দেশে নৈতিকতা এখন বাজারদরের জিনিস। চাল-ডালের মতো এরও ওঠানামা আছে আর টিভি টকশোর স্টুডিও হচ্ছে সেই দর ঠিক করার নিলামঘর। তাই কোনো জনপ্রতিনিধির মুখে যদি শোনা যায়—চাঁদাবাজি নাকি জাকাত-ফিতরা-লিল্লাহর চেয়েও ‘বেটার’—তাতে আর অবাক হওয়ার কিছু থাকে না। অবাক হওয়ার জায়গাটা অন্যত্র। নৈতিকতাকে এখন এমনভাবে নামানো হচ্ছে, যেন দান-ইবাদত আর অপরাধ একই র্যাকে সাজানো পণ্য—কে কত স্টার পাবে, সেটাই শুধু বাকি।
দেশে নৈতিকতার বাজার যখন আগেই চড়া দামে—তখন নতুন করে এই ‘রেট চার্ট’ দেওয়ার দরকার ছিল না। কিন্তু সম্প্রতি বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও দলীয় নেত্রী—নিলোফার চৌধুরী মনি—একটি টিভি চ্যানেলের টকশোতে এমনই এক ‘মূল্যতালিকা’ ঘোষণা করেছেন, ‘চাঁদাবাজি তো বেটার আপনার জাকাতের চেয়ে, ফিতরার চেয়ে, লিল্লাহর চেয়ে’। সংবাদমাধ্যমে আলোচিত এই উক্তির ভেতর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে খোঁচা দেওয়ার তাড়না থাকতে পারে; কিন্তু সচেতন মহল মনে করে, কথাটির মর্মার্থ ভয়াবহ। এতে প্রচণ্ড ইসলামবিদ্বেষ মনোভাব প্রকাশ পায়। তদুপরি এতে ধর্মীয় অনুশাসনকে বিদ্রুপের আসনে বসিয়ে, অপরাধকে ‘তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য’ দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এটি স্পষ্টত ইসলাম ধর্ম অবমাননার শামিল। রাজনীতির বাগযুদ্ধ যদি এখন দান-ইবাদতকে নামিয়ে আনে চাঁদাবাজির ‘মান-নির্ধারণে’, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই হবে—এই নৈতিকতার জবাবদিহি করবে কে?
বস্তুত, এটা কোনো শব্দচ্যুতি নয়। এটা চিন্তার প্রকাশ। যেখানে ন্যায়-অন্যায় আলাদা করতে আর নীতিবোধ লাগে না, লাগে তুলনামূলক হিসাব। এই যদি হয় রাজনীতিকদের মনোভাব, তাহলে দেশের প্রচলিত ধারার রাজনীতিকরা কীভাবে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে?
জাকাত : ‘দান’ নয়, ন্যায়ভিত্তিক সামাজিক অধিকার
জাকাতকে কেউ ‘দান’ বলে ভুল করলে সেটা অজ্ঞতা—আর জাকাতকে অপরাধের তুলনায় ‘কম ভালো’ বললে সেটি দায়িত্বহীনতা। জাকাত ইসলামের ফরজ বিধান; আবার এই দেশেও সামাজিক জীবনের এক বাস্তব সহায়ব্যবস্থা। দুর্যোগ, বেকারত্ব, চিকিৎসাব্যয় আর মূল্যস্ফীতিতে যে পরিবারগুলো প্রায়ই ‘শেষ টাকাটা’ গুনে দিন কাটায়—তাদের কাছে জাকাত-ফিতরা অনেক সময় বিলাসিতা নয়, বেঁচে থাকার ভরসা। জাকাতের দর্শন সম্পদের পরিশুদ্ধি ও বণ্টনের ন্যায্যতা—অর্থাৎ ধনী সমাজকে মনে করিয়ে দেওয়া যে, ধনীর সম্পদে দরিদ্রেরও অধিকার আছে। সেই জাকাতকে টেনে এনে চাঁদাবাজির সঙ্গে তুলনা করা মানে, সমাজের ন্যায্যতার ধারণাকেই ব্যঙ্গ করা—যেন দারিদ্র্য-দুর্দশা কোনো ‘ডিবেট ক্লাব’-এর বিষয় আর ইবাদত শুধু প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার স্লোগান।
