ইসলামের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের একটি হলো জাকাত। এটি শুধু একটি ধর্মীয় বিধান নয়; বরং একটি শক্তিশালী সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন, দারিদ্র্যবিমোচন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ জাকাত আদায় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই সম্ভাবনার পূর্ণ সুফল সমাজে প্রতিফলিত হয় না। পরিকল্পনার অভাব, সঠিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং সমন্বয়হীনতার কারণে জাকাতের প্রকৃত লক্ষ্য অনেক ক্ষেত্রে পরিপূর্ণভাবে অর্জিত হয় না।
বাংলাদেশে জাকাতের পূর্ণ ফল পেতে হলে একটি সুসংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক জাকাত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি। বর্তমানে অধিকাংশ জাকাত ব্যক্তিগতভাবে বা বিচ্ছিন্নভাবে বিতরণ করা হয়। ফলে অনেক সময় প্রকৃত দরিদ্র বঞ্চিত হয় এবং একই ব্যক্তি একাধিক উৎস থেকে সহায়তা পায়। যদি জাতীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ জাকাত ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করা যায় এবং স্থানীয় পর্যায়ে এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়, তবে জাকাত সমাজকল্যাণে অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি।
জাকাত বণ্টনের ক্ষেত্রে পরিকল্পিত ও উৎপাদনমুখী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা প্রয়োজন। অনেক সময় জাকাত সাময়িক সহায়তা হিসেবে বিতরণ করা হয়, যা দরিদ্র মানুষের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটালেও দীর্ঘ মেয়াদে তাদের দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করতে পারে না। এর পরিবর্তে ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি, পশুপালন বা কারিগরি উদ্যোগের জন্য পুঁজি দেওয়া হলে দরিদ্র মানুষ স্বাবলম্বী হতে পারে। এভাবে জাকাত দারিদ্র্যদূরীকরণের একটি কার্যকর অর্থনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
প্রকৃত দরিদ্রদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি জাতীয় ডেটাবেস তৈরি করা হলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সঠিক তালিকা প্রস্তুত করা সম্ভব। এতে জাকাতের অর্থ সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছাবে এবং অপব্যবহারের সুযোগ কমে যাবে।
জাকাত ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। জাকাত তহবিলের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ, নিয়মিত অডিট এবং আধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করা জরুরি। কারণ আস্থাই হলো একটি সফল জাকাত ব্যবস্থার মূল ভিত্তি।
ইসলামী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো জাকাত ব্যবস্থাপনার সঙ্গে আরো সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা যেতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দক্ষতা ও অবকাঠামো ব্যবহার করে জাকাতভিত্তিক দারিদ্র্যবিমোচন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করলে এর কার্যকারিতা অনেক বাড়বে।
জাকাত সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করাও অত্যন্ত জরুরি। অনেক ধনী মুসলমান এখনো সঠিকভাবে জাকাত হিসাব ও প্রদান সম্পর্কে সচেতন নন। মসজিদের খুতবা, গণমাধ্যম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জাকাতের গুরুত্ব ও সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা দরকার।
এখানে একটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য, জাকাত বলতে শুধু নগদ অর্থের জাকাত নয়; বরং দেশে উৎপাদিত বিভিন্ন শস্যপণ্য, গবাদি পশু ইত্যাদির ও জাকাত রয়েছে ভিন্ন নামে, যা সাধারণত বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ দেন না অজ্ঞতা ও জনসচেতনতার কারণে। এ বিষয়ে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে তেমন কোনো প্রচার-প্রচারণা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম নেই বললেই চলে। ব্যাপকভাবে প্রচার-প্রচারণা চালানো গেলে বিপুলসংখ্যক নগদ অর্থ, স্বর্ণ-রৌপ্যের বাইরেও ভিন্ন নামের জাকাত (উশর) আদায় হতে পারে। যা দারিদ্র্যবিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের ঋণ মুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, বাংলাদেশে যদি জাকাত, উশর ইত্যাদি বাধ্যতামূলক ডোনেশনকে সুশৃঙ্খলভাবে সংগঠিত ও পরিকল্পিতভাবে ব্যবহারের ব্যবস্থা করা যায়, তবে এটি শুধু ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের মাধ্যমই হবে না; বরং দারিদ্র্যবিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি শক্তিশালী জাতীয় ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে। একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনে জাকাত ও উশর ইত্যাদি আয় তখন সত্যিকার অর্থেই তার পূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।
লেখক : ইসলামি অর্থনীতিবিদ ও সমাজচিন্তক
mukhles1975@gmail.com