খবরটা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে শুনেছিল সিমন; কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছিল না কিছুতেই। এ কান, ও কান—দশ কান হয়ে মুহূর্তেই চাউর হয়ে যায় হোস্টেলের এ রুম, ও রুম এবং গোটা এলাকা। স্বভাবতই হাতের আঙুল ছোঁয় মোবাইলের নব। প্রথমবারের চেষ্টাতেই রিং হয় মোবাইলে।
—হ্যালো।
—কী অবস্থা? একরাশ উষ্মা ঝরে পড়ে সিমনের কণ্ঠ থেকে।
—আমি ভালো আছি। পরে কথা বলছি।
আগুনে পানি পড়লে যেমন দপ করেই নিভে যায় জ্বলন্ত আগুন, ঠিক সেভাবেই উবে যায় সিমনের সমস্ত উৎকণ্ঠা। দুশ্চিন্তার ঝড়ে ওঠে শান্ত বাতাস। যাক ও বেঁচে আছে! আহ! কী শান্তি! কেন যে এতক্ষণ ফোন দিলাম না। মুহূর্তেই জানা যেত সব। ইস, কী বোকা আমি! নিজের মাথার চুল নিজেই ছিঁড়ে যেন। আর কত দিন যে ও এভাবে নিজের মাথার চুল নিজে ছিঁড়বে সেটাও বুঝতে পারে না। কিন্তু পুরো খবরটা তো ও পুরোপুরি শুনতে পারল না। আসল ঘটনা কী? কিছুই জানতে পারেনি। বিস্তারিত জানার আগেই তো ফোন রেখে দিল।
ও আসলে ওরকমই। অথচ কেন যে সিমন ওকে এত ভালোবাসে। নিজের জীবনের থেকেও কি ও ওকে বেশি ভালোবাসে? ও জানে মানুষ পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে নিজেকেই বেশি ভালোবাসে। কিন্তু সিমনের মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়—সে কি সত্যি ওর নিজের জীবনের চেয়েও ওকেই বেশি ভালোবাসে? কী আছে ওর মধ্যে? আলাদা আলাদা করে মেলালে সেরকম এক্সট্রা কিছুই তো ওর নজরে পড়ে না। আর পাঁচটা ছেলের মতোই সে স্বাভাবিক, সাধারণ। মধ্যবিত্ত ঘরের মেধাবী ছেলে। পড়াশোনা করে মন দিয়ে। ভদ্র এবং সর্বোপরি জেন্টল। পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি লম্বা। উন্নত গ্রীবা। মাথাভর্তি ঘন কালো চুল। উন্নত নাক, ভরাট কণ্ঠস্বর—সব মিলিয়ে প্রকৃত সুপুরুষ সে। কঠিন ব্যক্তিত্ব। অনেক মিলিয়ে সিমন যে সিদ্ধান্তে আসে সেটা হলো, আর এক হাজার ছেলের মধ্যে যে হ্যাংলামো আছে, সেটা জাফরের নেই। ও বরং সবসময়ই শান্ত। হিসাব মেলে না কিছুতেই। ও কি সত্যি সত্যি সিমনকে এড়িয়ে চলে? না, তা তো নয়। যদি তাই হতো, কেন তাহলে এত যত্ন করে দরদ দিয়ে ওর সঙ্গে কথা বলে? যখন ওপ্রান্ত থেকে কণ্ঠ ভেসে আসে, তখন কে বলবে কোন পাষণ্ড, পাথর, নির্জীব—ক্লীবলিঙ্গ কথা বলছে? অথবা দয়ামায়াহীন কোনো সিমার ওর সঙ্গে কথা বলছে? শুধু এজন্যই সিমন ওকে পুরোপুরি ভুল বুঝতে পারে না। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ওকেই নক করে ও। মানুষের ভেতরের মানুষের মধ্যে যদি ওরকম সফ্ট কোনো কর্নার না থাকে, তাহলে দীর্ঘ বছর ধরে ও এভাবে ওকে অ্যাটেন্ড করত না। মিছেই ও ওকে সিমার ভেবে সত্যিকারে বুকের লোম আছে কি না দেখতে চায়। বিষাদসিন্ধুতে ও পড়েছিল সিমারের বুকে কোনো লোম থাকে না। সিমনেরও মাঝে মাঝেই খটকা লাগে জাফরের বুকে কোনো লোম আছে কি না? এবার অবশ্যই যেকোনোভাবেই ও দেখবে। আবার ভাবে, না ওর এই স্বভাবের জন্য ওর নামটাই দায়ী। ও ঠিক এবার ওর নামটাই পাল্টে দেবে। আবার ভাবে, কোন অধিকারে সে ওর নাম পাল্টাবে? আবার ভাবে, অধিকার কখনো রাস্তাঘাটে পড়ে থাকে না। জোর করে আদায় করে নিতে হয় অধিকার। ও ঠিক পেরেছে সেটি। যদি কিছু বাকি থেকে যায় তো ও এবার ঠিকই তা আদায় করে ছাড়বে। সম্ভব হলে ওর নামটাও ও পাল্টে দেবে আমূল। বাংলার মীর জাফরের সঙ্গে ওর নামের কোনো সংশ্রব রাখবে না আর। সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে ওর আবার মনে পড়ে যায়, আসল ঘটনাই তো সে জানে না। কী হয়েছে, কেমন আছে সে এখন? সব বিস্তারিত জানানোর আগেই কেন সে ফোনের সুইচ অফ করে দিল? ও আসলে বরাবর এরকমই। সিমন শান্ত হতে চেষ্টা করে। আমি কঠিনেরে ভালোবাসিলাম...
আমি কঠিনেরে ভালোবাসিলাম...। আবার ভাবে নিশ্চয় এত কঠিন সময়েও শুধু ওর জন্যই ফোনের সুইচ অফ করেনি এতক্ষণ। আবার নিজে থেকে কিছু আগাম জানিয়ে ওকে দুশ্চিন্তার মধ্যে রাখতে চায়নি। আরো কত কিছু হতে পারে। ও সাত-পাঁচ ভাবে...।
জাফরের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল কলেজের প্রথম দিন থেকেই। প্রথম দিন জাফর খুব গুরুত্ব দিয়েছিল ওকে। আজও স্পষ্ট দেখতে পায় সেসব। বরং সিমনই নাক-উঁচু ভাব দেখিয়েছিল সেদিন। হয়তোবা সেজন্যই ওর এই প্রতিশোধপরায়ণতা। ও খুব সেন্টিমেন্টাল। বন্ধুদের কাছে শুনেছে সে মাঝে মাঝে কবিতাটবিতাও লেখে লুকিয়ে-চুরিয়ে। তাই কি ওর এত দেমাগ? তাই এত...? কী জানি, না, ওর আর এখন ভালো লাগছে না এসব ভাবতে।
কেমন আছে ও এখন? আসলে কী ঘটেছে? ও তো কিছুতেই স্পষ্ট নয়। ভেতরে ভেতরে ও আবার অস্থির হয়ে ওঠে।
হৃদয় কাঁপিয়ে মোবাইলে রিংটোন বেজে ওঠে। কল আইডিতে রাজন মরিয়া।
—হ্যালো।
—জানিস, জাফরের পায়ে গুলি লেগেছে দুটো। ব্লিডিং হচ্ছে খুব। অপারেশন চলছে ওর।
—বলিস কী? সত্যি সত্যি ওর পায়ে গুলি লেগেছে?
—হ্যাঁ, তাই তো। কেন, তুই শুনিসনি এখনো?
—নারে, ওইভাবে শোনা হয়নি। এমনি শুনেছি এলোমেলো কিছু কথা। কিন্তু জাফরের পায়ে গুলি লাগবে কেন?
—সেটা তো আমারও কথা। ও তো এসবের আগে-পিছে থাকে না কখনো। কার যে কখন কী হয়, বলা মুশকিল। তা তোকে কেউ কিছু জানায়নি?
—হ্যাঁ, আমি ফোন দিয়েছিলাম ওকে। বলল, ‘ভালো আছি।’
—আর কিছু বলেনি?
—না, ওইটুকু বলেই ফোনের সুইচ অফ।
—তুই পারিসও বটে। কেন যে তুই ওর পেছনে এত মরিয়া হয়ে ছুটিস? কী দেখেছিস ওর মধ্যে বলত?
—থাক না এসব কথা। পরে কথা বলব।
ওকে অপেক্ষমাণ রেখেই সিমন ওর ফোনের সুইচটা অফ করে দেয়। এই এক ছেলে। দিন নেই রাত নেই ঘ্যানর ঘ্যানর করে। কিছুই কি বোঝে না রাজন? কেন ও আমাকে এত ডিস্টার্ব করে?
আবারও মন ছুটে যায় ওর জাফরের কাছে। দীর্ঘ সময়ে ওরা ক্লাসের ক্যাম্পাসের সব ছেলেমেয়েরা একে অপরের সঙ্গে খুব আপন হয়ে মিলেমিশে থাকে। সেই সুবাদে সিমন দেখেছে সব ছেলেরা একটু সুযোগ পেতে না পেতেই তাদের কণ্ঠ এবং আচরণ পাল্টে ফেলে মুহূর্তেই। কিন্তু ও সবার থেকে আলাদা। ওর বোধের গভীরতা হচ্ছে সমুদ্রের মতো। সেখানে না আছে কোনো বাঁক আর না ওঠে তাতে সহজেই কোনো ঝড়! এজন্যই সিমন ওকে এত পছন্দ করে।
জাফরও হয়তো ওকে পছন্দ করে, কিন্তু ধরা দেয় না। কিংবা ও গভীরভাবে দেখেছে হয়তো ওর ফ্যামিলির সঙ্গে সিমনের ফ্যামিলি যায় না, অথবা অন্যকিছুও হতে পারে সেখানে।
২
সিমন সব বোঝে। তাই অপেক্ষায় থাকে সময়ের। কিন্তু তাই বলে জাফর ওকে কখনো অবহেলা বা উপেক্ষা করে, সেটা ও বুঝতে পারে না। সেটা বোঝার জন্য তো খুব বেশি কিছুর দরকার হয় না। সিমন খেয়াল করেছে, শত ব্যস্ততায়ও জাফরের কণ্ঠের ‘হ্যালো’ শব্দটা পৃথিবীর সবার চেয়ে আলাদা হয়ে বেজে ওঠে। ওই একটুখানি শব্দের মধ্যেই পৃথিবীর তাবৎ প্রেম-ভালোবাসা ভরসা-প্রশ্রয় লুকিয়ে থাকে। সিমনকে আরো বেশি সাহসী, আরো বেশি আগ্রহী করে তোলে জাফরের প্রতি। জাফরও কম যায় না। যখনই দেখা হয়েছে ওর, তখনই ওকে খাইয়েছে। কোনো দিন সিমনের মনে পড়ে না ওর ওখানে ও গিয়েছে, অথচ খালি হাতে ফিরেছে। বিভিন্ন পত্রিকা, বই, প্যাড, কলম, ঝালমুড়ি, লাল চা ইত্যাদি যখন যেটা হয় ও দেবেই ওকে। বিশেষ করে ওর প্রতি গুরুত্বসহকারে সময় দেওয়া, আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বলা, আপ্যায়ন করা—কোনো কিছুতেই এত দিনে সিমন কোনো অভিযোগ দাঁড় করাতে পারেনি। তারপরও সিমনের কেন ওরকম মনে হয় ও জানে না। ও ভাবে অন্য সব ছেলেদের চেয়ে জাফর আলাদা। এজন্যই এত সন্দেহ, এত ঘনঘটা। অন্যরা যেখানে প্রথম সাক্ষাতে অথবা দেখা হওয়ার আগেই তাদের কণ্ঠের কারুকাজ পাল্টে ফেলে, সেখানে বছরের পর বছর ও পাল্টায়নি। একেবারেই যে পাল্টায়নি তা নয়; ও ওকে বোঝাতে চেয়েছে আকাশের উদারতার কথা, সাগরের গভীরতার কথা, বাতাসের ঔদার্যের কথা। এবং কবিতার সৌন্দর্যের কথা শিখিয়েছে ওকে। কঠোর চেষ্টার কথা, ভালোভাবে পড়াশোনা করার কথা এবং জীবনে অনেক বড় হয়ে উঠবার কথা ওকে শুনিয়েছে। ওকে স্বপ্নের কথা শুনিয়েছে, আকাঙ্ক্ষার কথা শুনিয়েছে। তারপরও সিমন নিজেকে কেন এত অসহায় মনে করে? ঠিক তখনো জাফর ওকে বিশাল আকাশ দেখতে বলে, মায়াময় বৃষ্টির কথা বলে, উষ্ণ রোদের কথা এবং কঠোর নিয়মে বয়ে চলা দিন আর রাত্রির কথা বলে।
