সেলিম মনে করে, তার বাসনাগুলো বুঝি অপূর্ণই থেকে যাচ্ছে। বয়স তো একেবারে কম হয়নি। উদ্দাম যৌবনে অনেক সোনালি স্বপ্ন ছিল। সুযোগের অভাব আর অপ্রকাশের দুর্ভেদ্য প্রাচীর টপকাতে পারেনি বলে শখের ইচ্ছেরা সুপ্তাবস্থায় শুকিয়ে মরতে শুরু করেছে। তুলির সঙ্গে কোনো এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে, তারপর কোনো মেয়ের সঙ্গে আর ঘনিষ্ঠ হতে পারেনি। সময়ে না হলে অসময়ে কি আর হয়? সেলিমের জীবনে এও বুঝি বড় অপূর্ণতা।
ছাত্রজীবনে বরাবরই গোবেচারা ছিল। এ যুগে সব ছেলে-মেয়ের যেখানে চোখ-কান খোলা, সেখানে মেয়েরা কি পৌরুষের প্রকাশ ছাড়া এমন নিরীহ ছেলেদের পছন্দ করে! সেলিম ছিল সে ধরনের ছেলে। তাই তার আঙিনায় কোনো কিশোরী কিংবা তরুণী পা রাখেনি।
ছাত্রজীবন শেষে সেলিমের বেশিদিন বেকার থাকতে হয়নি। অজ পাড়াগাঁয়ের কোনো এক সিনিয়র মাদরাসায় খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেছে কিছুদিন। তারপর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে একটি সরকারি চাকরিও জুটিয়ে নেয়। যোগ্যতা অনুযায়ী মনোমতো হয়নি। তারপরও নুন-রুটির জন্য তো চাকরি করতে হয়।
সেলিমের কলেজজীবন কেটেছে লজিং বাড়িতে। উপজেলা পর্যায়ের ছোট শহরের কাছেই এক গ্রামের বাড়িতে লজিং থেকে দুটি ছেলে ও একটি মেয়েকে সকাল-সন্ধ্যায় পড়াতে হতো। তিন ছাত্র-ছাত্রীর মাঝে মেয়েটাই ছিল বড়। অষ্টম শ্রেণি পাস করে নবম শ্রেণিতে পা রেখেছে। তখন বেধড়ক স্পষ্ট হয়ে উঠছে তার শারীরিক উচ্চারণ। সেলিমের বয়ানুক্রমিক দৃষ্টি কখনো তুলির সেই তুলতুলে শারীরিক অঙ্গ-সৌষ্ঠবের দিকে গেলেও তা সবসময় কঠোর অবদমন করে রেখেছে।
সেলিম থাকে বাহির-বাড়িতে। পুকুরপাড়ে খড়ের একটি দোচালা ঘর সেটি। উত্তর পাশের চৌকিতে থাকে বছরবাঁধা কামলা, দক্ষিণ দিকে খিড়কির পাশের চৌকিতে থাকে সেলিম। চৌকি-লাগোয়া পাশে একটি টেবিল। কেরোসিনের টিমটিম হ্যারিকেনের আলোয় গভীর রাত পর্যন্ত সেলিমের পড়ার শব্দ শোনা যায়।
মাঘ মাসের তুমুল শীতে নামা বিলে একটা পগার সেচা হয়েছে। বিলের তলির এ পগারে নানারকম লোভনীয় মাছ পাওয়া গেছে। সেলিমকেও মাছ ধরতে যেতে হয়েছে। গ্রামের ছেলে বলে সেলিমও মাছ ধরায় দক্ষ। অন্য মাছের সঙ্গে বড় আকারের কয়েকটি শোল মাছ দেখা গেছে সেই খাদে। বড় শোলগুলোর মাঝে একটা শোল আবার ‘বেসামা’ বড়। সেলিম সেই শোলটা ধরতে গিয়েই আগুন-রাঙা একটা শিং মাছের কাঁটার আঘাতে একেবারে কুঁকড়ে যায়। তখন তুলির নানা খাদের কিনারে থেকে জিগায়—কী অইছে তোমার সেলিম?
