হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

রামিসার পরিণতি রাষ্ট্রের লজ্জা

জাকিয়া সুলতানা

‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে’—এটি কবি গোলাম মোস্তফার ‘শিশু’ কবিতার একটি বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি। এর মূল ভাবার্থ হলো, আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। শিশুকে নিয়ে রচিত হয়েছে অসংখ্য গান ও কবিতা। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শিশুদের জান্নাতের ফুল বলে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, সেই শিশুরাই আজ সমাজের কিছু মানুষরূপী অমানুষের লালসার শিকার হয়ে অঙ্কুরেই ঝরে পড়ছে।

রামিসার ঘাতকের ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত। প্রধানমন্ত্রী নিজে তদারকি করার জন্য বিচারটি দ্রুত হলো। রায়ে বাংলাদেশের মানুষ সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। যখন রামিসার ছিন্ন মাথাটি বালতিতে রাখা অবস্থায় দেখেছি, তখন মনে হয়েছে—তার মতো খুনির জন্য একবার ফাঁসির শাস্তি যথেষ্ট নয়। যতবার সেই দৃশ্যটি মনে পড়ছে, ততবারই কিছুক্ষণের জন্য হলেও মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছি। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড কি ঠান্ডা মাথায় করা সম্ভব? পূর্বশত্রুতা বা চরম ক্ষোভ থেকে হয়তো কেউ এমন অপরাধ করতে পারে, কিন্তু এই নিষ্পাপ শিশুটির সঙ্গে এমন কি শত্রুতা ছিল, যার জন্য তাকে এমন নির্মম পরিণতির শিকার হতে হলো—এ প্রশ্ন শুধু আমার নয়, সবার। এমন দৃশ্য কোনো মানুষের পক্ষেই সহ্য করা সম্ভব নয়, সে যতই কঠিন হৃদয়ের হোক না কেন।

আমাদের বিচারব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে অনেক সময় খুনি বা ধর্ষক আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়। কিন্তু রামিসার মামলার বিচার দ্রুত সম্পন্ন হয়েছে। একইভাবে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত আরো কয়েকটি শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার বিচারও দ্রুত সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। যেসব আসামি এখনো গ্রেপ্তারের বাইরে রয়েছে বা বিচারাধীন অবস্থায় আছে, তাদেরও দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা দরকার। মোদ্দাকথা, বাংলাদেশে সংঘটিত সব ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

আর যেন কোনো কন্যাশিশু এই সমাজে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকিতে না পড়ে, সে ব্যবস্থা সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। আদিম যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগেও কন্যাশিশুরা পুরোপুরি নিরাপদ নয়। একসময় কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো। কারা দিত? নিজের বাবা, চাচা কিংবা পরিবারেরই কোনো সদস্য। আর আজকের যুগে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ টুকরো টুকরো করা হচ্ছে। অপরাধের ধরন বদলেছে, কিন্তু নিষ্ঠুরতার রূপ বদলায়নি। মানুষরূপী এসব পশু যুগে যুগে এমন ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড চালিয়ে এসেছে, যা সমাজ ও রাষ্ট্রকে কলুষিত করছে।

কোনো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটলে কয়েক দিন হইচই হয়, মানুষ শোকে মুহ্যমান থাকে, তারপর সবকিছু আবার নিশ্চুপ হয়ে যায়। যেন আরেকটি নতুন অঘটনের অপেক্ষা শুরু হয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এটি যেন আমাদের সমাজের এক স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী। আজ অনেক নারী নিজ নিজ যোগ্যতা, দক্ষতা ও মেধার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখছেন। প্রায় প্রতিটি পেশাতেই তারা কৃতিত্বের সঙ্গে কাজ করছেন। নারী যেমন দক্ষ হাতে সংসার সামলাচ্ছেন, সন্তান লালনপালন করছেন, তেমনি কর্মক্ষেত্র ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। পুরুষের পাশাপাশি নারীরা আজ কোথায় পিছিয়ে আছেন?

