লাঠিচার্জে সরাল সেনাবাহিনী
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বাকলিয়া এলাকার বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটারদের যেতে বাধা দেওয়ার অভিযোগে লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে সেনাবাহিনী।
বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে ডিসি রোডের সরু গলিতে এ ঘটনা ঘটে। হঠাৎ বাধার কারণে কেন্দ্রমুখী ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাকলিয়া থানার বড় মিয়া মসজিদ এলাকার পাশে অবস্থিত বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। এ ভবনে আজকের নির্বাচনে তিনটি কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। কেন্দ্র–১–এ মোট ভোটার সংখ্যা ৪ হাজার ২৩৭ জন। সকাল থেকে তুলনামূলকভাবে কম ভোট পড়ছিল। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর ভোটারদের কেন্দ্রগামী সরু গলিতে কয়েকজন যুবক অবস্থান নিয়ে ভোটারদের থামানোর চেষ্টা শুরু করে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
গলি হওয়ায় দ্রুত মানুষের ভিড় জমে। কয়েকজন নারী ভোটার ফিরে যেতে বাধ্য হন। হিন্দু ভোটাররা বিশেষভাবে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, যারা বাধা দিচ্ছিল তারা নিজেদের একটি রাজনৈতিক পক্ষের সমর্থক পরিচয় দিচ্ছিল।
বাধা দেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই কেন্দ্র তত্ত্বাবধানে থাকা সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তিনটি টহল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে। সেখানে গিয়ে তারা প্রথমে বাধা সৃষ্টিকারীদের সরে যেতে বলেন। কিন্তু অনেকে তাতে সাড়া না দিলে সেনাসদস্যরা লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেন।
সেনাবাহিনীর টহল দল সূত্র জানায়, প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভোটারদের নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে পৌঁছানো নিশ্চিত করা। ঝুঁকি দেখা দেওয়ায় তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেয় এবং ওই এলাকা পরিষ্কার করে দেয়। পরে সেনাসদস্যরা গলির মুখে দাঁড়িয়ে ভোটারদের নিরাপদে ভেতরে নিয়ে যেতে সহযোগিতা করেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে।
ঘটনাস্থলে গিয়ে অন্তত তিনজন হিন্দু ভোটারের সঙ্গে কথা হয়। তারা প্রত্যেকে বলেন, সকাল ১০টার পর ভোট দিতে এসে বাধার মুখে পড়েন।
এক হিন্দু নারী ভোটার বলেন, ‘আমরা দু’জন একসঙ্গে ভোট দিতে যাচ্ছিলাম। গলিতে ঢুকতেই কয়েকজন বলে—ওদিকে যাওয়া যাবে না। আমরা ভয় পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। পরে সেনাবাহিনী আসলে আমরা ভোট দিতে পারি।’
অন্য একজন পুরুষ ভোটার বলেন, ‘নির্বাচনের দিন ভোট দিতে এসে এমন হুমকি পাব ভাবিনি। সেনাবাহিনী না এলে বোধ হয় আমাদের ভোট দেওয়া হত না।’
তাঁদের মতে, সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ায় হিন্দু ভোটারদের মধ্যে স্বস্তি ফেরে।
চেয়ার প্রতীক সমর্থক ও স্থানীয় কর্মী ওসমান গনি অভিযোগ করে বলেন, ‘সকালের দিকে একটা পক্ষ বিশেষভাবে হিন্দু ভোটারদের ভয় দেখিয়ে ফিরিয়ে দিচ্ছিল। আমরা বিষয়টি জানাই। পরে সেনাবাহিনী এসে দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেয়।’ তিনি আরও বলেন, সেনাবাহিনী দায়িত্ব নেওয়ার পর ভোটারদের কেন্দ্রে আসা স্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে।
বাধা দেওয়ার অভিযোগের সত্যতার অন্যতম প্রমাণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য হলো একাধিক কেন্দ্রের ভোটগ্রহণের হারের হঠাৎ পরিবর্তন।
কেন্দ্র–১: সকাল ১১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ভোট পড়ে ৩৩.৩৫%। সেনাবাহিনী দায়িত্ব নেওয়ার পর দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে তা বেড়ে হয় ৪০.০১%।
কেন্দ্র–২: সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে ভোট পড়ে ২২%, দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে তা বেড়ে ৩৩% কেন্দ্র–৩: সকাল ১০টায় ভোট পড়ে ১৪.৬৮%, দুপুর ২টায় তা বেড়ে ৩৯.১৬%। নির্বাচন–সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাধা অপসারণের পর ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়ার এ পরিবর্তনই প্রমাণ করে সকালে বাধার প্রভাব ছিল।
দুপুর আড়াইটার দিকে কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, তিনটি কেন্দ্রেই পুরুষ–নারী–বয়স্ক ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। অনেকে বলেন, সেনাবাহিনীর টহলের পর তারা নিরাপদ মনে করে ভোট দিতে এসেছেন।
কেন্দ্র এলাকায় পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসারের পাশাপাশি সেনাসদস্যদের টহল বাড়ানো হয়েছে। নিরাপত্তায় নিয়োজিত এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘ঘটনা শুরুর পর থেকে আমরা এলাকায় সতর্ক অবস্থানে আছি। পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে।’