গ্রিক পুরাণের ইকারাসের কাহিনিতেও উচ্চাকাঙ্ক্ষার এমন সীমালঙ্ঘনের পরিণতি দেখা যায়। ইকারাস ও তার পিতা ডেডালাস মোম এবং পালক দিয়ে তৈরি ডানা ব্যবহার করে বন্দিদশা থেকে পালিয়ে আকাশে উড়েছিল। ডেডালাস তাকে সতর্ক করেছিলেন, যেন সে খুব বেশি ওপরে না ওঠে, কারণ সূর্যের তাপে মোম গলে যাবে। কিন্তু ওড়ার উন্মাদনায় ইকারাস সতর্কতা ভুলে সূর্যের খুব কাছে চলে যায়; মোম গলে তার ডানা ভেঙে পড়ে এবং সে সমুদ্রে পতিত হয়। কাহিনিটির প্রতীকী শিক্ষা স্পষ্ট : বাস্তবতার সীমা অতিক্রম করা উচ্চাকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত শক্তির প্রমাণ নয়, পতনের কারণ হতে পারে। ‘অখণ্ড ভারত’-এর রাজনৈতিক কল্পনাও যদি বর্তমান রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব ও জনগণের সম্মতিকে অতিক্রম করতে চায়, তবে তা ইতিহাসের বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষে পড়বে। অতীতের স্মৃতি যতই গভীর হোক, বর্তমানের মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার ওপর তার কোনো অধিকার নেই।
‘অখণ্ড ভারত’ হয়তো একটি রাজনৈতিক কল্পনা, কোনো হারানো ভূগোলকে পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা, কিংবা নির্বাচিত ইতিহাসের স্মৃতিকে বর্তমানের মানচিত্রে আবার এঁকে দেওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু ইতিহাসের মাটিতে কল্পনার বীজ বপন করলেই তার ডালে ফুল ফোটে না। ইতিহাসের নিজস্ব ঋতু আছে, ভূগোলের নিজস্ব স্মৃতি আছে, আর মানুষের আত্মপরিচয়ের গভীরে এমন কিছু শিকড় প্রোথিত থাকে, যেগুলো কোনো সাম্রাজ্যিক মানচিত্রের রেখা দিয়ে উপড়ে ফেলা যায় না। মানচিত্রে একটি রেখা টেনে দেওয়া সহজ; কিন্তু একটি জাতির সার্বভৌম ইচ্ছার সীমারেখা আঁকা হয় রক্ত, অশ্রু, স্মৃতি, আত্মত্যাগ এবং সম্মতির কালিতে। কাগজের ওপর আঁকা সীমান্ত মুছে ফেলা যায় এক টানে; কিন্তু মানুষের চেতনায় খোদাই হয়ে থাকা স্বাধীনতার রেখা কোনো কলমে মুছে ফেলা যায় না।
যে রাষ্ট্র তার প্রতিবেশীর কাছ থেকে বন্ধুত্বের পরিবর্তে ভীতি, সমতার পরিবর্তে আনুগত্য এবং সহযোগিতার পরিবর্তে নতজানুতা দাবি করে, সে অজান্তেই নিজের চারপাশে একটি অদৃশ্য প্রাচীর তুলে দেয়। বাইরে থেকে তার প্রাসাদ যতই উঁচু হোক, তার জানালায় যতই বিজয়ের পতাকা উড়ুক, ভেতরে যদি আস্থার বাতাস প্রবেশ না করে, তবে একদিন সেই প্রাসাদ নিজেরই প্রতিধ্বনির মধ্যে বন্দি হয়ে পড়ে। ক্ষমতার সবচেয়ে বড় বিপর্যয় কখনো কখনো পরাজয় নয়; বরং এমন এক নিঃসঙ্গতা, যেখানে চারপাশে সবাই উপস্থিত থেকেও কেউ আর হৃদয়ের দরজা খুলতে চায় না।
ভারতের সফট পাওয়ারের (Soft Power) শক্তি অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। বলিউডের রঙিন পর্দা, ভারতীয় সাহিত্য ও দর্শনের সুদীর্ঘ ঐতিহ্য, উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ভারতীয় প্রবাসীদের উপস্থিতি এবং ইংরেজি ভাষায় ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের সক্রিয়তা ভারতকে বিশ্বপরিসরে একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচিতি দিয়েছে। জওহরলাল নেহরুর জোটনিরপেক্ষতার নীতি, উচ্চশিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের প্রাথমিক কল্পনা বহু দশক ধরে ভারতের একটি আকর্ষণীয় মুখ নির্মাণে ভূমিকা রেখেছিল। আমেরিকান রাজনৈতিক বিজ্ঞানী জোসেফ নাইয়ের চিন্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্র শুধু সামরিক শক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রলোভনের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে না; আকর্ষণ, সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধও মানুষের মন জয় করার শক্তিশালী মাধ্যম।
