কিছুক্ষণ আগের মৃদুমন্দ বাতাস এখন রূপ পেয়েছে সমীরণে। মিনারের গায়ে ঝোলানো রাজপতাকা উড়ছে প্রবলভাবে। মিনারে দাঁড়ানো শিকারির লক্ষ্যস্থির করা তিরও যেন সন্দেহের বাতিকে দুলছে; হরিণ শাবকের গায়ে বিঁধবে তো?
শেষ পর্যন্ত ধনুকের ছিলা আলগা হয়ে নেমে এলো দুই বাহুর কাছাকাছি। মহামতি আকবর তির-ধনুক রেখে দিলেন পাশে। খানিক দূর থেকে ভেসে আসা তানসেনের গানের ধুয়া যেন আকবরকে করে তুলছে মোহাচ্ছন্ন। দূর থেকে কিছুক্ষণ হরিণ শাবকের বিস্তীর্ণ অরণ্যে বিচরণ অবলোকন করে গেলেন তিনি।
গদিতে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে রইলেন সম্রাট আকবর। হয়ত ব্যুহ রচনা করছেন কল্পনায়। কিন্তু হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন, ‘বাংলা থেকে খাজনা কি বারওয়াক্ত এসেছে রাজা দিওয়ান-ই-আশরাফ?’
আকবরের নবরত্নের একজন, অর্থমন্ত্রী টোডরমল আশপাশের শান্ত পরিবেশে হয়তো অবচেতন হয়ে পড়েছিলেন। তাই তার উত্তর দিতে কিছুটা দেরি ঘটল।
‘খোদাবন্দ জিল-ই-ইলাহি, এখনো আসেনি। আশা করছি শিগগির কোষাগারে জমা হবে।’
দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা হয় না। সম্রাটের চোখ এখনো বন্ধ।
‘গত কয়েক সন থেকেই দেখছি এমন অবস্থা। বিদ্রোহ দানা বেঁধে উঠছে না তো! আপনার কী ধারণা?’
কোনো সম্বোধন না করলেও সৈয়দ মীর ফতহুল্লাহ শিরাজী বুঝতে পারলেন প্রশ্নটি তাকেই করা হয়েছে।
‘শাহেনশাহ-ই-আলা, আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানের বয়ান এই, রায়তদের ফসল এখনো ঘরে ওঠেনি। তাই এত দেরি।’
সম্রাট আকবর রাজ্য নিয়ে আলোচনা করে চললেন। হরিণ মিনারে শিকার করতে গিয়ে তিনি সেদিন রকমফের সমস্যা এবং তার ভাবনা বলেছিলেন সভাসদদের কাছে। দশম রত্ন ফতহুউল্লাহ শিরাজি নীরবে শুনে গিয়েছিলেন। ঠোঁট তার কম চললেও ক্ষুরধার মস্তিষ্ক খুঁজে পেয়েছিল ঐতিহাসিক সমাধান।
বেশ কয়েকপক্ষ পর একদিন সম্রাট বসেছিলেন তার দরবারে। একে একে সব সভাসদ সালাম জানিয়ে বিদায় নিলেও বসে রইলেন ফতহুউল্লাহ শিরাজী এবং দেওয়ান টোডরমল। সম্রাট মুচকি হাসলেন। দুই রত্ন গিয়ে সম্রাটের কাছে বসলেন। টোডরমল মাথা নাড়িয়ে ইঙ্গিত করলেন ফতহুউল্লাহ শিরাজীকে।
‘জাহাঁপনা, সমস্যার মূল সুতো গিয়ে ঠেকেছে সূর্য আর চন্দ্রে। সমস্যাটি তানসেনের সুরের মতোই বোধগম্য কিন্তু আব্দুল রহিম খান-ই-খানানের দোহার মতোই দুর্বোধ্য।’
শিরাজীর কথা শুনে এবার সশব্দে হাসলেন আকবর। রসিকতা করে বললেন, ‘বীরবল থাকলে মনে শঙ্কা লাগত বৈকি, ওর চাকরি বুঝি এবার গেল!’
টোডরমল দেঁতো হাসি দিলেও শিরাজী রইলেন শান্ত। কারণ, তিনি জানেন সমাধানের দুর্বোধ্যতা ভেদ করা গেলেও বাস্তবায়ন ঢের কঠিন।
‘আপনি সবিস্তারে বলার পর আমি পাটনা, ওড়িশা আর তান্ডা ভ্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেই। নাতিদীর্ঘ এ ভ্রমণের শিক্ষা এই, চন্দ্রবর্ষ প্রতি বৎসর ১১ দিবস এগিয়ে আসার দরুন কয়েক বছর পরপর রাজস্ব আদায়ের তারিখের সঙ্গে এর তারতম্য লক্ষ করা যাচ্ছে।’
ফতহুউল্লাহ শিরাজী আড়চোখে তাকালেন টোডরমলের দিকে। টোডরমল এবার বললেন, ‘ফসল তোলার সময় ওদের হাতে পয়সা থাকে। তাই খাজনা আদায়ের সময় তখন নির্ধারণ করাটাই সমীচীন।’
‘কিন্তু একটিবার তারিখ তো নির্দিষ্ট হওয়া জরুরি, তবে সেক্ষেত্রে কী চিন্তা করেছেন আপনারা’Ñআকবর প্রশ্ন তুললেন।
এবার শিরাজী বললেন, ‘বিজ্ঞ, আপনি বুঝতে পেরেছেন। আপনি যদি এজাজত করেন, আমি আমার পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করে পারি।
‘বলুন’Ñগম্ভীর মুখে বললেন সম্রাট।
‘নতুন এক সন চালু করা যেতে পারে, মহামান্য!’
দরবারে কিছুক্ষণ পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। সম্রাট নিশ্চুপ দেখে জনাব শিরাজী বলতে লাগলেন, ‘হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর শানে প্রবর্তিত হিজরি সনের সূচনা থেকেই নতুন এ সনের গণনা শুরু হবে, মহামান্য। তবে এর বাস্তব প্রয়োগ শুরু হবে আপনার সিংহাসনে আরোহণের সময় অর্থাৎ ১৫৫৬ থেকে। সেই সন থেকে গণনার মাধ্যমে সমন্বয় করে একটি মাস আমরা নির্ধারণ করব রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে, যদি আপনার মর্জি হয়।’
সম্রাট বেশ কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, ‘হিজরি সনকেই ভিত্তি ধরছি কেনো?’
ফতহুউল্লাহ শিরাজী বললেন, ‘সারা অঞ্চলে যে এটিই প্রসিদ্ধ, মান্যবরের অজানা নয় সেটি। কিন্তু তার পরেও আরেকটি নির্লিপ্ত কারণ রয়েছে হুজুর। দ্বীন-ই-ইলাহির পর আলেম-ওলামারা নানারূপ মন্তব্য করেছেন। নতুন এই অব্দ নিয়েও আলোচনা হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এটি যতটা না ধর্মীয়, তার চেয়ে বেশি অর্থনৈতিক, জাহাঁপনা। তাই এমনভাবে এর কাঠামো দেওয়া উচিত, যাতে সবাই তা নিজের মনে করে গ্রহণ করে।’
সম্রাট আকবর মাথা নাড়ালেন। বললেন, ‘উত্তম চিন্তা। তবে কি মাসের নামকরণ…?’
টোডরমল বললেন, ‘আজ্ঞে না হুজুর, মাসের নামগুলো কৃষকদের থেকেই নেওয়া হবে!’
ভ্রু কুচকে রইলেন সম্রাট। শিরাজী ব্যাখা করলেন, ‘শকাব্দে প্রচলিত মাসের নাম অবিকলভাবে এই অব্দের মাস হিসেবে জারি থাকবে, মহামান্য। কারণ হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিমÑসব সমাজের কৃষকের মুখে মুখে এসব মাসের কথাই ফেরে। নতুন বন্দোবস্ত করে তাদের ওপর কিছু চাপিয়ে দেওয়া অনুচিত হবে।’
সম্রাট আকবর দাঁড়িয়ে গেলেন। পায়চারি করতে লাগলেন। ঐতিহাসিক একটি কাজ হতে যাচ্ছে সামনে। অনেকক্ষণ এমন অবস্থা বিরাজ করার পর তিনি মুখ খুললেন, ‘ফসল কাটার পর আরো কয়েক মাস সময় দিয়ে খাজনা আদায় করতে হবে। নতুন সনের প্রথম দিন নওরোজ উৎসবের মধ্য দিয়ে আদায় হবে রাজস্ব। উত্তর ভারতের মতো জবতি প্রথায় পরিশোধ হবে খাজনা। সব প্রজাকে মিষ্টিমুখ করানো হবে সেদিন, এটিকে কেন্দ্র করে বসবে আনন্দের মহোৎসব।’
ফতহুউল্লাহ শিরাজী মিষ্টি হাসলেন। তিনি স্পষ্টতই বুঝতে পারলেন সম্রাট সব ধর্মের গূঢ়তত্ত্বের সন্নিবেশ উদার মনে নিয়েছেন। অন্যদের চেয়ে তিনি যে এক ধাপ এগিয়ে গেলেন, তা তার অস্থিরতাই প্রমাণ করে দেয়।
টোডরমল বিদায় নিলে কিছুক্ষণের জন্য সম্রাটকে একা পেলেন ফতহুউল্লাহ শিরাজী। ফিসফিস করে বললেন, ‘মহামান্য, রুষ্ট না হলে একটি কথা পেশ করার ছিল।’
‘আপনি আজাদুদ্দৌলা, সাম্রাজ্যের বাহু। আপনার প্রতি রুষ্ট হলে সাম্রাজ্য টিকবে!’
