সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) সামাজিকবিজ্ঞান ভবন নির্মাণের এক বছরের মধ্যেই অনেক ফাটল দেখা দিয়েছে। প্রায় ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পাঁচতলা এই ভবনে প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার শিক্ষক-শিক্ষার্থী যাতায়াত করেন।
বাইরে থেকে দৃষ্টিনন্দন ভবনটির ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে ছোট-বড় অসংখ্য ফাটল; যা সিমেন্টের প্রলেপে ঢাকার চেষ্টা করা হলেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। সামান্য ভূকম্পনেই ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা। এছাড়া এত বড় ভবনে নেই কোনো লিফট। ফলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
জানা যায়, ২০১৭ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) শাবিপ্রবির অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-১ অনুমোদন দেয়। এ প্রকল্পের আওতায় ২৩ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণের দায়িত্ব পায় মেরিনা কনস্ট্রাকশন অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড ও দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড। ২০২০ সালের ১১ মার্চ নির্মাণকাজ শুরু হয়ে চুক্তি অনুযায়ী দুবছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৩০ জুন কাজ শেষ করে কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু উদ্বোধনের পরপরই ভবনটিতে একের পর এক ফাটল দেখা দিতে শুরু করে।
বর্তমানে ভবনটিতে সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজকর্ম ও পলিটিক্যাল স্টাডিজ—এ চারটি বিভাগের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। নিচতলায় রয়েছে ডিন অফিস, দুটি গ্যালারি কক্ষ এবং একটি শিক্ষক লাউঞ্জ। প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজারের বেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী এই ভবন ব্যবহার করছেন। তবে শুরু থেকেই লিফট স্থাপনের দাবি জানানো হলেও এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। এতে করে বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থী ও প্রবীণ শিক্ষকদের ভোগান্তি বাড়ছে। সিঁড়ি দিয়ে বারবার ওঠানামা করতে গিয়ে কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলেও জানা গেছে।
সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, পুরো ভবনজুড়ে অন্তত ২০টির বেশি ফাটল রয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের বিমে বড় ধরনের ফাটল উদ্বেগজনক। নিচতলা থেকে পঞ্চমতলা পর্যন্ত দেয়ালের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা গেছে, যেগুলো সিমেন্ট দিয়ে ঢেকে রঙ করা হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী গত ছয় মাসে সিলেটে আটবার ভূমিকম্প হয়েছে। এর মধ্যে গত ২১ নভেম্বর রিখটার স্কেলে ৫.৪ মাত্রার ভূমিকম্পের পর ভবনটিতে বড় ফাটল দৃশ্যমান হয়। পরে সেগুলো সিমেন্ট দিয়ে মেরামতের চেষ্টা করা হলেও বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক দিলার রহমান বলেন, প্রবীণ শিক্ষকরাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। উঁচুতে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে অনেকের শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। নারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যেও অসুস্থ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আমি ডিন থাকাকালীন আশা করেছিলাম ভালো মানের কাজ হবে; কিন্তু তা হয়নি।
সমাজকর্ম বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, আমার ক্লাসরুমের পাশেই বড় ফাটল রয়েছে। প্রকৌশলীদের দেখালে তারা এটিকে স্ট্রাকচারাল ফাটল নয় বলে দাবি করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দেয়ালে ফাটলইবা কেন হবে। এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী জুনায়েদ হাসান বলেন, ভবনের এমন অবস্থা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন প্রকল্পের মানÑদুটোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এ ব্যাপারে দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে চলমান অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি না হয়।
এদিকে নির্মাণকাজের সময় দায়িত্বে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলী বিকাশ চন্দ্র দাশ ভবনের ফাটল নিয়ে কিছু ত্রুটির কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, এটি স্ট্রাকচারাল সমস্যা নয়, নন-স্ট্রাকচারাল বা দেয়ালের ফাটল। আমরা আবার ভবনটি পরিদর্শন করব এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে জানা গেছে, ভবনে লিফট স্থাপনের লক্ষ্যে ‘লিফটের গুণগতমান’ যাচাই করতে বর্তমানে গ্রিসে অবস্থান করছেন প্রধান প্রকৌশলী জয়নাল ইসলাম চৌধুরী। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড এ এম সরওয়ার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এটা আগের প্রশাসনের সময়ে তৈরি করা হয়েছে। তাদের দুর্নীতির কারনে এই অবস্থা হয়েছে। তবে আমরা এই ভবনের নির্মাণ কাজের তদারকির ব্যবস্থা করতেছি।
সব মিলিয়ে কোটি টাকার এই ভবনের এমন নাজুক অবস্থা শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।