আধুনিক জাতি ও রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো জাতীয়তা। রাষ্ট্রীয় মূলনীতিরূপে গৃহীত জাতীয়তাবাদ থেকেই রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর ব্যক্তিগত নাগরিকতার প্রশ্নটি মীমাংসিত ও নির্ধারিত। বলা যায়, জাতীয়তাবাদ হলো একটি রাষ্ট্র, জাতি বা জনগোষ্ঠীর সামষ্টিক পরিচয়, আত্মমর্যাদা ও ঐক্যের বোধ।
জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে দেশি-বিদেশি রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের নানারকম সংজ্ঞা রয়েছে। তাদের প্রায় সবাই অভিন্ন মত পোষণ করেন। তাদের মতামতের ভিত্তিতে মোটামুটি এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, জাতীয়তাবাদ হলো একটি চেতনা বা মানসিক অবস্থার মানবগোষ্ঠী। দৃঢ়তম প্রবৃত্তিই হলো এর উৎস। নিজেদের মাঝে ঐক্যবোধ এবং বিশ্বের অন্যান্য মানবগোষ্ঠী বা সম্প্রদায় থেকে পার্থক্যবোধই জাতীয়তাবাদের বৈশিষ্ট্য।
ব্রিটিশ ভারতে বাঙালি জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বরাজ তথা অখণ্ড বাংলার স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন দানা বাঁধে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক প্রমুখ। চিত্তরঞ্জন বলেছিলেন, ‘বাঙ্গালীরা সত্যিকার অর্থেই একটা নেশন। ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ইউরোপ হইতে ধার করা। বাঙ্গালী নেশনের অবস্থান শহরে নয়, কৃষকরাই আসল বাঙ্গালী জাতি।’
বাংলা নামক রাজ্যটিতে জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তখন দুটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে আলাদা দুটি সংস্কৃতি বিদ্যমান ছিল। একটি হলো বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতি, অন্যটি বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতি। নিখিল বাংলাদেশে স্বরাজ বা স্বায়ত্তশাসন কায়েম হলে মুসলিমদের প্রাধান্য আসার সম্ভাবনা ছিল। কারণ, সমগ্র বাংলায় তখন মুসলিমরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। কাজেই স্বায়ত্তশাসনের সেই বিপদ থেকে আত্মরক্ষার জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় ছিল একটা বৃহত্তর জাতীয়তাবাদে মিশে যাওয়া। আর তা ছিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদ। হিন্দু সংস্কৃতিও ছিল সেখানেই নিরাপদ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথও ছিলেন অখণ্ড ভারতীয় জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী।
১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়। পূর্ব বাংলা তখন পূর্ব পাকিস্তান নাম ধারণ করে। ১৯৫২ সালে যখন কায়েদে আজম উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করেন, তখনই বাঙালি জাতীয়তাবাদ আন্দোলন উসকে ওঠে। ২১ ফেব্রুয়ারি রক্ত দিয়ে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা করা হয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াও সেখান থেকেই শুরু। সেই জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়েই স্বাধীনতা আন্দোলন চলতে থাকে। একাত্তরে নয় মাসের সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি। তাতে রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এই জাতীয়তাবাদে সংখ্যালঘু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আত্মস্বীকৃতির পথ খোলা থাকেনি।
’৭৫-এ পটপরিবর্তনের পর আমাদের জাতীয়তায় একটা গ্রহণযোগ্য মাত্রা আসে। তখন ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। ফলে ‘বাঙালি’ ও ‘বাংলাদেশি’ জাতীয়তাবাদ—এ দুটি বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষের মাঝে চেতনাগত দিক থেকে কিছুটা বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তবু আমাদের জাতীয়তা হয়ে ওঠে বাংলাদেশি, তথা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ।
কোনো সমাজে জাতীয় ঐক্যবোধ, জাতীয়তাবাদ সৃষ্টি হতে পারে মৌলিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। বলা যায়, বিগত হাজার বছরের মাটির মানুষ বাঙালি জনগোষ্ঠীর স্বভাবজাত আশা-বিশ্বাস-সংস্কৃতি-সভ্যতার নির্যাসের দ্বারা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় তিলে তিলে গঠিত হয়েছে এই জাতীয়তাবাদ।
বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রক্তধারা, জনসংমিশ্রণ তথা নৃতাত্ত্বিক পরিচয়। বাঙালি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ আমাদের জাতীয় আত্মপরিচয়ের সারকথা। এ বিষয়ে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা বাঙালি। এটি কোনো আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে, মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-দাড়িতে ঢাকবার জো পর্যন্ত নেই।’
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশবাসী জাতিগত সত্তা হিসেবে বাঙালি বলে চিহ্নিত হয় এবং দেশগত সত্তা ছিল বাংলাদেশ।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবর্তক লে. জে. জিয়াউর রহমান বহির্বিশ্বের বিশেষত জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, পোল্যান্ড, মিসর ও সৌদি আরবের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘...এ কারণেই আওয়ামী লীগরা বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্বপ্নে এখনো বিভোর রয়েছে। আবার মুসলিম লীগ, আইডিএল এবং জামায়াতীরা বলে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের কথা।’
ব্যাখ্যামূলক বক্তব্যে তদানীন্তন সামরিক শাসক জিয়া বলেছিলেন, ‘...বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ হলো সঠিক জাতীয়তাবাদ। আমাদের আছে জাতিগত গৌরব, রয়েছে সমৃদ্ধিশালী ভাষা এবং ধর্মীয় ঐতিহ্য। ভৌগোলিক অবস্থান হিসেবে আমরা এক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের বাসিন্দা। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ একদিকে যেমন ধর্মভিত্তিক নয়, তেমনি আবার ধর্মবিমুখও নয়...।’
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সমর্থনে রাজনীতিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার খন্দকার আবদুল হামিদ উল্লেখ করেন, আমাদের জাতীয়তাকে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তা’ বলাই ‘অ্যাপ্রোপ্রিয়েট’ বা সংগত।
একই সুরে সুর মিলিয়েছিলেন জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান। তিনি ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়া-আফ্রিকার বিভিন্ন রাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত দিয়ে বলার চেষ্টা করেছেন, আধুনিককালে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রসত্তা লাভ করার পরে ভূখণ্ডগত রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাই প্রধান ও পূর্ণাঙ্গ। সেই অর্থে বাংলাদেশি জাতীয়তা আমাদের রাষ্ট্রসত্তার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ; জাতিসত্তাগত পরিচয়টি এখানে গৌণ হয়ে পড়েছে। ...বর্তমানে পৃথিবীতে আমরা বাংলাদেশি এবং এটাই আমাদের অনিবার্য এবং একান্ত পরিচয়।
জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের মতামত হলো, “...ধর্ম এক হলেও সকল মুসলিমের সাংস্কৃতিক ‘চেতনার ঐক্য’ এক জাতীয়তা হয়নি। তেমনি একই ভাষার দৌলতে কোনো মানুষ এক জাতির হতে পারে না। উভয় বঙ্গে এক ভাষা হলেও তাদের মধ্যে রয়েছে নৃতত্ত্ব ও ঐতিহ্যগত প্রভেদ। এজন্যে একই মানবগোষ্ঠীতে পরিণত হওয়া সম্ভবপর নয়।”
এজন্য বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের স্বীকৃতি এ দেশীয় জনসমাজে হয়েছে বলেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধ্বজাধারী আওয়ামী লীগ বিগত ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকলেও ফের বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রবর্তন করেনি। ফলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ তর্কাতীতভাবেই প্রতিষ্ঠা পায় বা স্থায়িত্ব লাভ করে।
তথ্যসূত্র
১. আবুল মনসুর আহমদ রচিত ‘বাংলাদেশের কালচার’
২. শেখ আবদুল জলিল রচিত ‘জাতীয়তায় ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার’
৩. লেখকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