ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি, আয়বৈষম্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থার প্রতিবাদে টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো রাজপথে নেমেছেন লাখো মানুষ। শনিবার রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করেছে। দিন শেষে দেশজুড়ে ৫৬৫ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বিক্ষোভের বড় অংশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি শহরে মিছিলের শেষ পর্যায়ে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। হ্যালোইন উৎসবের দিন হওয়ায় অনেক বিক্ষোভকারীকে ভৌতিক ও বিচিত্র পোশাকে মিছিলে অংশ নিতে দেখা যায়। কেউ সেজেছিলেন স্পাইডারম্যান, কেউ ফ্রাঙ্কেনস্টাইন, আবার কেউ ক্লাউন বা ডাইনি। তবে উৎসবের আমেজের মধ্যেও আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ ছিল জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষা ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে।
বিক্ষোভকারীর সংখ্যা নিয়ে মতভেদ
শনিবারের বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে সরকারি হিসাব ও আয়োজকদের দাবির মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, সারা দেশে ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে রাজধানী প্যারিসে ছিলেন ৭০ হাজার। অন্যদিকে, যুব সংগঠন ও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী ইউনিয়নগুলোর দাবি, দেশজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। তাদের হিসাবে, শুধু প্যারিসেই অংশ নিয়েছেন প্রায় দুই লাখ মানুষ।
এর আগের দুই সপ্তাহেও বড় বিক্ষোভ হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। ওই দিনের আন্দোলন একপর্যায়ে ব্যাপক সহিংসতায় রূপ নেয়। এরপর ২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভে অংশ নেন ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ। ফলে তৃতীয় সপ্তাহে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আগের দুই সপ্তাহের তুলনায় কম হলেও আন্দোলনের ব্যাপ্তি ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
প্যারিসে পেট্রলবোমা, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
শনিবার প্যারিসের পূর্বাঞ্চলে শহরের কেন্দ্রের বাইরে দিয়ে বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করা হয়। কয়েক ঘণ্টা শান্তিপূর্ণভাবে চলার পর মিছিলের শেষ গন্তব্য পোর্ত দ্য শারঁতনে পৌঁছালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কালো পোশাক ও মুখোশ পরা কয়েক ডজন ব্যক্তি হাতুড়ি দিয়ে রাস্তার পাথর তুলে পুলিশের দিকে ছুড়তে থাকেন। কোথাও কোথাও আবর্জনার স্তূপ ও রাস্তার বিভিন্ন সরঞ্জামে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ পুলিশের দিকে কাচের বোতল ও আতশবাজিও ছোড়েন।
জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, স্টান গ্রেনেড ও লাঠিচার্জ করে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে আশপাশে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। কাঁদানে গ্যাসের কারণে চোখ জ্বালা ও শ্বাসকষ্টে অনেক শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীও মিছিল ছেড়ে চলে যান। আহত কয়েকজনকে চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নিতে দেখা যায়।
প্যারিসে পুলিশের একটি নিরাপত্তা ব্যারিকেড লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা ছোড়ার ঘটনাও ঘটে। এতে এক দাঙ্গা পুলিশের সদস্যের শরীরে আগুন ধরে যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানান, ওই পুলিশ সদস্য সামান্য আহত হয়েছেন। এ ঘটনাকে তিনি ‘হত্যাচেষ্টার’ সঙ্গে তুলনা করেন। প্যারিসে চার পুলিশ সদস্য ও একজন জেন্ডারম (সামরিক পুলিশ) আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজন পেট্রলবোমার আগুনে দগ্ধ হন।
৫৬৫ জন গ্রেপ্তার, মোতায়েন ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবার রাতে দেশজুড়ে ৫৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে সন্ধ্যায় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ৪২২ এবং পরে ৫১১ জন বলে জানানো হয়েছিল। সারা দেশে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারম মোতায়েন করা হয়।
বিক্ষোভ ঘিরে আগেই নিরাপত্তা জোরদার করেছিল সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ৩১ অক্টোবরের ঘোষণায় বলা হয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট, ড্রোন, হেলিকপ্টার, অশ্বারোহী দল, প্রশিক্ষিত কুকুরের ইউনিট, জেন্ডারম বাহিনীর ২৬টি সাঁজোয়া যান এবং জলকামান ছোড়ার ১৫টি গাড়ি প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। সড়ক, রেলস্টেশন ও রেলপথেও আগাম তল্লাশি চালানো হয়।
প্যারিসের কয়েকটি এলাকায় রাত ১১টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। শঁজেলিজে এলাকায় অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রাত ৯টার কারফিউও জারি ছিল।
প্যারিসের বাইরে লিওঁ, মার্সেই, তুলুজ ও বোর্দো শহরেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। লিওঁতে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুড়লে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। তুলুজে অনুমতি ছাড়া আয়োজিত কয়েক হাজার মানুষের একটি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ব্যবহার করা হয়। বোর্দো ও মার্সেইসহ কয়েকটি শহরে উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তিদের শহরের কেন্দ্রস্থলে ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাটের চেষ্টা ঠেকাতে নিরাপত্তা বাহিনী তৎপর ছিল।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে দেশজুড়ে প্রতিবাদ
