নজরুলের উপন্যাস
‘পুতুল খেলার কৃষ্ণনগর।’
‘যেন কোন খেয়ালি শিশুর খেলাশেষের ভাঙা খেলাঘর।’
এই প্রথম দুই লাইনেই লুকিয়ে রয়েছে পুরো উপন্যাসের মর্মার্থ। এখানকার মানুষ যেন মানুষ নয়—এক-একটা পুতুল। সৃষ্টিকর্তা তার আপন মহিমায় এদের নিয়ে একটি খেলাঘর সাজিয়েছেন এই কৃষ্ণনগরে। যখন ইচ্ছে হয় ঘর সাজালেন; খেলা শেষ হলো, খেয়ালি মনে ভেঙে দিলেন সাজানো ঘর। কৃষ্ণনগর হয়ে রইল খেলা শেষের ভাঙা খেলাঘর।
তেমনি এক সাজানো পরিবার ছিল প্যাকালের মায়ের। বিধাতা আপন হাতে সাজিয়েছিলেন তার পরিবার তার স্বামী, চার পুত্র, তিন পুত্রবধূ, এক কন্যা ও ডজনখানেক নাতি-নাতনি দিয়ে। তারপর বিধাতার সাজানো সে খেলাঘর ভেঙে দেওয়ার সময় হলো। প্যাকালের মা বিধবা হলো, বিধবা হলো তার তিন পুত্রবধূ। ধীরে ধীরে ক্ষুধাতুর শিশুদেরও মৃত্যু ছাড় দেয়নি। নজরুল বলেন, ‘অন্ধকার ঘরে ক্ষুধাতুর শিশুর মাথার ওপর বাদুড় উড়ে যায়—আসন্ন মৃত্যুর ছায়ার মতো।’ তেমনি সেজো বউকে মৃত্যু ছাড় দেয়নি। এত মৃত্যুর শোক হৃদয়ে নিয়েও তারা বেঁচে থাকে বাকিদের খাবার জোটানোর চেষ্টায়। বিধবা ও ছেলেহারা মাকেও সমাজ ‘তিনবেটাখাগী’ উপাধি দিয়ে দেয়। আবার রুবি আনসারকে পায় ঠিকই, তবে মরণের আগে এবং এই পাওয়া তাকেও নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। আর মেজো বউ বেঁচে থাকে নিজ খোকাকে হারিয়ে, জগতের সকল খোকাকে নিজের মনে করে, বিশ্বমাতা হয়ে।
‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসে মৃত্যু যেমন আষ্টেপৃষ্ঠে ধরেছে দুঃখী, দরিদ্র প্যাকালের মায়ের পরিবারটিকে, তেমনি ক্ষুধা হচ্ছে আর-এক বাস্তবতা। ক্ষুধা মেটানোর ব্যস্ততায় অনেক মৃত্যুকে তাদের ভুলে থাকতে হয়।
‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসে তৎকালীন সমাজের ইতিহাস তুলে ধরেছেন কাজী নজরুল। প্রতিটি চরিত্র, প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি যে দুঃখের সাগর তিনি রচনা করেছেন, তাতে যে অল্পবিস্তর হাস্যরস দিয়েছেন, তা না হলে যেন জীবন আর জীবন থাকে না।
উপন্যাসটিতে চারটি পর্যায় রয়েছে। প্রথম পর্যায়, মেজো বউ ও তার পরিবারের সদস্যদের দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা। দ্বিতীয় পর্যায়, ক্ষুধা ও মৃত্যু থেকে সন্তানদের বাঁচানোর জন্য মেজো বউয়ের ধর্মান্তরিত হওয়া। তৃতীয় পর্যায়, আনসার চরিত্রটির মাধ্যমে দেশের ও বিশ্বের সমসাময়িক অবস্থা ও দেশপ্রেমকে পাঠকের মনে জাগ্রত করা হয়েছে। চতুর্থ পর্যায়, শত ক্ষুধা-তৃষ্ণার মাঝেও জীবন বহমান আপন গতিতে, তা বোঝাতে নজরুল মাতৃস্নেহ ও নর-নারীর প্রেমকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করেননি। আনসার-রুবির আবার দেখা হওয়া, রুবির আনসারের সেবায় নিজেকে সঁপে দেওয়া—যেন নর-নারীর প্রেমকে সমুন্নত করার জন্যই। আর মেজো বউয়ের খোকার চালশে পালনের জন্য আবার স্বধর্মে ফিরে আসা এবং মাতৃস্নেহকে উপেক্ষা করে আনসারের কাছে না যাওয়া—মাতৃস্নেহকেই মহামান্বিত করার শামিল। নজরুল যত সুন্দর করে প্রতিটি পর্যায়কে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন, তা হয়তো খুব কম ঔপন্যাসিকই পেরেছেন।
