হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বাংলার কৃষকদের সেই অবিস্মরণীয় দিন

এলাহী নেওয়াজ খান

১৯৫০ সালের ১৬ মে বাংলাদেশের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় একটি দিন। এই দিনে মুসলিম লীগ সরকার জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করে একটি বিপ্লব ঘটিয়েছিল। যার ফলে ১৫৭ বছর পর পূর্ববাংলা, তথা বর্তমান বাংলাদেশের কৃষকরা জমির মালিকানা স্বত্ব আবার ফেরত পায়। এ ঘটনা বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক সমাজে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেললেও রাজনৈতিকভাবে এর গুরুত্ব তেমনভাবে চর্চিত হয়নি।

বাংলার প্রবহমান সমাজ জীবনের পর্যায়ক্রমিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, একদিকে যেমন রয়েছে ঐশ্বর্যমণ্ডিত ইতিহাস, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে নিষ্ঠুর নিপীড়নমূলক শাসন ও শোষণের এক বেদনাদায়ক চিত্র। মোগল সুবেদার শায়েস্তা খাঁর শাসনামলের কৃষকদের স্বর্ণযুগ, মারাঠা বর্গিদের নির্মম নির্যাতন ও লুণ্ঠন, ব্রিটিশ আমলের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এবং অতঃপর জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত বাংলার ইতিহাসকে চার পর্বে বিভক্ত করে দিয়েছে।

বাংলার ইতিহাসে শায়েস্তা খাঁর অমলকে স্বর্ণযুগ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এ সময় বাংলার কৃষকদের সুখ ও সচ্ছলতার কাব্যময় প্রকাশ হচ্ছে—গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু ও পুকুর ভরা মাছ। কিংবা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সেই গানটির প্রথম লাইনের মতো—‘ধনধান্যে পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’। সোনার বাংলা বলতে যেটা বোঝায় সেটা ছিল সেই শায়েস্তা খাঁর আমলে। তখন ১ টাকায় ৮ মণ ধান পাওয়া যেত। অর্থাৎ শায়েস্তা খাঁর শাসন আমলের বিপুল উন্নয়নের ঘটনা বাংলার ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে আছে। সেই সময়কার অর্থনৈতিক সাফল্যের কথা এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

শায়েস্তা খাঁ শুধু গ্রামীণ অর্থনীতির ব্যাপক উন্নয়ন ঘটাননি, তিনি ঢাকা শহর নির্মাণে ব্যাপক অবদান রাখেন। তার সময় ঢাকায় অসংখ্য রাস্তা, সেতু, সরাইখানা ও মসজিদ নির্মিত হয়। বিখ্যাত সাত মসজিদ ও চকবাজার মসজিদ তার স্থাপত্য কীর্তির অন্যতম একটি নিদর্শন। তার পুরো নাম ছিল মির্জা আবু তালিব। কিন্তু তিনি শায়েস্তা খাঁ নামেই পরিচিত ছিলেন। দুই দফায় তিনি ২২ বছর বাংলার সুবিধার হিসেবে অসাধারণ অবদান রাখেন। সেই সময়কালটা ছিল ১৬৬৪ থেকে ১৬৭৮ এবং ১৬৮০ থেকে ১৬৮৮।

এখানে উল্লেখ করতে হয়, মোগল আমলে বাংলার কৃষকদের জমির ওপর পূর্ণ দখলদারিত্ব ছিল। খাজনার বোঝা থাকলেও তখনকার কৃষিভিত্তিক বাংলার উর্বর জমি ও বিপুল ফসলের খবর বিশ্বময় ছিল। সমসাময়িক লেখক ও বিদেশি পর্যটকরা তাদের লেখনীতে বাংলার প্রাচুর্য ও ঐশ্বর্যের কথা নির্দ্বিধায় লিখে গেছেন। যেমন ইবনে বতুতা লিখেছেন, তিনি মেঘনার উভয় তীরে উদ্যানরাজি, শস্যপূর্ণ মাঠ ও জনবহুলসমৃদ্ধ গ্রামগুলো দেখতে পেয়েছেন। ঠিক এ ধরনের এক পটভূমিতে মারাঠা দস্যুরা—অর্থাৎ বর্গিরা ১৭৪২ সালে বাংলা আক্রমণ করে যে ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল, তা ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে লিপিবদ্ধ আছে। পরিস্থিতিটা এতটাই ভীতিকর ছিল, বাংলার মায়েরা শিশুদের ঘুম পাড়াত এই ছড়া পাঠ করে—ছেলে ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো/ বর্গি এলো দেশে/ বুলবুলিতে ধান খেয়েছে/ খাজনা দিব কিসে। এই লোকো ছড়া এখনো গ্রামবাংলার মায়েদের মুখে ধ্বনিত হয়।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বর্গিরা বাংলার কৃষি, বাণিজ্য, শিল্প—অর্থাৎ অর্থনীতিকে এমনভাবে ধ্বংস করেছিল, যার অবশ্যম্ভাবী ফলশ্রুতি ছিল সারা বাংলায় দুর্ভিক্ষ অবস্থা। ওই অবস্থায় চার লাখের মতো মানুষ হয় মৃত্যুবরণ করেছিল কিংবা গৃহহারা হয়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিল। ১৭৫১ সাল পর্যন্ত বর্গিরা বাংলায় যেভাবে লুণ্ঠন চালিয়েছিল, তা ছিল এক বেদনাদায়ক কালো অধ্যায়। নবাব আলীবর্দী খানের সঙ্গে একটি চুক্তির মাধ্যমে নজিরবিহীন বর্গি লুণ্ঠনের সমাপ্তি ঘটলেও পরবর্তী ইতিহাস আরো বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে।

অর্থাৎ ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের যে সূচনা ঘটে, তা বাংলার কৃষকদের জীবনে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। এই শাসনের মাত্র ১৩ বছরের মাথায় ১৭৭০ সালে (বাংলা ১১৭৬) যে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, তাতে বাংলার তিন ভাগের এক ভাগ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল। এই দুর্ভিক্ষকেই আমরা ছিয়াত্তরের মন্বন্তর হিসেবে জানি। এ রকম দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে ঠিক ২৩ বছরের মাথায় ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করলে বাংলার কৃষকদের ওপর নেমে আসে অবর্ণনীয় দুঃখ ও দুর্দশা। এই পরিস্থিতি বাংলার চিত্রকে পুরোপুরি বদলে দেয়। রাতারাতি একদল ধনিক জমিদার শ্রেণির উত্থান ঘটে, যারা জমির মালিক হয়ে যান। আর জমির মালিক কৃষকরা রাতারাতি ভূমিদাসে পরিণত হন।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করেছিল মূলত খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য। কিন্তু জমিদার ও কৃষকদের মধ্যে এমন এক মধ্যস্বত্বভোগীর উত্থান ঘটে, যাদের সামাজিক পরিচয় ছিল জোতদার, তালুকদার, নায়েব, গোমস্তা ইত্যাদি। এরাই কৃষকদের ওপর শোষণের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল, যা বাংলার কৃষকদের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে। বাংলার কৃষকরা ১৫৮ বছর এই দুঃস্বপ্নের কাল থেকে কার্যত মুক্তি লাভ করে ১৯৫০ সালের ১৬ মে। অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান সৃষ্টির প্রায় তিন বছর পর মুসলিম লীগ সরকার ১৯৫০ সালের ১৬ মে পূর্ববঙ্গীয় রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন পাস করে । এই আইন বলে ১৯৫১ সালে জমিদার ও মধ্যশক্তি ভোগীদের উচ্ছেদ ঘটে ।

মূলত এটা এক যুগান্তকারী ঘটনা ছিল। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অবসান ঘটিয়ে এ আইন কৃষকদের সরাসরি সরকারের অধীনে নিয়ে আসে। বাংলার কৃষকদের মধ্যে এর প্রভাব ছিল বহুমাত্রিক। যেমন : যিনি জমি চাষ করবেন, তিনিই মালিক—এই নীতিতে কৃষকরা তাদের জমির মালিকানা লাভ করেন। যদিও এই আইনে একটি কৃষক পরিবারের জন্য সর্বোচ্চ জমির পরিমাণ নির্ধারণ করা ছিল ১০০ বিঘা। অর্থাৎ এর বেশি কেউ মালিক হতে পারবেন না।

অন্যদিকে জমিদার ও প্রজাদের মধ্যকার মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি বিলুপ্ত হওয়ায় কৃষকরা সরাসরি সরকারের কাছে খাজনা দেওয়ার অধিকার লাভ করেন। এর ফলে জমিদারদের ইচ্ছামতো খাজনা আদায় ও অত্যাচার থেকে কৃষকরা মুক্তি পান। এসব সত্ত্বেও এই নতুন প্রথা মুক্তির বারতা নিয়ে এলেও পরে মহাজন ও সরকারি আমলাদের খপ্পরে পড়ে যান তারা।

এ সম্পর্কে প্রখ্যাত প্রগতিশীল চিন্তাবিদ ও লেখক বদরুদ্দীন উমর ১৯৭৯ সালে তৎকালীন সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছিলেন, ‘জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের মাধ্যমে জমিদার ও খাজনা দানকারী কৃষকদের মধ্যবর্তী সমস্ত মধ্যস্বত্ব বিলুপ্ত হলেও খাজনার সামগ্রিক ভার কিন্তু কৃষকদের ওপর কিছু মাত্র কমল না। নতুন ব্যবস্থায় জমিদারদের পরিবর্তে খাজনার মালিক হলো রাষ্ট্র। জমিদারি প্রথায় স্বত্বভোগী এবং জমিদারের নায়েব, গোমস্তরা কৃষকদের ওপর যে নির্যাতন চালাতেন, সেই নির্যাতনের কোনো লাঘব নতুন ব্যবস্থায় হলো না। কারণ সরকারি আমলা এবং কর্মচারীরা রাষ্ট্রের পক্ষে কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায়কালে পূর্ববর্তীদের মতোই বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা শুরু করলেন। গ্রাম অঞ্চলে শুরু হলো ঘুস ও দুর্নীতির ব্যাপক রাজত্ব। সার্কেল অফিসার এবং তহসিলদাররাই থাকলেন এই নির্যাতনকারীদের পুরো ভাগে।’

পরিশেষে বলতে চাই, সমালোচনা সত্ত্বেও জমিদারি প্রথার উত্থান-পর্ব একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ঘটনা ছিল।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মোক্ষম অস্ত্র

তুরস্ক-সৌদি-মিসর-পাকিস্তান জোটে আলজেরিয়া

হামের প্রাদুর্ভাব ও বিশ্ব স্বাস্থ্যসংকট

হাওরে বোরো ধানের দুর্যোগ মানুষসৃষ্ট

ইসলামি মূল্যবোধভিত্তিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ

ইরানে এক অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের গল্প

যেমন ছাত্ররাজনীতি চাই

ভয়ংকর ভালোবাসা এবং একটি ঘৃণার গল্প

সৌদি-আমিরাত বিরোধের নেপথ্য কথা

হাম দিয়ে জুলাইকে খাটো করা যাবে না