২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর। ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে বর্ণাঢ্য আয়োজন। লাল ফিতা। মাইকে বক্তৃতা। উৎসুক জনতা। শেষ পর্যন্ত কাঁচি চলল। চালু হলো দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ। ১১ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকায় দেশ পেল ১০১ কিলোমিটারের (কিমি) আধুনিক রেললাইন।
কিন্তু ফিজিবিলিটি স্টাডিতে যে ২৩ জোড়া ট্রেন চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, সেখানে চলছে মাত্র দুই জোড়া ইন্টারসিটি আর দুটি লোকাল ট্রেন। বাকি ট্রেন? কোচ নেই। ইঞ্জিন নেই। রেলওয়েতে এই হলো সবচেয়ে পুরোনো গল্পÑ ফিতা কাটা হয়, ট্রেন চলে না।
এরকম ট্রেন না চলতে চলতে ৩১৬ কিমিতে বছরের পর বছর ধরে ঘাস জন্মেছে রেললাইনের ফাঁকে ফাঁকে। মরিচা পড়েছে লোহায়, স্লিপারে ধরেছে পচন। ফেনীর বিলোনিয়া থেকে নরসিংদীর মদনগঞ্জ। দেশের একাধিক শাখা রেললাইন দশকের পর দশক ধরে পড়ে আছে কোনো ট্রেন চলাচল ছাড়াই। অথচ এই লাইনগুলো নির্মাণ, সংস্কার আর রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে নতুন রেললাইন তৈরি হচ্ছে, কিন্তু সেখানেও চলছে না ট্রেন। চালানোর মতো লোকোমোটিভ নেই, কোচ নেই, জনবলও নেই। ফলে রেলে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো পরিণত হয়েছে কাগুজে অগ্রগতি।
রেলের তথ্যমতে, রেল উন্নয়নে গত এক দশকে এক লাখ ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে। নির্মিত হয়েছে নতুন নতুন রেলপথ, স্টেশন ও অবকাঠামো। তবে বিপুল এই বিনিয়োগের পরও দেশের উল্লেখযোগ্য অংশের রেলপথে এখনো ট্রেন চলাচল শুরু হয়নি। তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৩১৬ কিমি রেলপথে কোনো ট্রেন চলাচল করছে না। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলে রয়েছে ১৮০ কিমি এবং পশ্চিমাঞ্চলে ১৩৬ কিমি রেলপথ।
কর্মকর্তারা বলছেন, ইঞ্জিন ও কোচের ঘাটতির পাশাপাশি তীব্র জনবল সংকটের কারণে এসব রুটে ট্রেন চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। নতুন রেললাইন নির্মাণ হলেও প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভ, বগি ও পরিচালনাকর্মী না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে অবকাঠামো কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে। এর অন্যতম উদাহরণ ঈশ্বরদী-রূপপুর রেলপথ। প্রায় ৩৩৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই রুটে এখন পর্যন্ত একটি ট্রেনও চলেনি। অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সম্পদের অভাবে রেলপথটি যাত্রীসেবায় যুক্ত করা যায়নি।
জনবল সংকটের চিত্রও উদ্বেগজনক। রেলওয়ের অনুমোদিত পদের সংখ্যা ৪৭ হাজার ৭০৩। অথচ বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২২ হাজার ৭৯০ জন। জনবল না থাকায় ১৩০টি রেলস্টেশন বন্ধ রয়েছে।
রেল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন রেলপথ নির্মাণের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ইঞ্জিন, কোচ ও জনবল নিশ্চিত করা না গেলে অবকাঠামোগত বিনিয়োগের পুরো সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।
ইঞ্জিন ও কোচ সংকটের কথা স্বীকার করে রেল পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট মোহাম্মদ সফিকুর রহমান বলেন, কোচ ও ইঞ্জিনের ঘাটতির কারণে নতুন রুটগুলোতে পর্যাপ্ত ট্রেন চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, নতুন রুট চালু করতে হলে শুধু রেললাইন থাকলেই হয় না, পর্যাপ্ত ইঞ্জিন, কোচ, চালক, গার্ড, স্টেশন মাস্টারসহ সংশ্লিষ্ট জনবল প্রয়োজন হয়। এসব সীমাবদ্ধতার কারণেই অনেক রুটে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া যাচ্ছে না।
নতুন লাইনে ট্রেন আসেনি
বিগত ১৫ বছরে ৯৪৮ কিমি নতুন রেললাইন নির্মাণ হয়েছে। ২০০৯-২০২৪ সালের মধ্যে আটটি নতুন রেলরুট নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৭১ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা। কিন্তু এসব রুটে পরিকল্পিত সেবার সামান্যই চালু হয়েছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালামাল পরিবহনের জন্য ৩৩৫.৯৭ কোটি টাকায় ঈশ্বরদী–রূপপুর (২৬.৩৫ কিমি) রেললাইন নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু এই লাইনে এখন পর্যন্ত একটি ট্রেনও চলেনি।
