মহিমা থেকে মরীচিকা
‘ফুটবলে ইতিহাস তোমাকে সম্মান দেয় না, যদি তুমি বর্তমানকে জিততে না পারো’—মন্তব্যটা কোচ হোসে মরিনহোর। বিশ্বকাপ ও ব্রাজিলের প্রসঙ্গ যখন আসবে, তখন সম্ভবত এরচেয়ে নির্মম সত্য আর নেই। অতীতকে জয় করা ব্রাজিল বর্তমানে হারছে এবং সেটা বেশ নিয়মিতই!
বিশ্বকাপ নকআউট পর্বের কোনো এক ম্যাচ। প্রতিপক্ষের ফুটবলার ও সমর্থকরা আনন্দে ভাসছেন। উল্লাসে, স্লোগানে আত্মহারা। ঠিক তখনই মাঠের আরেক প্রান্তে পুরো ব্রাজিল দল এবং গ্যালারিতে সবুজ-হলুদ জার্সি গায়ে সমর্থকদের চোখে শুধু শূন্যতা। চোখের জলে ভিজে উঠছে সেই জার্সি। বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জন্য এমন দৃশ্য নতুন নয়। ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২—প্রতিবারই ব্যর্থতার পর বলা হয়েছে, ‘চার বছর পর আবার ফিরবে ব্রাজিল’। ২০২৬-এও সেই একই গল্প। আবারও বিশ্বকাপ শেষ হলো চোখের জলে, আরেকবারও স্বপ্ন ভাঙল। বিশ্বকাপ শুরুর আগে ব্রাজিলকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি শোনা গিয়েছিল একটি শব্দÑ‘হেক্সা’। অর্থাৎ, ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপ। জার্সিতে পাঁচটি স্টার আছে। ছয় নম্বরটি এবার তাহলে বসছে। কিন্তু ব্রাজিলের জার্সিতে নতুন স্টার বসেনি! তবে হেক্সা একটা ঠিকই পেয়েছে ব্রাজিল, এবার!
জি, টানা ছয় বিশ্বকাপে শিরোপা জিততে ব্যর্থ ব্রাজিল। অন্তত হারের হেক্সা তো পুরো হয়েছে!
নরওয়ের কাছে হার কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি ছয় বিশ্বকাপ ধরে জমে থাকা ভুলের সর্বশেষ কিস্তি। চলুন, এবারের ব্রাজিল দলের ব্যর্থতার অডিট রিপোর্ট তৈরি করে ফেলি।
মাঝমাঠে মস্তিষ্কের অভাব
কোচ আনচেলত্তির পরিকল্পনা ছিল বল ছেড়ে দিয়ে দ্রুত ট্রানজিশনে ফিরে আসা, দ্রুত প্রতিপক্ষের খেলা নষ্ট করা; সেই দ্রুততায় আবার আক্রমণে উঠে আসা। পরিকল্পনা ভুল ছিল না; কিন্তু সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মাঝমাঠে যে একজনের ‘মস্তিষ্ক’ দরকার, তার অভাবে ব্রাজিল সবচেয়ে বেশি ভুগেছে নরওয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচে। লুকাস পাকেতার অনুপস্থিতিতে মাঝমাঠ আর আক্রমণের মধ্যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়। ভিনিসিয়ুস, মার্তিনেল্লি কিংবা কুনহা দৌড়াতে পারেন; কিন্তু মাঝমাঠ থেকে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। ব্রাজিলের আক্রমণ তাই হয়ে ওঠে বিচ্ছিন্ন, এলোমেলো এবং খুবই অনুমিত। আধুনিক ফুটবলে মাঝমাঠ ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করে। ব্রাজিল সে লড়াইটা শুরু হওয়ার আগেই হেরে বসেছিল।
চাই একজন গোলমেশিন
শেষ ছয়টি বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় সংকট একই—একজন প্রকৃত নম্বর নাইন নেই।
রিচার্লিসন, কুনহা কিংবা অন্য কেউই ক্লাব ফুটবলে ধারাবাহিক গোলস্কোরার নন। অন্যদিকে নরওয়ের সামনে ছিল হালান্ড, ইংল্যান্ডের আছে কেইন, ফ্রান্সের আছে এমবাপ্পে। বড় দলগুলোর আক্রমণের কেন্দ্রে একজন কিলার থাকে; ব্রাজিলের আছে শুধু প্রতিভাবান উইঙ্গার।
ফলাফল? অসংখ্য সুন্দর আক্রমণ; কিন্তু গোল নেই। বিশ্বকাপ শুধু সুন্দর ফুটবলের টুর্নামেন্ট নয়, এখানে জেনুইন গোলগেটার প্রয়োজন। নিষ্ঠুর ভঙ্গিতে যিনি প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙেচুরে একাকার করে দেবেন।
কিন্তু এই ব্রাজিল দলে তেমন নিষ্ঠুর কেউ যে নেই!
তারকা পূজার সংস্কৃতি
ব্রাজিল এখনো ব্যক্তিকে বড় করে, দলকে নয়। এক সময় সবকিছু ঘুরেছে নেইমারকে ঘিরে। এখন নেইমার নেই; কিন্তু সেই মানসিকতা রয়ে গেছে। বছরের পর বছর একটি তারকার ওপর নির্ভরশীল ফুটবল সংস্কৃতি নতুন নেতৃত্ব তৈরি হতে দেয়নি। ইউরোপের বড় দলগুলো যেখানে কাঠামোকে শক্তিশালী করেছে, ব্রাজিল সেখানে এখনো ব্যক্তিগত জাদুর অপেক্ষায় থাকে। ফুটবল অনেক আগেই বদলে গেছে। ব্রাজিল বদলায়নি।
সুযোগ নষ্ট, চাপে ভেঙে পড়া
এ ম্যাচে ব্রাজিল সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু বড় দলকে বড় বানায় সুযোগ সৃষ্টি নয়, সুযোগ শেষ করার ক্ষমতা। ব্রুনো গিমারায়েসের পেনাল্টি মিস যেন পুরো ব্রাজিলিয়ান মানসিকতার প্রতিচ্ছবি। চাপের মুহূর্তে সিদ্ধান্ত ভুল, শরীর শক্ত, আত্মবিশ্বাস উধাও। রাফিনিয়ার অনুপস্থিতি শুধু একজন খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতি ছিল না; হারিয়ে গিয়েছিল নির্ভরতার একটি জায়গাও।
বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা চাপে পড়ে দিক হারায় না। জেতার জন্য নতুন জেদ বাড়িয়ে সেটাকে শক্তি বানায়। কিন্তু এবারের ব্রাজিল যেন চাপের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।
সমস্যার নাম ফুটবল দর্শন
ছয় বিশ্বকাপে ব্রাজিল পাঁচজন কোচ বদলিয়েছে। পেরেইরা, দুঙ্গা, স্কোলারি, তিতে, দিনিজ, দরিভাল; এখন আনচেলত্তি। মুখ বদলেছে, ফল বদলায়নি। কারণ, সমস্যাটা বেঞ্চে নয়, কাঠামোয়। প্রতিভা তৈরির ধারা বদলেছে; কিন্তু ব্রাজিলের দল নির্বাচনে এখনো নামের মূল্য ফর্মের চেয়ে বেশি। মাঝমাঠ তৈরির চেয়ে উইঙ্গার তৈরিতে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।
এক সময় ব্রাজিলের হলুদ-সবুজ জার্সি প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাত। সমীহ জাগাতে বাধ্য করত। এখন সেই জার্সির ওজনই যেন খেলোয়াড়দের কাঁধে বোঝা হয়ে গেল।
সমাধান কোথায়
বিশ্বকাপে ব্যর্থতা সত্ত্বেও কোচ আনচেলত্তির চাকরি যায়নি। সামনের বিশ্বকাপ পর্যন্ত ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন তাকে রেখে দিয়েছে। আনচেলত্তির সামনে ট্রফি জেতার আগে সবচেয়ে কঠিন কাজ হবে ব্রাজিলের ফুটবল চিন্তা-চেতনাকে বদলে দেওয়া। মাঝমাঠে নতুন স্থপতি তৈরি করতে হবে। ডিফেন্সের দেয়ালকে সত্যিকার অর্থে শক্তপোক্ত করতে হবে। আক্রমণে একজন প্রকৃত ‘নম্বর নাইন’ খুঁজে বের করতেই হবে। দল নির্বাচনে নাম নয়, ফর্মকে একমাত্র মানদণ্ড করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, একক ব্যক্তিনির্ভর ব্রাজিলকে দলনির্ভর ব্রাজিলে বদলাতে হবে। খেলাটা একজনের নয়, ১১ জনের।
প্রখ্যাত লেখক ও ফুটবল বিশ্লেষক সাইমন কুপার লিখেছিলেন, ‘ফুটবল কখনো মিথ্যে কিছু বলে না, বরং এটা সেটাই প্রকাশ করে দেয়-যা দলগুলো লুকাতে চায়।’
ব্রাজিলের এবারের ব্যর্থতা সে সত্যেরই জানান দিল!