ইমতুর জগৎটা পিক্সেল আর আরজিবি কালার কোডের গোলকধাঁধায় বন্দি। প্রতিদিনের অফিসের কর্মমুখর প্রহরে তার চোখের সামনে সারা দিন শুধু ভাসে ইলাস্ট্রেটরের সূক্ষ্ম সব লেয়ার, যেখানে জীবন মানে কেবলই ‘Ctrl+S’ চেপে বর্তমানকে সুরক্ষিত রাখা। লাঞ্চ আওয়ারে সে ক্যান্টিনের দিকে এগোলো ছোট্ট টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে। সাথি অফিসেরই সিনিয়র ইফতেখার। ডেস্কেও তারা পাশাপাশিই বসে। ইফতেখার আর দশজনের মতো ভেতো বাঙালি নন। তার টিফিন ক্যারিয়ারে সবসময় থাকে সেদ্ধ ছোলা, স্লাইস করে কাটা শসা-গাজর, সেদ্ধ ডিম আর অর্ধসেদ্ধ শাকসবজি। মাঝে মাঝে মাছ-মাংসও থাকে, সেটাও মসলা ছাড়া সেদ্ধ। আপাদমস্তক স্বাস্থ্যসচেতন মানুষটি ইমতুকে বেশ স্নেহ করেন। হাস্যরসিক, তবে বেজায় প্রফেশনাল। কিছু মানুষ থাকে, যাদের মধ্যে ইমপ্যাথির ব্যাপারটা তেমন জোরালো নয়। ইফতেখার সেই দলের মানুষ। সম্ভবত এই ইমপ্যাথির ব্যাপারটা তার সঙ্গে সেভাবে যায়ও না।
টিফিন ক্যারিয়ার খুলে ইমতু নিজের ‘গতানুগতিক’ লাঞ্চ সেরে নিল। ইফতেখার ভাই আগেই লাঞ্চ সেরে নিজের ডেস্কে চলে গিয়েছিল। ইমতু অবশ্য ডেস্কে ফেরেনি। লাঞ্চের পর তার কিছুটা সুখটানের অভ্যেস আছে। সেই অভ্যেসকে প্রশ্রয় দিতে প্রতিবার লাঞ্চ সেরেই তে-তলার অফিস থেকে নেমে ফুটপাতের সগীর মামার টংঘরে সে চলে যায়। খুব সংক্ষেপে সুখটান সেরে মাঝেমধ্যে এক কাপ চায়ের তাগিদও মেটায়। অফিসের সিনিয়রদের সামনে এসব সুখটানের বিলাস সে করে না। মাঝে মাঝে ইফতেখার ভাই সামনে পড়ে গেলে ইমতু নিজের শলাকাকে আড়াল করে নেয় খানিকক্ষণের জন্য। ইফতেখার কি জানেন না ইমতুর বদভ্যাসের কথা! সকলেই জানে। তবু একটু ছল করতে দোষ কী! এটুকু তো সোসাইটি অ্যালাউ করে।
ইমতু যখন ফিরল, তখন লাঞ্চ আওয়ার শেষ হতে আর মিনিট দশেক বাকি। তখনো অনেকে লাঞ্চ থেকে ফেরেনি। অফিস প্রায় ফাঁকা। করিডোরের শেষ প্রান্তের উজ্জ্বল টিউবলাইটটি নিভু নিভু হয়ে কাঁপছে। সেই কাঁপুনি আর এসির একটানা গুঞ্জনের মাঝে অফিসটায় কেমন যেন এক ভূতুড়ে নিস্তব্ধতা ছেয়ে আছে। লো ভোল্টেজ? ডেস্কে ফিরতেই ইমতুর নজরে এলো পাশের ডেস্কে ইফতেখার নিজের মাথাটা ডেস্কের কিবোর্ডের ওপর নুইয়ে রেখেছেন। তার কাঁধ দুটো কাঁপছে এক ছন্দহীন যন্ত্রণায়। তিনি কি কাঁদছেন? ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে? ইমতু দ্রুত এগিয়ে ইফতেখারের পিঠে হাত রেখে বলল, ‘কী ব্যাপার ইফতেখার ভাই, কী হয়েছে?’
