ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চলার মধ্যেই ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আকস্মিক হামলা শুরু করে। ভেনেজুয়েলার মতো ইরানেও হামলা চালিয়ে দ্রুত সাফল্য পাবেন বলে আশা করেছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু তা না পাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসন এখন ইরানি কুর্দি বিদ্রোহীদের স্থল যুদ্ধে ব্যবহার করতে চাইছে।
এ জন্যই ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের কুর্দি অধ্যুষিত প্রদেশগুলোয় নিরাপত্তা বাহিনীর অবকাঠামো বেশি আক্রমণের শিকার হচ্ছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি), বাসিজ স্বেচ্ছাসেবক মিলিশিয়া, গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়, পুলিশ এবং সীমান্তরক্ষীদের স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয়েছে। এ হামলার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা ইরানি কুর্দি সশস্ত্র সংগঠনগুলোকে অস্ত্র দেবে, যাতে তারা দেশটির সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান দুর্বল করার জন্য তাদের ওপর জোরালো হামলা চালাতে পারে।
৪ মার্চ রাতে পশ্চিমা এবং ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানি কুর্দিদের স্থল অভিযান ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। যদিও ইরানের একাধিক রাজনৈতিক দল এবং ইরাকি কুর্দিরা এ ধরনের খবর অস্বীকার করেছে। এ সম্পর্কে এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র লেকচারার ডক্টর অ্যালান হাসানিয়ান দ্য নিউ আরবকে বলেন, ‘অনেক ভুয়া খবর আছেÑযেগুলো ইরানি শাসকগোষ্ঠী ব্যবহার করে কুর্দিবিরোধী অভিযান জোরদার করে থাকে। ইরানের বিরোধীরাও এসব ভুয়া খবরকে কাজে লাগায়।
সংবাদমাধ্যম আক্সিওসের একটি রিপোর্ট প্রকাশের পর ইরানি কুর্দি দলগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন দেওয়ার স্পষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশ পায়। এ থেকে আভাস পাওয়া যায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (কেডিপি) নেতা মাসুদ বারজানি এবং প্যাট্রিয়টিক ইউনিয়ন অব কুর্দিস্তান (পিইউকে) নেতা তালাবানির সঙ্গে কথা বলেছেন।
ওয়াশিংটন পোস্টের সঙ্গে কথা বলা পিইউকে এর একজন কর্মকর্তার মতে, এই ফোনালাপের সময় ট্রাম্প তাদের বলেছেন, ‘এই যুদ্ধে তাদের একটি পক্ষ বেছে নিতে হবেÑহয় আমেরিকা-ইসরাইলের সঙ্গে অথবা ইরানের সঙ্গে।’ এই তথ্য প্রকাশের পরই ইরান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের কাছ থেকে ইরাকি কুর্দি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফোনালাপের ঝড় ওঠে, যারা সম্ভবত কেডিপি এবং পিইউকে-কে চাপ দিয়েছিলেন, যাতে ইরানি কুর্দিরা কুর্দিস্তান অঞ্চল ব্যবহার করে আক্রমণ চালাতে না পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে কুর্দি জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই বসবাস করেন তুরস্ক, ইরাক, ইরান ও সিরিয়ায়। এসব দেশে মোট কুর্দির সংখ্যা প্রায় চার কোটি। দীর্ঘদিন ধরেই তারা নিজেদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অথবা ন্যূনতম স্বায়ত্তশাসনের জন্য সশস্ত্র লড়াই করে আসছে। এই চারটি দেশেই কুর্দিদের সশস্ত্র সংগঠন রয়েছে। কুর্দিরাই হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী বা জনগোষ্ঠী, যাদের নিজেদের শাসিত কোনো রাষ্ট্র নেই। এ অঞ্চলে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কুর্দিদের সবসময়ই নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। আবার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তাদের ছুড়ে ফেলে দিয়েছে।
এর সর্বশেষ উদাহরণ সিরিয়ার কুর্দিরা। যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের স্বার্থে সিরীয় কুর্দিদের দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ব্যবহার করে সম্প্রতি তাদের পরিত্যাগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেদের প্রয়োজনে ইরানের কুর্দিদের দিকে নজর দিয়েছে। দেশটির সঙ্গে চলমান যুদ্ধে কুর্দিদের অস্ত্র দিয়ে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়ে সরকারের পতন ঘটানোই ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।
ইরানি কুর্দিদের প্রধানত পাঁচ-ছয়টি সক্রিয় সশস্ত্র সংগঠন এবং রাজনৈতিক দল রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑকুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি অব ইরান (কেডিপিআই), বামপন্থি ঘরানার কোমালা পার্টি অব ইরানিয়ান কুর্দিস্তান (কোমালা), ফ্রি লাইফ পার্টি অব কুর্দিস্তান (পিজেএকে), কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টি (পিএকে) ও খাবাত অর্গানাইজেশন। এছাড়া কোমালা পার্টির কয়েকটি উপদল সক্রিয় রয়েছে। সম্প্রতি প্রধান পাঁচটি কুর্দি দল মিলে একটি রাজনৈতিক জোট করেছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে কোয়ালিশন অব পলিটিক্যাল ফোর্সেস অব ইরানিয়ান কুর্দিস্তান।
