মন্তব্য প্রতিবেদন
জায়নবাদীরা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের সব আগ্রাসনকে ধর্মের লেন্সে ব্যাখ্যা করে থাকে। সেই ১৯৪৮ সাল থেকে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে বৃহত্তর ইসরাইলের অংশে পরিণত করার জন্য নব্য সাম্রাজ্যবাদীদের সৃষ্ট ‘সেটলার-কলোনিয়াল’ স্টেট ফিলিস্তিনের আরবদের ওপর যে অব্যাহত জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালাচ্ছে, তার সমর্থনেও দেশটির ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতারা বিভিন্ন ইহুদি এবং খ্রিষ্টান ধর্মপুস্তকের নানারকম কাহিনির আশ্রয় নেয়।
আমেরিকার প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ও ডিপ স্টেটসহ ওয়াশিংটন এস্টাবলিশমেন্টের মধ্যকার ইসরাইলের অনুসারী ও সমর্থকদের মধ্যে এ ধরনের ধর্মীয় কট্টরপন্থিদের প্রবল উপস্থিতি রয়েছে। ইসরাইলে নিযুক্ত বর্তমান মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হুকাবে এই কট্টরপন্থি ধর্মান্ধদের মধ্যে একজন, যিনি কি না ইরানে হামলার কয়েকদিন আগেই সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য ইসরাইলি দখলে নেওয়ার পক্ষে প্রকাশ্যে ওকালতি করেছেন।
ওয়াশিংটনের বর্তমান প্রশাসনে হুকাবের মতো কট্টর জায়নবাদীরাই সব গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার প্রভাবশালী জামাতা জারেড কুশনার এদেরই অংশ। ইসরাইলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু চলমান যুদ্ধকে ২০০০ বছর আগের তৎকালীন পারস্য সাম্রাজ্যে ইহুদিদের সঙ্গে বিরোধের ঘটনাকে মিলিয়ে একুশ শতকের আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ যুদ্ধের ন্যায্যতা উৎপাদনের উদ্ভট চেষ্টা চালাচ্ছেন।
সুতরাং, নেতানিয়াহু ও তার মার্কিন অনুসারীদের কাছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের সব অভিযানই প্রকৃতপক্ষে ধর্মযুদ্ধ। তিনি মুসলমানদের ‘আমালেক’ নামে অভিহিত করে তাদের বধযোগ্য মনে করেন। অপরদিকে কেবল আপন ক্ষুদ্রস্বার্থে সমগ্র মুসলিম বিশ্ব বিভক্ত হওয়ায় ইসরাইলের হাতে তাদের একে একে ধ্বংস হওয়াই যেন নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুসলিম উম্মাহর আজকের করুণ অবস্থায় পতিত হওয়ার আদি ইতিহাস এবং বিশেষ করে, বিগত একশ বছরের অবক্ষয়ের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
উম্মাহ বিভক্তির পটভূমি
বিশ্ব মানব ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তনকারী বিখ্যাত ভাষণসমূহের মধ্যে ৪৪ খ্রিষ্টপূর্বে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় প্রদত্ত জেনারেল মার্ক অ্যান্টনির বক্তৃতা, হজরত মোহাম্মদ (সা.)-
এর বিদায় হজের ভাষণ, ১৫২১ সালে জার্মান ধর্মপ্রচারক এবং প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টান ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মার্টিন লুথার-১-এর আত্মপক্ষ সমর্থনে দেওয়া জবানবন্দি, হেয়ার আই স্ট্যান্ড (Here I Stand), ১৮৬৩ সালে প্রদত্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের গেটিসবার্গ বক্তৃতা (Gettysburg Address), দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের একাধিক বক্তৃতা যেমনÑ দিস ওয়াজ দেয়ার ফাইনেস্ট আওয়ার (This was their finest hour), ব্লাড, টয়েল, টিয়ার্স, অ্যান্ড সোয়েট (Blood, toil, tears, and sweat) এবং উই শ্যাল ফাইট অন দি বিচেস (We shall