হোম > সাহিত্য সাময়িকী > মুসলিম বিশ্বের ইতিহাস

হারিয়ে যাওয়া আমিরুল মুমিনিন খাল

জাহিদ হাসান

আজকের বিশ্ব অর্থনীতি অনেকটাই সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল আর সেই পথের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধমনি মিসরের সুয়েজ খাল। বিশ্ববাণিজ্যের প্রায় ১২-১৫ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়েই চলাচল করে। তবে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন সহজ করার এই ভাবনা নতুন কিছু নয়। চৌদ্দ শতকেরও বেশি আগে মিসরেই কাটা হয়েছিল এমন আরেকটি খাল, ইতিহাসে যা ‘আমিরুল মুমিনিন খাল’ নামে পরিচিত।

পরিচয় ও ঐতিহাসিক পটভূমি

খালটির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে খলিফা ওমর (রা.)-এর শাসনামলের এক কঠিন দুর্যোগের স্মৃতি। ১৮ হিজরির (৬৩৯-৬৪০ খ্রি.) দিকে আরব উপদ্বীপে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। খাদ্য সংকটে মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। মদিনাসহ হিজাজের বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যাভাব মোকাবিলা করা খলিফার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

এমন পরিস্থিতিতে ওমর (রা.) বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নরদের কাছে সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠান। মিসরের গভর্নর আমর ইবনুল আস (রা.)-এর উদ্যোগে উটের কাফেলায় করে মিসর থেকে হিজাজে খাদ্যসামগ্রী পাঠানো হয়। এই খাদ্যসহায়তায় দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের দুর্দশা কিছুটা লাঘব হলেও স্থলপথে এত বিপুল খাদ্য পরিবহন ছিল সময়সাপেক্ষ ও শ্রমসাধ্য। তাই খলিফা আরো সহজ ও কার্যকর বিকল্পের কথা ভাবলেন।

সেই প্রেক্ষাপটে খলিফার মনে জাগল নীলনদ আর লোহিত সাগরকে জলপথে যুক্ত করার ভাবনা। তিনি আমরকে লিখে পাঠালেন, মিসরের নীলনদ থেকে একটি খাল কেটে তার পানি সাগরে নিয়ে যেতে চান। খলিফার নির্দেশ পেয়ে আমর কাজে নেমে পড়লেন।

ঐতিহাসিক সূত্র অনুসারে, এর আগেও মিসরে নীলনদ থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি প্রাচীন নদীপথ ছিল। ফারাওদের আমলে খনন করা এই নদীপথ পরবর্তী সময়ে ভরাট হয়ে নৌচলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। নতুন খালটি খনন করা হয়েছিল আরো উত্তর দিক ঘেঁষে। সেটি নীলনদের সঙ্গে মিলেছিল আজকের কায়রোর সাইয়েদা জয়নব এলাকার কাছাকাছি।

আমর ইবনুল আস (রা.)-এর কর্মদক্ষতা

আমর ইবনুল আস (রা.) নীলনদ থেকে লোহিত সাগরের তীরবর্তী প্রাচীন বন্দর কুলযুম পর্যন্ত জলপথ পুনঃখননের ব্যবস্থা করেন। কুলযুমের অবস্থান ছিল বর্তমান সুয়েজ অঞ্চলের কাছাকাছি। এই খালের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৭০ কিলোমিটার। ঐতিহাসিক মাকরিজির বর্ণনা অনুযায়ী, খালটি খনন করতে প্রায় ছয় মাস সময় লেগেছিল। কাজ শেষ হওয়ার পর এতে নৌযান চলাচল শুরু হয় এবং মিসর থেকে সহজে ও কম সময়ে হিজাজে খাদ্যশস্য পাঠানো সম্ভব হয়। ফুসতাত থেকে নৌকাযোগে গম ও যব এই খাল ধরে পৌঁছাত কুলযুমে। সেখান থেকে জাহাজে সাগর পাড়ি দিয়ে সেই রসদ যেত হিজাজের বন্দরে।

