মুঘল স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত লালমনিরহাটের ঐতিহাসিক নিদাড়িয়া মসজিদ সময়ের ক্ষয় ও অবহেলায় এখন অস্তিত্ব সংকটে। পৌনে তিন শতাব্দী আগে নির্মিত তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই প্রাচীন স্থাপনাটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তালিকাভুক্ত হলেও সংস্কারের অভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সংস্কার ও দখলমুক্ত করা না হলে উত্তরাঞ্চলের এই ঐতিহ্যবাহী পুরাকীর্তি হারিয়ে যেতে পারে।
ইতিহাস ও স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, লালমনিরহাট সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের নয়ারহাট এলাকায় বসবাসকারী সুবেদার মনছুর খাঁ মসজিদটি নির্মাণ করেন। ধর্মভীরু এই ব্যক্তির মুখে দাড়ি না থাকায় তিনি বিব্রতবোধ করতেন। এক সময় তিনি আল্লাহর কাছে মান্নত করেন—মুখে দাড়ি গজালে একটি মসজিদ নির্মাণ করবেন।
স্থানীয় প্রবীণ কফিল উদ্দিন জানান, মান্নত করার কিছুদিনের মধ্যেই মনছুর খাঁর মুখে তিনটি দাড়ি গজায়। এরপর ১১৭৬ হিজরিতে তিনি তার মান্নত পূরণার্থে তিন গম্বুজবিশিষ্ট একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। দাড়িহীনতার প্রসঙ্গ থেকেই ফারসি ভাষায় মসজিদটির নামকরণ হয় ‘নিদাড়িয়া মসজিদ’। যদিও এ বিষয়ে প্রামাণ্য ঐতিহাসিক তথ্য খুবই সীমিত। মসজিদটির মোয়াজ্জিন আনসার আলী বলেন, বাপ-দাদার মুখে শোনা এই কাহিনি এখনো এলাকায় প্রচলিত রয়েছে।
রংপুর-কুড়িগ্রাম মহাসড়কে লালমনিরহাটের বড়বাড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দক্ষিণে সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের কিশামত নগরবন্দ মৌজায় অবস্থিত এই মসজিদটি বর্তমানে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত একটি প্রাচীন স্থাপনা। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা এখানে এসে নামাজ আদায় ও দোয়া করেন।
এক কক্ষবিশিষ্ট মসজিদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪২ ফুট ও প্রস্থ ১৬ ফুট। উপরিভাগে তিনটি গম্বুজ, চার কোনায় চারটি পিলার এবং সম্মুখে একটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। বাম পাশে একটি দোচালা ঘর রয়েছে, যা আগে স্টোররুম বা ইমামের আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। মসজিদের সামনে রয়েছে একটি বড় ঈদগাহ এবং উত্তর-পূর্ব কোনে একটি কবরস্থান। উত্তর দিকে ২০১৯ সালে একটি হাফিজিয়া মাদরাসা স্থাপন করা হয়।
জানা যায়, মসজিদের নামে প্রায় ১০ একর ৫৬ শতক জমি দান করা হয়েছিল। সেই জমি থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে প্রতিবছর ওয়াজ মাহফিল আয়োজন করা হয়। তবে বর্তমানে জমির একটি অংশ দখলে থাকায় তা দখলমুক্ত করতে মামলা চলমান রয়েছে। স্থানীয় প্রবীণ মনছুর আলী (৯০) বলেন, মসজিদটির সংস্কার ও জমি সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দা কায়সার আলী জানান, মসজিদটি অত্যন্ত পুরোনো। ছাদে ফাটল ধরেছে, কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অনুমতি ছাড়া সংস্কারও করা যায় না। আবার মসজিদের জমির একটি অংশ দখলে থাকায় সমস্যাও জটিল হয়েছে।
আরেক বাসিন্দা মোক্তার আলী বলেন, দাদার কাছ থেকে শুনেছি, তার দাদার আমলের আগেই মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সময়ের বিবর্তনে এটি নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আগে সংস্কারের উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও কার্যকর কোনো অগ্রগতি হয়নি।
স্থানীয় খয়বর আলী জানান, ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও জাদুঘর অধিদপ্তর নিদাড়িয়া মসজিদটিকে প্রাচীন পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করে এবং সেখানে সাইনবোর্ড স্থাপন করে। কিন্তু সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলা ও পুরাকীর্তি হওয়ায় কেউ উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে পারেননি।
লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার বলেন, ঐতিহাসিক নিদাড়িয়া মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তালিকাভুক্ত। প্রাচীন এ মসজিদের সংস্কার ও বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এলাকাবাসীর মতে, যথাযথ সংরক্ষণ ও দখলমুক্ত করা গেলে নিদাড়িয়া মসজিদ উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।