বিষয়টি নিশ্চিত করে পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফরিদ আহমেদ বলেন, ঈশ্বরদী–রূপপুর রুটে এখনো ট্রেন চলেনি।
দোহাজারী–কক্সবাজার (১০১ কিমি) রেললাইন ১১ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকায় নির্মিত হয়। এই রুটে ফিজিবিলিটি স্টাডিতে ২৩ জোড়া ট্রেন চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। বাস্তবে চলছে মাত্র দুই জোড়া ইন্টারসিটি ও দুটি লোকাল ট্রেন।
পদ্মা সেতু–যশোর রুট (১৬৯ কিমি) ৩৭ হাজার ৪০১ কোটি টাকায় নির্মিত হয়। এই রুটে ২৪ জোড়া ট্রেন চলানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু লোকোমোটিভ ও কোচ সংকটের কারণে এই মুহূর্তে চলছে মাত্র ছয়টি ট্রেন।
ঈশ্বরদী-পাবনা-ঢালারচরে (৬৩.৮২১ কিমি) ২০১০-২০২৫ সালের মধ্যে চার হাজার ২২৫ কোটি টাকায় নির্মিত এই রুটে আট স্টেশন ভবন এবং দুটি ফুটব্রিজ তৈরি হয়েছে। সেখানে চলছে মাত্র একটি কমিউটার ট্রেন।
রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন বলেছেন, পদ্মা-যশোর রুটে ৪০টি ট্রেন চালানোর সক্ষমতা থাকলেও কোচের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, চীন থেকে আনা ১০০টি কোচ এই রুটের বদলে অন্য রুটে ব্যবহার করতে হচ্ছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে রেলওয়েতে মোট বিনিয়োগ হয়েছে এক লাখ ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি। এই বিনিয়োগে নির্মিত হয়েছে ৩৩০.১৫ কিমি নতুন রেললাইন, ২৪৮.৫০ কিমি মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর এবং এক হাজার ১৩৫.২৩ কিমি পুনর্বাসন বা পুনর্নির্মাণ। নির্মিত হয়েছে ৯১টি নতুন স্টেশন ভবন এবং পুনর্বাসন হয়েছে ১৭৭টি। তৈরি হয়েছে ২৯৫টি নতুন রেলসেতু।
তারপরও বর্তমানে রেলওয়ের কাছে মাত্র ২৯৪টি লোকোমোটিভ আছে, যার বেশিরভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ। যাত্রীবাহী কোচ রয়েছে এক হাজার ৮৩৮টি। এরও উল্লেখযোগ্য অংশ পুরোনো। ঢাকা-চট্টগ্রাম ডাবল লাইন থেকে শুরু করে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ পর্যন্ত সর্বত্র একই সমস্যাÑ অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেই অবকাঠামো ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভ, কোচ এবং দক্ষ জনবল নেই।
কেন পুনরুদ্ধার হয় না?
বিশেষজ্ঞ ও রেল কর্মকর্তারা কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে পরিকল্পনায় সমন্বয়হীনতা। ট্র্যাক নির্মাণ করা হয়েছে, কিন্তু সেই ট্র্যাকে চলানোর জন্য রোলিং স্টক কেনার প্রকল্প নেওয়া হয়নি।
বিদেশি ঋণ জটিলতাও একটি বড় কারণ বলছেন বিশেষজ্ঞরা। বগুড়া-সিরাজগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে ভারতীয় এক্সিম ব্যাংকের ঋণের প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ঝুলে থেকেছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ভারতীয় অর্থায়ন বাতিল করলে প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। ভূমি দখলের কারণে অনেক পরিত্যক্ত রেললাইনের জায়গা স্থানীয়ভাবে দখল হয়ে গেছে। উচ্ছেদ ও আইনি প্রক্রিয়া জটিল এবং ব্যয়বহুল। রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের অনুপস্থিতির কারণে পুরোনো শাখা লাইন পুনরুদ্ধারে রাজনৈতিক মনোযোগ কম। ফিতা কাটার সুযোগ থাকা নতুন লাইনে বিনিয়োগই বেশি আকর্ষণীয়।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদ ওমর ইমাম বলেন, যাত্রীরা টিকিট পাচ্ছেন না, অথচ আমরা ট্রেনের সংখ্যা বাড়াতে পারছি না। কিন্তু সেই সুযোগ রয়েছে। রোলিং স্টকের জন্য অর্থ ছিল না, তা বলা যাবে না। বিশাল বিনিয়োগ করা হয়েছে অবকাঠামোয়, কিন্তু সেই রুট সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। দরকার প্রাইভেট অপারেটরদের সম্পৃক্ততা।
রেল সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, দ্রুততম সময়ে নতুন লোকোমোটিভ ও ওয়াগন সংগ্রহ করা হচ্ছে। যেগুলো অব্যবহৃত রুট আছে, সেগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে চালুর পরিকল্পনা আছে। ইতোমধ্যে কিছু কিছু জায়গায় কাজ চলছে।