কিন্তু এখানেই লুকিয়ে থাকে সূক্ষ্ম বিপদের রেখা। আকর্ষণ যখন প্রভাবের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, আর প্রভাব যখন নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষায় রূপ নেয়, তখন সংস্কৃতির যে সেতু একদিন দুই তীরকে কাছে এনেছিল, সেটিই ধীরে ধীরে আধিপত্যের সিঁড়িতে পরিণত হতে পারে। ফুল দিয়ে যদি পথ দেখানো হয়, তাকে সৌন্দর্য বলা যায়; কিন্তু সেই ফুলের আড়ালে যদি পথের দিক নির্ধারণের চেষ্টা থাকে, তখন সৌন্দর্য আর নিছক সৌন্দর্য থাকে না।
ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তক আন্তোনিও গ্রামসির হেজিমনি (Hegemony) ধারণা এই জায়গাটিকে বুঝতে বিশেষভাবে সহায়ক। গ্রামসি দেখিয়েছিলেন, আধিপত্য সবসময় বন্দুকের নল দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না। অনেক সময় তা মানুষের চিন্তা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সংবাদমাধ্যম এবং দৈনন্দিন বোধের মধ্যে এমনভাবে প্রবেশ করে যে মানুষ আধিপত্যকে আর আধিপত্য হিসেবে চিনতেই পারে না। শিকল তখন আর লোহার তৈরি থাকে না; শিকল হয়ে ওঠে ধারণা। কারাগারের দেয়াল তখন ইট-পাথরে নয়, মানুষের চিন্তার ভেতরে নির্মিত হয়।
একটি সমাজ যখন ভাবতে শুরু করে, ‘আমাদের নিরাপত্তার জন্য ওদের দরকার’, ‘আমাদের স্থিতিশীলতার জন্য ওদের অনুমোদন প্রয়োজন’, কিংবা ‘ওদের অসন্তুষ্ট করা বিপজ্জনক’, তখন আধিপত্য আর সীমান্তের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকে না; সে মানুষের মনের ভেতরে ঘর বানিয়ে ফেলে। তখন শাসককে প্রতিটি দরজায় প্রহরী বসাতে হয় না, কারণ মানুষের ভয়ই প্রহরীর কাজ করতে শুরু করে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিজয় তাই শুধু ভূখণ্ড দখল নয়; বরং অন্যের কল্পনাশক্তির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভারতীয় উপমহাদেশে শুধু সেনাবাহিনীর শক্তিতে শাসন করেনি। আইন, শিক্ষা, আমলাতন্ত্র, জনশুমারি, মানচিত্র, ইতিহাসচর্চা এবং জ্ঞান উৎপাদনের মধ্য দিয়েও তারা একটি ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলা নির্মাণ করেছিল। মানচিত্র তখন শুধু ভূখণ্ডের ছবি ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল ক্ষমতার একটি ভাষা। ইতিহাস তখন শুধু অতীতের বিবরণ ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি উপায়।
বিখ্যাত ফিলিস্তিনি-আমেরিকান সাহিত্যতাত্ত্বিক অ্যাডওয়ার্ড সাঈদ তার ওরিয়েন্টালিজম (Orientalism) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, জ্ঞান ও ক্ষমতা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়। কে কাকে কীভাবে বর্ণনা করবে, কে সভ্য, কে পশ্চাৎপদ, কে নিরাপদ, কে বিপজ্জনক, কে মধ্যপন্থি এবং কে উগ্র, এই শব্দভান্ডারও ক্ষমতার রাজনীতির অংশ হতে পারে। কোনো জনগোষ্ঠীকে একটি নির্দিষ্ট নামে ডেকে দীর্ঘদিন ধরে তার পরিচয় ব্যাখ্যা করতে থাকলে একসময় সেই ব্যাখ্যাই যেন তার ওপর আরোপিত আয়নায় পরিণত হয়।
আসলে, ক্ষমতা শুধু আদেশ দেয় না; ক্ষমতা শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করে, পরিচয়ের নাম দেয়, ‘স্বাভাবিক’ ও ‘অস্বাভাবিক’-এর সীমা নির্ধারণ করে এবং কোন সত্য দৃশ্যমান হবে আর কোন সত্য অন্ধকারে ঢাকা থাকবে, তার কাঠামো নির্মাণ করে। ফলে কোনো জনগোষ্ঠীর পরিচয়, কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কিংবা কোনো রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে যে ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়, সেই ভাষাও ক্ষমতার একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের প্রশ্নটি তাই ভারতপ্রীতি