এই বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে জাকাতকে চাঁদাবাজির সঙ্গে তুলনা করা মানে ক্ষুধাকে তর্কে রূপ দেওয়া। যেন বলা হচ্ছে—হাসপাতালে অক্সিজেনের চেয়ে রাস্তায় ছিনতাই ‘বেটার’, কারণ অন্তত ছিনতাইয়ে মামলা হয়! ধিক! এমন মনোভাব পোষণকে।
চাঁদাবাজি : ‘কম ক্ষতি’ নয়, রাষ্ট্রসমাজ ধ্বংসের নিয়মিত মেশিন
চাঁদাবাজি নিয়ে আমাদের দেশে নতুন করে ‘ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং’ দেওয়ার দরকার নেই—ভুক্তভোগীরা প্রতিদিনই জানে, এটা কতটা ‘উন্নত’ ব্যবস্থা।
চাঁদাবাজি নিছক টাকা তোলার নাম নয়; এটা ক্ষমতার অপব্যবহারকে প্রাতিষ্ঠানিক করার কৌশল—যাতে নাগরিক বুঝে যায়, ন্যায়বিচার নয়, ‘মিটমাট’ই নিরাপত্তা। আর এই ‘মেশিন’ যখন চলতে থাকে, তখন রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় ‘আইনের শাসন’ নয়—চলতে থাকে ‘ক্ষমতা যার, চাঁদা তার’। প্রকৃতপক্ষে দেশে চাঁদাবাজি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি সমান্তরাল প্রশাসন। দোকান খুলতে হলে ‘লাইন ক্লিয়ার’, বাস চালাতে হলে ‘ম্যানেজমেন্ট’, ভবন তুলতে হলে ‘সেটেলমেন্ট’—এই ভাষা কোনো অভিধানের নয়, ভয়ভিত্তিক শাসনের কোড। এখানে কর দেওয়া হয় না, দেওয়া হয় মুক্তিপণ। যেখানে চাঁদাবাজি বসে, সেখানে দাম বাড়ে, বিনিয়োগ পালায় আর নাগরিক শেখে—আইনের চেয়ে সমঝোতা নিরাপদ। একে ‘বেটার’ বলা মানে টোলবুথকে আইন অনুমোদিত করা; যেন বলা হচ্ছে, সিগন্যালে দাঁড়িয়ে চাঁদা দিলে ট্রাফিক জ্যাম কমে!
কাজেই একে ‘বেটার’ বললে আসলে বলা হয়—অপরাধকে আমরা শুধু সহ্য করি না, প্রয়োজনে তাকে নৈতিকতার মঞ্চেও বসাতে পারি।
যুক্তির ফাঁক : শাস্তি আছে বললেই কি অপরাধ ‘উত্তম’ হয়ে যায়?
বক্তব্যের পক্ষে যে ‘ব্যাখ্যা’ ভেসে বেড়ায়—অপরাধের শাস্তি আছে বলেই নাকি অপরাধ ‘বেটার’—তা শুনলে মনে হয়, নৈতিকতা বুঝি এখন শুধু দণ্ডবিধির মার্জিনে লেখা এক ফুটনোট। আরো ভয়ানক হলো যুক্তির এই উল্টো হিসাব। শাস্তি আছে বলেই নাকি অপরাধ ‘ম্যানেজেবল’, তাই তুলনায় গ্রহণযোগ্য। এই যুক্তি মানলে বিষ ভালো—কারণ অ্যান্টিডোট আছে। আগুন ভালো—কারণ ফায়ার সার্ভিস আছে। প্রকৃতপক্ষে, আইন শাস্তি দেয়, কারণ অপরাধ ক্ষতিকর। শাস্তি কোনো প্রশংসাপত্র নয়; এটি বিপদের সাইনবোর্ড। আর জাকাত-ফিতরা কোনো শাস্তিযোগ্য কাজ নয় বলেই তার নৈতিক মূল্য কমে যাবে—এমন ধারণা যুক্তির নয়, নৈতিক দেউলিয়াপনার লক্ষণ।
কেননা, আইন কোনো অপরাধকে ‘ভালো’ বানায় না। আইন শাস্তি দিয়ে অপরাধকে দমন করতে চায়। শাস্তি আছে মানে অপরাধটা সমাজের জন্য ক্ষতিকর—এটাই তো স্বীকারোক্তি। আর জাকাত-ফিতরা-লিল্লাহ কোনো ‘শাস্তিযোগ্য অপরাধ’ নয়; এগুলো ইবাদত ও সামাজিক অধিকার-চেতনার অংশ। ফলে ‘অপরাধ’ বনাম ‘ইবাদত’—দুই ভিন্ন পৃথিবীকে একই বাক্যে বসিয়ে ‘বেটার-ওয়র্স’ খেলাটা আসলে যুক্তির নাম করে অর্থহীনতা চালানো। সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো—এমন বাক্য জনপরিসরে একজন সংসদ সদস্যের মুখে উচ্চারিত হলে, সাধারণ মানুষের মনে বার্তা যায়, অপরাধও নাকি গ্রহণযোগ্য, শুধু তার ‘রেটিং’ ঠিকঠাক হলে!