এই খালের ফলে খাদ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়। একটি নৌকা বা সমুদ্রগামী জাহাজ বহু উটের কাজ সামলাতে পারত, খরচও অনেক কম হতো। কুলযুম থেকে বয়ে আসা উত্তুরে হাওয়ায় জাহাজ দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে হিজাজের বন্দরে পৌঁছে যেত। সময় বাঁচার পাশাপাশি মরুদস্যুদের ভয় থেকেও নিস্তার পাওয়া গেল। মরুভূমির তপ্ত বালুর ওপর দিয়ে যে যাত্রা ছিল কষ্টকর, সাগরের ঢেউয়ে তা হয়ে উঠল সহজ ও দ্রুত। এই খালের নামকরণ করা হয় খলিফার সম্মানে। ওমরের স্মরণে নতুন খালটি পরিচিত হয় ‘খালিজে আমিরুল মুমিনিন’ নামে।

ভূমিকা ও পতন

ক্ষুধা মেটানোই ছিল এই খালের প্রথম উদ্দেশ্য। কিন্তু বলা হয়, একবার পথ খুলে গেলে জীবন নিজের পথ নিজেই খুঁজে নেয়। গবেষকদের মতে, এই খাল ছিল আরব শাসকদের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক প্রকল্প। নীলনদকে লোহিত সাগরের সঙ্গে যুক্ত করার ফলে মিসরের অভ্যন্তরীণ নদীপথের সঙ্গে আরব উপদ্বীপের সামুদ্রিক যোগাযোগের সংযোগ তৈরি হয়েছিল। এর মাধ্যমে খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহন করা যেত।

খালটি দীর্ঘকাল ব্যবহৃত হলেও চিরকাল সচল থাকেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর বিভিন্ন অংশে পলি ও বালু জমতে থাকে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে নৌচলাচল ক্রমে ব্যাহত হয়। পরবর্তী শাসনামলে খালটির গুরুত্ব কমে যায় এবং একপর্যায়ে লোহিত সাগরের সঙ্গে এর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

ঐতিহাসিক সূত্রগুলোতে খালটির বিলুপ্তি ও বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময় নিয়ে বিভিন্ন বিবরণ পাওয়া যায়। কিছু বর্ণনায় উমর ইবনু আবদুল আজিজের শাসনামলের পর এর রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ঐতিহাসিক মাকরিজির বিবরণে আব্বাসী খলিফা মানসুরের আমলে, ১৫০ হিজরি (৭৬৭ খ্রি.) এর দিকে, খালটি বন্ধ করে দেওয়ার কথা এসেছে। পরবর্তী সময়ে এর বিভিন্ন অংশের চিহ্ন টিকে থাকলেও প্রাচীন নৌপথ হিসেবে এর কার্যকারিতা বিলুপ্ত হয়ে যায়।

সমুদ্রের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও খালটি কায়রোর ভূগোল ও পানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থেকে যায়। এর নাম হয়ে দাঁড়ায় ‘আল খালিজুল মিসরি’ বা মিসর খাল। খালের মুখ নীলনদের যেখানে মিশেছিল, সেই জায়গার নাম হয় ‘ফামুল খালিজ’—অর্থাৎ খালের মুখ। এই খালের পাড় ঘেঁষে ঐতিহাসিক কায়রোর বহু উত্তর-দক্ষিণমুখী সড়ক গড়ে উঠেছিল। এমনকি বিখ্যাত আল-মুইজ সড়কও নির্মিত হয়েছিল এর কোল ঘেঁষে। তবে আধুনিক যুগে নগরায়ণের চাপে পুরোনো খালটি ভরাট হয়ে সড়কে রূপ নেয়। এখন সেই পথ ধরে বয়ে চলে গাড়ির স্রোত।

মাহমুদ গজনবির ভারত অভিযান, উপনিবেশী বয়ান ও বাস্তবতা

কাশ্মীরের ৬০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বিয়ের ভোজ

আধুনিক অপটিকস, ইবনুল হাইসাম ও নতুন যুগের সূচনা

মধ্যযুগের মিনিয়েচার শিল্পে জীবন ও সংস্কৃতি

পর্দার জৌলুস বনাম ইতিহাসের বাস্তবতা

সেপ্টেম্বর-রবিউস সানি-আশ্বিন: মুসলিম বিশ্বের ইতিহাস ক্যালেন্ডার

খলিফা ওমরের অর্থ ব্যবস্থাপনায় বায়তুল মাল

কৃষিকাজ ও সেচব্যবস্থার আধুনিকায়ন

আইনে জালুতের যুদ্ধ: পাল্টে দিয়েছিল ইতিহাসের গতিপথ

কৃষিকাজ ও সেচব্যবস্থার উন্নয়ন