ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনক সামনে রেখে বগুড়ায় নারী ভোটারদের লক্ষ্য করে কাজ শুরু করেছে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো। জেলার সাতটি নির্বাচনি আসনে বিএনপি ও জামায়াতের নারী নেতাকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ ও প্রচার চালাচ্ছেন। জেলায় মোট ভোটারের অর্ধেকেরও বেশি নারী হওয়ায় তারাই এবারের নির্বাচনে জয়–পরাজয়ের গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠতে পারেন। এ প্রেক্ষাপটে বিএনপির নারীকর্মীরা যেমন দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে ভোট চাচ্ছেন, তেমনি সংগঠিতভাবে মাঠে নেমেছেন জামায়াতের মহিলা শাখা ও ইসলামী ছাত্রী সংস্থার কর্মীরাও। তারা ব্লকভিত্তিকভাবে ভাগ হয়ে নারী ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
তবে নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে আলোচিত গণভোট ইস্যুতে দলগুলোর পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রচার এখনো চোখে পড়েনি। একইভাবে সরকারি পর্যায়েও গণভোট বিষয়ে দৃশ্যমান বা কার্যকর প্রচার কার্যক্রম লক্ষ করা যাচ্ছে না।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, বগুড়ায় মোট ভোটার ২৯ লাখ ৫৬ হাজার। এর মধ্যে নারী ভোটার ১৪ লাখ ৮৮ হাজার আর পুরুষ ভোটার ১৪ লাখ ৬৭ হাজার। এ হিসাবে নারী ভোটারের সংখ্যা ২১ হাজার বেশি। এ ব্যবধান আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি হওয়ায় নারী ভোট টানতে কাজ করছে দলগুলো।
জেলার ১২টি উপজেলার ভোটার তালিকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ উপজেলাতেই নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষের সমান কিংবা কিছু ক্ষেত্রে বেশি। এর মধ্যে কাহালু–নন্দীগ্রাম আসন-৪, সারিয়াকান্দি-সোনাতলা, আসন-১ এবং শাজাহানপুর-গাবতলী আসন-৭-এ নারী ভোটারের সংখ্যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব আসনে নারী ভোটারদের গুরুত্ব বিবেচনায় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনি প্রচার নতুনভাবে সাজিয়েছে।
এছাড়া অন্য আসনেও নারীরা দলবদ্ধভাবে প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চাইতে মাঠে নেমেছেন। এক্ষেত্রে সংগঠিতভাবে এগিয়ে রয়েছেন জামায়াতের মহিলা শাখার নারীকর্মীরা। তারা কাকডাকা ভোর থেকেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। প্রতিটি ওয়ার্ডে নারীকর্মীরা গ্রুপভিত্তিকভাবে কাজ করছেন, যেখানে প্রতি গ্রুপে সর্বনিম্ন ১০ জন থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১০০ জন নারী ভোটারের তালিকা নিয়ে মাঠে নামা হচ্ছে।
পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমকেও কাজে লাগাচ্ছেন তারা। মোবাইল ফোনে মেসেজ ও ভয়েস কলের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে ক্ষুদে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। নিশ্চিন্তপুর গ্রামের আনজুয়ারা বেগম এ তথ্য নিশ্চিত করেন। একই ধরনের মেসেজ পাওয়ার কথা জানান অবসরপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীর সদস্য ও শহরের লতিফপুর এলাকার বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম।
এ ব্যাপারে জেলা জামায়াতের মহিলা শাখার সাধারণ সম্পাদিকা ডা. মাকসুদা করিম আমার দেশকে বলেন, আমরা বহু আগে থেকেই মাঠে নেমেছি। মহিলাদের উদ্বুদ্ধ করছি, যাতে আমাদের প্রার্থীকে তারা ভোট দেন।
এছাড়া জেলা জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক নাজমা আক্তার বলেন, আমাদের প্রতিটি উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে ওয়ার্ড কমিটিগুলো নির্বাচনে কাজ করছে। বিশেষ করে নারীদের ভোটে সম্পৃক্ত করতে বাড়িবাড়ি গিয়ে উঠোন বৈঠক করছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ভাষ্য, এসব আসনে জয় পরাজয়ের ব্যবধান খুব বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে সংগঠিত নারী ভোটারদের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত বিজয় নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারি আজিজুল হক কলেজের শিক্ষার্থী তামান্না বেগম বলেন, সংস্কারের জন্য গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর তেমন মাথাব্যথা নেই।
সুশাসনের জন্য প্রশাসন (সুপ্র)-এর সাধারণ সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, কয়েকটি কারণে বগুড়ায় নারী ভোটারের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। নারীশিক্ষার হার বৃদ্ধি, জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার নিবন্ধনে সচেতনতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে নারীদের সম্পৃক্ততা এবং নিয়মিত ভোটার তালিকা হালনাগাদ সব মিলিয়েই এ পরিবর্তন এসেছে।
টিএমএসএসের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপিকা ড. হোসনে আরা বলেন, ভোট সুষ্ঠু না হওয়ায় আগে অনেক নারী কেন্দ্রে যেতেন না। তবে এখন নারীরা ভোটকেন্দ্রে যেতে আগ্রহী। সে ক্ষেত্রে তারাই বড় ফ্যাক্টর হতে পারেন। নারী ভোটারের এ সংখ্যাগত আধিক্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার ভাষাতেও পরিবর্তন এসেছে। উন্নয়ন, সড়ক বা অবকাঠামোর পাশাপাশি এখন প্রার্থীদের বক্তব্যে উঠে আসছে স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, নারীশিক্ষা ও নারী নিরাপত্তার বিষয়।