হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

সুদের হার বাড়িয়ে কি হরমুজ খুলতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র

আল-জাজিরা

এআই দ্বারা নির্মিত ছবি।

যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার বাড়িয়ে কি হরমুজ প্রণালি খুলতে পারবে? ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফের একটি গাণিতিক সমীকরণ ঘিরে এখন এমন প্রশ্নই সামনে এসেছে।

বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার নির্ধারণে ব্যবহৃত ‘টেইলর রুল’ বদলে একটি নতুন সমীকরণ দেন। সেখানে তিনি হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দাবকে যুক্ত করেন। এর কয়েক ঘণ্টা পরই যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ নীতি সুদের হার ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়ায়।

গালিবাফ লিখেছেন, ‘দেখি তো, সুদের হার বাড়ালে হরমুজ প্রণালি খুলতে পারে কি না, কিংবা এক ব্যারেল তেল উৎপাদন করা যায় কি না।’

এরপর তিনি বলেন, ‘২৫ বেসিস পয়েন্ট দিয়ে কোনো চোকপয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।’

তার বক্তব্যে ‘SOH’ বলতে হরমুজ প্রণালি এবং ‘BEM’ বলতে বাব আল-মান্দাবকে বোঝানো হয়েছে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের বহু বিমান ভূপাতিত হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটির শত শত স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে বলে চলতি সপ্তাহের শুরুতে পেন্টাগন স্বীকার করেছে। এতে কয়েক শ কোটি ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জামের মজুতও ক্ষয় হয়েছে। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে গালিবাফের নতুন এই ‘অস্ত্র’—গণিতের সমীকরণ।

গালিবাফ গত ছয় মাসে বিভিন্ন পর্যায়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের আলোচনায় প্রধান আলোচকদের একজন ছিলেন। যুদ্ধের শুরুর দিক থেকেই তিনি আর্থিক ও অর্থনৈতিক যুক্তি ব্যবহার করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধ পরিচালনার ধরন নিয়ে ব্যঙ্গ করে আসছেন।

তার বক্তব্য ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তন না হলে অর্থনৈতিকভাবে ওয়াশিংটনকে চাপে ফেলতে সক্ষম ইরান।

এবার সেই ব্যঙ্গের হাতিয়ার হয়েছে গণিত।

আইজি গ্রুপের প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্প আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এটি ইরানের দারুণ এক প্রচারণামূলক কৌশল।’

তার মতে, ২০২৬ সালে ইরান অন্তত একটি বিষয়ে নজর কাড়ার মতো সক্ষমতা দেখিয়েছে—মার্কিন প্রতিপক্ষকে খোঁচা দেওয়া।

টেইলর রুল কী

টেইলর রুল হলো এমন একটি অর্থনৈতিক সূত্র, যার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনীতির শক্তির ভিত্তিতে একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার কোন পর্যায়ে থাকা উচিত, তার একটি ধারণা পাওয়া যায়।

অর্থনীতিবিদ জন টেইলর ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে এই সূত্রটি তৈরি করেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ফান্ডস রেটের সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও ‘আউটপুট গ্যাপ’ যুক্ত করা হয়। আউটপুট গ্যাপ হলো একটি অর্থনীতি যে পরিমাণ উৎপাদন করছে এবং তার সম্ভাব্য উৎপাদনক্ষমতার মধ্যে পার্থক্য।

সহজভাবে সূত্রটি হলো—

সুদের হার = মূল্যস্ফীতি + ০.৫ (আউটপুট গ্যাপ) + ০.৫ (মূল্যস্ফীতি − ২ শতাংশ) + ২ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রার ওপরে গেলে বা অর্থনৈতিক উৎপাদন সম্ভাব্য মাত্রার চেয়ে বেশি হলে এই সূত্র অনুযায়ী সুদের হার বাড়ার কথা। বিপরীতে মূল্যস্ফীতি কমলে বা অর্থনীতি সম্ভাবনার তুলনায় দুর্বল হলে সুদের হার কমার কথা।

তবে এটি কোনো বাধ্যতামূলক সূত্র নয়। ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার নির্ধারণের সময় অর্থনীতির আরো অনেক বিষয় বিবেচনায় নেয়।

ইরান যুদ্ধ কি যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার বাড়িয়েছে

বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি, ইরান যুদ্ধের পর জ্বালানি বাজারে ধাক্কা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বড় বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো শক্তিশালী।

বুধবার ফেডারেল রিজার্ভ নীতি সুদের হার ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়েছে। তিন বছরের মধ্যে এটিই ছিল প্রথম বৃদ্ধি। নতুন হার দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৭৫ থেকে ৪ শতাংশে।

ফেডের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ সুদের হার বাড়ানোর পর দেওয়া বক্তব্যে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত এবং এর ফলে পেট্রোলের দাম বেড়ে যাওয়া ফেডের কর্মকর্তাদের উচ্চ সুদের পক্ষে অবস্থান নিতে সহায়তা করেছে।

তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে চোখ সরিয়ে রাখার সুযোগ নেই।

আইজি গ্রুপের বিউচ্যাম্পের মতে, ইরান যুদ্ধ পরোক্ষভাবে এই সুদের হার বৃদ্ধির বড় কারণ।

তার ভাষায়, জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে বন্ডের মুনাফা বাড়ায় ফেড এমন এক পরিস্থিতিতে পড়েছে, যেখানে তার সামনে খুব বেশি পথ খোলা নেই।