Ñশিঙের গালা খাইছি। ব্যথা করতেছে।
বলেই সেলিম পগার থেকে উঠে আসে। শিং মাছের কাঁটার বিষ সারা শরীরে ছড়ায়। কাদামাখা গায়ে সে বাড়ি যায়। পুকুরে নেমে গোসল করে কাদা ছাড়ায়। তারপর সোজা বিছানায়। শিঙের কাঁটার বিষে জর্জরিত হওয়ায় এসেছে জ্বর। এক দিন এক রাত জ্বরের পর সেলিম সুস্থ হয়।
দুদিন পর সকালে বড় শোল মাছটা রান্না করা হয়েছে। অথচ সেলিমকে এ মাছের তরকারি দেওয়া হয়নি। ছোট মাছের তরকারি দিয়ে খাবার দেওয়া হয়। সেদিন বিকালে নানারকম কাজ সামলাতে গিয়ে তুলির মা ও নানি দুজনই কাজে ব্যস্ত। তুলি স্কুল থেকে ফিরেছে বেশ আগেই। কিছুক্ষণের মাঝে সেলিমও কলেজ থেকে ফিরেছে। মা ও নানির হাত বন্ধ থাকায় সেলিমের খাবার বেড়ে দিতে তুলিকে বলা হয়।
তুলি তার ছোট ভাইকে দিয়ে পাশের কক্ষে খাবার দেয়। এ সুযোগে সেলিমকে সে শোল মাছের বড় টুকরোটাই পরিবেশন করে। দরজার আড়ালে তুলি। সেলিম চোরা চাহনিতে তাকিয়ে দেখেছে তাকে। কেমন যেন অপ্রত্যাশিত রোমান্টিকতার একটা অভিব্যক্তি তার চাহনিতে। তুলিও দরজার আড়াল থেকে তার চোখে চোখ রাখে। একপর্যায়ে দুজনের দৃষ্টি এক হয়ে যায়।
ঠিক তখনই ঘরে ঢোকে তুলির মা। সেলিমের পাতের পাশের বাটিতে শোল মাছের বড় টুকরোটা দেখে নিচুস্বরে মা তুলিকে শাসায়। তাতে লজ্জায়-ক্ষোভে অন্য ঘরে চলে যায় তুলি। সেলিম তুলির মায়ের অনুশাসনের অর্থ বুঝতে পারে। তাই সে মাছের টুকরোটা রেখে শোল মাছের ঝোল দিয়ে খাবার খেয়েই বাহির-বাড়িতে চলে আসে। বৈঠকঘরে বিছানায় শুয়ে শুয়ে নিজের ভাগ্যকে ভর্ৎসনা করতে থাকে সেলিম।
তুলির পরিবেশন করা মাছের টুকরোটা অক্ষত ও অক্ষুণ্ণ থাকায় তুলির মা সেলিমের নীরব প্রতিবাদের ভাষাটুকু বুঝতে পারে। এ ঘটনার প্রতিবাদে মা-মেয়ের মাঝে একটা গুমোট স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়। ওদিকে বিছানার আশ্রয়ে অব্যক্ত একটা দুঃখবোধে ছটফট করতে থাকে সেলিম। তখন মায়ের কথা খুব মনে পড়ে। অমনি তার অন্তর্জগৎটা আবেগে উষ্ণ হয়ে ওঠে। মায়ের কথা মনে হতেই দুচোখ ঝাপসা হয়। আবেগের উচ্ছ্বাসে বেসামাল কান্না বুকের মাঝে নিঃশব্দে তোলপাড় শুরু করে। বেপরোয়াভাবে গলা দিয়ে উগরে উঠতে চাইলে কঠোর অবদমন করেও যখন ঘরে টিকতে পারছে না, তখন এ অবস্থা থেকে নিজেকে আড়াল করতে চলে যায় নির্জন পুকুরপাড়ে। একটা জাম গাছের তলায় নরম ঘাসে বসে মনে মনে বলতে থাকে—আজ যদি নিজের মা হতো!
এ কথা ভাবতেই দুচোখ থেকে দু-ফোঁটা গরম জল গাল বেয়ে টপ করে গড়িয়ে পড়ে ঘাসের ওপর। সেলিম একাকী পুকুরপাড়ে ঘাসের ওপর বসে থাকে অনেকক্ষণ।
ওদিকে অন্দরমহলে সেলিম কর্তৃক ফিরিয়ে দেওয়া শোল মাছের টুকরো নিয়ে তুলির মা বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে মেয়ের প্রতি রাগে অগ্নিশর্মা হয়। মা তার রাগের সবটুকু ঝাঁজ ঢালে মেয়ের ওপর। মায়ের একতরফা আক্রমণে তুলি একেবারে কোণঠাসা। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মেয়েও মায়ের প্রতি রাগ দেখায়। প্রতিবাদ করে তুলি বলে, এর মাঝে আমার দোষের কী অইল?