জীবন যেমন একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় না, তেমনি নজরুলের ‘মৃত্যুক্ষুধা’ একটিমাত্র প্রেক্ষাপট নিয়ে আবর্তিত নয়। এখানে রয়েছে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই, রয়েছে মৃত্যু, ক্ষুধা, বিদ্রোহ, রয়েছে ধর্ম নিয়ে বিরোধ ও ধর্মপ্রচার, রয়েছে মাতৃস্নেহ, রয়েছে প্রেম ও বিরহ। তবে সবকিছু ছাপিয়ে মাতৃস্নেহ ও প্রণয় যেন টিকে থাকে শেষ লড়াইয়ে।
দারিদ্র্য কৃষ্ণনগরের মানুষকে এমনভাবে গ্রাস করেছে যে তারা একটু ক্ষুধা নিবারণের জন্য কতই না কিছু করে। তবুও হয় না তাদের পেট পুরে খাওয়া। দারোগাবাড়ির বিড়ালের খেতে না পারা ফেলে যাওয়া অল্প দুধের সঙ্গে পানি মিশিয়ে আধা সের দুধ ঝির হাতে পাঠিয়ে দিয়েছেন দারোগা সাহেব। মুরগির বাচ্চার জন্য রেখে দেওয়া তিন ছটাক খুদকুঁড়ো আর সে দুধ দিয়ে ক্ষীর বানিয়ে ডজনখানেক বাচ্চাকে তাই খাওয়ান মেজো বউ। তাই তাদের সারাদিনের আহার। এই ক্ষীরই তাদের জন্য ঈদের আনন্দ এনে দিয়েছে। আঠারো-উনিশ বছরের প্যাকালে চার আনা দিয়ে একটি আয়না না কিনে, সেই টাকা দিয়ে দেয় সংসারে; আর সে স্টিলের প্লেটে পানি নিয়ে তাতে রোজ চেহারা দেখে এবং না খেয়ে খুশিমনে কাজে বের হয়ে যায়। যেটা উনুনশাল, সেটাই ঢেঁকিশাল, সেটাই রান্নাঘর এবং সেটাই জনসাতেকের রাতে শোবার ঘর। তারই একপাশে বিশেক মুরগি ও ছাগলের ডাকবাংলো তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। হাঁড়িগুলো যেমন ফুটো, ঘরের চালও সমান ফুটো। সে চালে বাসা বাঁধার খড় না পেয়ে চড়ুই পাখিগুলোও চলে গেছে। দারিদ্র্যের তাড়নায় তারা ধর্মান্তরিত হয়ে যায়। ক্ষুধায় আর বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে পরিবারের এক-এক সদস্য।
আর এই সমাজে খ্রিষ্টান আর মুসলমানদের মধ্যে ঝগড়া নিত্যদিনের ব্যাপার। আবার তারা পরক্ষণেই সব ভুলে যায়। দুঃখ এদের মঙ্গলই করেছে। এত দুঃখ যদি এদের না থাকত, তাহলে এমন প্রচণ্ড ঝগড়ার পরদিনই আবার ‘দিদি’ ‘বুবু’ ‘খালা’ বলে হেসে কথা বলতে পারত না। নজরুল বলেন, ‘এরা সব ভোলে—ভোলে না কেবল তাদের অনন্ত দুঃখ, অনন্ত অভাব।’
নজরুলের প্রতিটি চরিত্রই স্বমহিমায় দীপ্ত। হোক সে প্রধান চরিত্র মেজো বউ, বা ক্ষুদ্র চরিত্র রেতো কামার। সবগুলো চরিত্রই কাহিনীকে এগিয়ে নিতে সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্যাকালের মা, বড় বউ, সেজো বউ, সেজো বউয়ের দুমাসের ছোট্ট খোকা, প্যাকালে, মেজো বউয়ের ছেলে-মেয়ে, গ্রামের মোড়ল, মিস জোন্স, কুর্শি, আনসার, লতিফা আর স্বল্প সময়ের রুবি—সকল চরিত্রই তাদের সর্বোচ্চ মহিমায় এই উপন্যাসে অবদান রেখেছে। ক্ষুধার্ত খোকার কথাগুলো সকল মাতৃহৃদয়কে ক্রন্দিত করতেও কার্পণ্য করেনি। আনসার চরিত্রটি যেন মেজো বউয়ের নারী চরিত্রের অনুরূপ একটি নর চরিত্র। একমাত্র আনসারই যেন পারে মেজো বউকে বশে আনতে। আনসারের দেশপ্রেম যেমন রুবির প্রেমকে হারিয়ে দেয়, তেমনি মেজো বউয়ের মাতৃস্নেহ আনসারের মোহ থেকে তাকে ফিরিয়ে আনে। তিনি যেমন জটিল ‘মেজো বউ’ চরিত্রটি তৈরি করেছেন, আবার সহজ, সরল লতিফাকেও তৈরি করেছেন।