—তুমি আকাশের কাছে যাও, তুমি খোলা প্রান্তরে যাও। দেখো পৃথিবী কতটা উদার। তোমার মন ভালো হয়ে যাবে।
—আচ্ছা, তোমার কি একবারও মনে পড়ে না?
—মন থাকলে তো মনে পড়বেই... হা... হা... হা...।
ওর প্রাণখোলা হাসির দমকে সিমন তাকে পাল্টা প্রশ্ন করতে ভুলে যায়।
—সেটা তো আমি দেখতে পাই না, বুঝতে পারি না।
ও হেসে ওঠে ওর সঙ্গে। খারাপ মনটা ম্যাজিকের মতো ভালো হয়ে যায়। যেভাবে ভালো হয়েছিল ওর মুখের মাত্র তিনটে বাক্যে—আমি ভালো আছি... আমি ভালো আছি... আমি ভালো আছি।
৩
—গুলি লেগেছে জাফরের পায়ে...
—বলে কী এরা, কী বলে?
সিমন মুহূর্তেই পাগলের মতো প্রলাপ বকে। টিভির স্ক্রিনের সঙ্গে ওর চোখ দৌড়ায়। হাত খেলা করে রিমোটের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। এ চ্যানেল থেকে ও চ্যানেল। পুলিশ কেন ওকে গুলি করবে? ওর দিব্যি মনে পড়ে গতকালের খবরের কাগজেই তো ও র্যাবকে নিয়ে একটা খবর পড়েছে—‘র্যাবের কার্যক্রম নিয়ে আবারও বিতর্ক শুরু হয়েছে। সরকারের শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত এ সংস্থাটি। ...এলিট ফোর্সটি পরিচালনায় কঠোর বিধিমালা হচ্ছে। র্যাবের লাগাম টেনে ধরার জন্য এবার নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে সরকার। এ ব্যাপারে নতুন এক কঠোর বিধিমালা তৈরি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।’ এ নিয়েই তো ওরা গতকাল বিকেলে অনেকক্ষণ আলোচনা করছিল। আসলে র্যাব আছে বলেই তো সন্ত্রাস অনেকাংশে কমেছে। সেই তারাই যদি ক্ষেতের বেড়া খায়, তাহলে রক্ষা করবে কে? কিন্তু পুলিশ অকারণে ছাত্র হলে গেল কেন? জাফর তো ওদের ফ্যাকাল্টির সবচেয়ে মেধাবী আর নিরীহ ছেলে। ও তো কোনো সাতে-পাঁচে থাকে না। কোনো রাজনীতি করে না, না করে কোনো সমাজনীতি; না যায় মিছিলে, না করে কোনো হই-হুল্লোড়! নিরিবিলি নির্জনে নিজের পৃথিবীতে বিচরণ করে সে। কবিতার কথামালায় নিজেকে ব্যস্ত রাখে। দিন-রাত ভুলে পড়তে থাকে পৃথিবীর প্রয়োজনীয় যত পাঠ্য-অপাঠ্য। তাহলে ওকে কেন গুলি খেতে হবে? সকালেই তো কথা হলো, মিছিলে তো ওর যাবার কথা ছিল না। ও তো রুমেই থাকবে। কী একটা প্রয়োজনীয় লেখা রেডি করতে সে মরিয়া হয়ে আছে। তাহলে...