Ñদোষের কিছু অয় নাই, মাছের টুকরাডা খাইল না কেরে?
Ñতা কি আমি জানি?
এ ঘটনায় তুলি সেলিমের প্রতিও মনে মনে ক্ষুব্ধ হয়। পরিবারের দিক থেকে কী বাধা আসবেÑতা তোয়াক্কা না করে তুলি সোজা চলে যায় বৈঠকঘরের দিকে। মেয়েকে অন্দরের বাইরে যেতে দেখে মা রেগে বলেন, ওই দিগে আবার কই যাস?
Ñযাই না, আইতেছি।
এই বলে তুলি হন-হন করে হেঁটে চলে যায় সেলিমের ঘরে। কিন্তু সেলিমকে ঘরে না পেয়ে রাগে গদগদ করতে করতে ফিরে আসে। রাগের মাথায় পেলে হয়তোবা জিজ্ঞেস করত, মাছের টুকরাডা ফিরায়ে দ্যায়া এমন একটা বাজে পরিস্থিতির সৃষ্টি করলেন ক্যান?
শোল মাছের ঝোল-সংক্রান্ত বিষয়ে মা-মেয়ের সম্পর্কে যে সাময়িক উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল, সন্ধ্যা নাগাদ তা অনেকটাই প্রশমিত হয়ে গেল। সেলিমও অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে সন্ধ্যায় ওদের পড়াতে গেল। তুলিদের পড়া শেষে সেলিম অনেকটা গাম্ভীর্যপূর্ণ ভাব নিয়ে নিজের পড়ার ঘরে যায়।
রাত ১০টা পর্যন্ত খাবারের জন্য অপেক্ষা করছে সেলিম। দুপুরের খাবারটা এমনিতেই সুবিধার হয়নি। তাই রাতের খাওয়ায় দেরি হওয়ায় ক্ষুধায় পেট চু-চু করছে। খাদ্যনালি কিছুটা দ্রোহী হয়ে উঠেছে। ১০টার পরপর ভিতর-বাড়িতে হাঁড়িপাতিলের শব্দে পেটের নাড়িভুঁড়ির উন্মুখতা প্রবোধ মানতে শুরু করে। থালাবাসনের শব্দে বুঝতে দেরি হয় না, এখনই খাবারের জন্য ভিতর-বাড়িতে ডাক পড়বে।
হ্যাঁ, কিছুক্ষণের মাঝেই ভিতর-বাড়ি থেকে বছরবাঁধা কামলা এসে বলে, খাইতে ডাকতেছে, আইয়েন!
সেলিম কোনো কথা না বলে ভিতর-বাড়িতে খেতে গেল। কাজের ছেলেটাই খাবার এনে দেয়। সেলিম লক্ষ করে দেখল, দুপুরের সেই শোল মাছের টুকরোসহ আগের তরকারিই আবার তাকে খেতে পাঠানো হয়েছে। এবারও সেলিম শোল মাছের ঝোল ও ডাল দিয়ে খাবার সম্পন্ন করে ফিরে এলো বৈঠকঘরে।
কিন্তু ভিতর-বাড়িতে মাছের টুকরোটা নিয়ে আবার চাপা গুঞ্জন শুরু হয়। একপর্যায়ে তা ক্ষোভে পরিণত হলো। সেলিম বাহির-বাড়িতে অবস্থান করেও কান পেতে তা আঁচ করতে পারে।
রাত কাটে ভালোয় ভালোয়। ভোরে অন্দরমহলের বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে তুলি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সেলিমের ঘরে ঢোকে। ভূত দেখার মতো নিজের পড়ার ঘরে তুলির অপ্রত্যাশিত আগমনে সেলিম থ বনে যায়। সেলিম কোনোকিছু বলার আগেই তুলির একের পর এক প্রশ্নবাণে ঘায়েল হয়ে গেল। তুলি বলে, আপনি আবার মাছের টুকরাটা ফেরত দিলেন ক্যান?
Ñমন চায় নাই বলেই খাই নাই।
Ñনা, গোপন করতেছেন আপনি!
Ñআমার জন্য তুমি কটু কথা শোন, তা আমি চাই নাই। তুলি, আমি সব বুঝতে পারছি।
Ñসেসব আমাদের অভ্যন্তরীণ পারিবারিক ব্যাপার। আপনি কিন্তু আমাদের অপমান করতেছেন!
Ñআমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না বলেই...।
Ñযা-ই বলেন, ব্যাপারটা নিয়া বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে।
এ কথা বলেই তুলি রাগে বিড়বিড় করতে করতে আবার ভিতর-বাড়ি চলে যায়। এদিকে এক ধরনের আত্মাভিমানে সেলিম সকালে পড়াতে যায়নি। তার মাঝে অহেতুক একটা ক্ষোভ দানা বাঁধে। সকালে না খেয়েই সেলিম কলেজে যায়। অনেক রাতে লজিং বাড়ি ফেরে।
তুলি তখন উভয় সংকটে। একদিকে মায়ের বকাবকি, তাতে যোগ দিয়েছেন নানা-নানিও। তুলিরা নানাবাড়িতেই থাকে। বাবা চাকরি করেন দূরের কোনো উপজেলায়। অভিভাবক মহলের তীব্র গালাগালে বিধ্বস্ত তুলি। এ ঘটনায় সবাই তুলিকে দায়ী করছে। ফলে তার ওপর দিয়ে একটা পারিবারিক ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
এদিকে সেলিমের প্রতিও তুলির রয়েছে অব্যক্ত এক হৃদ্যতা। সেলিম সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাদের বাড়িতে কিছুই খায়নি। অথচ সামান্য খাবার আর একটু আশ্রয়ের জন্যই না ছেলেটা একান্ত অনাদর-অবজ্ঞা আর তাচ্ছিল্য সহ্য করে তাদের বাড়িতে থাকছে। একটা দরদবোধ তুলির মনোরাজ্যকে সিক্ত করেছে বলেই সেলিমের এমন নীরব প্রতিবাদকে সে মনে মনে সমর্থন করছে। তাই রাত জেগে তুলি এই প্রথম সেলিমের কাছে একটা চিঠি লেখে। চিঠি লেখা শেষ না হতেই সুচতুর মায়ের কাছে ধরা পড়ে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাতে মায়ের হাতে মার খায় তুলি।
পরদিন সকালে তুলিকে ঘিরে ওঠা পারিবারিক ঝড়ে সেলিমও আক্রান্ত হয়। সকালে ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে বৈঠকঘরে সেলিমের ওপর হামলে পড়ে তুলির নানি; বলে, রাতে তোমার কাছে চিডি লেখতে গেয়া তুলি তার মা’র কাছে ধরা পড়ছে। এর আগে তুলি আর কয়বার তোমার কাছে চিডি লেখছে?
Ñএকবারও না।
Ñতুমি তার কাছে কয়ডা লেখছ!
Ñএকটাও না।
Ñতুমি কইলেই অইল! তোমারে খুব বিশ্বাস করছিলাম, কিন্তু তলে তলে তুমি যে মিরমিইরা শয়তান, তা তো বুঝতে পারি নাই!
জবাবে সেলিম কোনো কথা বলে না। বরং কিছুক্ষণের মাঝেই তল্পিতল্পা নিয়ে সে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।
দুই
সেই যে তুলিদের বাড়ি ছাড়ল, আর কোনোদিন সে বাড়িতে যায়নি সেলিম। আর দেখাও হয়নি তুলির সঙ্গে। ততদিনে সেলিম শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করে। সেই থেকে সাত বছর পর দেখা। তুলি ময়মনসিংহ সরকারি হাসপাতালের তিনতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে পায়, অতিপরিচিত একজন লোক হাসপাতালের সামনের বিল্ডিংয়ের দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। তুলি বেশ কিছুক্ষণ দেখল লোকটাকে। সঠিকভাবে চেনার চেষ্টা করল।
হ্যাঁ, চেনা চেনা মনে হচ্ছে! সেই লোকটাই—যাকে তুলি অনেকদিন যাবৎ খুঁজছে। তুলি শুনেছিল, লোকটি ঢাকায় কিছুদিন চাকরি করার পর ময়মনসিংহে বদলি হয়ে গেছে। তাই তার সঙ্গে দেখা করার জন্য সিঁড়ি বেয়ে নিচতলায় নামছে আর ভাবছে, লোকটি যদি সেই লোক না হয়, তাহলে?
