হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কি বিকল্প নেই

এম আব্দুল্লাহ

এম আব্দুল্লাহ

মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেল। সর্বশেষ এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির ফলে সীমিত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর চাপ আরেক দফা বেড়েছে । ৬ মে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এপ্রিল মাসের মূল্যস্ফীতির চিত্র প্রকাশ করেছে।

গত ১৯ এপ্রিল সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। ফলে বেড়ে গেছে জীবনযাত্রার খরচ। পরিবহন খরচ থেকে শুরু করে পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়ে। ফলে ভোক্তাদের আগের চেয়ে বেশি দামে পণ্য কিনতে হয়। বিবিএসের হিসাব অনুসারে, গত এপ্রিল মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয় ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ। গ্রাম-শহর নির্বিশেষে সার্বিক মূল্যস্ফীতি এখন ৯ শতাংশের বেশি। পতিত আওয়ামী লীগ সরকার মূল্যস্ফীতি ডবল ডিজিটে রেখে গিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেটি সিঙ্গেল ডিজিটে নামলে কিছুটা স্বস্তি মেলে। এখন আবার ডবল ডিজিটের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির রেশে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির এ খবরের মধ্যেই এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু হয়েছে। দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নীতিগত অনুমোদনও দিয়েছে সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ। পাইকারি পর্যায়ে ১৭ থেকে সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। প্রস্তাব আমলে নিয়ে কারিগরি কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। পাইকারির সঙ্গে সমন্বয় করে আনুপাতিক হারে খুচরাপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোরও প্রস্তাব করেছে বিতরণ কোম্পানিগুলো। ঈদের আগে চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে এ নিয়ে গণশুনানি হবে বলে পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা গেছে। জুনে বর্ধিত মূল্য কার্যকর করার কথা ভাবা হচ্ছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির প্রভাবে অসহনীয় মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভোক্তাপর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য আরেক দফা বাড়ানোর তোড়জোড় সুবিবেচনাপ্রসূত নয়। বিইআরসি ভোক্তা অধিকার অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা। শুনানির মাধ্যমে যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত দেওয়ার দায়িত্ব বিইআরসির। কিন্তু এ সংস্থাটিও বিদ্যুৎ খাতের লাগামহীন লোপাট ঠেকাতে কিংবা ভোক্তাদের অধিকার রক্ষায় চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। সরকারই এই কমিশনের কর্তাদের নিয়োগ দেয়, সে কারণে সরকারের বিরাগভাজন হতে চান না তারা। গণশুনানিতে ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা যেসব যুক্তিতর্ক নিয়ে হাজির হন, তা আমলে নেওয়া হয় কমই। মূল্যবৃদ্ধির বিরোধিতা করে বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি ও ভুলনীতি থেকে বেরিয়ে আসার ওপর বরাবরই জোর দিয়ে আসছিলেন ভোক্তা স্বার্থ দেখভালের দায়িত্বে থাকা সংগঠনগুলো।

দাম বাড়িয়ে সরকার কী অর্জন করবে, তা-ও এসেছে খবরে। পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে পিডিবি। বছরে ৯ হাজার ৭০০ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ পাইকারি দরে সরবরাহ করে পিডিবি। দেড় টাকা বাড়লে বছরে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা আয় করতে পারবে তারা। আর ১ টাকা বাড়লে বছরে বাড়তি আয় হবে ১০ হাজার কোটি টাকার মতো।

পতিত লুটেরা সরকারের সময়ে করা রাষ্ট্র ও ভোক্তা স্বার্থপরিপন্থী চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্ধারিত দামে বিদ্যুৎ কিনে নেয় পিডিবি। এরপর তারা সরকার নির্ধারিত পাইকারি দামে ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করে। ঘাটতি মেটাতে পিডিবি সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি পায়। তবে বিতরণ সংস্থাগুলো কোনো ভর্তুকির প্রয়োজন পড়ে না। বরং তারা খুচরা দামে ভোক্তার কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে মুনাফা করছে। ডেসকো গত বছর পরিচালন মুনাফা করেছে ১১৪ কোটি টাকা। কেনাবেচায় গ্রস মুনাফা ছিল ৪৬৮ কোটি টাকা। ডিপিডিসি বিগত বছরে মুনাফা করেছে ২৩০ কোটি টাকা। মুনাফা সূত্রে এসব কোম্পানির কর্মীরা বাড়তি সুবিধাও নেন।

সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয় নির্বাহী আদেশে। পাইকারি পর্যায়ে ৫ শতাংশ ও গ্রাহকপর্যায়ে গড়ে ৮ শতাংশ বাড়ে দাম। প্রতি ইউনিট খুচরা বিদ্যুতের দাম গড়ে এখন ৮ টাকা ৯৫ পয়সা। আর পাইকারি বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ৪ পয়সা।

সরকারের মাথাব্যথা মোটা অঙ্কের ভর্তুকি নিয়ে। কিন্তু ১০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি কমাতে গিয়ে জনগণকে নানা স্তরে গুনতে হবে বহুগুণ বেশি অর্থ। গত অর্থবছরে সরকার পিডিবিকে ভর্তুকি বাবদ ৩৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা দিয়েছিল। আবার পিডিবি সরকারকে গত বছর ট্যাক্স হিসেবে ৩ হাজার কোটি এবং বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন ফান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দিয়েছে। ঋণের সুদ পরিশোধ করেছে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এসবই বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের খরচে যুক্ত হয়েছে। পিডিবির ১ লাখ ১৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা পরিচালন ব্যয়ের খাতগুলো পর্যালোচনা করা হলে সেখানে বিপুল অর্থ সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন। সেদিকে নজর না দিয়ে গ্রাহকদের ওপর বোঝা চাপানোর সহজ পথই বেছে নেয় সব সরকার।

পিডিবির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে তাদের উৎপাদিত বিদ্যুতে ইউনিটপ্রতি খরচ ৯ টাকা ২৬ পয়সা। আইপিপি (ইনডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রোডিউসার) থেকে কেনা বিদ্যুতের দাম পড়েছে প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৫৬ পয়সা। ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কেনা হয়েছে ৬ টাকা ৫২ পয়সা দরে। ভারত থেকে আমদানি করেছে ১১ টাকা ৭২ পয়সা করে। ভর্তুকিতে সরকার যে অর্থ দেয়, এর সুদ বাবদ প্রতি ইউনিটে যোগ হয়েছে ১৪ পয়সা করে। বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন তহবিলে দিতে হয়েছে ইউনিটপ্রতি ১৫ পয়সা। এতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড়মূল্য গত অর্থবছরে ১২ টাকা ১০ পয়সা দেখিয়েছে পিডিবি। গড় পাইকারি বিক্রয় মূল্য গত অর্থবছরে ছিল ৬ টাকা ৮০ পয়সা। আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ইউনিটপ্রতি ব্যয় ছিল ১১ টাকা ৩৫ পয়সা। আর গড় পাইকারি বিক্রয় মূল্য ছিল ৬ টাকা ৫৮ পয়সা।

পিডিবির ব্যালান্সশিটেও আছে গড়বড়। এক জায়গায় বার্ষিক পরিচালন ব্যয় ১ লাখ ১৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা দেখানো হলেও, অন্য হিসাবে দেখানো হয়েছে, গত অর্থবছরে ১ লাখ ২১ হাজার ৪২০ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে বিদ্যুৎ বিক্রিতে পেয়েছে ৬৯ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা। আবার লাভ-লোকসানের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পিডিবি বিদ্যুৎ কেনাবেচা করে ১৭ হাজার কোটি টাকা লোকসান করেছে। তার আগের অর্থবছরে এ লোকসানের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। হিসাবনিকাশের গোলকধাঁধায় ফেলে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে সরকারের সম্মতি আদায় করে।

পাইকারি বিদ্যুতের বর্তমান দাম ৬ টাকা ৮০ পয়সা, নাকি ৭ টাকা ৪ পয়সাÑএ নিয়েও আছে বিভ্রান্তি। বিতরণ কোম্পানি গড়ে ৮ টাকা ৯৫ পয়সা দরে খুচরায় বিক্রি করে। পাইকারি ও খুচরার মধ্যে ব্যবধান এত বেশি হওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিদ্যুৎ বিক্রি রাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর লাভজনক ব্যবসা হতে পারে না। বিনাভোটে ক্ষমতায় থাকতে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা এসব কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তুষ্ট করতে বাড়তি সুযোগ করে দিয়েছে। মুনাফা করে বাড়তি সুযোগ-সবিধা নেন এসব কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