এসব সংগঠন ও দল মূলত ইরাকি কুর্দিস্তান এবং ইরাক-ইরান সীমান্ত অঞ্চলে ঘাঁটি করে তাদের তৎপরতা চালায়। তারা ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করার লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করছে। এ জন্য তারা বিভিন্ন সময় ইরানের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে। ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনের পর দেশটিতে কুর্দি রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বৃদ্ধি ও সরকার পরিবর্তনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবেÑএমনটাই মনে করে ট্রাম্প প্রশাসন।
বিশ্লেষক অ্যালান হাসানিয়ান বলেন, ইরানে চলমান যুদ্ধে দেশটির কুর্দিদের নতুন জোট সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে কতটুকু কার্যকর ভূমিকা পালন করবে, তা প্রমাণ করতে তাদের সময় লাগবে। কারণ, তারা দীর্ঘদিনের সশস্ত্র লড়াইয়ে তেমন কোনো সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। চলমান মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনের মুখে তারা বড় ধরনের সাফল্য পাবেÑএমন সম্ভাবনা খুব কম। কারণ ইরান সরকার তাদের সামরিক বাহিনীসহ সব বাহিনীকে সারা দেশেই একটি সুবিন্যস্ত কাঠামোর আওতায় মোতায়েন করে রেখেছে। কুর্দি বিদ্রোহীরা এখন চাইলেই এসব বাহিনীকে পরাস্ত করে দ্রুত সাফল্য অর্জন করতে পারবে বলে এমন সম্ভাবনা খুবই কম।
পরিত্যক্ত হওয়ার পুরোনো ভয়
নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন এবং অভ্যন্তরীণ ঐক্য সত্ত্বেও বিদেশি শক্তিগুলো একটা সময় তাদের আগের মতোই পরিত্যাগ করবে এই ভয় কুর্দিদের মধ্যে এখনো কাজ করছে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো সিরিয়ার কুর্দিদের যুক্তরাষ্ট্রের পরিত্যাগ করা। যুক্তরাষ্ট্র তাদের দীর্ঘদিন ধরে সমর্থন দিয়ে এলেও গত জানুয়ারিতে সিরিয়ায় কুর্দিদের নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র সংগঠন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসকে (এসডিএফ) সরকারি বাহিনীর হামলা থেকে রক্ষায় হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকৃতি জানায় ট্রাম্প প্রশাসন। ইরানি কুর্দি যোদ্ধাদের সংখ্যা যাই হোক না কেন, তাদের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থন যে অব্যাহত থাকবে, সে ব্যাপারে কুর্দিরাও নিশ্চিত নন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে জানবাজি রেখে লড়াই করার ব্যাপারে তাদের মধ্যে একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সবসময়ই কাজ করবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু অংশ দখল করে যুদ্ধের পর কিছু সময়ের জন্য সেখানে সৈন্য রেখেছিল। এই সুরক্ষার ফলে ১৯৪৬ সালে স্বাধীন কুর্দি প্রজাতন্ত্র মাহাবাদ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়। তবে, সোভিয়েত ইউনিয়ন সেখান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের কয়েক মাস পরই স্বাধীন কুর্দি প্রজাতন্ত্র ভেঙে পড়ে এবং তৎকালীন শাসক রেজা শাহ পাহলভি এই অঞ্চলে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। যুক্তরাষ্ট্রও যে একই কাজ করবে, না তার নিশ্চিয়তা কুর্দিদের কে দেবে?
এছাড়া ইরাকি কুর্দিরা ইরানি কুর্দিদের পক্ষে দাঁড়ালে তাদেরও আক্রান্ত হওয়ার ভয় আছে। এর প্রমাণ ইতোমধ্যেই তারা পেয়েছে। সম্প্রতি ইরান এবং ইরাকি মিলিশিয়াদের ছোড়া ১০০টিরও বেশি রকেট এবং ড্রোনের আঘাতে ইরাকি কুর্দিস্তানের রাজধানী ইরবিল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব হামলার বেশির ভাগই করা হয়েছে শহরের উত্তরদিকের বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সেনাদের অবস্থান লক্ষ্য করে। হামলায় এখন পর্যন্ত কয়েকজন আহত হওয়ার ও বাড়িঘরের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ৪ মার্চ রাতে শহরের খ্রিষ্টান অধ্যুষিত অংশে হামলায় পোপ ফ্রান্সিস আবাসিক কমপ্লেক্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান বেশ কয়েকবার পিডিকেআই, কোমালা এবং পিএকের অন্তর্ভুক্ত কুর্দি অঞ্চলের ঘাঁটিগুলোয় আক্রমণ করেছে। রাজনৈতিকভাবে ইরাকের কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারকে (কেআরজি) অবশ্যই একটি সূক্ষ্ম লাইন অনুসরণ করতে হবে, যাতে কোনো একপক্ষের বিরোধিতা না হয়।
৪ মার্চ কেআরজির উপ-প্রধানমন্ত্রী কুবাদ তালাবানি বলেন, ‘কুর্দিস্তান অঞ্চল যইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের এই যুদ্ধের কোনো অংশ নয় এবং ভবিষ্যতেও অংশ হবে না।’ পরের দিন কেআরজির মুখপাত্র পেশোয়া হাওরামানিও বলেছেন, ‘কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকার এবং এর সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক দলগুলো এই অঞ্চলে যুদ্ধ এবং উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রচারের অংশ নয়।’ কিন্তু তারপরও কেআরজি ওয়াশিংটন, তেহরান এবং আঞ্চলিক অন্যান্য সরকারের দিক থেকে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছে। বিশ্লেষক অ্যালান হাসানিয়ান বলেন, ইরাকি কুর্দিস্তান অঞ্চল ব্যবহার করে যেকোনো মার্কিন অভিযানের জন্য কেআরজিকে ব্যাপক মূল্য দিতে হবে।
দ্য নিউ আরব অবলম্বনে মোতালেব জামালী