বনাম ভারতবিদ্বেষের সরল দ্বন্দ্ব নয়; এর কেন্দ্রে রয়েছে স্বাধীনতা (Sovereignty) । প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক একটি প্রয়োজনীয় বাস্তবতা, কিন্তু বন্ধুত্ব কখনো অভিভাবকত্বের সমার্থক হতে পারে না। বড় রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ছোট রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আত্মমর্যাদা এবং স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি (Strategic Autonomy) । ছোট ভূখণ্ড মানেই ছোট আত্মা নয়; সামরিক শক্তিতে দুর্বল হওয়া মানেই রাজনৈতিক ইচ্ছায় দুর্বল হওয়া নয়।
বাংলাদেশের প্রয়োজন তাই নতজানু আনুগত্য কিংবা অন্ধ বৈরিতার কোনো একটি প্রান্ত বেছে নেওয়া নয়; প্রয়োজন বিচক্ষণ কূটনীতি, জাতীয় স্বার্থ এবং সমমর্যাদার সম্পর্ক। বন্ধুত্ব থাকবে, বাণিজ্য থাকবে, সীমান্ত সহযোগিতা থাকবে, নিরাপত্তা সহযোগিতা থাকবে; কিন্তু জাতীয় সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি থাকবে ঢাকার হাতেই। প্রতিবেশীর সঙ্গে হাত মেলানো যায়, কিন্তু নিজের হাতের মুঠোয় থাকা কলমটি অন্যের হাতে তুলে দেওয়া যায় না।
তাছাড়া, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা (Sovereignty) শুধু পতাকা বা সীমান্তে নয়; তা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, স্মৃতি ও মানুষের আত্মপরিচয়ে বাস করে। যে জাতি নিজের ইতিহাসকে অন্যের আয়নায় দেখতে অভ্যস্ত হয়, একসময় সেই আয়নাকেই নিজের মুখ বলে ভুল করতে পারে। তবে আত্মপরিচয় কোনো দুর্গ নয়; গভীর শিকড়ের বৃক্ষের মতোই সে বহির্বিশ্বের বাতাস গ্রহণ করতে পারে।
বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের কল্পিত সম্প্রদায় (Imagined Communities) ধারণা দেখায়, জাতি শুধু ভূখণ্ড নয়; অভিন্ন স্মৃতি ও কল্পনায় নির্মিত একটি কমিউনিটি (Community)। বাংলাদেশের পরিচয়ও ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বৈচিত্র্য, নদী, সাহিত্য ও রাজনৈতিক সংগ্রামের বহুস্তরীয় অভিজ্ঞতায় গড়ে উঠেছে। তাই এই বহুত্বই তার শক্তি, কোনো দুর্বলতা নয়।
আদতে, ‘অখণ্ড ভারত’ ধারণাটিকেও তাই ইতিহাসের আদালতে নতুন করে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। উপমহাদেশের ইতিহাস একদিকে সাংস্কৃতিক সংযোগের, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিচ্ছেদেরও ইতিহাস। ভাষা, খাদ্য, সাহিত্য, ধর্ম, সংগীত এবং পারিবারিক স্মৃতির সীমান্ত আধুনিক রাষ্ট্রের সীমান্তের চেয়ে অনেক পুরোনো। কিন্তু সাংস্কৃতিক সংযুক্তি থেকে রাজনৈতিক পুনরেকত্রীকরণের দাবি স্বয়ংক্রিয়ভাবে জন্ম নেয় না। একই নদীর দুই তীরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ একই জলের স্মৃতি বহন করতে পারে; একই ভাষার শব্দ উচ্চারণ করতে পারে; একই গানের সুরে আবেগ খুঁজে পেতে পারে। কিন্তু তাই বলে দুই তীরকে একটি ঘর বানানো বাধ্যতামূলক নয়। ইতিহাসের আত্মীয়তা আর রাষ্ট্রের একীভবন এক জিনিস নয়। সাংস্কৃতিক নৈকট্য সীমান্তকে নরম করতে পারে, কিন্তু সার্বভৌম রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে অকার্যকর করে না। ইউরোপের ইতিহাসেও বহু জাতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির বন্ধনে যুক্ত থেকেও পৃথক সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিকশিত হয়েছে। তাই ভারতীয় সভ্যতার বিস্তৃত ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারকে সম্মান করা এবং একটি অখণ্ড রাজনৈতিক ভূখণ্ডের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা এক বিষয় নয়। অতীতের একটি অভিন্ন স্মৃতি ভবিষ্যতের একটি অভিন্ন রাষ্ট্রের বাধ্যতামূলক নকশা নয়।
