যেকোনো উপনিবেশিত—অর্থাৎ ঔপনিবেশিকার তিক্ত অভিজ্ঞতা যেসব দেশের রয়েছে, তারাই জানেন এবং বোঝেন এটি শুধু লুণ্ঠনের, নির্যাতনের মতো হীন কুকর্মই তারা করেনি, সঙ্গে সঙ্গে ওইসব দেশের নিজস্ব বা দেশজ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সামাজিক ন্যায়ানুগ আচার-আচরণ, কলুষিত, ক্ষয়প্রাপ্ত ও ধ্বংস করে ‘তাদের অনুপযুক্ত অন্যায়’ ব্যবস্থাবলি চাপিয়ে দিয়েছে জোর করে। ভাষাসহ সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক ব্যবস্থায় যে বিন্যাস এবং দেশজ ঐতিহ্য তাকে ধ্বংস করা হয়েছে, যা এখনো আমরা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি। সবচেয়ে বড় যে সর্বনাশটি করা হয়েছে, তা হচ্ছে—নিজস্ব, দেশজ উন্নত ও টেকসই রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে লন্ডভন্ড করে একটি সংকর শাসন এবং রাজনৈতিক কাঠামো (Hybrid Regime and Structure) তৈরি করা হয়েছে। সঙ্গে অতি অবশ্যই জন্ম দেওয়া হয়েছে দালাল এবং প্রভুভুক্ত একটি শ্রেণি।
ফরাসি রাজনীতিবিজ্ঞানী ফ্রঁৎস ফানোঁ তার বিখ্যাত বই The Wretched of the Earth-এ বলেন, ঔপনিবেশিক শাসন-সহিংসতা, শ্রেণিভেদ, অমানবিকীকরণের মাধ্যমে এবং ভিত্তি করে একটি কাঠামো চাপিয়ে দিয়ে দেশীয় জনগোষ্ঠীর আপন ও নিজস্ব বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত, উন্নত রাজনৈতিক ব্যবস্থার সবকিছু ধ্বংস করে আর ওই ব্যবস্থার মাধ্যমে আদি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তে নতুন যে ব্যবস্থার প্রতিস্থাপন করা হয়, তার মাধ্যমে সত্যিকারের জনগণের রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের পরিবর্তে দমনমূলক রাজনৈতিক কাঠামো এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ওই রাষ্ট্রসহ পুরো ব্যবস্থাটি ইতিবাচক ভূমিকা পালনের পরিবর্তে হস্তক্ষেপ এবং ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। এটি এমন এক মনস্তাত্ত্বিক বৈকল্য সৃষ্টি করে, যা শুধু শাসক বদলের ব্যবস্থা হিসেবেই থেকে যায়।
ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষত পাকিস্তানের ইতিহাস পর্যালোচনার ফল হচ্ছে, ওই ঔপনিবেশিকতারই কুফল। পাকিস্তানে ১৯৪৭ থেকে শুরু করে ১৯৭০ পর্যন্ত কোনো নির্বাচনই হয়নি। কার্যকর কোনো রাজনৈতিক দলও গড়ে ওঠেনি বা উঠতে দেওয়া হয়নি। ভারতে পাঁচ বছর পরপর পার্লামেন্ট নির্বাচন হলেও শুধু শাসকশ্রেণি বদলের ধারা থেকে দেশটি বের হতে পারেনি। দুটো দেশেই সর্বসাধারণের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে উঠতে পারেনি। এ কথা বলা জরুরি যে, ঔপনিবেশিকতার কারণে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ভারতে কখনোই প্রকৃতার্থে রাজনৈতিক দল গড়ে উঠতে পারেনি। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ‘The Political Parties in India’ বইয়ে বলেন, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতীয় কংগ্রেসের সভাপতি জে বি কৃপালনি যেমনটা বলেন, কার্যত এমন কোনো ইতিবাচক কর্মসূচি নেই, যার ভিত্তিতে আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকৃত মূল্যায়ন করতে পারি। ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোরও চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল সরকারব্যবস্থায় নিজেদের দখল কায়েম করা।
