হোম > অন্যান্য

কেন এখনো বলি ‘স্যার’ ও ‘ম্যাডাম’?

আতিকুর রহমান নগরী

বাংলাদেশের প্রশাসন ও শিক্ষাঙ্গনে ‘স্যার’ ও ‘ম্যাডাম’ সম্বোধন যেন একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। তবে এই শব্দ দুটির ইতিহাস কেবল সম্মান বা সৌজন্য প্রকাশ নয়—বরং এক গভীর ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন।

ইতিহাসের গর্ভে ‘স্যার’ ও ‘ম্যাডাম’

ইংরেজি ভাষায় ‘স্যার’ শব্দটির ব্যবহার শুরু হয় ১২৯৭ সাল থেকে। এটি এসেছে ফরাসি শব্দ ‘স্যায়ার’ (sire) থেকে, যার অর্থ ছিল প্রভু বা কর্তৃত্ব। সেই সময় ‘স্যার’ ছিল নাইট উপাধিপ্রাপ্তদের জন্য সম্মানসূচক একটি শব্দ, কিন্তু এর ভেতরে ছিল কর্তৃত্ব ও আনুগত্যের ছাপ। একইভাবে ‘ম্যাডাম’ এসেছে ফরাসি শব্দ Madame থেকে, যার ব্যবহার হত সম্ভ্রান্ত নারীদের সম্মোধনে।

ভারতীয় লেখক উদয়লাল পাই-এর গবেষণা অনুযায়ী, SIR শব্দকে অনেকে ব্যাখ্যা করেন ‘Slave I Remain’ (আমি দাসই থেকে গেলাম) হিসেবে, আবার ইংল্যান্ডে এর অর্থ ধরা হত ‘Servant I Remain’।

বাংলা অঞ্চলে এই শব্দদ্বয়ের প্রবেশ ঘটে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে। ১৭শ শতকে ব্রিটিশরা উপমহাদেশে উপনিবেশ গড়ার সময় এই সম্বোধন চালু হয়—প্রাথমিকভাবে ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের প্রতি স্থানীয় জনগণের আনুগত্য প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে।

ব্রিটিশ রাজনীতি ও শিক্ষার ছাপে সম্বোধন

১৮৩৫ সালে লর্ড ম্যাকলে ‘মিনিটস অন এডুকেশন’ এ বলেন, এমন একটি শ্রেণি তৈরি করতে হবে যারা ‘রঙে ভারতীয়, কিন্তু রুচিতে, বুদ্ধিতে ও চিন্তায় হবে ব্রিটিশ’। এই লক্ষ্যেই গড়ে ওঠে ইংরেজি শিক্ষাব্যবস্থা—যার অংশ ছিল শিক্ষক বা কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলা।

বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতিতে শিক্ষকদের বলা হত ‘মাস্টারমশাই’ বা ‘পণ্ডিতমশাই’। কর্মকর্তাদের জন্য ব্যবহার হত ‘সাহেব’, যা এসেছে আরবি 'সাহাবী' শব্দ থেকে। তবে ব্রিটিশরা এসে ‘সাহেব’ শব্দটিকেও কর্তৃত্বের প্রতীক বানিয়ে ফেলে।

লেখক মুনতাসীর মামুন তার বই ঔপনিবেশিকোত্তর ঔপনিবেশিক মন এ উল্লেখ করেছেন, ‘সাহেব, মেমসাহেব বা বেগম সাহেব শব্দসমূহ ইংরেজ আমল থেকেই ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।’

স্বাধীনতার পরও বদলায়নি চিত্র

১৯৪৭ সালের পর উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলেও, বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) এবং পরে স্বাধীন বাংলাদেশেও প্রশাসন ও শিক্ষাব্যবস্থায় ‘স্যার/ম্যাডাম’ সম্বোধন চালু থাকে।