ইফতেখার মাথা তুলল না। কিন্তু ইমতু স্পষ্ট টের পেল তার সুরহীন সেই কান্নার এক ঘড়ঘড়ে শব্দ, যেন পুরোনো কোনো মেশিনের জং-ধরা চাকা ঘুরতে গিয়ে বারবার আটকে যাচ্ছে। একসময় ইফতেখার মাথা তুলে তাকিয়ে কান্নাভেজা জড়ানো স্বরে বলল, ‘ইমতু, আম্মা নেই। একটু আগে বাড়ি থেকে ফোন এলো। আমি এখন কী করব?’
ইশ, কেমন অসহায় দেখাচ্ছে ইফতেখারকে! কেমন ভরসাহারা দৃষ্টি ফেলছেন তিনি! গাঢ় বেদনার অশ্রুভরা দুচোখ দেখে ইমতুও কেমন ভড়কে গেল। আনইমপ্যাথেটিক ইফতেখারকে সিমপ্যাথি কীভাবে দেবে সে? ইমতুকে একরকম উদ্ধার করল টিম লিডার শওকত। তিনি এগিয়ে এসে ইফতেখারের সবটুকু শুনে নিচু স্বরে বললেন, ‘ইফতেখার ভাই, মা তো সবারই একদিন চলে যাবেন! এভাবে ভেঙে পড়বেন না প্লিজ। আপনি এখনই বাড়ির দিকে রওনা দিন।’
ইফতেখার যখন টলতে টলতে ব্যাগটা গুছিয়ে লিফটের দিকে এগোচ্ছিলেন, তখন অফিসের বাকিরা ফিরতে শুরু করলেন। সকলেই ভেঙে পড়া ইফতেখারকে দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াচ্ছিলেন। বাকিদের কাছে এ দৃশ্য ছিল একজন সহকর্মীর জরুরি প্রস্থান। কিন্তু ইমতুর কাছে দৃশ্যটা ছিল যেন এক প্রমোদভ্রমণী জাহাজের নিরুপায় ডুবে যাওয়া।
ইফতেখার চলে যাওয়ার পর কাজে একদমই মন বসাতে পারছিল না ইমতু। একটু পরপর ফিরে তাকাচ্ছিল ইফতেখারের শূন্য ডেস্কের দিকে। বিকেল পাঁচটা বাজতেই যখন ওঠার সময় এলো, তখনই ইমতুর নজরে এলো শূন্য ডেস্কের ওপর একটা হলুদ রঙের স্টিকি নোটস আধছেঁড়া অবস্থায় পড়ে আছে। ইমতু কাগজটা হাতে নিয়ে দেখল তাতে অসমাপ্ত কলমের টানে লেখা—‘মা, তুমি হারিয়ে গেলে কেন?’
কাগজের কুঁচকানো প্রান্তগুলোই ঘোষণা করছে, ইফতেখারের কান্নারুদ্ধ কণ্ঠখানি ও-প্রান্তে এসেই নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি আর। একটামাত্র বাক্যে মিশে আছে এক অনন্ত হাহাকার।
কাগজটা ভাঁজ করে মানিব্যাগের পকেটে রেখে দিল ইমতু। অফিস থেকে বেরিয়ে বাস ধরে সুবিধাজনক আসনে বসার সময় তার মনে হচ্ছিল—ইফতেখার ভাই কি এখন গ্রামের বাড়ি রওনা হয়েছেন? কোনো বাস ধরেছেন? বাসের জানালায় মাথা ঠেকিয়ে রেখেছেন? দুপাশের দ্রুত বদলে যাওয়া দৃশ্য না দেখে শূন্যপানে চেয়ে আছেন? বাসের চাকার প্রতিটি ঘূর্ণন তাকে বাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই বাড়িতে তো এখন ‘খোকা ফিরলি তুই’ বলে কেউ বুকে জড়িয়ে নেবে না। বাড়ি ফিরে যখন মায়ের সেই নিথর শয্যার পাশে তিনি বসবেন, তখন কি তীব্র ব্যথায় তিনি ভাববেন—‘দুনিয়াটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে কেন?’
ইফতেখারের সঙ্গে কী ঘটেছে, ইমতু তা জানে না। কিন্তু পরবর্তী পাঁচ দিন ইমতুর মনটা অফিসের কাচের দেয়াল ভেদ করে যেন এক অজানা গন্তব্যে ঘুরে এসেছে। সে যখন মনিটরে লোগো ডিজাইন করতে গিয়ে মাউস ড্র্যাগ করত, তার মনে হতো সে যেন ইফতেখারের সেই নীল বেদনার লেয়ারগুলো সাজাচ্ছে। প্রতিটি ক্লিক যেন একেকটি স্মৃতির পরত—কখনো মায়ের হাতের গরম ভাতের গন্ধ, কখনো অসুস্থ শরীরেও মায়ের এক চিলতে হাসি, আবার কখনো ইমতুর নিজের সীমাহীন উদাসীনতা। ইলাস্ট্রেটরের আর্টবোর্ডে সে যেন এক কাল্পনিক ক্যানভাস সাজাচ্ছিল, যেখানে প্রতিটি স্ট্রোক ছিল ইফতেখার ভাইয়ের শূন্যতার প্রতিচ্ছবি।
কাজ থামিয়ে ইমতু পকেট থেকে সেই হলুদ কাগজটা বের করল। ‘মা, তুমি হারিয়ে গেলে কেন?’ ইফতেখারের সেই কাঁপা হাতের লেখা দেখে হঠাৎ এক তীব্র আতঙ্কে ইমতুর বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। যদি ইফতেখারের জায়গায় আজ সে নিজে হতো?
ইমতু তার পরিবারের সঙ্গেই থাকে। ভোরের নাশতা, মধ্যাহ্নভোজ, নৈশভোজ—সবকিছুই তার মায়ের হাতে তৈরি। মায়ের শরীরে দুর্বলতা আছে, কিছু অসুখবিসুখও আছে। তবু তো যত্নের ত্রুটি তিনি করেননি কখনো। একটা দিনও নেননি ছুটি। কিন্তু ইমতু আর দশটা গড়পড়তা ছেলের মতোই উদাসীন। মায়ের আদর-যত্নকে তাই সে নিজের আবশ্যক অধিকারের মতোই বিশ্বাস করে এসেছে। কখনো ভাবেনি, এই ভালোবাসবার পেছনেও মায়ের কতটা কষ্ট স্বীকার করতে হয়। এই হলদেটে কাগজের টুকরো তাকে দাঁড় করিয়ে দিল ভিন্ন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। যে বাস্তবতায় কয়েক মুহূর্ত আগের জ্বলজ্যান্ত মা মুহূর্তমাঝেই ‘নেই’ হয়ে যান। পেছনে ফেলে যান নিঃস্ব হয়ে পড়া পুত্রকন্যাদের।
যদি আজ অফিস শেষে বাড়ি ফিরে ইমতু দেখত কলিংবেলের আওয়াজে মা আর দরজা খুলছেন না? যদি ডাইনিং টেবিলের সেই পরিচিত চিরচেনা ঢাকা দেওয়া খাবারগুলো আর না থাকত? ইমতুর সাজানোগোছানো পৃথিবীটা মুহূর্তেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ত। সে তো কেবল খেতে জানে, আদর নিতে জানে; কিন্তু যে মানুষটা নিঃশব্দে তাকে আগলে রেখেছে, তাকে ছাড়া এক মুহূর্ত বাঁচার প্রস্তুতি তো তার নেই। এক না-চাওয়া দৃশ্যপট ইমতুর চারপাশে যেন ছেয়ে এলো। সেই দৃশ্যপটে ইমতুর মা জীবিত নেই। মায়ের সেই শূন্য বিছানায় সে একা বসে আছে। ঘরভর্তি মানুষ, অথচ তার বুকজুড়ে অসীম শূন্যতা। ইফতেখার সবকিছুও কি তবে এভাবেই তছনছ হয়ে গিয়েছে?
দু’দিন বাদে ইমতুকে ইফতেখার হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠাল—‘কাল অফিসে আসছি ইমতু।’ খুবই সংক্ষিপ্ত মেসেজ। এ থেকে আঁচ করা যায় না ওপাশের মানুষটা এখন কেমন আছে। ইমতুর কেন যেন ভয় করতে লাগল। ইফতেখারকে না জানি কোন অবস্থায় পাবে সে! হয়তো আরো রোগা হয়ে গিয়েছেন এর মাঝে। সবসময় হাসিঠাট্টা, টিপ্পনীকাটা সেই রসিক স্বরটা হয়ে পড়বে ভাঙা কাচের মতো ধারালো। কীভাবে সেই বিধ্বস্ত মানুষটার সামনে দাঁড়াবে, কীভাবে সেই পবিত্র শোককে অসম্মান না করে কথা বলবে—এসব ভেবে ভেবেই নিজেকে প্রস্তুত করছিল ইমতু।
পরদিন একটু দেরিতেই অফিসে পৌঁছুলো ইমতু। ততক্ষণে ইফতেখার চলে এসেছে। কাছাকাছি আসতেই ইমতু দেখল, ইফতেখার বেশ হাসিখুশি অবস্থাতেই আরেক কলিগের সঙ্গে তার গ্রামের বাজারের টাটকা কই মাছের গল্প করছেন। সুন্দরভাবে আঁচড়ানো চুল, গায়ে কড়া ইস্ত্রি করা শার্ট, পরনে আকাশরঙা জিন্সপ্যান্ট। যে শোকাতুর মূর্তিকে ইমতু মনে মনে গেঁথে রেখেছিল, তার সঙ্গে এই রক্তমাংসের মানুষটার কোনো মিল নেই। মনে হচ্ছে, তিনি যেন কোনো করপোরেট ট্যুর সেরে অফিসে ফিরলেন। ইমতু একটু দ্বিধাবিভক্ত হলেও তার মনে হলো, ইফতেখার বোধহয় শোককে বুকে চেপে রেখেছেন।
একটু ইতস্তত করে এগিয়ে ইফতেখারকে সালাম জানাল ইমতু। ইফতেখারও সহাস্যে হাত মিলিয়ে কুশল বিনিময় করে আবারও কই মাছের আলাপে ফিরে গেল। ইমতুর মনে পড়ল সেই হলুদরঙা স্টিকি নোটসের জীর্ণ কাগজের টুকরোর কথা। এখনো সেটা মানিব্যাগেই আছে। এটা ইফতেখারকে দেখালে নিশ্চয়ই তিনি আবেগে আর্দ্র হয়ে উঠবেন। ইমতু সেটা মানিব্যাগ থেকে বের করে ইফতেখারের দিকে বাড়িয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, ‘ভাই, এটা সেদিন আপনার ডেস্কে ছিল। আপনি হয়তো খালাম্মাকে ভেবে লিখেছিলেন...।’
ইফতেখার কথা বলতে বলতে থামলেন। কাগজটার দিকে একবার তাকালেন, যেন কোনো পুরোনো বিল বা অপ্রয়োজনীয় ড্রাফট দেখছেন। তারপর চিনে ফেলার ভঙ্গিতে হেসে ফেললেন—‘আরে ইমতু! এটা তুমি আবার রেখে দিলে কেন? সেদিন আম্মার নিউজটা আসার পর মাথা কাজ করছিল না, তাই কী সব হাবিজাবি লিখে ফেলেছিলাম। ফেলে দাও তো!’
কথাটা শেষ করেই ইফতেখার কাগজটা হাতে নিয়ে নিলেন। এরপর যেভাবে মানুষ প্রতিদিন অপ্রয়োজনের কাগজ দলা পাকায়, সেভাবেই দুহাতের তালুতে হলদে কাগজটি রেখে দলা পাকিয়ে পাশের ডাস্টবিনের ভেতর ছুঁড়ে দিলেন। ডাস্টবিনের ভেতরের পুরোনো কফির কাপ আর ওয়েস্ট পেপারের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ল মাকে লেখা সেই হলুদরঙা চিরকুটটি।