যুদ্ধ দূরে, ঝুঁকি ঘরে
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা একই সুতোয় বাঁধা। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ, কাতারের এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, সৌদি আরবসহ এ অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনায় ড্রোন হামলা- সব মিলিয়ে স্পষ্ট বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় আরেকদফা চরম ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে।
আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের অর্থনীতির সামনে প্রশ্ন তিনটি।
১। জ্বালানির দাম কি বাড়ানো উচিত?
২। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কীভাবে ব্যবস্থাপনা হবে? এবং
৩। যুদ্ধঝুঁকির সময়ে সুদের হার কমানো কতটা যৌক্তিক?
এক- জ্বালানির দাম বাড়ানো
সমাধান নাকি দ্বৈত মুদ্রাস্ফীতির ?বাংলাদেশে জ্বালানির দাম বাজারনির্ভর নয়; সরকার নির্ধারিত। ফলে সংকট এলে সরকার সাধারণত দুটি পথের একটিতে যায়। ১) ভর্তুকি বাড়ানো, অথবা ২) দাম বাড়ানো।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরাসরি মূল্যবৃদ্ধি একটি ‘double inflation trap’ তৈরি করতে পারে।
অর্থাৎ একই সঙ্গে দুই দিক থেকে মুদ্রাস্ফীতি আঘাত করবে।
করণীয় কী? অবশ্যই বড়ো আকারে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি করে শক তৈরি নয় বরং Targeted Energy Pricing Reform করাই শ্রেয়।
মূল্য সংকেত হচ্ছে, কিন্তু অর্থনীতিকে শক না দিয়ে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কৌশল। এনার্জি কঞ্জাম্পশন কমানো এবং ইফিশিয়েন্ট উতপাদনে ভর্তুকি। অদক্ষ উতপাদনে কম জ্বালানি সরবারহ, অপচয়ে জরিমানা।
দুই- বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষায় কৌশল গুরুত্বপূর্ণ
নিট রিজার্ভ ১৩ বিলিয়ন ডলার থেকে ২৯ বিলিয়নে উন্নীত হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য ছিল।
কিন্তু যুদ্ধে রেমিটেন্স কমবে। পাশাপাশি জ্বালানি আমদানি বাড়লে রিজার্ভ দ্রুত ক্ষয় হওয়া স্বাভাবিক।
এখানে সবচেয়ে বড় ভুল হবে রিজার্ভকে শুধুই ‘বৈদেশিক মুদ্রা রক্ষা’র অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা।
সংকটকালে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার নীতি হবে-
১. Energy Import Prioritization Window
খাদ্য, কৃষি ও দক্ষ বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে টার্গেট করে প্রাথমিক জ্বালানি আমদানিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
২. Short-term luxury import compression
অপ্রয়োজনীয় আমদানি সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ। প্রায়োরিটি নয় এলসি নিয়ন্ত্রণে যেতে হবে।
আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিং নিয়ন্ত্রণ।
এলসি’র গুণগত মান নির্ণয়ে বিভিন্ন ডোমেইনের সাবজেক্ট ম্যাটার এক্সপার্ট পুল তৈরি করে জাতীয় বিষেশজ্ঞ কমিটি লাগবে।
৩. Currency flexibility (managed depreciation)
রেমিটেন্স বেশি কমতে থাকলে টাকার ধীর অবমূল্যায়ন করার প্রস্তুতি রাখা, এতে রপ্তানির ইআরকিউ কোটার রক্ষিত অংশ এবং রেমিট্যান্স দেশে আনাতে কিছু উৎসাহ যোগাবে।
৪. Forward energy payment planning
ক্যাশ পেমেন্ট দেয়া লাগে বলে স্পট মার্কেট জ্বলানি আমদানি কমিয়ে পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পেমেন্ট শিডিউল সুবিধায় জ্বালানি কেনার সোর্স খোঁজা, এখানে দাম বেশি হলেও যেতে হবে।