fight on the beaches) এবং ১৯৬৩ সালে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মার্কিন ধর্মপ্রচারক এবং মানবাধিকার নেতা, শান্তিতে নোবেলজয়ী মার্টিন লুথার কিং-২-এর আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম (I have a dream) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি বক্তৃতাই অনন্যসাধারণ বাগ্মীতার নজির, উদ্দীপনাময় এবং জ্ঞানের গভীরতায় শ্রদ্ধাপূর্ণ বিস্ময় উৎপাদনকারী। তবে আমি মনে করি, বৃহত্তর মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশে সামগ্রিক ও কালজয়ী প্রভাব সৃষ্টি, মানবহিতৈষী চিন্তাধারা, আধ্যাত্মবাদ এবং বিষয়ের ব্যাপকতা বিবেচনায় নিলে সামগ্রিকভাবে বিদায় হজে আমাদের রাসুল (সা.) মানব ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণটি দিয়ে গেছেন। এর কোনো তুলনা নেই।
দশ হিজরিতে (৬৩২ ইং) দেওয়া সেই ভাষণে ইসলাম ধর্মের পূর্ণতা ঘোষণার পাশাপাশি হজরত মোহাম্মদ (সা.) অর্থনীতি, ইসলামি রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং পরিচালনা পদ্ধতি, এমন রাষ্ট্রের নেতৃত্বের প্রয়োজনীয় গুণাবলি, মুমিন মুসলমানের পরিবার ও দাসদাসীর প্রতি কর্তব্য, বর্ণপ্রথার অবসান, তৌহিদের ব্যাখ্যা, ইসলামের সাম্যের বাণী এবং উম্মাহর ঐক্যের মৌলিক উপাদানের ব্যাখ্যা অনন্তকালের জন্য রেখে গেছেন। আমার আজকের লেখা যেহেতু মুসলিম উম্মাহবিষয়ক, তাই বিদায় হজের ভাষণ থেকে রাসুল (সা.)-এর ওই অংশটি কেবল উদ্ধৃত করব।
মুশকিল হলো, ইসলামে এত ফিরকা যে, এসব উদ্ধৃতি দেওয়াই বিপজ্জনক। আলেমরা সেই উদ্ধৃতি থেকে এমনভাবে ভুল ধরা শুরু করবেন, মনে হবে যেন বিদায় হজের ভাষণের সময় তারা সবাই সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং স্বকর্ণে শুনেছেন। কেবল তা-ই নয়, তারা এটাও দাবি করবেন যে তাদের বর্ণনাই সহি এবং অন্যদেরটা ইসলাম ও হাদিসবিরোধী। শরিয়ত নিয়ে নিজেদের মধ্যেই বিভক্ত এসব আলেমের পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যায় আমাদের মতো সাধারণ মুসলমানদের একেবারে নাজেহাল অবস্থা।
আমার উদ্ধৃতি কলহরত আলেমদের মনঃপূত না হলেই কাফের গালি শুনতে হবে। এসব অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক এড়াতে আমি শুধু রাসুল (সা.) যে তাঁর সাহাবা ও উম্মতদের ইসলামের রজ্জুতে ঐক্যবদ্ধ থাকতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, শুধু সেই মূল কথাটি পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।
দুর্ভাগ্যবশত মহান খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগ থেকেই উম্মাহর অভ্যন্তরে যে অনৈক্য মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল, তার অবসান কখনও হয়নি। আমাদের চার খলিফার মধ্যে তিনজন শহীদ হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে একমাত্র হজরত উমর (রা.) একজন বিধর্মীর অস্ত্রের আঘাতে শাহাদত বরণ করেছিলেন। হজরত ওসমান (রা.) এবং হজরত আলী (রা.)-এর ওপর মুসলমানরাই তরবারি চালিয়েছিলেন।
রাসুল (সা.)-এর অতি স্নেহের দৌহিত্র হজরত হোসেন (রা.)-কে সপরিবারে হত্যায় প্রধান অভিযুক্ত সীমার, নির্দেশদানকারী ইরাকের কুফার তৎকালীন রক্তপিপাসু গভর্নর উবায়দুল্লাহ ইবন জিয়াদ এবং উমাইয়া খলিফা ইয়াজিদ ইবন মুয়াবিয়া ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছিলেন। হজরত হোসেনের সেই পবিত্র রক্তের দাগ আজও যে মিলিয়ে যায়নি, তার প্রমাণ আরব বিশ্বের কিছু মুসলমান রাষ্ট্রের মৌন সমর্থনে পবিত্র রমজান মাসে ইরানে ইসরাইলি-মার্কিনিদের চলমান মুসলিম হত্যাযজ্ঞ।