উপন্যাসের কোথাও মেজো বউয়ের নাম না পাওয়া গেলেও, খ্রিষ্টান হয়ে ‘হেলেন’ নাম ধারণ করেন তিনি। কিন্তু হেলেন নামটি তাকে সেই শক্তি দিতে পারেনি যা সে ‘মেজো বউ’ নামে পেত। ‘মেজো বউ’ শব্দটিই তার শক্তি, তার সৌন্দর্য, তার জৌলুস। এবং বিধবা মেজো বউ এই উপন্যাসের অলংকার। বিধবা হয়েও তার পরিপাটি থাকা, গুনগুন করে গান গাওয়া, কারো কথায় কান না দেওয়া, কারো কাছে নত না হওয়া, সবাইকে ভালোবাসা ও ভালো রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করা—যেন জীবনকে কীভাবে যাপন করতে হয় তারই উদাহরণ। বুদ্ধিমতী মেজো বউয়ের পরামর্শে রুবি অবশেষে আনসারের কাছে ছুটে যায়। অবশেষে সন্তানের ক্ষুধা মেটানোর জন্য ও সমাজের অবহেলায় প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ধর্মান্তরিত হয়ে, কীভাবে মাথা না নুয়ে বাঁচতে হয় তা-ই যেন দেখিয়েছেন।
‘আনসার’ চরিত্রটির আবির্ভাব ঘটে উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্যায়ে। লতিফার আনু ভাই (আনসার) হিসেবে সে কৃষ্ণনগরে আসলেও, তার আসল উদ্দেশ্য ছিল এখানে ‘শ্রমিকসংঘ’ গড়ে তোলা। আনসার চরিত্রটি নজরুলের অন্য উপন্যাসগুলোর প্রধান পুরুষ চরিত্রগুলোর মতোই। জাগতিক কোনো কিছুই তাদের বেঁধে রাখতে পারে না। না ঘর, না পরিবার, আর না কোনো নারী তাদের ধরে রাখতে পারে। তারা দেশের তরে, বিশ্বের তরে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতেই যেন এই ধরাতে এসেছে। তারা বেখেয়ালি, প্রতিবাদী, মানবপ্রেমী, পরোপকারী নিখাদ হৃদয়ের পুরুষ। সকল মায়ার বাঁধন তারা ছিন্ন করতে পারে বৃহৎ স্বার্থের জন্য।
রুবি চরিত্রটির আবির্ভাব হয় উপন্যাসের চতুর্থ ধাপে। স্বল্পসময়ের হলেও উপন্যাসে তার গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়। বরং তার মাধ্যমে উপন্যাসটি তার অন্যতম একটি অধ্যায় নর-নারীর প্রেমকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে। রুবি বুদ্ধিমতী, সুন্দরী, জেদি একজন নারী। কিন্তু আনসারের কাছেই সে কেবল নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে। বিধবা শ্বেতবসনা রুবি বিয়ের একমাসের মধ্যেই স্বামীকে হারায়। স্বামীশোক তার নাই। তবে মা-বাবা তার অমতে বিয়ে দেওয়ায় তাদের দুঃখী করার জন্যই তার বৈধব্য ধারণ করা। অবশেষে সে আনসারকে পায়। তবে টিউবারকিউলোসিস আক্রান্ত আনসারকে সেবা করার জন্যই সে যায়। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও আনসার মরণের আগে রুবিকে কাছে পাওয়ার এক তীব্র মৃত্যুক্ষুধা অনুভব করে। রুবিও তার ডাকে সাড়া দিয়ে ওয়ালটেয়ার চলে আসে। তার সেবা করে এবং সে নিজেও মৃত্যুর কোলে পতিত হবে জেনেও সে আনসারের মৃত্যুক্ষুধা নিবারণে নিজেকে সঁপে দেয়। আনসার বলে, ‘রুবি, চিরদিনই বিষ খেয়ে বড় হয়েছি, আজ মৃত্যুর ক্ষণে তুমি অমৃত পরিবেশন করো! আমি মৃত্যুঞ্জয়ী হই।’ রুবিও তার উপবাসী ভিখারি বন্ধুকে ফিরাতে পারেনি।
