হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জে বাজেট, চূড়ান্তে হিমশিম সরকার

এম আবদুল্লাহ

এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা লাগবে বিদ্যুৎ, এলএনজি, সারসহ কয়েকটি খাতের ভর্তুকি ও প্রণোদনায়। পে স্কেল আংশিক বাস্তবায়নে লাগবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। মোটা অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করতে হবে মেগা প্রকল্প পদ্মা ব্যারাজ ও মেট্রোরেলের নতুন দুটি লেনে। অর্থ লাগবে ৪০ হাজার কোটি টাকার বোয়িং এয়ারক্রাফট ক্রয়চুক্তির অনুকূলে। বিভিন্ন ধরনের কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক সহায়তা খাতে লাগবে বিপুল অর্থ। খাল খননসহ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অন্যান্য ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় অঙ্কের চাহিদা।

পক্ষান্তরে সামগ্রিক অর্থনীতি মন্দার কবলে। রেমিট্যান্স ছাড়া সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো নেতিবাচক ধারায়। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির অঙ্ক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অর্থ সংকটে সরকার ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা ধার করে চলছে। ইরান-যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির রেশে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। নিত্যপণ্যের বাজারে অসহনীয় উত্তাপ। জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে সীমিত আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস অবস্থা। এমন বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ ও চাপ নিয়েই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করতে হচ্ছে নতুন সরকারকে। হিসাব মেলাতে রীতিমতো হিমশিম অবস্থা। আগামী ১১ জুন সংসদে বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

গণঅভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের প্রথম বাজেটকে জনবান্ধব করার চ্যালেঞ্জ উতরাতে গিয়ে ঘামছেন নীতিনির্ধারকরা। রাতদিন একাকার করে কাজ করছেন বাজেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী হিসাব কষছেন দফায় দফায়। নির্দেশনা দিচ্ছেন নিয়মিত। তিন সপ্তাহের মাথায় ৭ জুন সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হবে। এরপর ১১ জুন উপস্থাপন করা হবে বাজেট। তার আগে সাত দিনের ঈদুল আজহার ছুটি। ঈদের আগে কর্মদিবস আছে মাত্র ছয়টি। বাজেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল বৃহস্পতিবারও বেশকিছু খাতের বিষয়ে সরকারের চূড়ান্ত নির্দেশনার অপেক্ষায় ছিলেন তারা।

করজাল বিস্তৃত করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় সাত লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে যাচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বিভাগ। যদিও অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে ৯৮ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি কোনোভাবেই আগামী অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পক্ষে সায় দিচ্ছে না। নতুন বাজেটে এডিপির আকারও বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ তিন লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৩৯ শতাংশই থাকবে থোক ও বিশেষ বরাদ্দের আওতায়। এ নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। বাজেটের ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক ঋণ থেকে এক লাখ ১০ হাজার কোটি এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে।

অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর সবশেষ নির্দেশনার আলোকে সীমিত আয়ের মানুষদের স্বস্তি দিতে বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করছাড়ের কথা ভাবা হচ্ছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে বিলাসবহুল জীবনযাপন ও উচ্চমূল্যের পণ্যের ওপর বাড়তি করারোপের প্রস্তাবনাও থাকবে এবারের বাজেটে। সীমিত আয়ের মানুষের জীবনে স্বস্তি আনতে বাজেটে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, আটা, ময়দা, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন মসলার ওপর বিদ্যমান উৎসে কর বাতিল করা হতে পারে বলে সূত্র আভাস দিয়েছে। পাশাপাশি নিত্যপণ্যের ওপর আরোপিত ১ শতাংশ টার্নওভার করও যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনার চিন্তা করা হচ্ছে। তবে অন্যান্য করের পরিধি একেবারে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত করারও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন প্রথম সরকারের প্রথম বাজেট ঘিরে জনপ্রত্যাশা ব্যাপক। সে কারণেই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ে অনিশ্চয়তার মাঝেই কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধিতে জোর দিয়ে বড় বাজেটের পরিকল্পনা করতে হচ্ছে সরকারকে। বলা হচ্ছে, আসন্ন বাজেটে বড় আকারের সম্প্রসারণমূলক পরিকল্পনা থাকছে। নতুন বাংলাদেশে জনআকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করা এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিকে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরানোই এ বাজেটের মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র দাবি করছে।