শিরাজী মুচকি হাসলেন। বললেন, ‘দ্বীন-ই-ইলাহি, বিতর্কটা কি পাশ কাটানো গেছে জাহাঁপনা?”
আকবর বললেন, ‘জ্যোতির্বিদ ফতহুউল্লাহ শিরাজীর ওপর যে ভার অর্পিত হয়েছিল, তার বরখেলাফ হবে, তা কীভাবে আশা করি আমি! যথার্থই বলেছেন আপনি আজাদুদ্দৌলা। চমৎকারভাবে সমাধান বের করেছেন রাজস্ব সমস্যার। সেই সঙ্গে বুক থেকে পাথরটাও নামার বন্দোবস্ত করেছেন আপনি। আমার নতুন ধর্মমতকে উপজীব্য করে দানা বাঁধা বিদ্রোহও দমন করার মোক্ষম অস্ত্র এই নতুন অব্দ! ধন্য ফতহেউল্লাহ শিরাজী!’
এ ঘটনার পর পেরিয়ে গেছে কয়েক বছর। নিজের কাজ শেষে ফতহুউল্লাহ শিরাজী এখন সাম্পানে বসে বুড়িগঙ্গার হাওয়ায় গোসল করছেন। কিছুক্ষণ পর তিনি পা দেবেন খিজিরপুরে। সম্রাটের অনুরোধে এসেছেন মোগল বশ্যতা অস্বীকার করা বারো ভূঁইয়াদের নেতা ঈশা খাঁর অঞ্চলে! দূরে তীর দেখা যাচ্ছে। অনেক অনেক ফসল তোলা হচ্ছে নৌকায়।
তার পাশে বসে থাকা খাদেমের সঙ্গে সারাপথ গল্প করতে করতে এসেছেন তিনি। খাদেম কী মনে করে বলল, ‘হুজুর, আপনি চাইলে আমার বাড়িতে কটা দিন থাকতে পারেন। আমার বাড়ির সামনেই বিঘাতক ধানক্ষেত। ধানের হাওয়ায় মন জুড়িয়ে যাবে আপনার।’
‘ধান তো সব কাটা হয়ে গেছে মোনসেফ, হাওয়া কোথায় পাব!’
মাথা চুলকে খাদেম বলল, ‘ওহ হ্যাঁ তাই তো! কদিন বাদেই তো বৈশাখ হুজুর! এবার দুই কেজি মিষ্টি খাব!’
ফতহুউল্লাহ শিরাজী আগ্রহী হলেন। বললেন, ‘বুঝিয়ে বলো।’
‘গত বছর জমিদার বাড়িতে খাজনা দেওয়ার সময় আমাদের মিঠাই দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়েছিল। এক কেজি রসগোল্লা খেয়েছিলাম, হাহা। এবার তাই ভেবে রেখে কম হলেও দুই কেজি খেতে হবে। এমন সুযোগ কি বারবার আসে হুজুর!’
ফতহুউল্লাহ শিরাজী মুচকি হাসলেন। কিন্তু তিনি হাসলেন মূলত অন্য একটি কথা মনে করে। বারো ভূঁইয়ারা এখনো মোগলদের বশ্যতা মানেনি। তারিখ-ই-ইলাহি তাই মানার প্রশ্নই ওঠে না। তাই তারা আগেই খাজনা আদায় করে নেয়। কিন্তু মুখে মুখে প্রচারিত হওয়া নওরোজের উৎসব তারা অজান্তেই গ্রহণ করে ফেলেছে! মনে মনে ভাবলেন, ‘মানুষ অন্যের দর্শন গ্রহণ না করলেও সংস্কৃতি ঠিকই আত্মস্থ করে ফেলে!’
ফতহুউল্লাহ শিরাজী পা রাখলেন সোনারগাঁয়ে। সম্রাটের আজ্ঞাবহ হয়ে কতদূর যেতে পারবেন, তা তিনি জানেন না। তবুও অজানার উদ্দেশে যাত্রা শুরু হলো তার…।