তীব্র তাপপ্রবাহে পুড়ছে জামালপুর। অসহনীয় গরম, ভ্যাপসা আবহাওয়া ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জেলার জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে কৃষক, শ্রমিক, শিশু ও বয়স্ক—সব শ্রেণি-পেশার মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এরই মধ্যে ৩দিনে হিটস্ট্রোকে ৩ কৃষক কৃষানির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। অনেকেই অসুস্থ্য হয়ে পড়োছে। সবচেয়ে বেশী ভোগান্তিতে পড়েছে কৃষকেরা। ধানকাটা, শুকানো ও মাড়াই নিয়ে বিপাকে রয়েছেন।
জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরে জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মাঝারি থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই প্রখর রোদ ও দমবন্ধ করা গরমে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহর ও গ্রামাঞ্চলের রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষকে বাইরে বের হতে দেখা যায়নি।
জামালপুরের মাদারগঞ্জে তীব্র গরমের মধ্যে খড়ের কাজ করতে গিয়ে হিটস্ট্রোকে বালি বেগম (৫০) নামের এক নারীর মৃত্যু হয়েছে।
বুধবার দুপুরে উপজেলার জোরখালী ইউনিয়নের কুকুরমারী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার পাররামরামপুর ইউনিয়নের পূর্ব ভাতখাওয়া গ্রামের কৃষক আসাদুল হক (৪৫) গত ১ জুন সকালে নিজ জমিতে বোরো ধান কাটার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তার মৃত্যু হয়।
স্থানীয়দের ধারণা, প্রচণ্ড গরমে হিটস্ট্রোকেই তার মৃত্যু হয়েছে। এর একদিন পর বকশীগঞ্জ উপজেলার মেরুরচর ইউনিয়নের রবিয়ারচর বিলের মুড়ি গ্রামে ধান কাটার সময় হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান সানোয়ার হোসেন (৬৫) নামে আরেক কৃষক। সোমবার (২ জুন) দুপুরে এ ঘটনা ঘটে।
প্রচণ্ড গরমে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন দিনমজুর, রিকশাচালক, কৃষিশ্রমিক ও নির্মাণশ্রমিকরা। অনেকেই জানান, রোদের মধ্যে দীর্ঘ সময় কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত ঘাম, ক্লান্তি ও পানিশূন্যতায় শ্রমিকদের মধ্যে অসুস্থতা বাড়ছে। কৃষকরাও মাঠে কাজ করতে গিয়ে বারবার বিশ্রাম নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে অনেক এলাকায় ধান কাটা ও কৃষিকাজের গতি কমে গেছে।
আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জেলার তাপমাত্রা ৩৩ থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলেও বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি থাকায় অনুভূত তাপমাত্রা আরও কয়েক ডিগ্রি বেশি। এ কারণে গরমের তীব্রতা সাধারণ মানুষের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
জেলা সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডায়রিয়া, জ্বর, পানিশূন্যতা ও গরমজনিত নানা রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। চিকিৎসকদের মতে, শিশু ও বয়স্করা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন।
এদিকে গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদা। ফলে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘন ঘন ও দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। দিনে-রাতে বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীদের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়েছে। অনেক এলাকায় রাতেও স্বাভাবিকভাবে ঘুমাতে পারছেন না মানুষ।
জামালপুরের সিভিল সার্জন ডা: আজিজুল হক জানিয়েছে, প্রয়োজন ছাড়া রোদে বের না হওয়া, বেশি বেশি বিশুদ্ধ পানি পান, হালকা খাবার গ্রহণ এবং শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
দীর্ঘস্থায়ী তাপদাহ, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও লোডশেডিংয়ের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
জামালপুরের বাসিন্দারা। তারা বলছেন, গরমের এই দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার দাবি জানিয়েছে স্থানীয়রা।
জামালপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইউসুপ আলী জানিয়েছেন, তীব্র গরমে হিট স্ট্রোকে মারা যাওয়া দুই জনের মধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একজনের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। অপরজনকেও আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে। সারা জেলায় সচেতনমুলক কার্যক্রম অব্যহত রয়েছে।
জরুরী কাজ ছাড়া কেউ যেন ঘর থেকে বের মা হয়। বের হলে সাথে ও পানি নিয়ে বের হওয়ায় জন্য জেলাবাসীকে আহবান জানিয়েছেন তিনি।