তিস্তা নদী এখন নতুন এক সংকটের মুখে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর বুকে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলজুড়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে তামাক চাষ। অধিক লাভের আশায় কৃষকের ঝোঁক বাড়লেও এ চাষে ব্যবহৃত অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক তিস্তার পানি দূষিত করে তুলছে। ফলে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে মাছসহ নানা জলজ প্রাণীর প্রজনন এবং নদীর প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র।
জানা গেছে, কয়েক দেশি-বিদেশি তামাক কোম্পানির প্রতিনিধিরা স্থানীয় কৃষকদের তামাক চাষ সম্প্রসারণে উৎসাহিত করছে। বাণিজ্যিকভাবে চার জাতের তামাকের চাষ করা হয়। এগুলো হলোÑএফসিভি, মতিহার, জাতি ও বার্লী। বেশ কয়েক তামাক কোম্পানি বীজ, সার ও অগ্রিম ঋণসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তামাক চাষে কৃষকদের আগ্রহী করে তুলছেন। এ কোম্পানিগুলোর আর্থিক সহযোগিতা ও বিনামূল্যে বীজ, ঋণ, সার ও নগদ অর্থসহ তামাক ক্রয়ের নিশ্চয়তার কারণে লালমনিরহাটে তামাক চাষ দিন দিন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কৃষি বিভাগের উদাসীনতা, তামাক উৎপাদনের আগে কোম্পানিগুলোর দর নির্ধারণ, বিক্রির নিশ্চয়তা, চাষের জন্য সুদমুক্ত ঋণ, কোম্পানির প্রতিনিধিদের নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন ও পরামর্শ দানে তামাক চাষ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। গত কয়েক বছর আগেও লালমনিরহাটের যেসব আবাদি জমিতে শীতকালীন মৌসুমে ধান, গম, ভুট্টা, সরিষা ও আলুসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হয়েছিল এখন সেসব জমিতে তামাকের চাষ হচ্ছে।
লালমনিরহাট সদরের পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের আকবর আলী জানান, সিগারেট কোম্পানির প্রতিনিধির মাধ্যমে তামাক চাষিদের জন্য একর প্রতি জমিতে বীজ বাবদ নগদ ৩ হাজার ৬০০ টাকা দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে সারের জন্য ৬ হাজার টাকার সার আগাম দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, উৎপাদিত তামাক সঠিক মূল্যে কৃষকের বাড়ি থেকে কেনার নিশ্চয়তাও পাওয়া যায়। যে কারণে এলাকায় রবি মৌসুমের বেড়ে চলেছে তামাকের চাষ।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার রাজপুর এলাকার জেলে দবিয়ার রহমান বলেন, ‘তামাক চাষ শুরু হওয়ার আগে তিস্তায় অনেক মাছ পাওয়া যেত। এখন নদী প্রায় ফাঁকা। শুষ্ক মৌসুমে তো পানি থাকে না, বর্ষাতেও আগের মতো মাছ নেই।’
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, তিস্তার চরাঞ্চলে ঠিক কত জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে, তার নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান নেই। আদিতমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক জানান, চরাঞ্চলের জমি অস্থায়ী হওয়ায় নিয়মিত জরিপ করা কঠিন। তিনি বলেন, কৃষকদের তামাক চাষ থেকে বিরত থাকতে বলা হলেও তামাক কোম্পানির প্রভাবের কারণে তারা তা মানছেন না। এতে খাদ্যশস্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। লালমনিরহাট জেলা মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সানজিদা ইয়াসমিন জানান, তামাক চাষে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে নদীতে প্রবেশ করে পানি বিষাক্ত করে তোলে।
এ বিষয়ে লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাইফুল আরিফিন বলেন, গত বছর লালমনিরহাটে প্রায় ৯ হাজার হেক্টরে বেশি জমিতে তামাক চাষ হয়েছে।
চলতি বছরে তার থেকেও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষিজমিতে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তামাক চাষ অত্যন্ত ক্ষতিকর।
তবে তামাকজাতপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা কৃষকদের বিনামূল্যে তামাকের বীজ, সারসহ ঋণ দেওয়ায় তামাক চাষে আগ্রহী হচ্ছেন কৃষকরা ।
এ জন্য কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের বিভিন্নভাবে সচেতন করেও তামাকের চাষ কমানো সম্ভব হচ্ছে না।