সিমনের দিব্যি মনে আছে, প্রথম যেদিন অন্য বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে জাফর ওদের বাড়িতে আসে, তখন সিমন লক্ষ করেছে অন্যদের খাওয়ার স্টাইলের সঙ্গে ওর খাওয়ার স্টাইলও আলাদা। ও খায় খুব পরিমিত, খুব ধীরস্থির। খাবার শেষে সবাই যখন চা, কফি, ফল, মিষ্টি নিয়ে ব্যস্ত ছিল, ও তখন এক টুকরো মিষ্টি খেয়ে এক ঝিমুনি ঘুমিয়ে নিচ্ছিল। এ নিয়ে সবাই যখন হাসাহাসি করছিল, ও সবাইকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়—এটাকে বলে কায়লুলা; দুপুরের একটুখানি ভাতঘুমে শরীর সুস্থ থাকে।
আমি ভালো আছি... আমি ভালো আছি... আমি ভালো আছি। বারবার রিলে হয় সিমনের ব্রেনে, মনে।
আমি ভালো আছি... আমি ভালো আছি... ও তো সব সময় ভালো থাকতে চায়, সুস্থ থাকতেই চায়।
কী করে সম্ভব গুলি খাওয়ার পরও এত অটল থাকা, এত শান্ত থাকা? ওর কণ্ঠের কাছে ওর কণ্ঠ যেন সুধা ঢালে অনবরত...। নিশ্চয় ও ওকে এত গভীর ভালোবাসে, তাই তো ওকে সব দুশ্চিন্তা থেকে দূরে রেখেছে। সিমন যাবে, অবশ্যই যাবে মেডিকেলে।
সিমন যখন পৌঁছায় ততক্ষণে জাফরের এক পা অপারেশন রুমে, আর এক পা নিয়ে নিশ্চিন্ত বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে পড়ে আছে সে। সিমনের পায়ের শব্দে যেন হকচকিয়ে যায় জাফর। ও কি চেনে ওর পায়ের আওয়াজ? ওর গায়ের গন্ধ?
সিমন ভেবে পায় না কী করে সম্ভব? এই অবস্থায়ও এত শান্ত, এত নিশ্চিন্ত...?
৪
রুমের বারান্দা থেকে অনৈতিক গুলি করা হয়েছে আমাকে। আমি তো ওখানটায় ছিলাম না। প্রচণ্ড তল্লাশির পর ওরা এ হল থেকে যখন কোনো কিছুই পায়নি, তখন উত্তেজিত হয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা আমাকে ওরা কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে ইচ্ছামতো পায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করেছে। আস্তে আস্তে ওর সব মনে পড়ছে। ওই মুহূর্তে আমি কি ভাবতেও পেরেছিলাম—আমি এভাবে বেঁচে উঠতে পারব; দেশের সাপোর্ট পাব?