ঔপনিবেশিক ভারতের ওই কুৎসিত উত্তরাধিকার আজও আমরা বহন করে চলেছি। তবে সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে ১৯৪৭-পরবর্তী পাকিস্তান আমলের উত্তরাধিকারও আমাদের বহন করতে হচ্ছে। ১৯৪৭ থেকে ৭০ সাল পর্যন্ত দেশটিতে কোনো নির্বাচন তো দূরের কথা, দুই পাকিস্তান মিলে এমন কোনো রাজনৈতিক দলের জন্মও হতে দেওয়া হয়নি। মুসলিম লীগ সর্বপাকিস্তানি দল হলেও তাদের ক্ষমতার ভিত্তি ছিল অভিজাত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করা। আর এর অনিবার্য ফল হচ্ছে—রাজনৈতিক শূন্যতা এবং এর পরিণতিতে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক শাসন। সর্বজনের বা সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক দল, যার ইতিবাচক—অর্থাৎ সাধারণ মানুষের উন্নয়নে কোনো দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর কর্মকৌশল সমৃদ্ধ দল গঠিত হয়নি।
অবিভক্ত পাকিস্তানের যাবতীয় রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের কর্মকাণ্ড পূর্ব পাকিস্তান হলেও, ওই দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক কর্মকৌশল এবং পরিকল্পনা রয়েছে, এমন কোনো রাজনৈতিক দল এ পর্যন্ত বাংলাদেশেও গঠিত হয়নি। সত্যি কথা বলতেই হবে, এমন ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভাবে আজ পর্যন্ত সত্যিকার কোন রাজনৈনিতক দল গঠিত হয়নি। এ ক্ষেত্রে দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল তার Power : A Social Analysis বইয়ে বলেন, ক্ষমতা লাভের সাধনা নিজেই এক চূড়ান্ত লক্ষ্য; শক্তি যেমন পদার্থবিজ্ঞানের মৌল ধারণা, সামাজিক বিজ্ঞানের ঠিক তেমনি ‘ক্ষমতা’। অর্থাৎ সমাজের এবং রাজনৈতিক সংগঠিত ক্ষমতার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই রাজনৈতিক দলগুলোর নিয়ন্ত্রণ দরকার হয় বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতায়।
আর এতে যে দেশের রাজনৈতিক পঙ্গুত্ব এবং জনবিলাসী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং হয়েছে বারবার, সেদিকে কোনো রাজনৈতিক দল মনোযোগী হয়েছে বলে মনে হয় না। মোট কথা হয়নি।
১৯৪৭ সালের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর একটি দফা ছিল—অর্থাৎ ‘ব্রিটিশ হটাও’ ঠিক তেমনি অবিভক্ত পাকিস্তানের পূর্ব পাকিস্তানে ‘স্বায়ত্তশাসন অথবা স্বাধীনতার’ বিষয়টি ছিল মুখ্য।
কিন্তু একটি রাজনৈতিক দলকে প্রকৃতার্থে রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠার জন্য একমাত্র ক্ষমতাশ্রয়ী মানসিকতার চেয়েও উল্লেখযোগ্য পূর্বশর্ত হচ্ছে—১. সুনির্দিষ্ট নীতি, মতাদর্শ-সংবলিত এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থাভিত্তিক সুস্পষ্ট লিখিত দলিল। ২. জনকল্যাণে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিকৌশল-সংবলিত পরিকল্পনা। ৩. জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ স্থাপন এবং তা নির্দিষ্ট সময়ান্তে অব্যাহত রাখা। ৪. ব্যক্তিপ্রাধান্য বা ব্যক্তিবাদিতার বদলে দলের নীতি-আদর্শকে প্রাধান্য দেওয়া। ৫. দলীয় নেতাকর্মীর পরিস্থিতি মূল্যায়নের বদলে সর্বসাধারণের মূল্যায়নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া। ৬. সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা চালু করা, যতে এসব কার্যক্রম চলছে কি না—অর্থাৎ মনিটরিং এবং প্রয়োজনে সংশোধন অব্যাহত রাখা। ৭. সাময়িক বা উদ্ভূত পরিস্থিতি এলে ব্যবস্থা নেওয়া—অর্থাৎ তাৎক্ষণিকতাকে পরিহার করা।