন আবু বকর (রা.) কোনো দ্বিধা না করে তাদের প্রতিহত করার সিদ্ধান্ত নেন। নিরাপত্তার খাতিরে তিনি নারী ও শিশুদের পাহাড়ের সুরক্ষিত স্থানে সরিয়ে দেন এবং বাহিনীর নেতৃত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়ে সরাসরি রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
মদিনা আক্রমণের চেষ্টা
জাকাত না দেওয়ার দাবিতে আসা বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিদল মদিনা থেকে ব্যর্থ হয়ে প্রত্যাবর্তন করলে পরিস্থিতি দ্রুত সংঘাতের দিকে অগ্রসর হয়। এ সময় তারা উপলব্ধি করে, খলিফা আবু বকর দ্বীনের মৌলিক নীতি কিংবা রাষ্ট্রীয় সংহতির প্রশ্নে কোনো আপস করতে প্রস্তুত নন। তার দৃঢ় ও আপসহীন অবস্থান বিদ্রোহী গোত্রগুলোর মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করলেও, শেষ পর্যন্ত তারা মদিনায় সামরিক আক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রতিনিধিদলের প্রত্যাবর্তনের মাত্র তিন দিনের মধ্যেই কয়েকটি গোত্র একত্র হয়ে গভীর রাতে মদিনার দিকে অগ্রসর হয়।
মদিনার পার্বত্য গিরিপথে নিয়োজিত প্রহরীরা সন্দেহজনক সামরিক তৎপরতা শনাক্ত করে অবিলম্বে খলিফাকে অবহিত করে। খলিফা প্রথমে প্রহরীদের নিজ নিজ অবস্থানে অটল থাকার নির্দেশ দেন। অতঃপর নিয়মিত সামরিক বাহিনী সংগঠনের অপেক্ষা না করে, তিনি মসজিদে উপস্থিত সাহাবিদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ অভিযানে বেরিয়ে পড়েন।
আকস্মিক ও সংগঠিত প্রতিরোধে আক্রমণকারী বাহিনী পশ্চাদপসরণে বাধ্য হয়। মুসলিম বাহিনী শত্রুপক্ষকে ধাওয়া করে ‘জু-হুসা’ পর্যন্ত এগিয়ে যায়। একপর্যায়ে বিদ্রোহী বাহিনী প্রতিরোধমূলক কৌশল হিসেবে চামড়ার থলে বাতাসে ফুলিয়ে রশিতে বেঁধে মুসলমানদের উটের সামনে নিক্ষেপ করে। এর ফলে উটগুলো আতঙ্কিত ও দিগ্ভ্রান্ত হয়ে মদিনায় ফিরে আসে।
যুদ্ধের দ্বিতীয় ধাপ : শত্রুদের কিছু মিত্র গোত্র ভেবেছিল, মুসলমানরা পরাজিত হয়ে পালিয়েছে। তাই তারা সংঘবদ্ধ হয়ে মদিনায় আক্রমণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেলে। খলিফা আবু বকরও বসে থাকেননি। মদিনায় পৌঁছে তিনি যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন এবং শত্রুদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। তারা ভীত হয়ে যুদ্ধ ত্যাগ করে পালিয়ে যায় এবং মুসলিমদের জয় হয়।
যুদ্ধের তৃতীয় ধাপ : আবস ও জবইয়ান গোত্রদ্বয় ধোঁকাবাজি করে ‘জুল-কাসসা’য় অবস্থানরত মুসলমান প্রহরীদের হত্যা করে। তারা আশপাশের মুসলিমদের নির্যাতন করে। খলিফা এর বদলা নিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলেন। এরই মধ্যে ওসামা বাহিনী ফিলিস্তিন থেকে মদিনায় ফিরে আসেন। তিনি পুরো বাহিনীকে বিশ্রাম নিতে বলেন এবং ওসামাকে মদিনার নায়েব বানিয়ে নিজে যুদ্ধের জন্য বের হয়ে পড়েন। শীর্ষ সাহাবিরা তাকে যুদ্ধে যেতে বারণ করলেন। কিন্তু খলিফা নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকেন। এরপর খলিফা সৈন্য নিয়ে ‘জুল কাসসা’য় আসেন। বিদ্রোহী বাহিনীর শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করেন।
যুদ্ধের ফল : এটা ছিল জাকাত অস্বীকারকারী গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে পরিচালিত প্রথম সামরিক অভিযান। এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করে। এ যুদ্ধের ফলে বিদ্রোহী শক্তিগুলোর মধ্যে দুটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থান দেখা দেয়। একপক্ষ সব দ্বিধা ও সংশয় ভুলে আবার ইসলামে ফিরে আসে। অন্যপক্ষ তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী শত্রুশিবিরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মিথ্যা ধর্মদ্রোহের আন্দোলনে যোগ দেয়।
এই অভিযানে খলিফা আবু বকর (রা.) দৃঢ় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তার সময়োপযোগী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ বিজয়কে দ্রুততর করে এবং মুসলিম রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। তার কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো সত্যিকার অর্থে প্রশংসার দাবি রাখে। তিনি, দৃঢ় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন, কার্যকর গোয়েন্দা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, শত্রুদের অপ্রস্তুত রেখে অতর্কিত হামলার কৌশল প্রয়োগ করেছিলেন, জাকাত প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন, বৃদ্ধ বয়সে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, খেলাফত রাষ্ট্রের সক্ষমতার সবার সামনে তুলে ধরে ছিলেন। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে রিজার্ভ বাহিনীর কৌশলগত ব্যবহার করেছিলেন।