হোম > সাহিত্য সাময়িকী > গল্প

হিলা ও আমুনির মউত

মাহমুদ নাসির জাহাঙ্গীরি

কোথাও এক ফোঁটা জায়গা নেই, তার মধ্যে আমুনি আর মরার সময় পেল না? মানুষ বসার জায়গা পায় না এই বন্যায়, খাওয়ার ঠাঁই পায় না, আর আমুনি আইছে ঘুমাইতে? মুখ ঝামটা দেয় মোতালেবের বউ। জুনাব আলীর বউ ধমক দিয়ে ওঠে—‘যা তুই এহান থাইকা, মুখপুড়ি।’ কোথায় গোসল দিবে তার? মানুষ খাওয়ার পানি পায় না, এক গামলা ধরার পানি পায় না, চারিদিক ভেসে যাচ্ছে গু-মোতের পানিতে, তার ভিতর আমুনির গোসলের পানি পায় কোথায়?

—বন্যার পানিত গোসল দিবা না, তয় কই পাইবা জমজমের পানি?

বালতি থেকে পানি ঢেলে কাঠের পাটাতনের মতো দেহটাকে ধোওয়া হলো কতক্ষণ। এবার কাফনের কাপড় জুটাবে কে?

—কাফনের কাপড়ের কি করসত তোরা?

—আমি কিছু জানি না। উত্তর দেয় শফিক।

—তুই কিছু জানস না, তয় জানে কে? তয়, কী জন্য আইসছ? ধমক দেয় কালু মাতবর।

শফিক আমুনির ভাইয়ের ছেলে। বোধশক্তি বিকশিত হয়নি। তার ফোলা শরীরটা নিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে কথা বলে। শফিককে কোলেকাঁখে করে আমুনিই মানুষ করেছে। সারা বছর ভাত তুলে তারই আদার মুখে তুলে দিয়ে কাকের ছাও বড় করেছে। কিন্তু এখন নিদানের দিনে কাফনের কাপড় কোথা থেকে যোগায় শফিক?

হ্যাঁ, জুনাব আলীর বিধবা বউয়ের ছেঁড়া একটা শাড়ি পাওয়া গেছে তার হাঁড়ির ভিতর। হাঁড়ির ভিতর থেকে সাপ যেমন বের করে আনে, তেমনি বের করা হলো দড়িপাকানো সাদা শাড়ি বিধবার। আমুনি হলো জুনাব আলীর বউয়ের ভাত তোলার সাথি। সন্ধ্যায় অন্ধকার পথে, রাতেবিরাতে সাপখোপের ভয়ের মধ্যে দুজনের কত দিন দেখা হয়েছে, ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে। আমুনির পথে কাঁটা হয়েছে জুনাব আলীর বউ। আমুনি যেখানে যায়, সেখানেই একজন সতিন। আমুনির শান্তি নাই। আমুনির ভাত তুলে নিয়ে যায় জুনাব আলীর বউ! কম কামড়াকামড়ি করেনি আমুনি, তবু আমুনির প্রতি আজ জুনাব আলীর বউয়ের সহানুভূতি জেগে ওঠে। আল্লার মাল আল্লায় নিয়া গেছে, আমুনির প্রতি কোনো অভিযোগ নেই জুনাব আলীর বউয়ের।

—এখন কবর দিবা কই?

—আমুনি সারা জীবন জ্বালাইয়া খাইছে। মৃত্যুর পরও কম জ্বালা দিবে না। এখন কোন লাঙ্গের ঠাঁই তার কবর বানান যায়?

খবর নিয়ে আসে আক্কাসের ছেলে, উত্তর চরে কবরস্থানে হামিদ আলীর কবরের পাশে এক চিলতে মাটি দেখা যায়। আক্কাসের ছেলে এ গ্রামের সব মানুষের কবর খোঁড়ে। তার বাবাকে সবাই আক্কাস মুন্সি বলে, কিন্তু তার মধ্যে নেই লেখাপড়া বা বিদ্যাবুদ্ধি। সে হয়েছে একটা চাষা, তার দাঁত ময়লা। তবে একটা কাজ করে সে ধর্মের। শত কবর সে খুঁড়ে চলে।

—ঠিকই লাঙ্গের পাশে আমুনির ঠাঁই হলো। ক্যামুন কারবার দ্যাখো। আল্লাহর কারবার দ্যাখো। কোন খানের লাডি, কোনখানে ঘুরাইয়া মারে, দ্যাখো।