নিম্ন আদালতে বিচারকদের ‘স্যার’ বা ‘ইওর অনার’ এবং উচ্চ আদালতে ‘মাই লর্ড’ বলা হয়। অথচ বাংলাদেশে কোনো আইনেই এই সম্বোধন বাধ্যতামূলক নয়।

২০১২ সালে হাইকোর্ট কার্যপদ্ধতি আইন সংশোধন করে শুধু ‘সম্মানসূচক সম্বোধন’ বলার কথা বলা হয়েছে, ‘স্যার’ বলা হয়নি।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১৯৯০ সালের ১১ ডিসেম্বর এক প্রজ্ঞাপনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্বোধনে ‘স্যার’ না বলে ‘জনাব’ এবং ‘মহোদয়/মহোদয়া’ ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনও ২০২১ সালে বলেন, ‘সরকারি সেবা নিতে আসা জনসাধারণকে ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলা বাধ্যতামূলক নয়।’

শিক্ষাঙ্গনে ‘স্যার’ ও ‘ম্যাডাম’

বাংলাদেশের স্কুল-কলেজে শিক্ষককে ‘স্যার’ ও ‘ম্যাডাম’ বলা এখন নিয়মতান্ত্রিক রীতি। এটি আদতে শৃঙ্খলা ও ‘ভদ্রতা’ শেখানোর অংশ হলেও, এর পেছনে রয়েছে ইতিহাস, মানসিক উপনিবেশ এবং ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব।

বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী শিক্ষকদের ‘ম্যাডাম’ অথবা ‘মেম’ বলা হয়। অথচ ‘মেম’ শব্দটি এক সময় ব্যবহৃত হতো ব্রিটিশ অভিজাত নারীদের জন্য, যাদের জীবন ছিল বিলাসিতা, দম্ভ ও শ্রেণিবৈষম্যে পূর্ণ।

প্রথা বনাম আইন

বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কোথাও ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলার লিখিত বাধ্যবাধকতা নেই। জাতীয় শিক্ষানীতিতেও এই বিষয়টি অনুল্লেখিত।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৩৩ ও ১৩৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তারা ‘পাবলিক সার্ভেন্ট’ হিসেবে বর্ণিত। তাদের পরিচয় জনগণের সেবক হিসেবে, কিন্তু বাস্তবে বহুক্ষেত্রে জনগণকে ‘স্যার-ম্যাডাম’ না বলায় দুর্ব্যবহারের মুখে পড়তে হয়।

এক সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে শেখ হাসিনাকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করা হতো, যদিও সেটি কখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত ছিল না।

সাম্প্রতিক প্রশাসনিক পরিবর্তন

২০২৫ সালের ১১ জুলাই বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধানমন্ত্রী ও সিনিয়র নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে ‘স্যার’ সম্বোধনের প্রথা বাতিল করে। সরকারি প্রজ্ঞাপনে এই সম্বোধনকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

বিচার বিভাগীয় কর্মচারী এসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন, সম্পাদক ফজলুর

বিচার বিভাগীয় কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচন ১৮ সেপ্টেম্বর

ভিকারুননিসার শিক্ষক আনোয়ারের দুই কিডনিই অকার্যকর

বার্লিনে বাংলাদেশের চিকিৎসকের সাফল্য

মুসলিম নিকাহ রেজিস্ট্রার কল্যাণ পরিষদের কমিটি গঠন

প্রকাশিত হলো ড. মেছবাহ উদ্দিনের ‘ওভারথিংকিং ডিটক্স ব্লুপ্রিন্ট’

বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাসের, সহসভাপতি ওয়ালিদ

দ্য সেকেন্ড স্টুডিও ফিচারিং বেস্ট শো এভারেস্টের উদ্বোধন

শিশু আবদুল্লাহ আল নোমানের জীবন বাঁচাতে মানবিক সহায়তার আবেদন

উগান্ডার বিরোধীদলীয় নেতাকে হেলিকপ্টারে তুলে নিয়ে গেছে সেনাবাহিনী