আন্দোলনটির সূচনা হয়েছিল গত মাসে। প্রথম দিকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা স্কুল ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থা, শিক্ষকের ঘাটতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়ায় বৈষম্যের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাদের অভিযোগ, সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ সমান নয়। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত সমস্যাও দীর্ঘদিন ধরে সমাধান করা হচ্ছে না।
পরে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি, বাড়িভাড়া ও আবাসনসংকট, আয়বৈষম্য এবং প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকারের নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তুষ্ট শ্রমিক ইউনিয়ন, যুব সংগঠন ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে যোগ দেন। ইয়েলো ভেস্ট বা ‘হলুদ জ্যাকেট’ আন্দোলনের কর্মীরাও এতে যুক্ত হয়েছেন।
সরকারি ছাত্রাবাসে বসবাসকারী ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী কোরেন্তাঁ কাব্রুর অভিযোগ, তার কক্ষের দেয়ালের নিচের অংশে স্যাঁতসেঁতে দাগ, দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়া এবং তেলাপোকা ও ইঁদুরের উপদ্রব রয়েছে। তার অভিজ্ঞতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের আবাসনসংক্রান্ত সমস্যার একটি চিত্র তুলে ধরে।
আন্দোলনে শুধু শিক্ষার্থীরাই নন, বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষও অংশ নিচ্ছেন। একজন তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ন্যূনতম মজুরিতে কাজ করা তার মায়ের দুরবস্থার প্রতি সংহতি জানাতে মিছিলে যোগ দেন। এক প্রবীণ নারী হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে অংশ নেন, যাতে লেখা ছিল—‘বয়স্করাও অতিষ্ঠ’।
পুলিশি ব্যবস্থা ও নাগরিক অধিকার নিয়েও ক্ষোভ
আন্দোলনের শুরুতে মূল দাবি ছিল জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা এবং বৈষম্য দূর করা। তবে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কঠোর অবস্থান, কয়েকজন আন্দোলনকারীর গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা এবং শহরের কেন্দ্রস্থলে মিছিলের ওপর বিধিনিষেধের পর আন্দোলনের দাবিতে নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে। এখন নাগরিক স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করার অধিকার নিশ্চিত করার দাবিও সামনে এসেছে।
বিক্ষোভকারী অ্যালিস হিয়েন বলেন, শহরের কেন্দ্র থেকে মিছিল সরিয়ে দেওয়া এবং অনেক বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার বিষয়টি স্বাধীনতার ওপর আঘাত। অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেছেন, অনুমোদিত মিছিলগুলো মূলত শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে। তবে সহিংসতা ও ভাঙচুরে জড়িত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, আলজাজিরার প্যারিস প্রতিনিধি নাতাশা বাটলার জানান, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বারবার রাজপথে নামা অনেক মানুষের মধ্যে সরকারের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। তাদের ধারণা, সরকার তাদের দাবি যথাযথভাবে শুনছে না। তবে ফরাসি সরকার বলছে, বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য তারা বিবেচনায় নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু চলতি সপ্তাহে শিক্ষার্থী ইউনিয়নগুলোর সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করছেন।
আন্দোলন আরো বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা
বিক্ষোভকারীদের একাংশ আগামী সপ্তাহে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা বিশেষ করে ৫ নভেম্বর নতুন কর্মসূচি পালনের কথা জানিয়েছে। ওই দিন শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর পক্ষ থেকেও বিক্ষোভ ও ধর্মঘটের ডাক রয়েছে।
ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এ আন্দোলনকে ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ছয় মাসেরও কম সময় দূরে। জনমত জরিপে ডানপন্থী নেতা মেরিন লে পেন এগিয়ে রয়েছেন। বামপন্থী দল ফ্রান্স আনবোডের নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ শনিবার প্যারিসের মিছিলে অংশ নিয়ে বিপুল উপস্থিতির প্রশংসা করেছেন।
অন্যদিকে, ইউরোজোনের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ফ্রান্স মন্দার ঝুঁকি ও সরকারি ঋণ কমানোর চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে আন্দোলনকারীদের দাবি পূরণের সুযোগ সরকারের জন্য সীমিত বলে এএফপি উল্লেখ করেছে।
ফ্রান্সের বাইরেও শনিবার ইউরোপের কয়েকটি দেশে তরুণদের বিক্ষোভ হয়েছে। জার্মানির ৩০টির বেশি শহরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু সুরক্ষা ও সাশ্রয়ী জীবনযাপনের দাবিতে কর্মসূচি পালিত হয়। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে আবাসনসংকটের প্রতিবাদে হাজারো মানুষ শান্তিপূর্ণ মিছিল করেন। নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরেও বিক্ষোভের আশঙ্কায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
ফ্রান্সে আন্দোলনটি আপাতত জীবনযাত্রার ব্যয় ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে শুরু হলেও নাগরিক অধিকার, পুলিশের ভূমিকা এবং সরকারের প্রতি আস্থার প্রশ্নও এতে যুক্ত হয়েছে। আগামী ৫ নভেম্বরের কর্মসূচি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবরোধের ঘোষণার মধ্য দিয়ে আন্দোলন কোন দিকে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।
সূত্র: এএফপি, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি),আলজাজিরা, ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও লে মঁদ