ভিতর থেকে জবাব আসে, তাতে ক্ষতি কী?
তুলি দোতলার দীর্ঘ বারান্দার পথ মাড়িয়ে যতই লোকটির কাছে যাচ্ছে, ততই নিশ্চিত হচ্ছে। কাছাকাছি এসে মনে মনে বলে, হ্যাঁ, যাকে অনুমান করে আসলাম, সে-ই তো!
খুঁজে পাওয়ার উল্লাসে তার দুই ঠোঁটে একরাশ হাসি ফোটে। ফর্সা তুলতুলে মুখশ্রী। সে মুখে একবার কারো চোখ গেলে সহসা ফিরে আসে না। তার ওপর মুখে যদি হাসি ছড়িয়ে কারো উদ্দেশে এগিয়ে যেতে থাকে, তখন বিস্মিত না হয়ে কি পারা যায়?
তুলিকে হঠাৎ দেখে সেলিম অবাক। আরে! তুমি তুলি না...?
হ্যাঁ।
তা হাসপাতালে কেন?
নানুর গলব্লাডারে স্টোন অপারেশন হইছে তো, তাই...
প্রথমে তো তোমারে দেইখ্যা চিনতেই পারছিলাম না। গত সাত বছরে অনেক বদলে গেছ তুমি?
আপনিও তো বদলাইছেন!
এই তুমি যে আমার কাছে আসছো, তোমার নানি কিছু মনে করবো না?
না। আপনিই বা হাসপাতালে ক্যান?
আর কইয়ো না। আমার বন্ধুর ওয়াইফ অসুস্থ।
আপনার পোস্টিং নিশ্চয় ময়মনসিংহে...।
হ্যাঁ।
থাকেন কোথায়?
মেসে। তুমি থাক কোথায়?
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফ কোয়ার্টারে। মামার বাসায়।
ও আচ্ছা। তা কী করছ এখন?
সামনে এমএ পরীক্ষা দেব।
তোমার মামার বাসায় থাক তাহলে?
হ্যাঁ।
অনেক দিন পর তোমার সঙ্গে দেখা, ভালো লাগল। এবার তাইলে আসা যাক।
সে কী, এতদিন পর দেখা...
আবার না হয় দেখা হবে।
কোথায়?
আমি তো মেসে থাকি। তোমার ঠিকানাটাই...
এ কথা বলেই সেলিম কেমন যেন থমকে যায়। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা স্মরণ করে আর তুলির মামার বাসার ঠিকানা চায়নি। বরং প্রতিক্রিয়ায় কেমন যেন বিমর্ষ হয়ে যায়।
তুলি তখন সেলিমের সংশয়ের কারণ বুঝতে পারে। তার বিমর্ষতা দূর করতে তুলি বলে, আগামীকাল তো শুক্রবার। বন্ধের দিন। সরকারি মহিলা কলেজের সামনে সকাল ১১টায় টাউন হলের মোড়ে দেখা হবে।
ঠিক আছে, আজ তাহলে আসি!
না না, একটু দাঁড়ান প্লিজ! নানুর একটা ওষুধ কিনতে আমারও বাইরে যাওয়া লাগবে। দুই মিনিটের মধ্যেই আমি নানুর কাছে বলে আসছি। তারপর একসঙ্গে বের হবো।
বলেই চপলা পায়ে তুলি চলে যায়। সেলিম হাসপাতালের সামনের বারান্দার কার্নিশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসে তুলি; বলে, এবার চলেন!
হ্যাঁ, চলো।
তুলি ও সেলিম একসঙ্গেই হাসপাতালের সিঁড়িপথ না ধরে লিফটে ওঠে। লিফটে চালক নেই। অটো লিফটে আর কেউ নেই। শুধু সেলিম আর তুলি। মুহূর্তের জন্য হলেও নির্জন প্রকোষ্ঠে দুজন। তবু যেন যোজন দূরে। নিরিবিলি সান্নিধ্যে ওরা। দুজনের বুকেই অন্যরকম অনুভূতি দোলা দেয়। ড্রাম পেটায় বুকের ভিতর। অথচ চক্ষুলজ্জায় কেউ কোনো কথা বলে না। কারো প্রতি তাকায়ও না। তাদের দৃষ্টির জড়তা ভাঙতে না ভাঙতেই লিফট নিচতলায় নেমে আসে।
উভয়েই পাশাপাশি হেঁটে হাসপাতালের আঙিনা পেরিয়ে রাস্তায় নামে। তুলি যেন সেলিমকে পেয়ে চাঁদ হাতে পেল। তাই ভেতরে বইছে ভিন্নরকম উল্লাসের জোয়ার। সেলিম অবশ্য তুলির ভিতর-রাজ্যের খবর জানে না।
তুলি সেলিমকে নিয়ে ওষুধ কিনল। সেলিম তখন বলে, ঠিক আছে, এখন তবে আসি!