‘মৃত্যুক্ষুধা’র শব্দচয়নে নজরুল যথেষ্ট পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন। ঘটনার প্রয়োজনে প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি শব্দই যেন এক-একটা ঘটনা হয়ে যায় এখানে। প্রথম পর্যায়ে দেখানো হয় বিধবা প্যাকালের মায়ের ক্ষুধার্ত পরিবারের চিত্র। সেজো বউ আর তার দুই মাসের খোকার মৃত্যুর সময়ের প্রতিটি বাক্য আর শব্দ পাঠক-হৃদয়কে ক্রন্দিত করে। তাদের হাহাকার যেন শব্দের মূর্ছনায় পাঠকের বুক ভারী করে দেয়। পাঠক নিজেই যেন সে সন্তানহারা মা, অথবা সেই আসন্ন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষারত শয্যাশায়ী সেজো বউ। পাঠক কখনো প্যাকালের মা, কখনো মেজো বউ। শব্দে শব্দে পাঠক চরিত্রের মধ্যে ঢুকে পড়ে এবং নিজেই সেই যন্ত্রণা অনুভব করতে থাকে।
আসন্ন মৃত্যুকে বোঝানোর জন্য নিবু নিবু প্রদীপের অবতারণা পাঠক মনেও মৃত্যুর ভয় সঞ্চার করে। নজরুল বলেন, ‘সেজো বউ শুয়ে শুয়ে ধুঁকছে। তার পাশে খোকা, যেন গোরস্থানের নিবু নিবু প্রদীপের শেষ রশ্মিটূকু। শুধু একটু ফুঁয়ের অপেক্ষায় আছে।’ তখন পাঠকের শ্বাসও যেন যায় যায় অবস্থা। মেজো বউ যখন তার ছোট ছেলে-মেয়েকে ফেলে রেখে বরিশাল চলে যায় খ্রিষ্টান মিশনারিতে, তখন মাতৃহীন ক্ষুধার্ত খোকা ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে গভীর রাতে মসজিদের দ্বারে যায় একটু শিন্নির আশায়। তখন নজরুল লিখলেন, ‘বড়বউ মসজিদের দ্বার থেকে কোলে করে আনতে চায়, সে ধুলায় গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে। বলে, ‘যাব না, আমি শিন্নি খাব, আমার বড্ড খিদে পেয়েছে গো। আমি যাব না।’ ঘটনার আবহে শব্দগুলো পাঠক-হৃদয়কে ছিন্ন করে আঘাত হানে। ক্ষুধা ওই সমাজকে কতটুকু গ্রাস করেছিল, তা বুঝতে আর বাকি থাকে না। এভাবে প্রতিটি পর্যায়েই শব্দচয়ন পাঠককে একটি মোহের মধ্যে থাকতে বাধ্য করে। যেন পাঠক নিজেই সকল দুঃখে দুঃখী।
তাছাড়া নারীর সৌন্দর্য বর্ণনায়ও তার শব্দের তুলনা হয় না। যেমন—কুর্শির সৌন্দর্য বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘মেয়েটি যেন একখানা চারপয়সা দামের চৌকো পাউরুটি।’ ক্ষুধার রাজ্যে যেন এর চেয়ে ভালো শব্দ আর হয় না। চোখগুলোকে বলেছেন কালো জলে ক্রীড়ারত চটুল সফরি, ভুরুজোড়া গাঙচিলের ডানার মতো, ঠোঁট দুটো কচি নিমপাতার মতো কাঁপছে, নাকটি যেন মোহনবাঁশি, চিবুকের মাঝে নাশপাতির মতো ছোট্ট টোল, আর শ্রাবণ রাতের মেঘের মতো চুল। এমন নারী-সৌন্দর্য কে কোথায় দেখেছে!
আবার দুই সন্তানের মাতা বিধবা মেজো বউয়ের সৌন্দর্য তিনি গড়নে নয়, বরং চালচলনে বর্ণনা করেছেন। যেমন—বিধবা হয়েও সে পান খায়, দু-একদিন চুড়ি পরে, আবার পরদিন ভেঙে ফেলে, কাপড় পরার ধরনটাও খেরেস্তানি ধরনের, সিঁথিটা সোজা কাটলেও বাঁকা মনে হয়। খোঁপায় মাঝে মাঝে গাঁদা ও দোপাটি ফুলের গুচ্ছ দেখা যায়। ঠোঁটে তার হাসি লেগেই থাকে, তার ওপর দিনরাত গুনগুন করে গান গায়। রূপ তার আগুনের শিখার মতোই লক্লক্ করে। সে যেন বসরা-গোলাবের মতো, শাখা-ভরা ফুল, পাতা-ভরা কাঁটা। তাকে সবাই ভয় পায়, সবার আদরের দুলালীও সে। তাকে ‘আড়কাঠি’ও বলে অনেকে।
তাছাড়া সেই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষার শব্দগুলোও কম সুন্দর নয়। যেমন—ওমান কাত্লি (রোমান ক্যাথলিক), ভদ্দর-নুক (ভদ্রলোক), ছিকরেট (সিগারেট), ছিটেনপাড়া (প্রোটেস্টান্ট পাড়া), খেরেস্তান (খ্রিষ্টান) ইত্যাদি। আবার ইংরেজ খ্রিষ্টানদের মুখে বাংলা ভাষাও বড্ড আদুরে লাগে। যেমন—মিস জোন্স মেজো বউকে বলে, ‘আমি টোমার মনের কঠা বুজেছে। টোমাকে একেবারে যেটে হবেনা ওখানে। ক্রীশ্চান ও হটে হবে না। টুমি শুডু রোজ সকালে একবার করে যাবে। আবার ডুপুরে চলে আসবে।’
উপন্যাসের ঘটনার প্রবাহে দারিদ্র্যপীড়িত জীবনের আড়ালে খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারও এ উপন্যাসের অন্যতম একটি থিম। খ্রিষ্টান মিশনারিরা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুঃখকে পুঁজি করে তাদের ধর্মান্তরিত করতে সচেষ্ট হয়। তারা অসহায়, দুস্থ, অসুস্থ দরিদ্র মানুষকে অর্থ সাহায্য দেয়। ফলে তাদের ওপর ভরসা করতে পারে সাধারণ জনগণ। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগায় খ্রিষ্টানরা। মুসলিম ধনী গোষ্ঠী যেখানে খোঁজও নেয় না, সেখানে খ্রিষ্টানরা ওষুধ-পথ্য দেয় দ্বারে এসে। ফলাফল—ধর্মান্তরিত হয়ে যায়। এভাবে কৃষ্ণনগরের জনগণ খ্রিষ্টান হতে শুরু করে। মেজো বউও বাদ যায় না। সেজো বউ আর সেজো বউয়ের খোকা মারা যাওয়ার পর শোকে পাথর মেজো বউ তার দুই সন্তানকে দুবেলা খাবার দেওয়ার জন্য খ্রিষ্টান মিশনারিতে যাওয়া-আসা শুরু করে। লেখাপড়া শেখে ওখানে। বাচ্চারাও লেখাপড়া শেখে। কিন্তু তা সহ্য হয় না মুসলমান মোড়লদের। তারা নানাভাবে তাকে উৎপাত করতে থাকে। তাই বাধ্য হয়ে মেজো বউ খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে। আনসারকে এক পর্যায়ে সে বলে, ‘আপনারা একটু একটু করে আমাকে খ্রিষ্টান করেছেন।’ আনসারের মেজো বউকে বুঝতে আর দেরি হয় না। সে বলে, ‘বুঝেছি, আমাদের ধর্মান্ধ সমাজ কত বেশি অত্যাচার করে আপনার মত মেয়েকেও খ্রিষ্টান হতে বাধ্য করেছে!’