চোখ বন্ধ রেখেই জাফর ভাবছে ক্রমাগত। সিমনও ভাবছে ক্রমাগত। আমি ভেবেছিলাম, আমি বুঝি একা। না, এখন দেখি আমার পাশে পুরো দেশ আছে, পুরো জাতি আছে। আমাকে যে করেই হোক পরিপূর্ণভাবে জাফরের পাশে দাঁড়াতে হবে। ওকে সুস্থ করে তুলতে হবে। অতি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতেই হবে ওকে। মিডিয়া, প্রশাসন, সরকার, এনজিও, মানবাধিকার সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়—সব আমার সঙ্গে আছে। সঙ্গে আছে আমার শক্তি।
সিমনকে দেখে জোর পায় জাফর। অন্য রকম জোর পায় ও। আমি একা নই, আমার পাশে সিমন আছে। আহ, কী শান্তি লাগছে! এত অসুস্থতার মধ্যে এত শান্তি কোথা থেকে এলো? অন্য এক ভালোলাগায় ভরে যায় জাফরের মন।
গ্রাম থেকে মা, বাবা ও দাদি এসেছে। একপাশে মৃদু বিলাপ করছেন দাদি।
—ওরে দাদাভাই, আমার সোনার নাহাল রাজপুত্তুর, জীবনের মতো খোঁড়া অইয়া গেল। ওরে আমার রাজপুত্তুর, যহন তুমি হাডো আমি পিচন তক চাইয়া চাইয়া দেহি। সাত জনমে আমার গুষ্টির কেউ খোঁড়া আছিল না। আল্লারে...
ছেলের হালকা ধমকে হঠাৎ চুপসে যান মরিয়ম বেগম। থতমত খেয়ে এদিক-ওদিক চোখ ঘুরিয়ে তাকান। এক দঙ্গল পুলিশ এদিকেই আসছে। পরে কি মরে, ভয়ে ভয়ে ছেলে-বউয়ের মাঝখানে গা ঘেঁষে দাঁড়ান মরিয়ম বেগম।
—ভয় নেই আম্মা, ওরা কিছু করবে না।
—তয় এইহানে ক্যান আইছে, বউমা?
—ওরা জাফরের পাহারার জন্যি আইছে। ঘরের বাইরে বারান্দায় থাকবে।
—ওমা, নিজিরা গুলি কইরা নিজিরাই আবার...
—হ্যাঁ আম্মা, শহরের অবস্থা বেশি ভালো না। মিছিল-মিটিং জ্বালাও-পোড়াও হচ্ছে। অবস্থা খুব খারাপ।
—তাইলে তো ভয়ের খবর।
—হ্যাঁ আম্মা, আপনি ভয় পাইয়েন না। সব ঠিক হয়ে যাবে। জাফরের নিরাপত্তারও তো দরকার। সরকার এইজন্যি ওর নিরাপত্তা দিয়ার জন্যি পুলিশ পাঠাইছে।
মরিয়ম বেগম যেন অকূলে কূল পেলেন। প্রাণে পানি এনে কুতকুত করে চেয়ে রুমের চারপাশে দেখেন।
—ও বু, তুমি কিডা? তুমারে তো চিনলাম না।
প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেয় বেডের একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা সিমনের দিকে।
—আমি... আমি... আমতা আমতা করতে থাকে সিমন।
—ও জাফরের সঙ্গে একসঙ্গে ভার্সিটিতে পড়ে। সিমনকে বাঁচিয়ে দেয় যেন জাফরের মা রাহেলা বেগম।
—হ্যাঁ, আমরা একসঙ্গে পড়ি ইউনিভার্সিটিতে। সিমনের মুখে কথা ফোটে।
—ও বু, তুমি কী সোন্দর চান্দের লাহান দ্যাকতে! ওরে, আমার রাজপুত্তুরও ওই রকম সোন্দর আছিল। আজ আমার দাদাভাই এক পা হারায়ে খোঁড়া... আল্লারে...
আবার কাঁদতে থাকা মরিয়ম বেগমকে অভয় দেয় সিমন।
—দাদি কাঁদবেন না। ওরকম পা কত পাওয়া যায়। ও আগে সুস্থ হয়ে উঠুক। ওর চিকিৎসার কোনো ত্রুটি হবে না। নতুন পা লাগানো তো কোনো ব্যাপারই না। আপনি বুঝতেই পারবেন না—কোনটি ওর আসল পা, আর কোনটি ওর ডুপ্লিকেট। বলেই যেন সিমন একটু আড়াল হয়ে ওড়নার আঁচল দিয়ে তড়িৎ চোখের কোনাটা মুছে নেয়।
—ও আবার ভার্সিটিতে পরতি পারবি বু? হাঁটতি পারবি?