ইসরাইলের কট্টর জায়নবাদী প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর তিন দশকের ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দুর্বিনীত ‘সেটলার-কলোনিয়াল’ স্টেটের সঙ্গে মিলে প্রাচীন মানবসভ্যতার অন্যতম কেন্দ্র ইরানকে ধ্বংস করতে যে হামলা চালাচ্ছে, তার প্রেক্ষিতে গত সপ্তাহে একটি বিশেষ সম্পাদকীয় লিখেছিলাম। ভূরাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামরিক শক্তি সমন্বয়ে বর্তমান একপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থা যে ইসরাইলি-মার্কিন জায়নবাদীদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে, সেই বাস্তবতা বিবৃত করাই ছিল আমার লেখার মূল উদ্দেশ্য।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিগত এক শতকে ক্রমান্বয়ে বিশ্ব পরিস্থিতি এই বীভৎস জঙ্গলের আইনের অবস্থায় উপনীত হয়েছে। ইরানি মুসলমানদের হত্যা করে ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জায়নবাদী শাসকরা এমন ভাষায় আনন্দ প্রকাশ করছে যে হালাকু খানের মতো নির্মম মোঙ্গল শাসকরাও আজ বেঁচে থাকলে বোধহয় লজ্জা পেত। আমার ধারণা, ১২৫৮ সালে জ্ঞানবিজ্ঞানের মধ্যযুগীয় পাদপীঠ বাগদাদ ধ্বংস করেও আজকের নেতানিয়াহু এবং ট্রাম্পের মতো অসভ্য বাগাড়ম্বর চেঙ্গিসের বংশধর নিষ্ঠুর হালাকু করেননি।
জায়নবাদীদের মধ্যপ্রাচ্য দখল
বিংশ শতকের প্রারম্ভ থেকেই আধুনিক জায়নবাদের উত্থান শুরু হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির সামরিক সাথি তুরস্কের উসমানীয় খেলাফত পরাজিত হলে মুসলমানদের সর্বশেষ ঘাঁটির পতন ঘটে। যুদ্ধের পর আমেরিকা-ইংল্যান্ড-ফরাসি অক্ষশক্তি বিজয়ীর একতরফা আইনে জেরুসালেমসহ উসমানীয় খেলাফতের বিভিন্ন অংশ নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেয়।
এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত হলে ১৯৪৮ সালে আরব মুসলমানদের ফিলিস্তিন থেকে বাস্তুচ্যুত করে ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম ভূমিতে প্রধানত ইউরোপের ইহুদি অধিবাসীদের জন্য ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্মের নানারকম সুবিধাজনক ব্যাখ্যা ব্যবহার করে একটি নিওকলোনিয়াল ও বর্ণবাদী রাষ্ট্র নির্মাণ করা হয়। অপরদিকে পুরো আরব বিশ্বজুড়ে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্র তৈরি করে, যার ফলে ওই অঞ্চলের মুসলমানদের বিভক্তির সুযোগ নিয়ে বৃহৎ শক্তিসমূহ নতুনভাবে জন্ম নেওয়া প্রত্যেকটি তথাকথিত ইসলামি দেশে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করার মাধ্যমে চিরস্থায়ী মালিকানা পেয়ে যায়।
এসব আমিরশাহির শাসকরা নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা এবং আল্লাহ প্রদত্ত বেশুমার ধনদৌলত নিজেরা কুক্ষিগত করার লোভে পশ্চিমা নব্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং ‘সেটলার-কলোনিয়াল’ স্টেট ইসরাইলের বশ্যতা মেনে নেয়। মধ্যপ্রাচ্যের তথাকথিত স্বাধীন দেশসমূহে আমেরিকা, ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সের নিম্নোক্ত ঘাঁটির তালিকার দিকে নজর দিলেই বিলাসব্যসনে মত্ত মধ্যপ্রাচ্যের বাদশাহ, শেখ ও আমিরদের তথাকথিত সার্বভৌম ক্ষমতার ভ্রান্তি পাঠকের কাছে পরিষ্কার হবে পড়বে :
১. মার্কিন ঘাঁটি