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও সত্য একটি রাজনৈতিক দলকে প্রকৃত রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে ওঠার যে দীর্ঘ ইতিহাস, ঐতিহ্য প্রয়োজন হয়, তা বাংলাদেশ কখনোই পায়নি। এর জন্য আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতির নেতিবাচক ইতিহাস এবং রাজনৈতিক ঐতিহ্য দায়ী। ঔপনিবেশিকতা-উত্তর তৎকালীন পাকিস্তানের দীর্ঘ সামরিক শাসনে রাজনৈতিক দলের গড়ে ও বেড়ে ওঠার ইতিহাস আমাদের নেই। রাজনৈতিক দল কীভাবে তার কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, কীভাবে করতে হয়, তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা তো দূরের কথা, উল্টো ওই সময়ে যেকোনো রাজনীতির কর্মকাণ্ড ছিল নিষিদ্ধ।
এ কথা বলতেই হবে, তৎকালীন পাকিস্তান এবং বর্তমান বাংলাদেশের সামরিক এবং অগণতান্ত্রিক শাসনের ইতিহাস যত দীর্ঘ, রাজনৈতিক দলের—অর্থাৎ বেসামরিক শাসনের ইতিহাস ততটাই স্বল্প এবং গোঁজামিলে পূর্ণ। কাজেই আমাদের বেসামরিক রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক দলের ইতিহাসও আসলে স্বল্পমেয়াদি, রাজনৈতিক-সংস্কৃতির বিকাশের ইতিহাসও যথোপযুক্তভাবে গড়ে ওঠেনি। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পরে যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা আমরা নিজেরাই ব্যর্থ করে দিয়েছি একেবারে ‘আত্মঘাতী পন্থায় এবং পদ্ধতিতে’।
বর্তমানে আমাদের দেশের রাজনীতির যে সংকট, তার সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জুড়ে আছে ওই নেতিবাচক উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সংকটের। আর এটাই হচ্ছে সংকটের মূল কারণ। আমরা ওয়েস্ট মিনিস্টার—অর্থাৎ ব্রিটিশ সংসদীয় রাজনীতির মডেলের কথা বলি, তথাকথিতভাবে প্র্যাকটিস করি। সেই মতো আমাদের সংবিধান, রাজনৈতিক ব্যবস্থা কামনা করি। কিন্তু আমাদের এও জানতে হবে যে, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট গঠিত হয় ১২১৫ সালের ম্যাগনা কার্টার ভিত্তিতে ১২২৫ সালে। যাকে ম্যাগনা কার্টা বলা হয়, তা হচ্ছে রাজকীয় ক্ষমতা হ্রাস করে রাজনৈতিক দল এবং পার্লামেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে রাজা দ্বিতীয় চার্লস বিরোধী দল গঠন করে দেন ১৬৬০ সালে। এটা আনুষ্ঠানিকভাবে, অনানুষ্ঠানিক ইতিহাস আরো প্রাচীন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল এবং সংসদ
১৯৭২ সালে বাংলাদেশে প্রথমবার সুযোগ এসেছিল রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নে প্রতিনিধিত্বশীলতা এবং এর ভিত্তিতে সংবিধান রচনা ও জাতীয় সংসদ গঠনের। কিন্তু সে সুযোগের যথেচ্ছ অপব্যবহার করা হয়েছে এমনভাবে, যাতে আঁতুড় ঘরেই সন্তানের মৃত্যু হয়। এর উত্তরাধিকার হিসেবে একটি বিকলাঙ্গ রাজনৈতিক দলীয় বিকাশের সংস্কৃতি সংসদীয় ব্যবস্থাসহ পুরো ব্যবস্থার ওপরে ভয়াবহ বিরূপ এবং বৈরী প্রভাব পড়ে। ১৯৭৩ সালেই সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীতে কোনো কারণ দর্শানো ব্যতিরেকেই যে কাউকে গ্রেপ্তার, আটকসহ জরুরি