প্লিজ চলুন না খাবারের হোটেলে একটু যাই! দুপুরের খাওয়া হয় নাই। একাকী হোটেলে যাইতে ভাল্লাগে না।
তুলির এমন প্রস্তাবে সেলিম বাধ্য না হয়ে পারে না। হাসপাতালের সামনে হোটেলের একটা কেবিন-কক্ষে ঢুকল সেলিম ও তুলি। কেবিনের সামনের দরজায় পর্দা ঝোলানো। মেয়েদের প্রাইভেসির সুব্যবস্থাও আছে। তুলি হোটেলের কর্মচারীকে বলে, দুইটা খাবার দেন।
তাতে আপত্তি তোলে সেলিম। কিন্তু তুলির বাড়াবাড়িতে সে আপত্তি টেকেনি। কর্মচারীর কাছে তুলি জিগ্যেস করে, খাবারের কী কী আছে?
কর্মচারী বলে, বোয়াল মাছ, রুই মাছ, শোল মাছ, খাসি-মুরগি...
তুলি বলে, আমাদের তুইটা শোল মাছ দেন!
শোল মাসের কথা শুনেই সেলিমের দৃষ্টি চলে যায় দূরের অতীতে। স্মৃতির জানালা খুলে সেলিম তাকিয়ে আছে পেছনে। তুলিও চায় সেলিমকে অতীতে ফিরিয়ে নিতে। তবে তুলির এ প্রয়াস পরিকল্পিত নয়, অপ্রত্যাশিত এবং আকস্মিক।
হোটেল কর্মচারী শোল মাছসহ খাবার পরিবেশন করে। সেলিম ও তুলি টেবিলের দুপাশে মুখোমুখি। সামনেই খাবার। ভাত-সালাদ-লেবু এবং দুটি বাটিতে শোল মাছের বড় বড় দুটি টুকরো।
তিন
সাত বছর পর দুজনের দেখা। লজ্জা, ভয় ও সংশয়ের জড়তার পর্দাটা পূর্বপরিচিতির টানে ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকে। সাত বছরের ব্যবধানে উভয়ের মাঝে কেমন পরিবর্তন এসেছে, তা জানার জন্য উভয়ই উন্মুখ। ওরা ধীরে ধীরে সেদিকে এগোয়...।
তুলি বলে, নেন। শুরু করেন।
বলেই শোল মাছের টুকরোটা নিজের পাতে তুলে নেয়। কিন্তু সেলিম তরকারির বাটি থেকে খানিকটা ঝোল ঢেলে খেতে শুরু করে। অমনি তুলি বলে, আইজও কি শোল মাছের ঝোলই খাইবেন?
হ্যাঁ। সেদিন তো শোল মাছের জন্যই তোমাদের বাড়ি ছাড়তে হইছিল। এবার কি এই শহরই ছাড়তে হয় কি না...!
ভণিতা রাখেন! অতীত স্মরণ করে আমারে আর লজ্জা দিয়েন না।
এই বলে নিজের থালা থেকে শোল মাছের টুকরোটা সেলিমের পাতে তুলে দেয়। সেলিম তুলির চোখের দিকে তাকায়। সেলিমও তার চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকে। তুলিকে ঘিরে কল্পনায় যে কবিতাটা লিখেছিল, তা যেন তুলির চোখে আরো স্পষ্টতায় প্রাঞ্জল হয়ে ওঠে। তুলি সেলিমের চোখের ভাষা বুঝে লজ্জায় চোখ নামিয়ে খেতে থাকে। সেলিমও খাওয়ায় মনোযোগ দেয়। খাবার সম্পন্ন হলে সৌজন্যবশত সেলিম বিল পরিশোধ করতে এগোয়। কিন্তু তুলি তাকে সে সুযোগ দেয়নি। শেষে তুলিকে হাসপাতাল পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসে সেলিম। তারপর নিজের গন্তব্যের দিকে পা বাড়ায়।
পরদিন বিকালে নির্ধারিত সময়ের ক’মিনিট আগেই তুলি টাউন হলের মোড়ে এসে দাঁড়ায়। মনে আনন্দের অথৈ জোয়ার। মনে মনে বলে, আবার যখন দেখা পাইছি, তারে আর ছাড়ব না।
কিন্তু মুহূর্তেই তার সে ভাবনায় চিড় ধরে। মনে মনে বলে, সেলিম যদি ইতোমধ্যে বিয়ে করে থাকে কিংবা অন্য কারো সঙ্গে...
তুলির এসব ভাবনার জট খুলতে না খুলতেই সেলিম এসে হাজির। রিকশায় থেকেই বলে, কখন আসলা?
এই তো মিনিট দশ আগে।
আমি তাইলে অনেকটা লেট!
না, তেমন না। রিকশা ছাড়ার দরকার নাই। চলেন নদীর পাড়ে...!
জয়নুল পার্কে?
না।
তাইলে?
ওখানে ভিড় হয়। তার চেয়ে বিপীন পার্কে অনেকটা নিরিবিলি।
বলেই তুলি রিকশায় সেলিমের পাশে গিয়ে বসে। সেলিম বলে, তুমি আমার সঙ্গে একই রিকশায়...
তাতে বাধা কোথায়? আপনার কোনো আপত্তি...
না, মানে...
লোকলজ্জার ভয় তাকে মুহূর্তেই ঘামিয়ে দেয়। শীতের বিকাল। অথচ সেলিমের কপালে ঘামের চিকন রেখা স্পষ্ট। অল্পক্ষণেই রিকশা গন্তব্যে পৌঁছায়। ওরা রিকশা থেকে নেমে পার্কে ঢোকে। সেলিমের মনে পড়ে, বছর কয়েক আগেও আবর্জনার স্তূপ ছিল এ পার্কে। এক বছরের ব্যবধানে নানারকম গাছ আর ফুল বাগানে সুশোভিত হয়ে উঠেছে। সেলিম তুলিকে নিয়ে নদীর একেবারে কিনারে নির্জন স্থানে কংক্রিটের বেঞ্চে গিয়ে বসে। পার্কের পশ্চিম প্রান্তে ক’টা ছেলে বসে গল্প করছে। এছাড়া সবটা পার্ক নিবিড়। বিপুল নিরিবিলিতে ওরা গল্প করবে। তুলি তাকিয়ে আছে ব্রহ্মপুত্রের বুকে শান্ত জলের দিকে। সেলিম তাকিয়ে অন্যদিকে। হঠাৎ তার চঞ্চল চোরা চাহনি তুলির অঙ্গ-সৌষ্ঠবের সুষমা নিরীক্ষণে মগ্ন হয়। মুহূর্তে আবার তা গুটিয়ে নেয়। দীর্ঘদিন পর ফের যখন দেখা, তখন কোন কথায় শুরু করে ওদের দূরত্ব কমিয়ে আনবেÑতা কেউ সহসা উচ্চারণ করতে পারছিল না।
তুলিই সেই জড়তার জট খুলে বলে, সেই ঘটনার অনেক দিন পর আমি সব খুইল্যা কওয়ার পর নানি অবশ্য তার ভুল বুঝতে পারছে। তাই আমাকে বেশ আগে এক দিন কইছিল, তাইলে তো আমার বড় একটা ভুল অইয়া গেছে রে তুলি! ওই নির্দোষ লোকটার কাছে আমার দুঃখ প্রকাশ করা উচিত। জবাবে আমি তখন কইছি, লোকটারে এখন কই পাইবেন?
গত রাতে যখন জানাইলাম, ওই লোকটার দেখা পাইছি, নানি! তখন নানি আমারে কইল, তাইলে তারে একটু আমার কাছে আইতে ক না তুলি! কোন সময় দম ফুরাইয়া যায়, কওন তো যায় না। মরণের আগে অন্তত তার হাতটা ধইরা একবার দুঃখ প্রকাশ করি।
একতরফাভাবে এ পর্যন্ত বলে সেলিমকে তুলি জিগায়, হাসপাতালে একবার যাইবেন কি নানির কাছে?