জনপ্রতিনিধির ভাষা : ভুল বলার অধিকার আছে, কিন্তু দায়মুক্তি নেই
রাজনীতিতে ‘ভুল’ কথা বলা যায়—এটা সত্য। কিন্তু জনপ্রতিনিধির বেলায় সমস্যা হলো, ভুলের পরও যদি আত্মতুষ্টি থাকে, তখন সেটাই নীতিতে পরিণত হয়। একজন সংসদ সদস্য শুধু ব্যক্তিগত মতপ্রকাশ করেন না; তিনি রাষ্ট্র ও দলের ভাষার মানদণ্ডও ঠিক করেন। তাই ধর্মীয় অনুশাসনকে অপরাধের তুলনায় ‘কম ভালো’ প্রমাণ করতে গেলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা হয়। একদিকে ধর্মপ্রাণ মানুষের বিশ্বাসকে তাচ্ছিল্য করা, অন্যদিকে চাঁদাবাজির মতো অপরাধকে কথার কারসাজিতে ‘স্বাভাবিক’ বানানো—এটি যেকোনো বিচারে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আর যদি দলীয় পর্যায় থেকে স্পষ্ট সংশোধন, প্রত্যাহার বা দুঃখ প্রকাশ না আসে, তবে বার্তাটি আরো পরিষ্কার হয়—এটি স্রেফ ‘স্লিপ অব টাং’ নয়, এটা আমাদের রাজনীতির ভাষাগত বেহিসাবি—যেখানে বাক্যই আগে, বিবেচনা পরে।
ধর্মকে তর্কের অস্ত্র করলে ক্ষতি রাজনীতিরই
বাংলাদেশে ধর্মীয় অনুশাসন শুধু ব্যক্তিগত আচার নয়। এটি সামাজিক আস্থারও ভাষা। সেই ভাষাকে যখন রাজনীতির টকশো স্টুডিওতে এনে ‘খোঁচা মারার সরঞ্জাম’ বানানো হয়, তখন লাভ কারো হয় না—ক্ষতি হয় রাজনীতিরই। কারণ এতে প্রকৃত প্রশ্নগুলো চাপা পড়ে যায়। চাঁদাবাজি নিয়ে প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল—কে আশ্রয় দেয়, কে রক্ষা করে, দলীয় শুদ্ধি কোথায়, প্রশাসনের জবাবদিহি কোথায়। কিন্তু এসবের বদলে যদি ‘জাকাত বনাম চাঁদাবাজি’ রকমের বাক্য ছোড়া হয়, তবে সেটি নীতির অভাব ঢাকার কৌশল—যেন সমস্যার সমাধান নেই বলেই শব্দের আতশবাজি। ধর্মকে বিতর্কের অস্ত্র বানানোর এই প্রবণতা থামানো না গেলে, শেষ পর্যন্ত রাজনীতি শুধু উচ্চকণ্ঠ থাকবে—কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য থাকবে না।
করণীয় : চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’—আর ভাষায় শৃঙ্খলা
এই বিতর্কের সার কথা খুব সরল—এতটাই সরল যে, একজন সংসদ সদস্যের তা বোঝার কথা আরো আগে। জাকাত কোনো পক্ষের রাজনৈতিক হাতিয়ার নয়। এটি ধর্মীয় বিধান ও সামাজিক ন্যায়ের ধারণা। আর চাঁদাবাজি কোনো ‘কম খারাপ’ বিকল্পও নয়। এটি নাগরিক জীবনের ওপর সংগঠিত সন্ত্রাস। ফলে যখন একজন জনপ্রতিনিধি চাঁদাবাজিকে ‘জাকাতের চেয়ে ভালো’ বলেন, তখন তা নিছক ‘বাগাড়ম্বর’ নয়—এটি অপরাধকে নৈতিকতার মঞ্চে তুলতে চাওয়ার চেষ্টা। তাই করণীয়ও সোজা—প্রথমত, বক্তব্যটি স্পষ্টভাবে প্রত্যাহার করে জনসমক্ষে দুঃখ প্রকাশ—কারণ ভুল শুধু বলা নয়, ভুলকে ধরে রাখাও অপরাধ। দ্বিতীয়ত, দলীয় ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে বাস্তব পদক্ষেপ—শুধু বক্তৃতা নয়, শুদ্ধি দরকার। তৃতীয়ত, রাজনীতির ভাষায় ন্যূনতম শৃঙ্খলা—যাতে ইবাদতকে আর ‘তুলনা-চ্যালেঞ্জ’-এর বস্তু বানানো না হয়। নইলে ‘জাকাত বনাম চাঁদাবাজি’ এই হাস্যকর বিতর্কে শেষ পর্যন্ত হাসবে অপরাধ—আর হারবে সমাজ, হারবে রাজনীতি, হারবে বিশ্বাস।
লেখক : প্রফেসর, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার ও প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি