চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানার লকআপে থাকা এক যুবলীগ কর্মীর পরিবার ও দলীয় কর্মীদের সঙ্গে কথোপকথনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। থানার লকআপে থাকা কোনো আসামি কি বাইরের লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে পারেন? আর পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয়ের দাবি করা বা সুবিধা পাওয়ার আশ্বাস দেওয়া কতটা গ্রহণযোগ্য?
গত শনিবার মো. শুক্কুর নামে ওই যুবলীগ কর্মীকে জনতা আটক করে থানায় সোপর্দ করে। ওই দিন লকআপে থাকা অবস্থার ভিডিওটি আজ সোমবার ভাইরাল হয়।
ভিডিওতে দেখা যায়, সিআরবি ও এনায়েত বাজার ওয়ার্ড যুবলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত মো. শুক্কুর লকআপে থেকে পরিবার ও দলীয় কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। একপর্যায়ে তিনি দাবি করেন, ‘ওসি আফতাব ভাই’ ও ‘সেকেন্ড অফিসার নওশাদ’ তার পরিচিত এবং তাদের পক্ষ থেকে কোনো অসুবিধা হবে না বলে আশ্বাস পেয়েছেন। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ওসি আফতাব উদ্দিন বলেন, পরিবারের সদস্যরা থানায় এসে দেখা করেছেন। তখন কেউ একজন ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আসামিরা অনেক ধরনের কথাবার্তা বলে থাকে। তার কথার দায় পুলিশ নেবে কেন?’
আইন ও বিধিতে আছে, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মৌলিক নীতিমালা অনুযায়ী গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দিতে হয়। একই সঙ্গে নিকটাত্মীয়দের কাছে গ্রেপ্তারের তথ্য জানানো এবং সীমিত পরিসরে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়ার বিধানও রয়েছে। তবে লকআপে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে বাইরের লোকজনের অবাধ যোগাযোগ বা অনিয়ন্ত্রিত সাক্ষাতের সুযোগ নেই।
পুলিশের অভ্যন্তরীণ বিধি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় কোনো সাক্ষাৎ হলে তা সাধারণত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অনুমতি ও তদারকিতে হয়ে থাকে। সাক্ষাতের সময় নিরাপত্তা, তদন্তের স্বার্থ এবং লকআপের শৃঙ্খলা বিবেচনায় রাখা হয়। ফলে কোনো আসামি লকআপের ভেতর থেকে ইচ্ছামতো লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন বা দীর্ঘ সময় আলাপ করবেন—এ ধরনের সুযোগ নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আইনবিদ, মানবাধিকার সংগঠক, সমাজকর্মী ও কলামিস্ট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, কোনো আসামি পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা বা বিশেষ সুবিধা পাওয়ার দাবি করলে তা সত্য কি না, সেটি আলাদা বিষয়। তবে এমন বক্তব্য জনমনে পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে পরিচিত বা আলোচিত কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে এ ধরনের মন্তব্য তদন্ত ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভাবমূর্তির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, একজন গ্রেপ্তার ব্যক্তির পরিবারের সঙ্গে দেখা করার অধিকার আছে। কিন্তু সেই সাক্ষাতের পরিবেশ, সময়, নিরাপত্তা এবং কথোপকথনের ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ থানার লকআপ কেবল হেফাজতের স্থান নয়; এটি বিচারপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব।
এমএইচ