মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে শুরু হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার নতুন অধ্যায়। একের পর এক সামরিক হামলা, আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার এবং পুরোনো মিত্রদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোকে নতুন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক উত্থান এবং সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের অস্থিরতা আর সাময়িক কোনো সংকট নয়। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহায়তা এবং ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে যে স্থিতিশীলতা ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, তা এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। পুরোনো জোটের ওপর নির্ভর করে এই সংকট মোকাবিলা করা যাবে—এমন ধারণাও ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
গত শনিবার ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জন আহত হয়েছেন বলে প্রাথমিক তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান শুরুর পর উপসাগরীয় কোনো দেশে এটিকে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
নিরাপত্তার পুরোনো সমীকরণ ভেঙে পড়ছে
দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছে। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এর আগে গত বছর ইরান কাতারে মার্কিন সেনা অবস্থানরত একটি বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ওই আক্রমণ করা হয়েছিল। হামলার আগে কিছুটা সতর্কতা ও সমন্বয় থাকলেও ঘটনাটি কাতারের জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করে।
এরপর ২০২৫ সালের শেষ দিকে ইসরাইল কাতারের রাজধানী দোহায় হামলা চালায়। হামলার লক্ষ্য ছিল হামাসের সদস্যরা। এতে পাঁচ ফিলিস্তিনি ও একজন কাতারি নাগরিক নিহত হন। বিশ্লেষকের মতে, এই ঘটনা উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের ধারণায় বড় ধাক্কা দেয়।
পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে ২০২৬ সালে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর। এর জবাবে ইরান সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমানে হামলা চালায়। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল সামরিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো ও পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
এর ফলে বিমানবন্দর ও আকাশপথ বন্ধ রাখা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিঘ্নের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। পর্যটন, ব্যবসা, খেলাধুলা ও বিনোদনের আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে উপসাগরীয় দেশগুলো যে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে, এসব হামলা সেই প্রচেষ্টাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
ইয়েমেনের সংঘাত নতুন করে তীব্র হচ্ছে
উপসাগরীয় অঞ্চলের অস্থিরতার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ইয়েমেন। ২০১৪ সালে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা দেশটির রাজধানী সানা দখল করলে গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়। পরের বছর সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি জোট হুতিদের দখল থেকে ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সামরিক অভিযান শুরু করে। দীর্ঘ সংঘাতে লাখো মানুষ নিহত হয় এবং দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়।
২০২২ সালে সংঘাত অনেকটা প্রশমিত হয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সৌদি-সমর্থিত সরকার ও হুতিদের মধ্যে কার্যত একটি বিভাজন তৈরি হয়। একই সময়ে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালে ইরানকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইয়েমেনের পরিস্থিতি আবারও বদলে যায়। হুতিরা নতুন করে ভূখণ্ড দখলের উদ্যোগ নেয় এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দিকে মনোযোগ দেয়।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ইয়েমেনের উপকূলীয় পথের কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে হুতিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
পরিস্থিতির অবনতি হলে সৌদি আরব হুতিদের অবস্থানে হামলা জোরদার করে। এর আগে ইরানের একটি বিমানকে সানায় অবতরণ করতে বাধা দিতে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকার বিমানবন্দরের রানওয়েতে বোমা হামলা চালায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হুথিরা শুধু ইরানের হাতিয়ার নয়
হুথিদের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির পেছনে ইরানের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাদের পুরোপুরি তেহরানের নির্দেশে পরিচালিত গোষ্ঠী হিসেবে দেখাকে যথেষ্ট মনে করেন না বিশ্লেষকেরা।
ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সৌদি আরবের প্রভাব মোকাবিলা করাও হুথিদের অন্যতম লক্ষ্য। সৌদি রাজপরিবারকে তারা আধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে দেখে এবং তাদের কর্তৃত্ব মেনে নিতে অনিচ্ছুক।
রিয়াদে হামলার পর হুথিদের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, ইয়েমেনের বেসামরিক অবকাঠামোয় সৌদি হামলার বিষয়টি বিশ্বকে বোঝাতেই এ আক্রমণ চালানো হয়েছে। এর মাধ্যমে ইয়েমেনে সৌদি সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে চেয়েছে গোষ্ঠীটি।
বিশ্লেষকের মতে, হুথিদের নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য ও আঞ্চলিক শত্রুতা রয়েছে। ফলে তাদের কর্মকাণ্ডকে শুধু ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের বৃহত্তর সংঘাতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করলে ইয়েমেনের বাস্তব পরিস্থিতি পুরোপুরি বোঝা যাবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে প্রশ্ন
উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহায়তার সীমাবদ্ধতা। দীর্ঘদিনের মিত্র হলেও ওয়াশিংটন সব পরিস্থিতিতে তাদের সামরিক সহায়তা দেবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে সংশয় দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত মাসে হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে ট্রাম্প প্রশাসন। এর আগে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় হুথিরা লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজে হামলা না করার আশ্বাস দিয়েছিল। তবে সৌদি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়ে তারা একই ধরনের নিশ্চয়তা দেয়নি।
এতে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। একদিকে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সহায়তা না পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সৌদি আরবকে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে হতে পারে।
২০১৫ সালে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানের অভিজ্ঞতা থেকেও সতর্ক হওয়ার কারণ রয়েছে। ওই অভিযানে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও হুথিদের পুরোপুরি পরাস্ত করা সম্ভব হয়নি। নতুন করে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হলে আবারও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটতে পারে, অথচ চূড়ান্ত সামরিক সাফল্যের নিশ্চয়তা থাকবে না।
অনিশ্চয়তার মুখে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চল
ইয়েমেনের সংঘাতের পাশাপাশি গাজায় যুদ্ধ, লেবাননে ইসরাইলের সামরিক অভিযান এবং ইরানকে ঘিরে সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরো অনিশ্চিত করে তুলেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো এখন এমন এক পরিস্থিতিতে পড়েছে, যেখানে পুরোনো নিরাপত্তা জোটের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, আবার নতুন সংঘাত মোকাবিলার পথও স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো কিংবা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে নতুন সমঝোতা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা সামনে এলেও এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন সহজ হবে না।
হুথিদের উত্থান এই নতুন বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়লে তার প্রভাব শুধু ইয়েমেন বা সৌদি আরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে এখন একদিকে সামরিক হুমকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পুরোনো মিত্রদের ওপর নির্ভরতা এবং সামরিক শক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি আঞ্চলিক কূটনীতি ও সংঘাত নিরসনের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করছে এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা।