হোম > মতামত

ইরান যুদ্ধ থেকে জাতীয় নিরাপত্তার শিক্ষা

মে জে. (অব.) রোকন উদ্দিন

ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে চলমান সংঘাত সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সংকট। এটি শুধু একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়; বরং এটি পারমাণবিক রাজনীতি, পরাশক্তির প্রতিযোগিতা, গোয়েন্দা যুদ্ধ এবং কৌশলগত স্থিতিস্থাপকতার জটিল সমন্বয়। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই সংঘাত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে—বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির ক্ষেত্রে। ইরান বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে, ২০০০-এর দশক থেকে তার পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হয়। এর ফলে ইরানের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—তেলের রপ্তানি কমে গেছে, আর্থিক লেনদেন সীমিত হয়েছে, মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে এবং মুদ্রার মান কমেছে। তবু ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে গেছে এবং দাবি করেছে যে এটি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে—বিশেষ করে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য।

২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির (জেসিপিওএ) মাধ্যমে ইরান তার পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি থেকে সরে এসে আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে ইরান আবার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়ায়। ২০২৫ সালের মধ্যে ইরান প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম-সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হয়, যা অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি স্তর হিসেবে বিবেচিত। ইরান বারবার ঘোষণা করেছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না এবং তাদের ধর্মীয় অবস্থান অনুযায়ী এটি মানবতার বিরুদ্ধে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এই দাবিকে সন্দেহের চোখে দেখেছে এবং এটিকে একটি সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছে। এই উত্তেজনা অবশেষে সংঘাতে রূপ নেয়। ২০২৫ সালে ইসরাইল ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায় এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রও এতে যুক্ত হয়। ইরানের ফোর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। এরপর সংঘাত আরো বিস্তৃত হয় এবং উভয় পক্ষের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু হয়।

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালায়, যখন আলোচনার প্রক্রিয়া চলমান ছিল। এই হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং সামরিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করা। তবে ইরান দ্রুত পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায় এবং তার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার মাধ্যমে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। অনেকের ধারণা ছিল, এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে—যেমনটি ইরাক (২০০৩) বা লিবিয়ার (২০১১) ক্ষেত্রে দেখা গেছে। কিন্তু ইরান সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল সংঘাতে পরিণত হয়েছে। ইরান তার অসম যুদ্ধ (asymmetric warfare) কৌশল, বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তিতে দক্ষতা প্রদর্শন করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে।

এই যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গোয়েন্দা যুদ্ধ। ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ভেতরে তাদের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল, যার মাধ্যমে তারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে আধুনিক যুদ্ধ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়—বরং এটি সাইবার, গোয়েন্দা ও মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্রেও বিস্তৃত। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।

প্রথমত, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (strategic autonomy) একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার মূল ভিত্তি। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা একটি দেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। ইরানের অভিজ্ঞতা দেখায়—যখন একটি দেশ আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে, তখন তার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং অর্থনৈতিক চাপ তাকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি, যেখানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে; কিন্তু কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হবে না। ‘বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, নির্ভরতা কারো ওপর নয়’—এই নীতির বাস্তবায়নই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার ভিত্তি।

দ্বিতীয়ত, নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলা আজকের যুগে অপরিহার্য। ইরান দীর্ঘদিন নিষেধাজ্ঞার মধ্য থেকেও নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়ন করেছে, যা তাকে প্রতিরোধ সক্ষমতা দিয়েছে। বাংলাদেশকে তার সীমিত বাজেটের মধ্যেও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হতে হবে। বিশেষ করে, এয়ার ডিফেন্স (এডি) সিস্টেম দেশের আকাশসীমা সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার (ইডব্লিউ) এখন যুদ্ধক্ষেত্রে একটি নির্ধারক উপাদান—শত্রুর যোগাযোগব্যবস্থা বিঘ্নিত করা বা নিজের যোগাযোগ রক্ষা করা উভয়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ড্রোন ও কাউন্টার-ড্রোনপ্রযুক্তি ভবিষ্যতের যুদ্ধের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা একটি শক্তিশালী ডিটারেন্স (deterrence) বা প্রতিরোধ তৈরি করে, যা শত্রুকে আগ্রাসন থেকে বিরত রাখতে পারে। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা এখন জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ—কারণ আধুনিক যুদ্ধ শুধু মাটিতে নয়, তথ্য ও নেটওয়ার্কের মধ্যেও সংঘটিত হয়।

তৃতীয়ত, গোয়েন্দা ও প্রতি গোয়েন্দা সক্ষমতা একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার মেরুদণ্ড। ইরানের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে বাহ্যিক আক্রমণের আগে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা তৈরি করা হয়—গোয়েন্দা অনুপ্রবেশ, তথ্য সংগ্রহ এবং লক্ষ্য নির্ধারণের মাধ্যমে। যদি একটি রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে না পারে, তবে বাহ্যিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও কার্যকর থাকে না। বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা ব্যবস্থা, মানব গোয়েন্দা (এইচইউএমআইএনটি), সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স (এসআইজিআইএনটি) এবং সাইবার ইন্টেলিজেন্সের সমন্বিত উন্নয়ন, পাশাপাশি শক্তিশালী কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স (counter-intelligence) ব্যবস্থা, যাতে কোনো বিদেশি নেটওয়ার্ক সহজে অনুপ্রবেশ করতে না পারে।

চতুর্থত, অসম যুদ্ধকৌশল (asymmetric warfare) ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত কার্যকর একটি পন্থা। বড় শক্তির সঙ্গে সরাসরি সামরিক প্রতিযোগিতা করা বাস্তবসম্মত নয়, কিন্তু প্রযুক্তি, গতিশীলতা এবং উদ্ভাবনের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব। ইরান ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, প্রক্সি নেটওয়ার্ক এবং দ্রুত আঘাত হানার সক্ষমতা ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করেছে। বাংলাদেশও উপকূলীয় প্রতিরক্ষা, দ্রুত মোতায়েনযোগ্য বাহিনী, মোবাইল মিসাইল সিস্টেম এবং নেটওয়ার্কভিত্তিক যুদ্ধকৌশল উন্নয়নের মাধ্যমে একটি কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।

পঞ্চমত, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা টেকসই হয় না। ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা তার অর্থনীতিকে দুর্বল করলেও, অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তারা টিকে আছে। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য, শিল্পায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ অত্যন্ত জরুরি। একটি শক্তিশালী অর্থনীতি প্রতিরক্ষা ব্যয় বহন করতে সক্ষম হয় এবং বাহ্যিক চাপ মোকাবিলায় সহায়তা করে।

ষষ্ঠত, জাতীয় ঐক্য একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। কোনো দেশ যদি অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত থাকে, তবে বাহ্যিক শক্তি সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে পারে। ইরান দীর্ঘ সংঘাতের মধ্যেও একটি নির্দিষ্ট মাত্রার জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে, যা তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়েছে। বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান।

সপ্তমত, আধুনিক যুদ্ধের প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়েছে। এটি আর স্বল্পমেয়াদি বা সীমাবদ্ধ নয়; বরং দীর্ঘস্থায়ী, বহুমাত্রিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর। এতে সামরিক, অর্থনৈতিক, সাইবার, তথ্য এবং কূটনৈতিক—সব ক্ষেত্রই একসঙ্গে কাজ করে। তাই বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কৌশলগত চিন্তা এবং ভবিষ্যৎমুখী প্রস্তুতি অপরিহার্য।

সবশেষে বলা যায়, একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা শুধু রাজনৈতিক ঘোষণার মাধ্যমে নিশ্চিত হয় না; এটি রক্ষা করতে হয় সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে। ইরানের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়—প্রস্তুতি থাকলে একটি দেশ প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—কারণ নিরাপত্তা কোনো স্থির অবস্থা নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা সচেতনতা, পরিকল্পনা এবং সক্ষমতার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হয়। ভূরাজনৈতিক সচেতনতা জরুরি। বাংলাদেশ একটি কৌশলগত অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির প্রভাব রয়েছে। তাই ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা করা জরুরি। ইরান সংঘাত শুধু একটি যুদ্ধ নয়—এটি আধুনিক যুদ্ধ ও রাষ্ট্রিক স্থিতিস্থাপকতার একটি বাস্তব পাঠ। এটি দেখিয়েছে, প্রস্তুতি, প্রযুক্তি ও জাতীয় ঐক্য থাকলে একটি দেশ কঠিন পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। বাংলাদেশের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট—সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে প্রস্তুত থাকতে হবে। শান্তির সময়েই প্রস্তুতি নিতে হবে, কারণ সংকটের সময় প্রস্তুতির বিকল্প নেই। এই শিক্ষা সংঘাতের নয়—প্রস্তুতির।

লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক, গবেষক ও লেখক

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন : সরকারের দায় ও বাস্তবতা

মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ও করণীয়

কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনভিত্তিক শিক্ষা মডেল

১৯৭৩-২০২৬ : তেল অস্ত্র এখনো কার্যকর

সরকার ও বিরোধী দলে যুদ্ধ কেন

পাঠ্যবইয়ে যেভাবে ফিরলেন শহীদ জিয়াউর রহমান

সিভিল সোসাইটি ও আমলাতন্ত্রের দ্বন্দ্ব

ভেনেজুয়েলাকে ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার ইঙ্গিতের অর্থ কী

সংস্কার ইস্যুতে তালগোল ও রাবণ হওয়ার ঝুঁকি

প্লাস্টিকদূষণের কবলে বাংলাদেশ