অবস্থার বিধান এবং ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসন বাকশাল গঠনসহ নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে চারটি বাদে সব সংবাদপত্র বাতিলসহ রক্ষীবাহিনী, লাল বাহিনী গঠনের এমন সব ব্যবস্থা কায়েম করা হয়। বিরোধী পক্ষ নির্মূল এবং বিন্যাসের লক্ষ্যে হত্যা করা হয় কমপক্ষে ৩০ হাজার বামপন্থি, প্রগতিশীল এবং ক্ষমতাসীন দল বিরোধী নেতাকর্মীদের। অথচ যখন হওয়ার কথা ছিল রাজনৈতিক দলের এবং প্রতিনিধিত্বশীল শাসনব্যবস্থার বিকাশ। কিন্তু তা না হয়ে উল্টো বিকশিত হয় স্বৈরশাসনের এবং শাসকদের মধ্যে দাউ দাউ করে জ্বলে ও বিস্তৃত হলো ফ্যাসিবাদের প্রবণতা। এটাই বাংলাদেশে প্রতিপক্ষ ‘নির্মূলতত্ত্ব’ বাস্তবায়নের সূচনা। এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, সেই সময়ে ক্ষমতাসীন পক্ষ যদি ‘গণতান্ত্রিক যাত্রাটির শুভসূচনা’ এবং শুরু করত, তাহলে বর্তমানের সমস্যাসংকুল এবং কঠিন পরিস্থিতি এমন না হয়ে এক সুন্দর, সজল, সজীব, নজির সৃষ্টিকারী বাংলাদেশ এবং গণতন্ত্রের দেশ হতে পারত।
যে সময়কাল হয়ে উঠতে পারত বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপনের, শক্তপোক্ত রাজনৈতিক দলগুলো এবং টেকসই রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণের ও প্রতিষ্ঠার, সে সুযোগ আমরা হারিয়েছি ১৯৭২-৭৫-এর সময়কালে। ব্যক্তিনির্ভর এবং ক্ষমতার সীমাহীন অপব্যবহারকারীদের কারণে সম্মিলিতভাবে যৌথ ব্যর্থতার এক ইতিহাস তৈরি হয়েছে দেশটির প্রথম প্রভাতেই।
কিন্তু এর পরও বাংলাদেশ দমে না গিয়ে বারবার সামরিক এবং অগণতান্ত্রিক শাসনকালকে মোকাবিলা করে এগিয়ে যাওয়ার নিরন্তর চেষ্টা করেছে এবং এর কৃতিত্ব সর্বদলের, সব জনগোষ্ঠীর। ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বরের আধিপত্যবাদবিরোধী সিপাহি জনতার বিপ্লব, ১৯৯০-এর স্বৈরশাসনবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের মতো ঘটনা যেমন ঘটেছে, এর সঙ্গে সঙ্গে ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনেরও প্রতিবাদ, মোকাবিলা এবং প্রতিরোধ করেছে সীমাহীন রক্তস্নাত পথে, হাজারো শহীদ এবং পঙ্গুত্ববরণকারী সাহসীরা এবং লাখো লাখো ছাত্র, শ্রমিক, নারীসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে ২৪-এর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। উদ্দেশ্য ছিল পুরোনো শাসনকাঠামো এবং বন্দোবস্তের ‘তিরোধান’ ও বিদায় এবং নয়া বাংলাদেশ গঠনের নয়া রাজনৈতিক ‘বন্দোবস্তের’ মাধ্যমে জনগণের ন্যায়, সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্কার ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাবলি গ্রহণ করে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তৎকালীন বিএনপিসহ এর সমমনা দলগুলোর বিপ্লবকে ব্যর্থ করার যে কার্যক্রম শুরু হয় এবং ২০২৪-এর বিপ্লবের মাত্র দুদিন বাদেই ৭ আগস্টই অবিলম্বে নির্বাচন অনুষ্ঠান দাবি করে যে জনসভা হয়, সে প্রচেষ্টা এখনো অব্যাহত আছে। যদিও বিএনপি এখন জুলাই বিপ্লবের প্রধান দাবিদার। এ সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো আলোচনা করব না। কারণ জুলাই সনদ এবং সংস্কার প্রশ্নে কোটি কোটি ভোটারের হ্যাঁ অথবা না-এর গণভোটকে যেভাবে গিলে ফেলা এবং অস্বীকার করা হয়েছে, তাতে ‘যা কিছু