ওয়েলথ ক্লাবের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুসানাহ স্ট্রিটারও বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে ইরানের পাল্টা হামলা জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও জোরালো হয়েছে।

তার মতে, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও অপরিশোধিত তেলের বাড়তি দাম ফেডের সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।

তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার ঠিক করছে ইরান

সংক্ষেপে, না।

স্ট্রিটারের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও তেলের বাড়তি দাম ফেডের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে। তবে এগুলোই একমাত্র কারণ নয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের বড় কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। শক্তিশালী মূলধনি বিনিয়োগ ও দেশের ভেতরে স্থিতিশীল চাহিদা মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে। তাই ফেডের নীতিনির্ধারকেরা অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেছেন।

স্ট্রিটার বলেন, তেল সরবরাহ ও দামের ওপর যুদ্ধের প্রভাবের কারণে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতিতে প্রভাব ফেলা কিছু অর্থনৈতিক শক্তির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নির্ধারণ করছে না ইরান। সুদের হার কোথায় থাকবে, সেই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ফেডারেল রিজার্ভের।

গালিবাফের সমীকরণের আসল অর্থ কী

গালিবাফের বক্তব্যকে সুদের হার নির্ধারণের কোনো বাস্তব প্রস্তাব হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। বরং এটি ইরানের অর্থনৈতিক প্রভাব দেখানোর একটি রাজনৈতিক বার্তা।

ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নেগার মোরতাজাভি বলেন, গালিবাফের বক্তব্যের মূল কথা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার বাড়ালেও হরমুজ প্রণালি আবার খুলবে না। এতে বন্ধ হয়ে যাওয়া তেল সরবরাহও স্বাভাবিক হবে না।

গালিবাফ প্রচলিত টেইলর রুলের সঙ্গে হরমুজ ও বাব আল-মান্দাবকে যুক্ত করেছেন। সাধারণত এই সূত্রে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক উৎপাদনের মতো বিষয় থাকে। গালিবাফের পরিবর্তিত সূত্রে তিনি দেখাতে চেয়েছেন, যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতির সঙ্গে সমুদ্রপথের নিরাপত্তারও সম্পর্ক রয়েছে। আর এই নিরাপত্তায় ইরানের প্রভাব রয়েছে।

মোরতাজাভির মতে, এটি মূলত ইরানের প্রভাবের কথা বলার একটি কৌশল। সুদের হার নির্ধারণের বাস্তব কোনো প্রস্তাব নয়।

এর আগে কীভাবে ব্যঙ্গ করেছেন গালিবাফ

গত মার্চে গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাজার ও জ্বালানি দামের বিষয়ে নিয়মিত মন্তব্য করেন। ট্রাম্প প্রশাসনের তেলের ভবিষ্যৎ বাজার বা অয়েল ফিউচার প্রভাবিত করার চেষ্টা নিয়েও তিনি ব্যঙ্গ করেন।

তার বক্তব্য ছিল, আর্থিক কৌশল ব্যবহার করে তেলের বাজারে প্রভাব ফেলা গেলেও পেট্রোল স্টেশনে বাস্তব জ্বালানি তৈরি করা যায় না।

গত মাসে তিনি ‘মেক আমেরিকা হাংরি এগেইন’ লেখা একটি ছবি প্রকাশ করেন। এটি ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগানের অনুকরণ। ছবিতে যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষুধার পরিসংখ্যানও দেওয়া হয়েছিল। তখন গালিবাফ বলেছিলেন, ‘মিথ্যা দাবি দিয়ে পরাজয় ঢেকে রাখা যায় না।’

এবার তার ব্যঙ্গের বিষয় হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতি।

গালিবাফের সমীকরণের সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। ফেডারেল রিজার্ভ ২৫ বেসিস পয়েন্ট সুদের হার বাড়ানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি সেটি প্রকাশ করেন। তার বারবার করা এসব আর্থিক মন্তব্যের লক্ষ্য হলো যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্যকে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের কাছে দাম, বাজার ও মুদ্রানীতির ভাষায় তুলে ধরা।

গালিবাফের বার্তাটি তাই মূলত এমন—ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়িয়ে অর্থনীতিতে চাহিদা কমাতে পারে। কিন্তু তাতে হরমুজ প্রণালি খুলবে না, তেল উৎপাদন বাড়বে না এবং ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলও সরাসরি স্বাভাবিক হবে না। এটাই তার ‘টেইলর রুল’ বদলে দেওয়ার ব্যঙ্গের মূল বক্তব্য।

এএম

ইসরাইলের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের আহ্বান রাশিদা তালিবের

সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রি নিয়ে সমালোচনার মুখে ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রথম মাসেই মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষতি ১৫ হাজার কোটি ডলার

হরমুজে সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত বাতিল করল দক্ষিণ কোরিয়া

ইয়েমেনে সেনাবাহিনী-হুথি-সৌদি সংঘাতে নিহত ৬৩

সৌদিকে অর্ধশত এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের সরকার পতন ঘটাব, হামাস-হিজবুল্লাহকে নির্মূল করব: নেতানিয়াহু

সৌদির অনুরোধে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে ইরানকে বার্তা চীনের

সৌদির তায়েফে হুথিদের ড্রোন, প্রতিহত করতে গিয়ে হতাহত ৩

মক্কায় হামলা হলে রক্ষায় কোনো চুক্তির প্রয়োজন নেই: খাজা আসিফ