যাই হোক, শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা হলো, কোনো সাম্রাজ্য তার মানচিত্রের আয়তন দিয়ে চিরস্থায়ী হয় না। তার স্থায়িত্ব নির্ভর করে প্রতিবেশীদের আস্থা, নিজের প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি এবং অন্যের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মানের ওপর। নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি ক্ষমতার বাস্তবতা বুঝেছিলেন; কিন্তু আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতি আরো একটি শিক্ষা দিয়েছে : জবরদস্তি দিয়ে আনুগত্য আদায় করা যায়, কিন্তু বৈধতা আদায় করা যায় না।
ভারত যদি সত্যিকারের আঞ্চলিক নেতৃত্ব চায়, তার পথ আধিপত্য নয়, আস্থা ও সমমর্যাদার অংশীদারত্ব। ভয় দিয়ে প্রতিবেশীকে নীরব করা যায়, হৃদয়ে জায়গা করা যায় না। বাংলাদেশের পথও তাই নতজানু আনুগত্য বা অন্ধ বৈরিতা নয়; জাতীয় স্বার্থ, সাংবিধানিকতা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ভিত্তিতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ। দিল্লি, ওয়াশিংটন, বেইজিং বা মস্কো নয়, বাংলাদেশের দিকনির্দেশ নির্ধারিত হবে বাংলাদেশেই।
তাই ‘অখণ্ড ভারত’-এর রাজনৈতিক ফুল ফুটবে কি না, তার উত্তর কোনো স্লোগান, প্রচারণা কিংবা টেলিভিশন স্টুডিও দিতে পারবে না। উত্তর দেবে ইতিহাস, ভূগোল এবং জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছা। ফুলের ছবি হাজারবার আঁকা যায়, তার নামে অসংখ্য কবিতা লেখা যায়, কাগজে তার জন্য নতুন মানচিত্রও তৈরি করা যায়; কিন্তু শিকড় যদি মাটির গভীরে না থাকে, তবে সেই ফুল কাগজের ফুল হয়েই থেকে যায়।
দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ কোনো একক রাজধানীর স্বপ্নে নয়; বরং সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক মর্যাদা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যে ভারত সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী, তাকে বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত ভয় পেতে হবে না। আর যে বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে সার্বভৌম, তাকে নিজের সার্বভৌমত্ব প্রমাণ করার জন্য ভারতের প্রতি ঘৃণা ছড়াতে হবে না।
আধিপত্যের বীজ বারবার বোনা যেতে পারে। নতুন নতুন বয়ান বাজারে আসতে পারে। ভূরাজনীতির মঞ্চ বারবার নতুন সাজে সজ্জিত হতে পারে। কিন্তু জনগণের ইতিহাসের মাটি যদি জেগে থাকে, তবে প্রতিটি সাম্রাজ্যিক কল্পনার সামনে এক অদৃশ্য প্রাচীর দাঁড়িয়ে থাকবে। সেই প্রাচীরের নাম সার্বভৌমত্ব; তার ভিত্তির নাম আত্মমর্যাদা; আর তার প্রাণ হলো জনগণের নিজের ভবিষ্যৎ নিজে নির্ধারণ করার অধিকার।
তাই ‘অখণ্ড ভারত’ যদি রাজনৈতিক আধিপত্যের স্বপ্ন হয়, তবে তার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কোনো বাহ্যিক শক্তি নয়; প্রশ্নটি ইতিহাসের নিজস্ব বিধানের : জনগণের সম্মতি ছাড়া কোনো মানচিত্রই চিরস্থায়ী নয়। কারণ মানচিত্র কালি দিয়ে আঁকা যায়, সাম্রাজ্য শক্তি দিয়ে বিস্তৃত করা যায়, সীমান্ত ক্ষমতা দিয়ে সরানোর চেষ্টা করা যায়; কিন্তু একটি জাতির ভবিষ্যৎ আঁকা যায় শুধু তার নিজের ইচ্ছার ক্যানভাসে।
আর সেই ক্যানভাসে অন্যের রঙ যতই গাঢ় হোক, ইতিহাসের শেষ তুলির আঁচড়টি নিজের হাতেই রাখে একটি জাতি। সার্বভৌমত্বের রঙ তাই সহজে মুছে যায় না। যে জাতি নিজের ভবিষ্যৎ নিজে লিখতে শেখে, তার ভাগ্যের পৃষ্ঠা অন্য কেউ দীর্ঘদিনের জন্য নিজের নামে লিখে রাখতে পারে না।
লেখক: সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক, ফ্রাই ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি
sahidkamrul25@gmail.com