আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কানসাট বাজার জমে উঠতে শুরু করেছে। মৌসুমের শুরুতেই উপজেলার বিভিন্ন বাগান থেকে ক্ষীরশাপাতি, লক্ষ্মণভোগ, গুটি, ল্যাংড়া ও আগাম জাতের আম বাজারে উঠতে শুরু করায় সরগরম হয়ে উঠেছে বৃহৎ এ আমের বাজার। প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বাজারে চলছে জমজমাট বেচাকেনা।
চাষিদের দাবি, গত বছরের তুলনায় এবার আম উৎপাদনের খরচ বেড়েছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় আমের আকারও কিছুটা ছোট হয়েছে। বাজারে আমের দাম গতবারের তুলনায় কম। চাষিরা জানায়, গত বছর এ সময়ে ক্ষীরশাপাতি আমের দাম ছিল দুই হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার ৮০০ টাকা মণ। বর্তমান বাজারে ক্ষীরশাপাতি আম এক হাজার ৩০০ থেকে দুই হাজার ৪০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। গুটি জাতের লখনা আম ছয়শ থেকে আটশ টাকা, ল্যাংড়া আম এক হাজার ৩০০ থেকে দুই হাজার টাকা মণ। এছাড়া আমের আকার ও ওজনভেদে দাম নির্ধারিত হচ্ছে। বাজারে আমের সরবরাহ বাড়লেও পর্যাপ্ত দাম না পাওয়ায় হতাশ চাষিরা। তাদের মতে, পর্যাপ্ত আম সরবরাহ থাকলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বেপারী বাজারে আসেনি।
আগামী সপ্তাহে বেপারীদের উপস্থিতি বাড়লে দামও বাড়তে পারে বলে আশা করছেন তারা। আমচাষি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বাজারে আম পর্যাপ্ত থাকলেও ক্রেতা কম। এ কারণে লোকসানের মধ্যে রয়েছি। তবে ক্রেতা বাড়লে ভালো দাম পাওয়া যাবে। আম চাষে প্রচুর খরচ হয়। ইতোমধ্যে সাত থেকে আটবার স্প্রে করা হয়েছে। কীটনাশক ও শ্রমিক খরচও অনেক। পর্যাপ্ত দাম না পেলে ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ কাটিয়ে কিছুটা হলেও লাভ করতে পারবেন—দাবি এ চাষির। আরেক আমচাষি আনারুল ইসলাম বলেন, এ বছর আমের দাম খুবই কম। বাগান পরিচর্যায় যে পরিমাণ খরচ হয়েছে, বর্তমান দামে তা উঠবে না। কৃষক ও আমচাষিরা হতাশাগ্রস্ত। আমের ন্যায্যমূল্য চান। কানসাট আমবাজার ঘুরে দেখা গেছে, ভোর থেকেই উপজেলার বাগান মালিক ও চাষিরা পিকআপ, ভ্যান ও ছোট ট্রাকযোগে আম নিয়ে আসছেন বাজারে।
এদিকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পাইকাররা বাজারে ভিড় শুরু করেছেন। দরদাম শেষে ট্রাকভর্তি করে আম কিনে পাঠানো হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। শরিফুল ইসলাম নামের এক আমচাষি বলেন, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আমের ফলন তুলনামূলক ভালো হয়েছে। তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভালো দাম পাব বলে আশা করেছিলাম। কিন্তু বাজারে দাম নেই।
আমচাষি আবদুর রহমান বলেন, বাগান পরিচর্যা, কীটনাশক, সার, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি আম পাড়া, পরিবহন ও বাজারজাতকরণেও অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। সব মিলিয়ে খরচ বেড়ে গেলেও সেই অনুপাতে নেই দাম। তারপরও লাভ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ থাকলে দাম আরো কমে যায়। কয়েক মাসের পরিশ্রমের সঠিক মূল্য নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন। ব্যবসায়ীরা বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখনো পুরোপুরি আমের চাহিদা তৈরি হয়নি। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় ও বাজার পরিস্থিতির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। তবে কয়েকদিনের মধ্যে বাজারে চাহিদা বাড়লে আমের দাম কিছুটা বাড়তে পারে বলেও আশা করেন। কানসাট বাজারের ইজারাদার আমিনুল ইসলাম বলেন, এবার আমের উৎপাদন ভালো হয়েছে। বাজার শুরু হয়েছে তিন-চার দিন হলো। উৎপাদন খরচের তুলনায় চাষিরা কম দাম পাচ্ছেন। এতে তাদের কিছুটা ক্ষতি হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. ইয়াসিন আলী বলেন, আমের দাম এখন প্রায় ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে বাজারে। এতে কৃষকের লোকসান হবে না। যদিও দাম আরো একটু বেশি হলে ভালো হতো। তিনি আরো বলেন, চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় মোট ৩৭ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে চার লাখ ৫৮ হাজার টন।