একসময় হাম বিশ্বের অনেক দেশ থেকেই নির্মূল হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সাল থেকে এই রোগের ভয়াবহ সংক্রমণ ঘটেছে, যার বিস্তার এখনো অব্যাহত আছে। শুধু উন্নয়নশীল বিশ্বেই নয়, উন্নত দেশগুলোয়ও বাড়ছে হামের সংক্রমণ।
হাম সাধারণত শিশুদের বেশি হলেও যেকোনো বয়সের মানুষই এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সমীক্ষায় জানা গেছে, ২০২৩ সালে আনুমানিক ১ কোটি ৩ লাখ মানুষ আক্রান্ত হন এবং ২০২৪ সালে তা আরো বেড়ে ১ কোটি ১০ লাখে গিয়ে দাঁড়ায়। তাদের মধ্যে মারা যায় প্রায় ৯৫ হাজার মানুষ, যার বেশির ভাগই ছিল ৫ বছরের কম বয়সের শিশু।
২০২৪ সালে এর ভয়াবহ সংক্রমণ ঘটে ৫৯টি দেশে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী ২০২৫-এর সেপ্টেম্বর মাস থেকে ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সর্বোচ্চ আক্রান্তের তালিকায় রয়েছে ১০টি দেশ; ভারত, ইয়েমেন, পাকিস্তান মেক্সিকো, অ্যাঙ্গোলা, ইন্দোনেশিয়া, কাজাখস্তান, ক্যামেরুন, সুদান এবং লাও-পিডিআর।
২০০০ সালে, হাম নির্মূল হয়ে গেছে বলে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দিলেও ২০২৫ সালে দেশটির ৩১টি অঙ্গরাজ্যে এর প্রাদুর্ভাব ঘটে। টিকা নেয়নি এমন মানুষই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
হাম পুরোপুরি নির্মূল হয়ে যাওয়ার পরও সেখানে আবার এর আগমন ঘটতে পারে। মরক্কো, আফগানিস্তান এবং আফ্রিকা মহাদেশের অনেকগুলো দেশেও এই রোগের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। ইউরোপের ৫৩টি দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে হাম এবং আক্রান্তের ২০২৪ সালের চেয়ে এখন দ্বিগুণ।
বাংলাদেশে এই রোগের প্রাদুর্ভাব গত কয়েক দশকের চেয়ে এবার মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি বিএমজে জার্নালে প্রকাশিত এক নিবন্ধের তথ্যে জানা গেছে, হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে এবং দ্রুত এর বিস্তার ঘটেছে। গত ১০ মে পর্যন্ত হামে ও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা ৩৫০ ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্বব্যাপী হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব ও দ্রুত বিস্তার ঘটার কারণ হিসেবে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এবং সিডিসি জানিয়েছে, ১. শিশুদের সময়মতো ভ্যাকসিন না দেওয়া। ২. কোভিড মহামারিকালে শিশুদের নিয়মমাফিক ভ্যাকসিন প্রদানে ব্যর্থতা। ৩. সীমিত সম্পদের দেশগুলোয় এই রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতা এবং ৪. আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের মাধ্যমে এই রোগ বহন এবং বিস্তার।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বিশ্বের ৮৪ শতাংশ শিশু হাম ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ পেয়েছে এবং ৭৬ শতাংশ পেয়েছে দ্বিতীয় ডোজ। অর্থাৎ প্রায় তিন কোটি শিশু রয়ে গেছে এই রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতাহীন। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক শিশু তহবিল সংস্থা জানিয়েছে, দুই ডোজ হামের ভ্যাকসিন ৯৫ শতাংশ প্রতিরোধ ক্ষমতার সৃষ্টি করে, তাই এই ভ্যাকসিন দেওয়া জরুরি।
হাম রোগজনিত বর্তমান বিশ্বসংকট মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও সরঞ্জাম আমাদের আয়ত্তে রয়েছে। এখন যা প্রয়োজন, তা হলো এটি অর্জনের নিশ্চয়তা যেন কোনো শিশুই মারা না যায়।
লেখক : মেডিসিন ও সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ
ক্লিনিক্যাল অধ্যাপক, ইন্টারনাল মেডিসিন, নর্থ ইস্ট ওহিও মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ওহিও, যুক্তরাষ্ট্র