—কেন পারবে না? হ্যাঁ, ও সব পারবে। আপনার রাজপুত্তুর তো এবার সত্যি সত্যি রাজপুত্র হয়ে গেল। দেখছেন না, তাকে নিয়ে দেশ, জনগণ, এনজিও, সরকার—সবাই কত কী ভাবছে। কত মিছিল-মিটিং, আলোচনা, মানববন্ধন—মিডিয়ায় ও তো সত্যিকারের হিরো হয়ে গেল, দাদি।
—তুই তাই কচ্চিস বু...
—হু তাই তো দাদি। দেখছেন না...
আধো ঘুম আধো জাগরণে জাফর শুনছিল দাদি আর সিমনের আন্তরিক কথাবার্তা। কত সহজেই সিমন আমার অশিক্ষিত গ্রাম্য সরল-সহজ দাদিকে আপন করে নিয়েছে। দাদিও কত নির্ভরতা পেয়েছে যেন সিমনের মধ্যে।
সিমন আস্তে আস্তে আর একটু জাফরের বেডের কাছে ঘেঁষে দাঁড়ায়। জাফর নিশ্চিন্তে, নির্ভাবনায়, পরম নিরুদ্বেগে চোখ বোজে। সুস্থ থাকা অবস্থায় কোনো দিন ওকে আমি বুঝতে দিইনি, আমার ভালোবাসা লালন করেছি সযত্নে। ও কি জানত, ওর চেয়েও আমি তাকে প্রচণ্ড রকম ভালোবাসি? হয়তো জানে, না হলে কেন সে এভাবে আমাকেও তার চেয়েও বেশি ভালোবাসে? ভালোবাসা কখনো একপক্ষ হয় না—কেউ যতই চালাকি করুক না কেন, যতই বুঝতে না দেবার ভান করুক। আমি জানি, কণ্ঠের আকুতি এবং আবেগই তা অন্যদের চেয়ে আলাদা করে। আমি তো চেয়েছিলাম ঠিকই প্রস্তুত হয়ে ওর সামনে এসে দাঁড়াব। আর আজ? কী হলো এসব? আজও যদি আমি ওর এই ব্যাকুল তৃষ্ণার্ত চোখ থেকে চোখ ফিরিয়ে নিই, তাহলে ওর জন্য হবে সেটা কঠিন আঘাত। ও সেটা সইতে পারবে না। আমি কি পারব ওকে এত বড় আঘাত দিতে? আমার কি উচিত হবে সেটা করা? এত দিন তো ওর সহ্য করার ক্ষমতা ছিল, কিন্তু এখন? আমি জানি, ও কোনোদিনও আমাকে ছেড়ে যাবে না কোথাও। তাহলে? ভাবতে ভাবতেই ও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। না, আর নয়। সারা জীবন ও আমাকে একপক্ষ ভালোবেসে এসেছে, আর এখন? আমাকেই ভালোবেসে যেতে হবে একপক্ষ। ওকে ছাড়া আমি এক মুহূর্ত বাঁচব না। জাফর ভাবতে থাকে ক্রমাগত।
কী এক ভালোলাগায় ভরে যায় জাফরের মন। খুব সতর্কতায় ওর হাতটা টেনে নিয়ে নিজের হাতের মুঠোয় এনে খুব মৃদুভাবে বলে ওঠে—তুমি আজও জিতে গেলে সিমন। আমি হেরে গেলাম। তোমার জিৎ সবসময়ই একপক্ষ।
জাফর দেখতে পায় ও আবার সিমনের সঙ্গে আগের মতো হাঁটছে দুর্দান্ত গতিতে ওর চেনা পথ, চেনা ক্যাম্পাসে। ওর বুকের মধ্যে কুহু-কুহু শুকপাখিটা ডেকে যায় ক্রমশ।