ইমাম আল-গাজ্জালী (র.) তার ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন-এ সিয়ামকে তিন স্তরে ভাগ করে সর্বোচ্চ স্তরকে অন্তরের সব আসক্তি থেকে মুক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। ইবনে তাইমিয়্যা (র.) সিয়ামকে অন্তরনির্ভর ইবাদত হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সিয়াম গোপনে ভঙ্গ করা সম্ভব হলেও মুমিন তা করে না; কারণ এটি আল্লাহর প্রতি গভীর আনুগত্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণের আমল।
তার শিষ্য ইবনুল কাইয়্যিম (র.) বলেন, সিয়াম নফসের প্রবলতা কমিয়ে অন্তরকে নম্র ও সংযত করে তোলে। এই আত্মসংযমই ব্যক্তি ও জাতির নৈতিক পুনর্জাগরণের শক্তি জোগায়। মুসলিম উম্মাহ যখন রমাদানের চেতনাকে অন্তরে ধারণ করেছে, তখন ইতিহাসেও তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে; অরাজকতার অন্ধকার ভেদ করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ন্যায়ভিত্তিক শাসন। রমাদান মাসে মুসলিমরা অর্জন করেছে অসামান্য সব বিজয়Ñযে ইতিহাস আজও মুসলিম পুনর্জাগরণ ও অনুপ্রেরণার উৎস।
দ্বিতীয় হিজরির রমাদানে বদর প্রান্তরে নবী মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর সাহাবাদের সংগ্রাম ছিল সামরিক অসমতার বাস্তব চিত্র; তবে ফল নির্ধারিত হয়েছিল নৈতিক ও মানসিক শক্তির ভিত্তিতে। সংযম ও দৃঢ়তায় গড়া আত্মশক্তি যে বিজয়ের আসল কারণÑবদর সেই সত্যের উজ্জ্বল প্রমাণ। অন্যদিকে রমাদানে সংঘটিত মক্কা বিজয় প্রমাণ করেছেÑপ্রতিশোধ নয়, ক্ষমা ও ন্যায়বোধই প্রকৃত জয়ের পরিচয়। নবীজি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা রমাদানের আবহে নৈতিক শক্তির সর্বোচ্চ প্রকাশ।
সংযম শক্তিকে মানবিক করে, নেতৃত্বকে ভারসাম্য দেয়। আবার আত্মশুদ্ধিহীন ক্ষমতা বিপজ্জনক; কিন্তু নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা কল্যাণকর। অন্যকে শাসনের পূর্বশর্ত হলো আত্মশাসন; আর নেতৃত্বের পূর্বশর্ত নফসের সংযম। বদরের দৃঢ়তা ও মক্কার ক্ষমাশীলতা শুধু অতীতের গৌরব নয়; এগুলো সমকালীন সমাজ বিনির্মাণের নৈতিক দিক নির্দেশ। অথচ দেশের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে ক্ষমতার পরিবর্তনেও অর্থনৈতিক বৈষম্য, দ্রব্যমূল্যের চাপ, নিম্ন-মধ্যবিত্তের কষ্ট, সামাজিক আস্থার সংকট এবং রাজনৈতিক বিভাজন বিদ্যমান, নৈতিক সংহতির ভিত্তি দুর্বল।
এই প্রেক্ষাপটে ভুলে গেলে চলবে না যে, রমাদান শুধু ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেয় না; বরং পরোক্ষভাবে জনকল্যাণে নিয়োজিত ব্যক্তিকে অর্পিত রাষ্ট্রক্ষমতা ন্যায় ও সততার সঙ্গে প্রয়োগের দিকনির্দেশও দেয়। যে ব্যক্তি বৈধ পানাহার থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারে, সে চাইলে অবৈধ সম্পদ আহরণ থেকেও বিরত থাকতে পারে। সংযমের মধ্য দিয়ে তাকওয়ার ভিত্তি গড়ে ওঠে; আর এই তাকওয়াই ব্যক্তিগত নৈতিকতা থেকে শুরু করে শুদ্ধ নেতৃত্ব ও সামাজিক দায়িত্ববোধের ভিত নির্মাণ করে।
পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজনের বড় অংশই শুরু হয় অসংযত বাক্য থেকে। সিয়াম আমাদের জিহ্বাকে সংযত করতে শিক্ষা দেয়। গুজব, অপপ্রচার ও বিদ্বেষমূলক ভাষা থেকে সমাজকে রক্ষা করার প্রত্যয় জোগায়। রমাদান আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñআল্লাহর আদেশ পালন শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি ভারসাম্যপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ জনজীবন বা সমাজ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি। রমাদানের আদর্শে উদ্দীপ্ত ব্যবসায়ী মুনাফালোভী কারসাজি না করলে, প্রশাসক ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে বিরত থাকলে, রাজনীতিবিদ সত্যভাষণ ও জবাবদিহিতে আগ্রহী হলে রমাদান হবে কল্যাণকর সামাজিক শক্তি।
বাংলাদেশে আজ আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থের নয়, আস্থার। মানুষ প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস করতে চায়, নেতৃত্বকে বিশ্বাস করতে চায়, বাজারকে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় দেখতে চায়। এ আস্থা শুধু আইনের কঠোরতা দিয়ে তৈরি হয় না; এটি তৈরি হয় উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে। রমাদান সেই চরিত্র ও আস্থা গঠনের বিদ্যালয়।
