দেশজুড়ে বৃষ্টির প্রবণতা কমে যাওয়ার পর থেকেই বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্য আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ফলে তাপমাত্রা খুব বেশি না হলেও, বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে সারা দেশে তৈরি হয়েছে এক অসহনীয় ভ্যাপসা গরম। তীব্র এই গরমে ওষ্ঠাগত হয়ে পড়েছে জনজীবন, যার সাথে পাল্লা দিয়ে যোগ হয়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। যদিও আবহাওয়া অধিদপ্তর আভাস দিয়েছে, আজ বিকেল বা সন্ধ্যার পর রাজধানীসহ দেশের কিছু অংশে বৃষ্টি নেমে এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি কিছুটা উপশম করতে পারে।
বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় রাঙামাটি ও সিলেটে সর্বোচ্চ ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপে ৫, সীতাকুণ্ডে ২, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও নেত্রকোনায় ১ মিলিমিটার করে বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।
এছাড়া দেশের ৫১টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের আর কোথাও বৃষ্টি হয়নি। আজ সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য বৃষ্টির মধ্যে সিলেটে মাত্র ৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এতে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে এবং দক্ষিণা বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্যে সারাদেশে অসহনীয় ভ্যাপসা গরম পড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। ফলে তীব্র গরমে ছটফট করছে সারাদেশের মানুষ।
তবে আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আজ বিকেলে কিংবা সন্ধ্যার পর থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কমবেশি বৃষ্টি হতে পারে। আগামীকাল শুক্রবার সারাদেশে বৃষ্টি কিছুটা বাড়লেও রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
সংস্থাটি বলছে, দুপুর একটা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে রাজধানীর আকাশ মেঘলা থাকাসহ বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। দিনে তাপমাত্রা কিছুটা বাড়তে পারে। দুপুর ১২টায় রাজধানীতে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস; যা আগের দিন ছিল ৩৪ দশমিক ৭ ডিগ্রি। মঙ্গলবার সারাদেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে যশোরে। এছাড়া আগের কয়েক দিন ১৩ জেলায় তাপপ্রবাহ বয়ে গেলেও মঙ্গলবার মাত্র চার জেলায় মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যায়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভাষায়, তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত থাকলে তাকে মৃদু তাপপ্রবাহ বলা হয়। তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তা মাঝারি তাপপ্রবাহ। তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তীব্র তাপপ্রবাহ ধরা হয়। তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রির বেশি হলে তা অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বলে গণ্য হয়।
এদিক থেকে সারাদেশে তাপমাত্রা খুব বেশি না হলেও তীব্র ভ্যাপসা গরমে মানুষের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। প্রাণীকুলেরও প্রাণ যেন ওষ্ঠাগত।
বিচ্ছিন্নভাবে বৃষ্টির প্রভাবে তাপমাত্রা খুব বেশি না বাড়লেও সারাদেশে তীব্র ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছে। গরমের তুলনায় প্রকৃতপক্ষে তাপমাত্রা কম। বছরের সবচেয়ে উষ্ণতম এপ্রিল-মে মাসে যে ধরনের তাপমাত্রা থাকার কথা তাও নেই; কখনো কখনো তাপপ্রবাহ শুরু হলেও বৃষ্টির কারণে তা আর বেশি সময় ধরে স্থায়ী হচ্ছে না। এমনকি দেশের দ্বিতীয় উষ্ণতম মাসেও রাতের বেলায় কখনো কখনো রাজধানীতেও গায়ে চাদর মুড়িয়ে ঘুমাতে হয়েছে। আবহাওয়ার এমন পরিস্থিতিকে অনেকটাই অস্বাভাবিক মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা।
শুধু তাই নয়, গত ১৪ বছরের চাকরিজীবনে এপ্রিল-মে মাসে অভ্যন্তরীণ এত বৃষ্টি আর ভ্যাপসা গরম আর কখনো দেখেননি বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ এ. কে. এম. নাজমুল হক ও মো. শাহীনুল ইসলাম।
বেশি বৃষ্টির পরও দেশজুড়ে কেন তীব্র ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে আবহাওয়াবিদ এ. কে. এম. নাজমুল হক বলেন, দেশজুড়ে বৃষ্টি তাপমাত্রা খুব বেশি বাড়তে না দিলেও দক্ষিণা বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি থাকায় মানুষের শরীর বেশি ঘামছে। আর সেই ঘাম সহজে শুকাতে দিচ্ছে না আর্দ্রতা। আর এতেই সারাদেশে তীব্র ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছে।
নাজমুল হক আরো বলেন, ২০২৩ সালের এপ্রিল-মে মাসে টানা ৩৫ দিন আর ২০২৪ সালে টানা ২৬ দিন তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। ওই দুই বছরে তাপমাত্রাও বেশি ছিল, কিন্তু এবার বৃষ্টি বেশি হওয়ায় সে ধরনের আবহাওয়া নেই।
আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম বলেন, গত ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালের এপ্রিল-মে মাসে কিছুটা কম তাপমাত্রা ছিল। আর গতবারের তুলনায় এবার আরো কম। বৃষ্টির প্রভাবে তাপমাত্রা খুব বেশি বাড়তে দিচ্ছে না। কিন্তু বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় গরম অনুভূত হচ্ছে তীব্র তাপপ্রবাহের মতো। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতি আগামী জুন-জুলাই জুড়েই থাকতে পারে। তবে আজ বিকেল থেকে আগামীকাল বৃষ্টির পরিমাণ বেড়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও তা বেশি সময় স্থায়ী নাও হতে পারে। সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।
আবহাওয়া দপ্তরের বিগত সময়ের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ২০২৩ ও ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে যে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ (৪২-৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ছিল, সেই তুলনায় ২০২৫ সালেও কম ছিল। তবে এবার এ পর্যন্ত তার চেয়েও কম তাপমাত্রা বিরাজ করছে। গত বছর ১০ মে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল চুয়াডাঙ্গায় ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগের বছর চুয়াডাঙ্গায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪৩ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর এবার গত ২২ এপ্রিল শুধু একদিন রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
অর্থাৎ বৃষ্টির প্রভাবে সারাদেশের তাপমাত্রা খুব বেশি না বাড়লেও স্বস্তি মিলছে না কোথাও। সারাদিনে জ্যৈষ্ঠের খরতাপ আর ভ্যাপসা গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে সহসা পরিত্রাণ পাওয়ারও কোনো লক্ষণ দেখছেন না আবহাওয়াবিদরা।
এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক ও বিশেষজ্ঞ কমিটির চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, মৌসুমের সবচেয়ে উষ্ণতম মাস এপ্রিলে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হলেও চলতি মে মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হতে পারে। এছাড়া আগামী জুন-জুলাই মাসে বৃষ্টি কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ বর্ষাজুড়তেও থাকতে পারে ভ্যাপসা গরমের দাপট।