বিদ্যুৎ উৎপাদন, ক্রয় ও বিক্রয়ের হিসাবেও আছে প্রশ্ন তোলার সুযোগ। গত অর্থবছরে দেশি-বিদেশি উৎপাদনকেন্দ্র থেকে পিডিবি বিদ্যুৎ নিয়েছে ১০ হাজার ১১৮ কোটি ইউনিট। বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করেছে ৯ হাজার ৭৩০ কোটি ইউনিট। কেনাবেচার মাঝখানে ৩৮৮ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ গায়েব হয়ে গেছে। যার ক্রয়মূল্য সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। এই বিদ্যুৎ সিস্টেম লস হিসেবে দেখানো হয়। আসলে এর বহুলাংশ বিলিংয়ের বাইরে থেকে যায়।

২০০৯-১০ অর্থবছরে পিডিবির প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি খরচ হতো মাত্র ৯৬ পয়সা। এর সঙ্গে অন্যান্য খরচ যোগ হতো ২ টাকা ৬৮ পয়সা। সব মিলিয়ে গ্রাহক প্রান্তে বিদ্যুতের খরচ দাঁড়াত ৩ টাকা ৬৪ পয়সা। আওয়ামী লীগ আমলের লাগামহীন দুর্নীতি ও লুটপাটে সেই ব্যয় এখন চার গুণ হয়েছে। গত অর্থবছরে তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি খরচ দেখানো হয়েছে ৫ টাকা ২৬ পয়সা। এর সঙ্গে ট্রান্সমিশন ব্যয় যোগ করে পাইকারি গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে ইউনিটপ্রতি পিডিবি খরচ দেখিয়েছে ১২টাকা ৩৪ পয়সা। এসব ব্যয়ের হিসাব স্বাভাবিক নয়। অদক্ষতা, দুর্নীতি ও বিদ্যুৎ কেনাবেচায় ঘাপলার খেসারত দিতে হচ্ছে অসহায় গ্রাহকদের।

মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৪৪ শতাংশই এখনো তুলনামূলক সাশ্রয়ী জ্বালানি গ্যাসে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশ হয় কয়লায়। সবচেয়ে ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলে ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হয়। ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন বন্ধ। আমদানি করা হয় ১৬ দশমিক ২১ শতাংশ। অবশিষ্ট যৎসামান্য বিদ্যুৎ আসে সোলার (১ দশমিক ২৭ শতাংশ), কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ (শূন্য ৯৫ শতাংশ) এবং উইন্ড (দশমিক ১০ শতাংশ) থেকে।

ভর্তুকি কমানোর অনেক পথ থাকলেও সেদিকে নজর কম। দাম বাড়ানোতে যতটা উৎসাহ, ততটাই উপেক্ষিত পরিচালন ব্যয় কমানোর পথ-পন্থাগুলো অবলম্বনে। সরকারি খাতে আটটি বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। সেগুলো উৎপাদনে এলে সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা। এগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করে বেসরকারি খাতের ক্যাপাসিটি চার্জ ও উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ থেকে যত দ্রুত সম্ভব পরিত্রাণ নেওয়া দরকার। রূপপুরের পারমাণবিক কেন্দ্রের সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ চলতি বছর থেকে শুরু হয়ে ২০২৭ সালের মধ্যে ২৪০০ মেগাওয়াট এলে পিডিবির ভর্তুকির চাপ অনেকখানি কমতে পারে। তবে ওই প্রকল্পে শেখ হাসিনা পরিবারের লুটতরাজের খেসারত হিসেবে ঋণ রাশিয়াকে কিস্তি পরিশোধের চাপ বাংলাদেশকে বহু বছর ধরে বহন করতে হবে।