ধূর্ত খ্রিষ্টানরা মেজো বউয়ের হাবভাব দেখে তাকে বরিশাল নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। চলে যায় সব ফেলে সে। কী এক অভিমানে প্রাণপ্রিয় সন্তানদেরও ফেলে রেখে যায়। চলে যায় প্যাকালেও ধর্মান্তরিত হয়ে। সঙ্গে যায় তার স্ত্রী কুর্শি। তাদের সচ্ছল দিন কাটে সেখানে। পেছনে পড়ে রয় মেজো বউয়ের মুসলমান সন্তান ও আপনজন।
মাতৃত্বকে ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসে মহামান্বিত করা হয়েছে এবং সার্বজনীন রূপ দেওয়া হয়েছে। মেজো বউয়ের মাতৃত্বের স্বাদ যেন পাঠকও পায়। সন্তানের জন্য খ্রিষ্টান মিশনারিতে যাতায়াত করা এবং পরে ধর্মান্তরিত হওয়া—তার নিজেকে বিসর্জন দেওয়ারই শামিল। তবে উপন্যাসের এক পর্যায়ে তিনি সন্তানদের রেখে চলে যান বরিশাল খ্রিষ্টান মিশনারিতে। তখন পাঠক-হৃদয়ও কষ্টে জর্জরিত হয় এবং ভেবে পায় না কেন সে সন্তানদের ফেলে গেল। আসলে সমাজ তাকে পাথর বানিয়ে দিয়েছিল।
খোকার অসুস্থতার খবর শুনে বিচলিত মেজো বউ যেন সমস্ত মাতৃহৃদয়ের প্রতিচ্ছবি। ছুটে আসে সে। কিন্তু শেষ দেখা হয় না। রাক্ষুসী উপাধি পায় সে। আরো পাথর হয়ে যায়। পাথর মেজো বউ সব ভুলে থাকার ভান করলেও সে ক্ষতবিক্ষত হৃদয় নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। খোকার সকল স্মৃতিচিহ্ন সে পুড়িয়ে ফেলে। আর সেই সঙ্গে পোড়ে তার মাতৃহৃদয়ও।
একরোখা মেজো বউকে সবাই মুসলমান করার বৃথা চেষ্টা করলেও, গ্রামের মোড়ল খোকার চালশেকে কাজে লাগিয়ে তাকে মুসলমান বানাতে সক্ষম হয়। খোকার চালশেতে (চল্লিশ দিন) তার মনে হয় তার খোকা কতদিন না খেয়ে ক্ষুধার জ্বালায় অসুস্থ হয়ে মারা গেছে। কিন্তু পাড়ার খোকাদের খাওয়াতে হলে তাকে মুসলমান হতে হবে। সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে বলতে লাগল, ‘আমি আজই মুসলমান হব। আমার খোকার আত্মা যেন চিরকালের ক্ষুধা নিয়ে না ফিরে যায়।’
পাড়ার সব ছেলেকে সে নিজের ছেলে মনে করে। সব ছেলেকে খাইয়ে সে নিজের মাতৃহৃদয়কে তৃপ্ত করে। তার খোকা এই ক্ষুধাতুর শিশুদের মাঝেই শত শিশুর রূপ ধরে এসেছে। যে খোকাকে দেখে, তার মধ্যেই সে তার খোকাকে দেখতে পায়। আজ যেন সে জগজ্জননী। ঐ আকাশের মতো বিরাট উদার খোকার মায়ের কোল। মেজো বউ চরিত্রটি যেন বিশ্বমাতার পরিপূর্ণ রূপ।
‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসটিতে কাজী নজরুল ইসলাম মূলত সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য, উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির বৈষম্যকে তুলে ধরেছেন। কৃষ্ণনগরের চাঁদসড়কের এই জনবসতিতে কীভাবে এই নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ কোনো রকমে জীবন যাপন করছে, তা-ই তুলে ধরেছেন নজরুল তার নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে। তবুও দিন কেটে যায়। জীবন চলতে থাকে পাওয়া আর না পাওয়ার দুঃখ-কষ্ট নিয়ে।