মধ্যপ্রাচ্যের সাতটি দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ওই অঞ্চলে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের হেডকোয়ার্টার কাতারের আল-উদিদ বিমান ঘাঁটিতে অন্তত ১০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকে। বাহরাইন হলো মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের প্রধান ঘাঁটি। এখান থেকে তারা পুরো উপসাগরীয় অঞ্চল, আরব সাগর, লোহিত সাগর এবং ভারত মহাসাগরের একাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। সৌদি আরবে মার্কিনিদের প্রধান ঘাঁটি প্রিন্স সুলতান এয়ার বেস থেকে মার্কিন বিমান বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মিশন চালায়।
ইরাকের কুর্দি স্বায়ত্তশাসিত আনবারের আইন-আল-আসাদ এবং আরির এয়ার বেসে রয়েছে মার্কিনিদের দুটি ঘাঁটি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রধানত সুন্নি ইসলাম ধর্মাবলম্বী কুর্দিরা বহুদিন ধরে তুরস্ক, সিরিয়া, ইরাক এবং ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে জায়নবাদীদের ঘুঁটি হিসেবে উম্মাহবিরোধী কাজ করে চলেছে। জেরুসালেম বিজেতা মহৎ শাসক, কুর্দি বংশোদ্ভূত সালাহউদ্দিন আইয়ুবির সঙ্গে বর্তমান কুর্দিদের মেলালে অবাক হতে হয়।
ইরান, ইরাক, তুরস্ক এবং সিরিয়ায় আজকের কুর্দিরা ইসরাইলের দালাল ও ভাড়াটে সৈন্যের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে রয়েছে মার্কিন নিয়ন্ত্রণাধীন আল-দাফরা এয়ার বেস। ইরান তার প্রতিরোধ যুদ্ধে এই মার্কিন ঘাঁটিতেই আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। জর্দানের রাজধানী আম্মানের একশ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত মার্কিন বিমান ঘাঁটি মুয়াফ্ফাক এয়ার বেস। কুয়েত সিটির অদূরে ক্যাম্প আরিফজান হলো মার্কিন সেন্ট্রাল আর্মির অগ্রবর্তী হেডকোয়ার্টার। উপরোক্ত সাতটি দেশের বাইরে তুরস্কের ইঞ্জিরলিক শহরে ন্যাটো ঘাঁটিতেও মার্কিন সৈন্য মোতায়েন রয়েছে।
২. ব্রিটিশ ঘাঁটি
বাহরাইনে ব্রিটিশদের প্রধান নৌঘাঁটি অবস্থিত। এখানে ফ্রিগেট, মাইন সুইপার, সাবমেরিন এবং অন্যান্য সহায়ক জাহাজের সমন্বয়ে শক্তিশালী ব্রিটিশ ফ্লিট সর্বদা মোতায়েন থাকে। এছাড়া জিসিসিভুক্ত আরেক আরব দেশ ওমানের নৌঘাঁটিতেও বিমান বহনকারী ব্রিটিশ ফ্লিট মোতায়েনের ব্যবস্থা আছে। মধ্যপ্রাচ্যের খানিকটা বাইরে সাইপ্রাসে রয়েছে পার্মানেন্ট ব্রিটিশ বেস, যেখানে যুদ্ধে প্রস্তুত সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত রয়েছে। সাইপ্রাসের ব্রিটিশ ঘাঁটি মার্কিন এবং ফরাসি বাহিনীও ব্যবহার করে থাকে।
৩. ফরাসি ঘাঁটি
আরব আমিরাত থেকেই মূলত ফ্রান্স মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক স্বার্থ দেখভাল করে। ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলি-মার্কিন হামলা শুরু হওয়ার পর আল-দাফরা বিমান ঘাঁটিতে ফ্রান্স অতিরিক্ত রাফেল যুদ্ধবিমানের বহর পাঠিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে আফ্রিকার জিবুতি এবং গ্যাবনে ফরাসি ঘাঁটি রয়েছে।
আরব শাসকরা কেন কট্টর জায়নবাদীদের সুরক্ষা দিতে ডেকে এনেছিল, তার পটভূমি জানা দরকার। আমার ব্যাখ্যা নানারকম বিতর্ক তৈরি করবে জানা সত্ত্বেও ইতিহাসের কাছে দায়বদ্ধতার কারণে সত্য গোপনের কোনো উপায় নেই। প্রথমত এসব নব্য শাসক আসলে কেউ রাজা-বাদশাহ ছিলেন না। নব্য সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেদের স্বার্থে আরবভূমি বিভক্ত করে ছোট ছোট রাষ্ট্র বানিয়ে বর্তমান রাজা, শেখ ও আমিরদের ক্ষমতায় বসিয়েছিল।
সুতরাং, অধিকাংশ আরব শাসকশ্রেণির বৈধতা জনগণের পরিবর্তে পশ্চিমারাই উৎপাদন করেছিল। দ্বিতীয়ত আরব শাসকরা কেউ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা চাননি। তাদের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা ছিল নিজেরা যাতে নিরাপদে থেকে মধ্যপ্রাচ্যে আল্লাহ প্রদত্ত অঢেল রাষ্ট্রীয় সম্পদের মালিক হতে পারেন। এই উদ্দেশ্য পূরণে দুই দিক থেকে বাধার আশঙ্কা ছিল। প্রথমটি দেশের জনগণ এবং দ্বিতীয়টি হাজার বছরের শত্রু শিয়া ধর্মাবলম্বী ইরান। সুন্নি শাসকদের কাছে শিয়া ইরান বংশপরম্পরায় জায়নবাদীদের চেয়েও বড় শত্রু বিবেচিত হয়ে এসেছে।
তাছাড়া ইসলাম গ্রহণের পরও আরব এবং পার্সিয়ার ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের সুরাহা হয়নি। লক্ষ করার বিষয় হলো, তুর্কিরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি হলেও তাদের সঙ্গেও সুন্নি আরবের দ্বন্দ্ব মেটেনি। বরং উসমানীয় খেলাফত দীর্ঘদিন আরবভূমি শাসন করার ফলে তুর্কিদের প্রতিও আরবদের ক্ষোভ অব্যাহত থেকেছে। সম্পর্কের এই জটিল ও আশ্চর্যজনক সমীকরণের ফলে আরব শাসকরা ক্রমেই শিয়া মুসলমান ইরান এবং সুন্নি মুসলমান তুর্কি, উভয়কে শত্রু বিবেচনা করে দূরে ঠেলে দিয়ে জায়নবাদী খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের বন্ধু বানিয়েছে।
পরিণামে শতবছরের ব্যবধানে সব অগণতান্ত্রিক আরব রাষ্ট্রে জায়নবাদীরা প্রকৃত মালিকে পরিণত হয়েছে। আজকের আরব আমিরাত এই আত্মবিধ্বংসী সমীকরণের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ইরানের প্রতি কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জায়নবাদীদের প্রবল বিদ্বেষ ও হিংস্রতা, সে সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে আলোকপাত করে আজকের দীর্ঘ লেখা শেষ করব।
ইরানের ভুয়া রাজবংশ
আগেই বলেছি, প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান হলে বিজয়ী আমেরিকা এবং ইউরোপ বিশ্বব্যাপী একচ্ছত্র হেজেমনি প্রতিষ্ঠার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের হীনবল মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে অস্ত্রোপচার চালিয়ে নতুন রাষ্ট্র এবং একদল মেরুদণ্ডহীন বশংবদ শাসকের জন্ম দেয়। এরাই মধ্যপ্রাচ্যের সব বাদশাহ, শেখ এবং আমির সেজে বসে।
অধিকাংশ সুন্নি শাসক মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের আধিপত্য মেনে নিলেও মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন ভূমি, পারস্যের জনগণ পরাজয় মানেনি। পার্শ্ববর্তী মুসলিম দেশগুলোর মতো ইরানেও ১৯২৫ সালে এক ভুয়া রাজবংশের উত্থান ঘটলেও দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে তারা কখনো গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এই তথাকথিত রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা রেজা খান পার্সিয়ান-কসাক ব্রিগেডের একজন সেনাপতি ছিলেন। ১৯২১ সালে রেজা খান তেহরান দখল করেন এবং ১৯২৩ সালে প্রধানমন্ত্রী বনে যান। তারপর ১৯২৫ সালে নিজেকে বাদশাহ ঘোষণা করেন।
একজন সাধারণ সৈন্য থেকে রেজা খান ইতিহাসবিখ্যাত দারিউস দ্য গ্রেট, সাইরাস দ্য গ্রেটদের মতো সব সম্রাটের দেশের এক হাস্যকর, পুতুল রাজা বনে যান। ১৯৪১ সালে ব্রিটিশরা ইরান দখল করে রেজা খানকে সিংহাসন থেকে সরিয়ে দিয়ে তার অধিকতর অনুগত ও বিলাসী পুত্র মুহাম্মদ রেজা পাহলভিকে নতুন ‘শাহ’ ঘোষণা করেন।