মনে রাখতে হবে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য হবে ‘ম্যাক্রো ইকনোমিক স্ট্যাবিলিটি’ নিশ্চিত করা, স্থায়ীভাবে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ধরে রাখা নয়।
তিন- যুদ্ধ ঝুঁকির সময়ে সুদের হার কমানো
নতুন সরকারের সুদের হার কমানোর ঘোষণা রাজনৈতিক মহল এবং ব্যবসায়ীদের মাঝে জনপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু অর্থনীতির বাস্তবতা ভিন্ন।
ম্যাক্রো ইকোনমিক তত্ত্বমতে, অনিশ্চয়তার সময়ে বিনিয়োগ সুদের হারের কারণে থামে না, বরং থামে ঝুঁকির কারণে।
উপরন্তু বাংলাদেশের ‘পলিটিক্যালি মটিভেটেড’ ঋণ খেলাপি ব্যবসায়ীরা কম সুদের ঋণ ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য চায় না, বরং কম সুদ চায় ‘ইজি মানি’ পেয়ে লুট ও পাচার করার জন্য।
মূলত যুদ্ধকালীন বৈশ্বিক অস্থিরতায় প্রকৃত ব্যবসায়ীরা সাধারণত-
ক। নতুন বিনিয়োগ স্থগিত করে,
খ। কঞ্জাম্পশন কমিয়ে নগদ সংরক্ষণ বাড়ায়।
গ। আমদানি ঝুঁকি কমায়।
অন্যদিকে ইনফ্ল্যাশন হারের কাছাকাছি সুদে ইজি মানি (ঋণ) পেলে অসৎ ব্যবসায়ীরা এসময় কঞ্জাম্পশন বাড়ায়, সস্তায় এসেট কিনে রাখে, এজন্য দরকারে বিভিন্ন ফর্মে বিদেশে অর্থ পাচার করে।
অতএব সুদের হার কমালেই বিনিয়োগ বাড়বে, এ ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
বরং এতে ঝুঁকি হলো-
এ সময় যুক্তিযুক্ত নীতি পারে-
আমাদের সংকটটি এককভাবে জ্বালানি কিংবা রিজার্ভ কিংবা রেমিট্যান্স কিংবা সুদের হারে হবে তা নয়, বরং এটা নীতিগত সমন্বয়ের (Policy relevance) ।
বাংলাদেশ এখন তিনটি চাপের মুখে পড়বে।
ক। জ্বালানি আমদানি অনিশ্চয়তা
খ। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি
গ। রেমিট্যান্স কমতে শুরু করা, মুদ্রা ও রিজার্ভ চাপ
এই তিনটি আলাদা সমস্যা নয়, অর্থনৈতিক চক্রেরই অংশ। বৈশ্বিক কিংবা আঞ্চলিক সংকটে ঘুরে ফিরে আসবে। ফলে জরুরি নীতিগত অগ্রাধিকার তালিকায় নিম্নোক্ত বিষয়াদিকে একটি টেকসই পলিসি মোডালে ডিল করতে হবে-১। জাতীয় পর্যায়ের জ্বালানি চাহিদা কমানো কর্মসূচি।
২। লক্ষ্যভিত্তিক জ্বালানি মূল্য সংস্কার
৩। রিজার্ভের কৌশলগত ব্যবহার
৪। সতর্ক মুদ্রানীতি (premature easing নয়)।
৫। দ্রুত দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সবুজ জ্বলানিতে যথাসম্ভব রুপান্তর।
শেষ কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড়ো ঝুঁকি শুধুমাত্র কয়েক বছর পরপর তৈরি যুদ্ধ বা মহামারি নয়, আমাদের বড়ো সমস্যা ‘১। অপ্রস্তুত পলিসি ও ২। যুদ্ধ ও আঞ্চলিক সংকটের পলিসি প্রতিক্রিয়া। তাই সংকটের সময়ে জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নয়, দরকার স্থিতিশীল সিদ্ধান্ত।
জ্বালানি নিরাপত্তা, মুদ্রানীতি এবং রাজস্ব নীতি- এই তিনটি যদি সমন্বিতভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝেও অর্থনীতি স্থির রাখা সম্ভব।
যুদ্ধ, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সংকট দেশকে যতটা না দুর্বল করে, তার চেয়ে বেশি করে অটেকসই ভুল নীতি। সরকার একদিকে নতুন, অন্যদিকে অনভিজ্ঞ। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে, রাজনীতির বাইরে এসে সরকারকে প্রকৃত বিশেষজ্ঞদের সাথে বসার এবং ন্যাশনাল ক্রাইসিস টিম গঠনের পরামর্শ দেই।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী। টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক লেখক।