দেশের উন্নয়ন, তথা জিডিপি প্রবৃদ্ধির একটি বিশেষ উপাদান হিসেবে বিদ্যুৎ খাতকে বিবেচনা করা হয়। বিগত সরকারে সময় উৎপাদন সক্ষমতা যেমন অনেকটা বেড়েছে, একই সঙ্গে দেশকে প্রথমবারের মতো বিদ্যুৎ আমদানিকারক দেশে পরিণত করা হয়েছে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে যেসব যুক্তি দেখানো হচ্ছে, এর অন্যতম হচ্ছে-ভর্তুকি কমানো। প্রত্যেকবারই মূল্যবৃদ্ধির যুক্তিতে আইএমএফের চাপের প্রসঙ্গ আসে। আইএমএফের ঋণের কিস্তি পাওয়ার শর্ত হিসেবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমানোর কথা বলা হয়েছে। সরকার বলছে-এ শর্ত পূরণের চাপ রয়েছে তাদের ওপর। কিন্তু ভর্তুকির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি। আর বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকৃত ব্যয় বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিদ্যুৎ না পেয়েও কাড়ি কাড়ি অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে পিডিবিকে, যার প্রভাব পড়ছে উৎপাদন মূল্যে।

বিদ্যুতের উৎপাদনে জ্বালানি খাতে ব্যয় ইউনিটপ্রতি সাড়ে ৫ টাকা। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছেপ্রতি ইউনিটে ক্যাপাসিটি চার্জ ৬ টাকার অধিক। অর্থাৎ উৎপাদন করতে গিয়ে জ্বালানি বাবদ যা ব্যয় হয়, এর চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে বিদ্যুৎ না পেয়ে বেসরকারি ও বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ খাতে।

শেখ হাসিনার সরকার শুধু বিদ্যুৎ খাতকে আমদানিনির্ভর করেনি, গ্যাস খাতকেও প্রথমবারের মতো আমদানিনির্ভর করে গেছে। গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন না বাড়িয়ে লুটপাটের সুবিধার্থে এলএনজি আমদানি করা শুরু করে। প্রতিবেশী দেশে যখন প্রতি ইউনিট এলএনজি ৫ ডলারে আমদানি করে, বাংলাদেশ তখন ১২ থেকে ১৫ ডলারে আমদানি চুক্তি করেছে। বর্ধিত মূল্যের সিংহভাগই কমিশন হিসেবে পেয়েছে তৎকালীন সরকারের শীর্ষপর্যায়ের লোকজন। গ্যাস সরবরাহে সংকট, উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি, অদক্ষতা ও দুর্নীতির কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়েছে।

জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি জীবনযাত্রার সব পর্যায়ে ব্যয় বেড়ে যায় কল্পনাতীতভাবে। মানুষ এমনিতেই খাদ্য থেকে শুরু করে জীবনযাপনের প্রতিটি পর্যায়ে কাটছাঁট করে কোনো মতে বেঁচে থাকার লড়াই করছে। সঞ্চয় ভেঙে জীবনের চাকা সচল রাখার প্রাণান্তকর চেষ্টার খবর আসছে সংবাদমাধ্যমে। এমন একটি পর্যায়ে বিদ্যুতের মতো জীবনের অপরিহার্য একটি উপাদানে আরেক দফা ব্যয়ের উল্লম্ফন ঘটলে তা যে জনজীবনে কত বড় অভিঘাত হয়ে দেখা দেবে, তা অনুধাবনের জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবিত হারে বিদ্যুতের দাম বাড়লে চার সদস্যের একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের এ খাতে মাসিক খরচ কম করে হলেও ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ব্যয় বৃদ্ধি এখানেই থেমে থাকবে না। বিদ্যুতের খরচ বৃদ্ধির প্রভাবে পণ্য উৎপাদন খরচ বাড়বে। অনিবার্যভাবে সব পণ্যের দাম আরেকবার বেড়ে যাবে। ব্যবসায়ীরা গ্রাহকের কাছ থেকেই বিদ্যুতের বাড়তি ব্যয় আদায় করবেন। হিমায়িত খাদ্যপণ্যের দামে এর প্রভাব অনিবার্য।

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বহুমাত্রিক প্রভাবে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ অবধারিতভাবে চাপে পড়বে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বড় চ্যালেঞ্জে পড়বে শিল্প-কারখানা। বর্ধিত বিদ্যুৎ বিলের ভার বহনের সক্ষমতা দেশের নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের যেমন নেই, তেমনি সাধ্য নেই শিল্প খাতেরও। ভুল নীতি-পরিকল্পনা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে জোর না দিয়ে দামবৃদ্ধির প্রতি মনোযোগ দিলে মানুষ বুঝে নেবে নতুন গণতান্ত্রিক সরকারও কার্যত দেশের মানুষের সাধ্য-সামর্থ্যের তোয়াক্কা করছে না। জনগণের ওপর বাড়তি খরচের বোঝা চাপিয়ে দিতে দ্বিধা করছে না।