রমাদান ব্যক্তিগত সাধনাকে সামাজিক ন্যায়বোধে রূপান্তরিত করে। জনজীবনের নৈতিক মানদণ্ডকে প্রভাবিত করে। নৈতিক পুনর্জাগরণ ব্যক্তির অন্তর থেকে সমাজে ছড়ায়। আল্লাহ বলেন, হে মুমিনরা! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো। (বাকারা ২ : ১৮৩) যখন মানুষ বুঝতে পারে তার সব কাজই আল্লাহর জ্ঞাতসারে হচ্ছে, তখন তার আচরণে স্বচ্ছতা আসে। ব্যক্তি আত্মস্বার্থ নয়, ন্যায় ও সত্যকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শেখে। রমাদানে আত্মসংযমের মাধ্যমে ক্ষুধা, লোভ, ক্রোধ ও অহংকার নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে সমাজে সদাচরণের বিস্তার ঘটে।
ইসলামিক দর্শনে তাজকিয়াতুন নফস কোনো আধ্যাত্মিক বিলাসিতা নয়। এটি ঈমানের গভীরতা ও চরিত্রের ভিত্তি। আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেনÑনিশ্চয়ই সে সফল, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে। (আশ-শামস ৯১:৯) এই সফলতার পর্যায়ে পৌঁছাতে পারলে সিয়াম ক্ষুধার কষ্টে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা অন্যের ক্ষুধা বোঝার সক্ষমতায় রূপ নেয়। তখন তারাবির দীর্ঘ কিয়াম শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; তা চরিত্রের দৃঢ়তায় প্রতিফলিত হয়। নবীজি মানব চরিত্রের এই অন্তর্গত শক্তিকেই প্রকৃত ক্ষমতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সেই ব্যক্তি নয় যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সেই ব্যক্তি, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। (বুখারি, ৬২৪৯)
আত্মশুদ্ধ মানুষ লোভের কাছে আত্মসমর্পণ করে না, ক্রোধে অন্ধ হয় না এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে না। তার অন্তরে একটি নৈতিক প্রহরী সক্রিয় থাকে, যা আইন না থাকলেও তাকে অন্যায় থেকে বিরত রাখে। কিন্তু সিয়াম যদি দৃষ্টি, উপার্জন ও সিদ্ধান্তকে পবিত্র ও ন্যায়নিষ্ঠ না করে, তবে তা শুধু অভ্যাসে পরিণত হয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কাজ পরিত্যাগ করে না, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। (বুখারি, ১৯০৩) তাই সিয়াম যদি ভাষা, লেনদেন ও আচরণে সততা না আনে, তবে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনও আসে না। কোরআন স্মরণ করিয়ে দেয়, আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। (আর-রা’দ ১৩:১১)
ইতিহাসের পাতায় আমরা দেখি, মঙ্গোল অত্যাচারের প্রেক্ষাপটে ৬৫৮ হিজরির রমাদানে প্রস্তুত হয় এক ক্ষুদ্র কিন্তু দৃঢ়চেতা সৈন্যদলÑযারা সংখ্যায় কম হলেও ঈমান ও সংকল্পে অটল। সে সময় উম্মাহ বিভাজিত, শাসকরা ক্ষমতাকেন্দ্রিক আর খিলাফত ছিল কার্যত অকার্যকরÑচারদিকে ছিল দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার লড়াই। এই ভাঙনের সুযোগে চেঙ্গিস খান ও হালাকু খানের বাহিনী মুসলিম বিশ্বে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালায়Ñগণহত্যা, নগর ধ্বংস ও গ্রন্থাগার পুড়িয়ে সভ্যতার বিশাল ভান্ডার ধ্বংস করে। সংঘটিত হয় আইন জালুতের যুদ্ধ। সাইফুদ্দিন কুতুজের নেতৃত্বে এই ঈমানদীপ্ত বাহিনী মঙ্গোলদের অপ্রতিরোধ্য শক্তিকে প্রতিহত করে।
৭১১ খ্রিষ্টাব্দের রমাদানে উত্তর আফ্রিকা থেকে মুসলিমদের অভিযাত্রা আন্দালুস বিজয়ের ভিত্তি স্থাপন করে। এর নেতৃত্বে ছিলেন ধর্মান্তরিত মুসলিম তারেক বিন জিয়াদ, যিনি চরিত্র, ইলম ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে নেতৃত্বে উন্নীত হন। তার শিক্ষক মুসা বিন নুসাইর তাকে কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক নৈতিকতা ও তাজকিয়াতুন নফসের শিক্ষা দেন। এই বিজয় প্রমাণ করে—ইসলামে বংশ নয়, তাকওয়া ও যোগ্যতাই মর্যাদার মাপকাঠি।
বদরের আত্মবিশ্বাস, মক্কার ক্ষমাশীলতা, আইন জালুতের বিজয় কিংবা আন্দালুসের নেতৃত্ব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়Ñইসলামের নৈতিক বিধান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মুসলিমদের স্থায়ী অগ্রগতি সম্ভব নয়। তাই আজ আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবেÑআমরা কি শুধু ইফতার পর্যন্ত সংযমী থাকব, নাকি সারা বছর নৈতিক সংযমের চর্চা করব। রমাদান যদি ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত নৈতিক জবাবদিহির সংস্কৃতি জাগ্রত করতে পারে, তবে তা ধর্মীয় সাধনার পাশাপাশি জাতীয় পুনর্গঠনের এক শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠবে। আমরা যদি রমাদানের তাকওয়া, সংযম ও সত্যনিষ্ঠার শিক্ষাকে সারাবছর জীবনের অংশ করে নিতে পারি, তবে সেই শিক্ষা সমাজে দায়িত্ববোধ, ইনসাফ ও জবাবদিহির পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে ইনশাআল্লাহ।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক
mazhar.philosophy@gmail.com