আগামী বাজেটে প্রস্তাবিত রাজস্ব আহরণকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, সামনের বাজেটের মূল সমস্যা আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহ। এই বিপুল অর্থের জোগান কীভাবে আসবে, সেটি বড় প্রশ্ন।

সূত্রমতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট হবে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। সাধারণত একটি বাজেট থেকে আরেকটি বাজেটে প্রবৃদ্ধি থাকে ১০-১৫ শতাংশ। কিন্তু নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশার বিপুল চাপের কারণে এটি ২৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকছে বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সোয়া ৯ লাখ কোটি টাকার বাজেটে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে অর্থ বিভাগ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুত করা খসড়া বাজেট থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

দেশে এখন পর্যন্ত রাজস্ব আহরণের সর্বোচ্চ রেকর্ড চার লাখ ৩৩ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরে এসেছে। আগামী বাজেটের খসড়ায় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ঠিক থাকলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চলতি বছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় অন্তত দেড় লাখ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় করতে হবে। আর অতিরিক্ত এ রাজস্ব সংগ্রহে এনবিআরকে বিভিন্ন খাতে কর অব্যাহতি কমানো, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বাড়ানো এবং আমদানিপণ্যের ট্যারিফ রেটকে বাজারভিত্তিক করার মতো কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে। উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি ও কর ফাঁকি রোধের নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে এটি কমিয়ে সাত লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা। মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে দুই লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা কম। রাজস্ব আদায়ের এ ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থবছর শেষে ঘাটতির অঙ্ক সোয়া লাখ কোটিতে ঠেকতে পারে। অবশ্য চলতি অর্থবছরের শুরুতে এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল চার লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। পরে গত ১০ নভেম্বর বাজেট মনিটরিং ও সম্পদ কমিটি তা বাড়িয়ে পাঁচ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করে।

এডিপিতে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে ২০ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ছয়গুণ বেশি। এতে এ খাত ১৫তম অবস্থান থেকে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। উন্নয়ন বাজেটে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ থাকছে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে। এর পরের অবস্থান বিদ্যুৎ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায়।

বর্তমানে কর-জিডিপির অনুপাত কমে ৭ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর, করের আওতা বাড়ানো, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং করবহির্ভূত রাজস্ব বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেবে সরকার। এছাড়া এনবিআরের বাইরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। চলতি অর্থবছরের আট মাসে এ খাত থেকে পাঁচ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা আদায় হলেও আগামী বছরে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকা।

ঢাউস সাইজের বাজেট করতে গিয়ে ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে দুই লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। অথচ চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার আগের অর্থবছরের তুলনায় কম হলেও বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে জিডিপির ৩ দশমিক ৪ শতাংশ, যা আগামী বাজেটের প্রাক্কলিত ঘাটতির তুলনায় বেশি। এ ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে এক লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেটের খসড়ায় নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কল্যাণমূলক কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি ও দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনীতিকে উচ্চতর প্রবৃদ্ধির ধারায় নিয়ে যাওয়া, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি খাতে সহায়তা বাড়ানো, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং ডি-রেগুলেশনের মাধ্যমে বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতা দূর করাও তারেক রহমান সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। বলা হচ্ছে, সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশকে বাজেটে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এজন্য চলচ্চিত্র, সংগীত-শিল্প, স্পোর্টস ও গ্রামীণ সংস্কৃতি বিকাশে বাজেটে বাড়তি গুরুত্ব থাকছে। ইতোমধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্রীড়া ও সংগীত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার ঘোষণার পাশাপাশি অ্যাথলেটদের জন্য প্রণোদনা দেওয়া শুরু করেছে বিএনপি সরকার।