১৯৪৪ সালে পিতা রেজা খান মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামিক বিপ্লবে রেজা পাহলভি ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। এর আগে ১৯৫৩ সালেও ইরানের জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ মোসাদ্দেকের কাছে তিনি একবার ক্ষমতা হারিয়েছিলেন। দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেক দেশের সব জ্বালানি সম্পদ জাতীয়করণ করলে চরম অসন্তুষ্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সহায়তায় তাকে ক্ষমতাচ্যুত এবং হত্যা করে। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের একজন একনিষ্ঠ দালাল হিসেবে রেজা পাহলভিকে পুনরায় ক্ষমতায় বসানো হয়, যার পতন হয়েছিল ইসলামিক বিপ্লবের মাধ্যমে।
১৯৮০ সালে কায়রোতে নির্বাসনে থাকা অবস্থায় তিনি ক্যানসার রোগে মারা যান। বর্তমানে তার বড় ছেলে প্রিন্স রেজা পাহলভি আমেরিকায় জায়নবাদীদের সমর্থন নিয়ে ইরানের ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন দেখছেন। ভূরাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং ধর্মীয় কারণ মিলিয়েই ইসরাইলের একনিষ্ঠ সমর্থক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের প্রতি এত বিদ্বেষ। ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে তার প্রশাসন যে বার বার ৪৭ বছরের প্রতিশোধ নেওয়ার কথা বলে যাচ্ছে, সেটা ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির কাছে পরাজয়ের অন্তর্জ্বালার বহিঃপ্রকাশ।
শেষ কথা
ইসরাইল এবং আমেরিকার যৌথ সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে অসম যুদ্ধে ইরান জয়লাভ করবেÑএমন অলীক কল্পনা করার কোনো সুযোগ নেই। তবে যুদ্ধের প্রায় দুই সপ্তাহ অতিক্রান্ত হলেও গর্বিত ও স্বাধীন ইরান কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা করে একা যে এখনো প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, সেটাই বিশ্বকে চমকিত করেছে। তেহরানের শাসকদের সঙ্গে রাজনৈতিক মতভিন্নতা সত্ত্বেও এক প্রাচীন সভ্য জাতিকে সারা বিশ্বের বিবেকসম্পন্ন মানুষ আজ শ্রদ্ধা জানাচ্ছে। এই অন্যায় যুদ্ধের মাধ্যমে ওয়াশিংটন প্রকাশ্যে কবুল করে নিয়েছে যে, সব পরিস্থিতিতে জায়নবাদী ইসরাইলের স্বার্থরক্ষাই তার পররাষ্ট্রনীতির একমাত্র লক্ষ্য। দালাল আরব শাসকদের নিরাপত্তা নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।
ইরানে অন্যায় আক্রমণের ফলে হঠকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল সারা বিশ্বে প্রকৃতপক্ষে একা হয়ে পড়েছে। ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স ও কানাডার মতো তাদের চিরাচরিত মিত্ররাও ভীষণ অস্বস্তি নিয়ে চুপ করে আছে। আরবের সুন্নি শাসকদের চোখ যদি এবারও না খোলে, তাহলে বুঝতে হবে এদের অন্তরে মহান আল্লাহতায়ালা কহর মেরে দিয়েছেন। আর আল্লাহ যাদের ধ্বংস করতে চান, তাদের আর কে রক্ষা করতে পারে? তবে এটুকু বোধহয় বলা যেতে পারে যে যুদ্ধের পরিণতি যা-ই হোক না কেন, যুদ্ধাবসানে মার্কিন-ইসরাইলি একপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থায় পরিবর্তন আসা সময়ের ব্যাপার মাত্র। এমন নির্লজ্জ গুন্ডামির বিশ্বব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।