সম্ভবের দেশ’ সম্পর্কে বলার কিছু নেই। তবে মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে ধন্যবাদ জানাতে চাই এ কারণে যে, জুলাই সনদ এবং সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে কী বা কি না—সে প্রশ্নে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলকে ওই একটি মাত্র ইস্যুতেই দেড় মাস ধরে আটকে ফেলা এবং সংসদ সদস্যরা তো বটেই, আম-জনতাকে পর্যন্ত সংবিধানের ‘ছাত্রছাত্রী’ বানাতে পারার অসীম দক্ষতার জন্য। আরো অনেক কিছু তার কাছ থেকে শেখার আছে নিশ্চয়ই।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে কথামালা
গণতন্ত্রে ‘প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থার’ তাত্ত্বিক ভিত্তির প্রতিষ্ঠাতা এবং দার্শনিক জন স্টুয়ার্ড মিল ১৮৬১ সালে Consideration on Representative Government-এ এই জোরালো যুক্তি দিয়েছেন, গণতন্ত্রে বিরোধী দল শুধু একটি রাজনৈতিক অস্তিত্ব নয়, বরং এটি গণতান্ত্রিক সমাজের সত্য উন্মোচন, সংখ্যাগুরুর স্বৈরশাসন প্রতিহত এবং যুক্তি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতকারী ব্যবস্থা, যা সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকারকে সঠিক পথে পরিচালনার প্রয়োজনীয় অঙ্গ। সঙ্গে সঙ্গে গণতান্ত্রিক সমাজে সহিষ্ণুতা, সীমাহীন সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা ও ইচ্ছাশক্তি থাকতে হবে বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে।
এ কথা সত্য যে, বর্তমান সরকার বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করছে। আর এ কারণে ব্যাংকব্যবস্থাসহ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে হয়েছে। অর্থবছরের রাজস্ব আয় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৭১ হাজার কোটি টাকা কম হয়েছে। আইএমএফ অর্থ সাহায্য না দেওয়ায় বিকল্প পন্থায় ঋণব্যবস্থা করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে আরো কঠিন-কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যেত। জ্বালানি তেলের কৃত্রিম হোক বা বাস্তব হোক সংকট তৈরি হয়েছিল বা করা হয়েছিল। পেট্রোল পাম্পগুলোয় দীর্ঘ লাইন বেশ কয়েক দিন ছিল। কিন্তু বর্তমানে নেই। গ্রামাঞ্চলে কৃষকরা প্রয়োজনের তুলনায় কম জ্বালানি পেয়েছেন এবং এতে সেচব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে বলে নানা অভিযোগ রয়েছে। ক্ষমতাসীন দল এবং বিরোধী দলের মধ্যে সশস্ত্র সংঘাতের ঘটনা ঘটছে ও ঘটেছে। সবচেয়ে বড় কথা—সংস্কার এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে যে তিক্ততা এবং বৈরিতার রাজনীতি শুরু, তা কাম্য নয়। তবে প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারকে এ খবরগুলো দেওয়া সমালোচনার পর্যায়ে পড়বে কেন? এসব তথ্যপ্রাপ্তির পথে বরং যারা বাধা সৃষ্টি করবে, তারাই ক্ষতিকর এবং সরকারবিরোধী অ্যালিমেন্ট। প্রধানমন্ত্রীকে এ কথা বলতে চাই, ব্যাপকহারে নতুন টাকা ছাপালে বাজারে এর ক্ষতিকর প্রভাব এবং চাপ পড়ে। এটা পরিহার করাই বাঞ্ছনীয়। আরো একটি বিষয় প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য ঊর্ধ্বগতি বলে দেখা যাচ্ছে। আশা করি, তার সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং দপ্তর এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
তবে আরেকটি পরামর্শ এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা তুলে ধরতে চাই। যে নিম্নবিত্ত এবং দরিদ্র শ্রেণিকে কার্ড ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে, তারা এই ব্যবস্থা গ্রামীণ অথবা শহুরে জীবনের এমন এক প্রান্তিক সীমায় বসবাস করেন বলে ওই কার্ড ব্যবস্থায় তারা এখনো অভ্যস্ত নন। এ ক্ষেত্রে মধ্যশ্রেণির—অর্থাৎ টাউট, বাটপাড় বা কমিশন বাণিজ্যকারী গোষ্ঠী সক্রিয় হতে পারে। বিকল্প কোনো পন্থা বের করা যায় কি না, সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে। আর যাদের কার্ড দেওয়া হচ্ছে, তারা যথাযথভাবে ওই ব্যবস্থায় উপকৃত হচ্ছেন কি না—তাও জোরদার মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
এ কথাও প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলতে চাই, আপনি অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclusive) রাজনীতি করবেন বলে বিশ্বাস করি। এ ক্ষেত্রে ‘গুপ্ত, সুপ্ত, লুপ্ত’—এসব স্বস্তা ও চটুল রাজনীতি আপনার জন্য বেমানান। বিষয়টি ভেবে দেখবেন।
আরো ভেবে দেখবেন, অতীত ইতিহাসকে পাঠ করে। আর তা হচ্ছে—সরকার এবং বিরোধী দল জাতীয় সংসদসহ দেশের সর্বত্র গণতন্ত্রের স্বার্থে প্রয়োজনীয়। কাজেই বিরোধী দল নির্মূলের রাজনীতিকে আপনি প্রশ্রয় দেবেন না বলে আশাবাদ ব্যক্ত করি। আপনি নিশ্চয়ই ১৯৭২ থেকে ৭৫-এর ইতিহাস জানেন এবং ১/১১-এর মতো গণতন্ত্রবিনাসী ঘটনাবলির আপনি একজন ভুক্তভোগী, বড় সাক্ষী।
বিগত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদের যে ভয়াবহতা, ভয়াল থাবা এবং ভীতিকর শাসনের কারণে দেশে যে হত্যাযজ্ঞ, গুম, নির্যাতনের অযুত-নিযুত ঘটনাবলি ঘটেছে এবং গণতন্ত্রকে চিরতরে নির্বাসনে পাঠানোর যে বন্দোবস্ত করা হয়—আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এর বড় একজন ভিকটিম। আপনিও এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত। জুলাই বিপ্লবের মৌল চেতনা এবং এর হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের যথাযথ কারণ বাস্তবায়নের দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে বিশ্বাস এবং এর আশ্বাস আপনি দিয়েছেন। নির্বাসিত গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনে একে আরো বলীয়ান এবং নিষ্কণ্টকভাবে যত দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়, তত মঙ্গল। কারণ রাজনৈতিক দল এবং গণতন্ত্র নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ঘটনা প্রবাদের মধ্য দিয়েই দেশে দেশে বেড়ে উঠেছে। ‘ফ্যাসিবাদ’কে ‘না’ বলুন, এই হোক আপনারসহ জনগণের সম্মিলিত যৌথ শপথ।
সাংবাদিকতাকে ‘গঠনমূলক’ করার নামে অনেকেই পুরো সাংবাদিকতাকেই বিনষ্ট করতে চায়। সুষ্ঠু এবং সত্যিকারের দালালিমুক্ত সাংবাদিকতা যাতে আবার ফিরে আসে, সে ব্যবস্থার দিকে দৃষ্টি দেওয়ার এখনই সময়।
সবশেষ আপনাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির একটি অসামান্য উক্তির কথা বলতে চাই, Victory has many fathers, but defeat is an orphan (বিজয়ের বহু জনক, কিন্তু পরাজয় হচ্ছে অনাথ)। অর্থাৎ বিজয়ের অনেক দাবিদার থাকে কিন্তু পরাজয়ের অংশীদার কেউই হতে চায় না। পরাজিত একজন অনাথ, পিতৃমাতৃহীন মাত্র।
লেখক : গবেষক