এডিপির আকার বাড়ছে ৫০ শতাংশ

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দ বর্তমান সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে তিন লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। দেশের ইতিহাসে এটিই হতে যাচ্ছে সর্বোচ্চ উন্নয়ন বাজেট। এর ফলে সরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে বলে আশা করছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। উন্নয়ন বাজেটে নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন ও বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে আরো ২০ হাজার ৭৫১ কোটি ১০ লাখ টাকার থোক বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশই এবার সামাজিক ও বিশেষ সহায়তা কর্মসূচির আওতায় যাচ্ছে।

১৭ হাজার কোটি টাকার বিশেষ সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য রাখা হয়েছে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কৃষক কার্ডের জন্য এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং ইমাম-পুরোহিতদের ভাতার জন্য এক হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা সহায়তা দেওয়া হবে। প্রস্তাবিত বরাদ্দ অনুযায়ী প্রায় ৪৮ লাখ ৩০ হাজার পরিবার এ সুবিধা পেতে পারে। গড় পরিবার সদস্যসংখ্যা বিবেচনায় সরাসরি উপকারভোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় দুই কোটি ছয় লাখ।

উন্নয়ন বাজেটে থোক বরাদ্দের উচ্চহার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অর্থনীতিবিদরা। প্রস্তাবিত এডিপির মধ্যে প্রায় এক লাখ সাত হাজার ২০১ কোটি টাকা রাখা হচ্ছে নতুন প্রকল্প অনুমোদনসহ বিভিন্ন খাতে থোক বরাদ্দ হিসেবে। এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে আরো ৯ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা সংরক্ষিত রাখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে মোট এডিপির প্রায় ৩৯ শতাংশই থাকবে থোক ও বিশেষ বরাদ্দের আওতায়।

ভর্তুকি-প্রণোদনায় এক লাখ ১৬ হাজার কোটি

এদিকে বাজেটের আকার বড় হলেও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে ভর্তুকি বরাদ্দ পুরোপুরি প্রাক্কলন করা হয়নি। আগামী অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৩৭ হাজার কোটি টাকা, এলএনজিতে ছয় হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সারে ২৭ হাজার কোটি টাকা ও খাদ্য সহায়তায় ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দসহ মোট ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণে এক লাখ ১৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে এক লাখ ১২ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা।

ইরান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরের মার্চ-জুন সময়ে অতিরিক্ত ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির চাপ সৃষ্টি হয়েছে বলে সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটের প্রাক্কলিত নথিতে সতর্ক করা হয়েছে, এই অস্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হলে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের ভর্তুকি আরো বাড়তে পারে।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে কৃষি খাতে প্রণোদনা, রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনা এবং পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে প্রণোদনায় বরাদ্দের পরিমাণ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়তে থাকায় এ খাতে প্রণোদনায় বরাদ্দ ৮০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে সাত হাজার কোটিতে উন্নীত করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

ঋণনির্ভরতা বাড়ছে

চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশকে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪০৯ কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭৪ কোটি ডলার বেশি। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৩৩৫ কোটি ডলার এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ২৬৭ কোটি ডলার। মূলত বৈশ্বিক সুদহার বৃদ্ধি পাওয়ায় ঋণ পরিশোধ ব্যয়ও দ্রুত বেড়ে গেছে।

চলতি অর্থবছরে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধেই বরাদ্দ ছিল প্রায় এক লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। আগামী বাজেটে এ ব্যয় আরো বেড়ে এক লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছাচ্ছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে জ্বালানি ভর্তুকিও বাড়ছে। এর সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও নতুন বেতন কাঠামোর চাপ যোগ হওয়ায় বাজেটের আকারও বড় হচ্ছে। ফলে বাজেট ঘাটতি জিডিপির প্রায় পাঁচ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সরকারি ব্যয় বেড়েই চলেছে

৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেটে উন্নয়ন খাতে থাকছে তিন লাখ কোটি। বাকি ছয় লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা অনুন্নয়ন খাতে। উন্নয়ন খাতের দ্বিগুণেরও বেশি অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় অর্থনৈতিক মানদণ্ডে উৎসাহব্যঞ্জক নয়। সরকারের এ অনুন্নয়ন বা পরিচালন ব্যয় লাফিয়ে বাড়ছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারি ব্যয় কমানোর নানা উদ্যোগের কথা বলেছিল। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়ন, ভর্তুকি ও ঋণের সুদ খাতে ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে বাড়াতে হচ্ছে অনুন্নয়ন বাজেট।

অর্থনীতিবিদদের মতামত

জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আমার দেশকে বলেন, বাজেটের আকার ও ব্যয় বৃদ্ধির যে গতানুগতিক ধারা বা সংস্কৃতি—সেটাই দেখা যাচ্ছে। এটা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে করা হচ্ছে; কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে এটা মানানসই নয়। রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, এটা কখনো আদায় সম্ভব নয়। যত ভালো পদক্ষেপই নেওয়া হোক না কেন, এটা আদায় হবে না। ক্রিকেট খেলার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, যত ভালো খেলোয়াড়ই হোক না কেন, একটি বলে ছক্কার বেশি কেউ রান করতে পারবে না। আবার চাইলে প্রতি বলে ছক্কা মারাও যায় না। কিন্তু সরকার মনে হয় প্রতি বলেই ছক্কা মারতে চাইছে। এতে কিন্তু আউট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বরং বেড়ে যাবে। রাজস্ব আয় করতে না পারলে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিতে হবে। কিন্তু তারও একটি সীমা রয়েছে। তাহলে সরকারকে টাকা ছাপাতে হবে। কিন্তু টাকা ছাপিয়ে তো এটা করা যাবে না।

তিনি আরো বলেন, বর্তমানে অর্থনীতি স্থবির, প্রবৃদ্ধি দুর্বল এবং মূল্যস্ফীতি উচ্চ। বিদ্যুৎ, গ্যাস, সারের সংকট রয়েছে। সরকার ব্যয় বাড়িয়ে এসব সংকট কি মোকাবিলা করতে পারবে? বরং সরকারের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যাবে, সুদহারও বাড়বে। এর ফলে পরোক্ষভাবে মুদ্রার বিনিময় হারে অস্থিরতা তৈরির শঙ্কা রয়েছে। ফলে সংকট সমাধান করতে গিয়ে সংকট আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রশ্নে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, অর্থনীতি ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। আমি কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছি না। সরকারের ঋণের পরিমাণ বাড়ছেই, রপ্তানি আয় নিম্নগামী। বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পাহাড়। ব্যাংকগুলো চলছে না। জোর করে এগুলো চালানোর চেষ্টা চলছে। সরকারের পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। সুদ ও করের উচ্চহার দিয়ে কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য হয় না। কর্মসংস্থান তৈরি করতে হলে শিল্পায়ন করতে হবে। কিন্তু গ্যাস না থাকায় কল-কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এসব বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবসম্মত বাজেট প্রণয়ন জরুরি।

ক্রমবর্ধমান শক্তিধর চীন সফরে ইরান যুদ্ধে দুর্বল ট্রাম্প

পদ্মা ব্যারাজের স্বপ্নপূরণ হচ্ছে

লাগেজ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, যাত্রী ভোগান্তি চরমে

বাংলাদেশবিরোধী পদক্ষেপ শুরু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর

পুলিশ পদকের জন্য মনোনীত জুলাই অভ্যুত্থানে বিতর্কিতরা

ফাঁসির রায় লেখা হয় আইন মন্ত্রণালয়ে

বস্তাবন্দি ডজন ডজন সুপারিশ, বাস্তবায়ন হাতেগোনা

আন্তর্জাতিক রুটে গন্তব্য বাড়াতে পারছে না বিমান

ভেজা ধান নিয়ে চরম বিপাকে হাওরাঞ্চলের কৃষক

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে জুনে