—আলো মঙ্গলনি পাগলনি—কই গেল তোর ভরম? যেমন তোর গোমর, তেমনি তোর শাস্তি।

দুই

এমনি কোনো এক বন্যার বছরই উত্তরচরে কবর হয় হামিদ আলীর, উঁচু জায়গাটায়। মঙ্গলনি পাগলনির কবরের পাশে কবর হতে পারত তার বাঁশঝাড়ে। বাঁশঝাড়েই তাদের পারিবারিক কবরস্থান। স্ত্রীর পাশে তার কবর হতে পারতো স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু বাধ সাধলো বন্যা। হামিদ আলীকে এনে ফেলে দিতে হলো বিদেশবিভুঁইয়ে। হামিদ আলীর কপাল কী রকম দ্যাখো, তার বাঁশঝাড়ের বাঁশ কপালে জুটলো, কিন্তু মাটি জুটলো না। বাঁশঝাড়ের বাঁশ বিক্রি করে সারা বছর চলত হামিদ আলী। দাফনের সব বাঁশ হামিদ আলীর বাঁশঝাড় থেকেই যায়। অন্য ১০টা মানুষের মতো তারও কপালে জুটলো বাঁশ, কিন্তু বাপদাদার কবরস্থানের মাটি পাওয়ার সৌভাগ্য তার হলো না। বন্যার পানি তার লাশ ভাসিয়ে নিয়ে আসলো কিনা ভূতে ভরা কবরস্থানে।

বাপদাদার কবরস্থানে হামিদ আলীর মাটি জুটবে কী করে? করছে তো মঙ্গলনি পাগলনির সঙ্গে বেইমানি। পাগলনির বদদোয়ার এই ফল।

—তা না হইয়া যায় না। মঙ্গলনির নিষেধ মানে নাই হামিদ আলী। বিয়া করলো আমুনিরে।

—হিল্লা বিয়া বেইমানি না?

—বেইমানির ফলেই তো মঙ্গলনি অইলো মঙ্গলনি পাগলনি।

শর্ত অনুযায়ী হিল্লা বিয়ের পরের দিন আমুনিকে তালাক দিল হামিদ আলী। কিন্তু আমুনি ঘর ছাড়ে না। আমুনি ঘর ছাড়ে না কেন? তার উত্তর পাওয়া গেল। কবরস্থানের বাঁশঝাড়ের বড় ভূতটা আসর করছে আমুনির ঘাড়ে। আমুনিরে ধরছে জিনে পাওয়া রোগে। কী সর্বনাশ! এই জিন ছাড়ায় কী করে? করিম ফকির দিলেন তার সমাধান। এই জিন তাড়াতে হয় বাঁশের খ্যাংরা দিয়ে পিটিয়ে।

আমুনি হাতে নেয় বাঁশ, মঙ্গলনি নেয় খ্যাংরা। বাঁশঝাড়ে আমুনির বাপভাইয়েরও আছে অর্ধেক ভাগ। আমুনি কেটে নেয় বাঁশের কঞ্চি, আমুনি ছাড়বে নাকি মঙ্গলনিরে? আমুনি তার দা ধরে বাগিয়ে। আমুনির কী হইল, লাশ খাওয়া কুত্তা হইয়া গেল শেষে আমুনি? কুত্তা হয়ে যাবে না? আমুনি সারা দিনরাত বাঁশঝাড়ে বসে থাকে তার বাপমার কবরের পাশে। তার কুই থামে না। কই গেল তার বাপমা—তাকে অকূলে ভাসিয়ে? তার দুনিয়াতে কেউ নাই, একটা ভাই ছাড়া, হেয়ও ফিরা চায় না তার মুখের দিকে। হেয় কিনা যোগ দিছে মঙ্গলনি পাগলনির লগে।

—আমার কা মরণ অয়না, আল্লারে। আমার কা এত দুঃখ, আল্লারে। চুন্দুইরার কাছে কা আমারে বিয়া দিল, আল্লারে। চুন্দুইরার ঘরোতো আমি আর যাইতাম না, খোদারে।

চুন্দুইরার প্রতি তার আর অভিযোগ শেষ হয় না। তারপর মউজ্যার বউয়ের প্রতি আক্রোশ। মউজ্যার বউ তার ভাইয়ের বউ।

—আলো ধলা মাগি, তুই ক্যামনে মঙ্গলনি পাগলনির লগে করস কানাকানি? হের লেইগ্যাইতো ছোছমা কুত্তার লাইন তোর মুখ পাকড়া করলো আল্লায়।

বউটার বাপের বাড়ি করিমখাঁ গ্রাম, সে তার ছুলি নিয়ে বিব্রত। মুখে বিশেষ কিছু বলে না। তবে তার অভাবের সংসারে আমুনি বাড়তি বোঝা হবে—এটা তো কাম্য হতে পারে না। আমুনি আর চুন্দুইরার ভাত খাবেই না—এই তার পণ।

তারপর চুলাচুলি। আমুনিরে মঙ্গলনি বাঁশ দিয়ে পিটায় ক্যান? আমুনি তার বাপভাইয়ের বাড়িতেও থাকতে পারবে না? না, আমুনি আর চুন্দুইরার ভাত খাবে না। সে থেকে যাবে বাপভাইয়ের বাড়িতেই। মঙ্গলনি কিন্তু তাকে থাকতে দিবে না এই বাড়িতে।

—আলো, তুই আমার সংসারেও আগুন জ্বালসত্‌ লো। বাইর হ তুই বাড়ি থাইকা, কইতাছি। মঙ্গলনির গলায় এসে যায় ঝামা পাথর ঘষার আওয়াজ।

—তোর আগুনে পুইড়া এই বাড়ি খাক অইবো লো। খাইতে পারলি না হাইয়ের ভাত, হাঙ্গালনি। এখন আইসত আমার সংসার ভাঙ্গার লাইগ্যা। এবার তার কণ্ঠে শোনা যায় লয় পরিবর্তনের আভাস।

আমুনিরই অত্যাচারে চুন্দুইরা তাকে তালাক দেয়। কত ভালবাসত চুন্দুইরা তাকে। কিন্তু কী করবে সে, কথায় কথায় ‘চুন্দুইরা, চুন্দুইরা’—এই ছাড়া আমুনির মুখে কোনো কথা নাই। স্বামীর সঙ্গে কথা বলে আমুনি ‘তুই-তোকারি’ কইরা। স্বামী যেন তার লাঙ্গ, তার সঙ্গে কথা বলে ধমক দিয়ে। কী করবে তালাক দেওয়া ছাড়া? অনেক বাড় বাড়ছিল আমুনির। এখন তেল মজুক, বিষাইল্যা মাগির বিষ মজুক। কত ভালবাসত আমুনিরে সে। আমুনি মাছ খায় না, চুন্দুইরা বাগুন পোড়া দিয়া ভর্তা করে দেয় আমুনিরে, আমুনি যাতে রাতে না খাইয়া না ঘুমায়। তবু আমুনির ফোঁস ফোঁস কমে না। আস্ত একটা সাপের হাঁড়ি আমুনি। জাতসাপ। কালসাপ আমুনি। ঠেস দেওয়া ছাড়া কতা কয় না আমুনি তার সঙ্গে। মেয়েলোকের এতো দেমাগ ভালো না। কেন, চুন্দুইরায় তোর স্বামী না? কীসের বলে তুই এত পাওয়ার দেহাস? কেন তুই দেখলি সাপের পাঁচ পাও? উপযুক্ত শাস্তি হইছে আমুনির। এখন মজাডা বুঝুক। সাত ঘাটের পানি খাইয়া মরুক এখন। বুঝুক মজাডা।

চুন্দুইরা সারা দিন একা খেটে যায়। জমিদার বাড়ির অন্দরমহলে বাইরের লোকের ঢোকা নিষেধ। আগে আমুনি নানা কাজের আঞ্জাম দিতে সাহায্য করতো। আমুনির সঙ্গে তালাক হওয়ার পর এখন সে একা তার শরীর টেনে ভিতরবাড়ি, বার বাড়ি দৌড়ায়। মুনিমানুষদের খাওয়ানো, ভাতের ডেগ টানা, তরকারির বোল টানা—সবই করতে হয় একা তাকে। সুঁইসুতার মতো এফোঁড়-ওফোঁড় করে ঘুরে বেড়ায় চুন্দুইরা। বাড়ির ভিতরে জেনানামহলে ঢুকে সে বলে, ‘ভাউজ, এই বোলডায় চুকা খাট্টা আর একটু দেন।’ বারবাড়িতে গিয়ে বলে, ‘আরে চান মিঞা, খাও সরকার বাড়ির ডাউল ডাউলের মজা জাইন্য ডেগের তলায়।’

জমিদার বাড়ির চারদিকে বেড়া। এ বাড়ির বউঝিদের কেউ কোনো দিন দেখে না। সারা গ্রামের লোক গোসল করে গাঙের ঘাটে। শুধু এই বাড়িতে কুয়া আর তার পাশে গোসলখানা। এই বাড়ির মেয়েদের কেউ দেখে না, শুধু বাড়ির ভিতর বসে চাঁদের হাট। চাঁদনি রাতে বসে রূপকথার আসর। সেখানে কারো স্থান নেই, কিন্তু চুন্দুইরার অবাধ আনাগোনা। পাইকপেয়াদার ভিতর সে শুধু অনন্য।

ভুঁইয়ার ঝি বলেন, ‘আরে চুন্দুইরা, লুঙ্গিডা ভালা কইরা পিন, সারা বাড়ি হেঁচড়াইয়া ধুলাবালি সব একত্র করছ। আমুনির খোঁজ করছ না?’

