রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার ছোট ভাকলা ইউনিয়নের মালিপাড়া এলাকায় অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী চড়ক মেলা ঘিরে ছিল ব্যতিক্রমী ও শিহরণ জাগানো আয়োজন। পিঠে বড়শি গেঁথে জীবন্ত মানুষকে শূন্যে ঘোরানোর দৃশ্য দেখতে মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) দিনব্যাপী মেলায় ভিড় জমায় হাজারো দর্শনার্থী।
সকাল থেকে শুরু হওয়া এ মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল চড়ক (চৈত্র পূজা) পূজার অংশ হিসেবে সন্ধ্যার আগমুহূর্তে পিঠে বড়শি গেঁথে ঘূর্ণন। ঢোলের তালে তালে চড়ক গাছের সঙ্গে বাঁধা বাঁশের কাঠামোয় অংশগ্রহণকারীদের শূন্যে ঘোরানো হয়। এ সময় বাতাসা ছিটানো, ছোট্ট শিশু কোলে নিয়ে ও নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় চড়ক পূজার মূল পর্ব। দৃশ্যটি যেমন ভয়ংকর, তেমনি উৎসুক জনতার জন্য ছিল বিরল এক অভিজ্ঞতা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই শত বছরের ঐতিহ্য বহন করে আসছে এই চড়ক মেলা। বাংলা নববর্ষ ও চৈত্র সংক্রান্তিকে ঘিরে প্রতি বছর এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ নয়, সব ধর্মের মানুষই এ মেলায় অংশ নিয়ে কেনাকাটা ও উৎসব উপভোগ করেন।
চড়ক পূজায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে দেবদাস বিশ্বাস (২৮) তিনি টানা ১৪ বছর ধরে পিঠে বড়শি গেঁথে এই চড়ক পূজায় ঝুলছেন। অপরদিকে তার আপর ছোট ভাই জয় বিশ্বাস (২৪) এ বছর পঞ্চমবারের মতো অংশ নেন। গোয়ালন্দ পৌর শহরের ২ নম্বর ওয়ার্ডে তাদের বাড়ী। আয়োজক কমিটির সদস্য বিপ্লব কুমার মন্ডল জানান, পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় প্রায় তিন যুগ ধরে বাদল কুমার বিশ্বাস এই আয়োজনের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
মেলা কমিটির তথ্যমতে, যারা চড়ক পূজায় পিঠে বড়শি গেঁথে অংশ নেন, তারা পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে প্রায় এক সপ্তাহ উপবাস পালন করেন। ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার অনুসরণ করেই তারা এই কষ্টসাধ্য প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেন।
মেলায় আগত দর্শনার্থীরা জানান, পিঠে বড়শি গেঁথে শূন্যে ঘোরানোর বিষয়টি শুনলেই গা শিউরে ওঠে। তবুও এ দৃশ্য সরাসরি দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে। অনেকেই শৈশব থেকেই এ মেলার সঙ্গে পরিচিত এবং প্রতি বছরই এটি উপভোগ করতে আসেন।
মেলাকে ঘিরে বসেছে নাগরদোলাসহ বিভিন্ন রকমের দোকানপাট, খেলনা, মিষ্টি ও গ্রামীণ পণ্যের সমাহার। এতে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মাঝে বাড়তি উৎসাহ লক্ষ্য করা গেছে। দিনব্যাপী উৎসবমুখর পরিবেশে চড়ক মেলা পরিণত হয় এক মিলনমেলায়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এমন ঐতিহ্যবাহী আয়োজন গ্রামীণ সংস্কৃতি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে লোকজ ঐতিহ্য তুলে ধরছে।