অথচ তাদের জীবন যখন কোনো বিকৃত মানসিকতার মানুষরূপী পশুর হাতে নিঃশেষ হয়ে যায়, তখন প্রশ্ন জাগে—এরা আসলে কোন মায়ের সন্তান? তাই আমাদের সন্তানদের নৈতিক ও মানবিক শিক্ষায় গড়ে তোলার বিষয়ে সবাইকে আরো মনোযোগী হতে হবে। কারণ পরিবার থেকেই যদি তারা সঠিক শিক্ষা না পায়, তাহলে ভবিষ্যতে তারা কেমন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে, তার নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন। একটি শিশুকে আদব-কায়দা, ভদ্রতা, মূল্যবোধ ও দ্বীনি শিক্ষা সর্বপ্রথম পরিবার থেকেই দিতে হয়। বড়দের সম্মান করা, ছোটদের স্নেহ করা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এসব শিক্ষা একটি শিশু পরিবার থেকেই অর্জন করে।

আমরা চাই, এ সমাজে আর কোনো কন্যাশিশু যেন মানুষরূপী হায়েনাদের শিকারে পরিণত না হয়। কোনো মা-বাবা যেন তাদের কন্যাসন্তানকে ঘরের বাইরে পাঠিয়ে উৎকণ্ঠা ও অশুভ আশঙ্কায় না ভোগেন। আমরা এমন একটি সমাজ কামনা করি, যেখানে দিন শেষে প্রত্যেক সন্তান নিরাপদে ঘরে ফিরবে।

আর শুধু নীতিকথা নয়, আইনের শাসনকে এমনভাবে কঠোর ও কার্যকর করতে হবে, যাতে মানুষরূপী কোনো অপরাধী আইনের ভয়ে হলেও কোনো নারী বা শিশুর প্রতি কুদৃষ্টি দেওয়ার সাহস না পায়। সমাজের সর্বত্র ঘাপটি মেরে থাকা এসব অমানুষকে চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ মাসে প্রায় ১১৮টি শিশু ধর্ষণ এবং ১৭টি শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। এর প্রতিটি ঘটনাই ছিল অত্যন্ত আলোচিত ও নির্মম। একটি শিশু যদি নিজের ঘরে কিংবা এই সমাজে নিরাপদে হেসেখেলে বড় হতে না পারে, তবে এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে? এ দায় সমাজের কেউ এড়াতে পারে না।

আমরা তো কোনো বর্বর সমাজে বাস করি না। তবে কেন সমাজে এত অবক্ষয়, তা খুঁজে বের করার সময় এখনই। একটি কন্যাশিশুকে যদি জন্মের পর থেকেই মানুষরূপী কিছু হায়েনার বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে বড় হতে হয়, তবে এ লজ্জা এই ঘুণে ধরা সমাজেরই। তারাও তো একজন নারীর গর্ভ থেকেই জন্ম নিয়েছে। তাহলে কীভাবে দুই, চার, পাঁচ, ছয় কিংবা আট বছরের ফুটফুটে একটি শিশুর প্রতি এমন জঘন্য অপরাধ করার মানসিকতা তাদের মধ্যে জন্ম নেয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা আজ সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) চার কন্যাসন্তানের জনক ছিলেন। তিনি কন্যাসন্তানকে কখনো বোঝা হিসেবে দেখেননি; বরং আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত ও জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাই নারী জাতিকে অপমান বা অবজ্ঞা নয়, সম্মান ও মর্যাদার চোখে দেখা উচিত। নারীকে যথাযথ সম্মান দেওয়াই একটি সভ্য, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের অন্যতম শর্ত।

লেখক : সিনিয়র সম্পাদনা সহকারী, আমার দেশ

নারীবাদ কি সর্বজনীন

বিদ্যুতের জন্য আর কত মূল্য দিতে হবে

এআই আইনের প্রয়োজনীয়তা

আমাদের মিডিয়ার শ্রেণিবিন্যাস

হৃদয়ে রক্তক্ষরণ : নৈতিক বিপর্যয় ও আত্মজিজ্ঞাসা

হাদি হত্যা ও সাংস্কৃতিক লড়াই

গতানুগতিক বাজেট ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা

ছাদেই লুকিয়ে আছে আগামীর বিদ্যুৎ

নেতানিয়াহু কেন ট্রাম্পের ইরান চুক্তি বানচাল করতে চান

ইতিহাসের কাঠগড়ায় গণহত্যাকারী শক্তি