পিডিবির দেখানো উৎপাদন খরচের যথার্থতা যাচাই বিতরণ কোম্পানিগুলো কেনাকাটা ও পরিচালন ব্যয়ে স্বচ্ছতার ওপর জোর দেওয়া জরুরি। আরো কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর চাইতে পারেন ভোক্তারা। বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বিদ্যুতের উৎপাদন প্রকল্পগুলোর ব্যয় কি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ? আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোয় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ব্যয় মেগাওয়াট প্রতি কত? চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে শেখ হাসিনা ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা লুট করেছে। তার বিদায়ের পর নতুন সরকারের সময়ে ভুলনীতির দায় ভোক্তাদের ওপর চাপানো নৈতিকতার মাপকাঠিতে কতটা গ্রহণযোগ্য?

নির্বাচনি ব্যবস্থা তছনছ করে নিরীহ-নিরুপায় ভোক্তাদের কাছে সরকারের দায়বদ্ধতা না থাকায় শেখ হাসিনার সরকার যা খুশি তাই করেছে। বর্তমান সরকারকে কিন্তু মানুষের কাছে যেতে হবে। ভোট লাগবে। সামনে যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন রয়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব কিন্তু সেখানেও পড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। জনভোগান্তিকে উপেক্ষা করা ঠিক হবে না। জনআকাঙ্ক্ষার বর্তমান সরকারের উচিত মানুষের কষ্ট অনুধাবন করে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দাম বাড়ানোর চিন্তা থেকে সরে আসা। মূল্যস্ফীতি আরেক দফা উসকে না দেওয়া।

৯ লাখ কোটির বাজেটে ১০ হাজার কোটি বড় অঙ্কের অর্থ নয়। সরকারি কর্মচারীদের বেতন স্কেল দুই ধাপে বাস্তবায়নের কথা ভাবছে সরকার। এ খাতে আগামী বাজেটে ৩৫ হাজার কোটি টাকা রাখার কথা শোনা যাচ্ছে। প্রয়োজনে বেতন স্কেল বাস্তবায়নে বরাদ্দ আরো কমানোর কথা ভাবা যেতে পারে। সাড়ে ১৪ লাখকে তুষ্ট করে ১৮ কোটির ওপর চাপ বাড়ানো ঠিক হবে কি না, প্রধানমন্ত্রী ভেবে দেখবেন নিশ্চয়ই। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী দায়িত্ব নিয়ে এফইআরবির অনুষ্ঠানে বলেছিলেনÑসরকার দুবছর বিদ্যুতের দাম বাড়াবে না। সে কথা রাখা বাঞ্ছনীয়।

পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে মূল্যস্ফীতি আরেক দফা বাড়বে। জুনে বাজেট ঘোষণা করলে করজাল বিস্তারের প্রভাবেও মূল্যস্ফীতির উল্লম্ফন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। ৪০ হাজার কোটির বোয়িং কেনার সুফল কিন্তু সরকার এ মেয়াদে পাবে না। অর্থ ব্যয় করতে হবে বর্তমান সরকারকেই। বোয়িংয়ের সুফল উচ্চবিত্তের। পারলে ওই খাত থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা উচিত। বিদ্যুতে দামের চাপ পড়ে সর্বস্তরে। সে চাপ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হবে অপরিণামদর্শী। বিদ্যুৎ খাতে বিরাজমান দায়-দেনাজনিত সংকটের মূল কারণগুলো আমলে নিয়ে তা নিরসনে বিকল্প পন্থাগুলো অনুসরণের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক ও যুগ্ম সম্পাদক, আমার দেশ

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক : কূটনৈতিক বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতা

আওয়ামী মার্কা আলাপ সংসদে কেন!

দুই যুদ্ধের ছায়া : ইউক্রেন থেকে ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরাজয়

সংকটময় সন্ধিক্ষণে পশ্চিমবঙ্গ

মধ্যপ্রাচ্য সংকট, বিশ্ব সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা

মুক্ত সংবাদমাধ্যম দিবস ও সূচকের উত্তরণ-অবনমন

সঠিক তথ্য দিয়ে রুখতে হবে অপতথ্য

কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি : দাপটের মোহে বিপন্ন ভবিষ্যৎ

শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দূরত্ব