—হ, ভাউজ—হ, খোঁজ লমু, খোঁজ লমু।

বউঝিরা তাকে স্নেহও করে, তামাশাও করে। চুন্দুইরা হলো তাদের বিনোদন ও রঙ্গরস।

চলাফেরায় চুন্দুইরা যেমন মেয়েলি, তেমনি কথায়। চলার সময় তার শরীর ভেঙে ভেঙে পড়ে, কথা বলার সময়ও কথা বলে মেয়েদের মতো। কতো বৈচিত্র্য জমিদার বাড়িতে, চুন্দুইরা তার মধ্যে একটা আনন্দের খোরাক। কিন্তু চুন্দুইরার জীবনে আনন্দ নাই। তার বউ আর তার ভাত খাবে না। বউ আর স্বামীর ঘরে আসবে না—এর চেয়ে বড় লজ্জা আর আছে? রাতে বিরাতে কাঁদে চুন্দুইরা আমুনির কথা মনে করে। সে তালাক দিয়েছিল আমুনিরে রাগের মাথায়। প্রেসিডেন্ট সাব ও কারী সাবের হাত পা ধরেও চুন্দুইরা আমুনিরে পায় নাই। হিল্লা বিয়ার পর আমুনিকে ঘরে তুলতে বাধা নেই। কিন্তু আমুনি পণ করেছে, সে আর ‘মাইগ্যা চুন্দুইরা’র মুখ দেখবে না। যে মাথা গরম করে স্ত্রীকে বলে দেয় বাইন তালাক, এমন মিন্সের ঘর করবে না আমুনি। ঘুমের মধ্যে মৃত্যু হল চুন্দুইরার। আমুনির আর ঘর করা হলো না হামিদ আলী বা চুন্দুইরা—কারো সঙ্গেই। শেষে কোনো ঘরে ঠাঁই না পেয়ে ভেসে এলো এক ভরা বর্ষায়।

—দেহো কেমন মরা মরলো আমুনি। এক বাড়িতে থাকলেও আমুনি ছায়া দেখতে পারে নাই মঙ্গলনির। মরার পরও ছাড়াছাড়ি হইল। সুদিনের বছর মরলো মঙ্গলনি, আর বন্যার বছর আমুনি। কবরেও যেনো দেহা না অয় দুই সতীনের। এক জনের কবর অইলো এই কূলে, আর এক জনের সেই কূলে। তেপান্তরের পার।

—সারা জীবন ঘর কইরাও মঙ্গলনি পাইল না স্বামীর সঙ্গে কবরস্থানে ঠাঁই। আর আমুনি এক রাত বাসরঘর কইরা পাইল স্বামীর সঙ্গে কবরবাস। মঙ্গলনি সারা বছর করলো হিংসা নিন্দা আমুনির লগে। হিংসানিন্দার ঘরে পড়ে আজদাহা বাজ, ঝগড়াটে নারীদের কপালে জোটে হাবিয়ার সমান আজাব। শেষে আমুনির অইলো স্বর্গবাস। এক রাতের স্ত্রীর প্রতি করছে মঙ্গলনি এত বাদ, আর এহন আমুনি পাইল স্বামীর সঙ্গে চিরদিন থাকার আশ্বাস। মানুষ করে সারা জীবন স্বার্থ নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি, কিন্তু মানুষের আখের থাকে আল্লার ওপর ন্যস্ত। সারা জীবন দুনিয়ার ওপর করলো বাহাস, কিন্তু দিল শেষ মার। আমুনির জোড়া মিলাইলো আল্লায় নূহের বন্যার পর। নূহের কবুতর-কবুতরী পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ায়, আর আমুনি মরার পর স্বামীর সঙ্গে জোড়া মিলানোর সুযোগ পায়।

আমাদের জাতীয়তা

সাঈদের ফিলিস্তিন : আধিপত্যবাদ ও আগামীর বিশ্ব

শোল মাছের ঝোলের পরে

ঢাকার রঙিন রমজান

বিজ্ঞান, সুফিবাদ ও প্রেমের অলৌকিক তর্জমা

সেই রাতে

রুহিতা নায়িকা হতে চেয়েছিল

প্যারালাল ইউনিভার্স থেকে

যেভাবে বেড়ে উঠি (তৃতীয় পর্ব)

অপেক্ষা ও অশরীরী জ্যামিতি