সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার ১৩ যুবক ইতালি যাওয়ার স্বপ্নে স্থানীয় মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন। কিন্তু তাদের ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন আর বাস্তবায়িত হলো না। এর আগেই লিবিয়ায় গিয়ে মাফিয়া চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে বর্তমানে জীবন নিয়ে শঙ্কায় আছেন তারা। মাফিয়াদের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মুক্তির জন্য আর্তনাদ করছেন ভুক্তভোগী যুবকেরা।
লিবিয়ায় জিম্মি হওয়া এসব যুবকের অভিভাবকেরা জানান, সম্প্রতি লিবিয়া থেকে তাদের বেশ কয়েকবার ভিডিও কল দেয় মাফিয়া চক্র। কল দিয়ে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করে এবং ভিডিও কলে জিম্মি যুবকদের মারধর ও নির্যাতনের দৃশ্য দেখানো হয়। অভিভাবকেরা জানান, মাফিয়া চক্র জিম্মি থাকা যুবকদের প্রতিজনের মুক্তিপণ হিসেবে ২৬ লাখ টাকা দাবি করে। পরে দরকষাকষিতে ১২ লাখ টাকায় ছেড়ে দিতে চুক্তিতে রাজি হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নাজিমনগরের মৃত আব্দুস শহিদের (মন্টু) স্ত্রী দিলোয়ারা বেগম, তার ছেলে হুমায়ুন ও জামাতা নজরুল ইসলাম (ভীমখালী ইউনিয়নের কলকতখা গ্রামের মৃত আব্দুল বারিকের ছেলে) মিলে ওই যুবকদের লিবিয়ায় পাঠান। আদম বেপারী চক্রটি ১৩ লাখ টাকার বিনিময়ে ইতালি যাওয়ার মৌখিক চুক্তি করে ভুক্তভোগী যুবকদের সঙ্গে। কিন্তু এই তিন দালাল ভুক্তভোগী যুবকেরা লিবিয়ায় মাফিয়া চক্রের কাছে জিম্মি হওয়ার পর থেকেই উধাও। তাদের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।
জিম্মি থাকা যুবকদের একজন জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাক ইউনিয়নের নাজিমনগর গ্রামের হামজা। তার মা জানান, সম্প্রতি একদিন ভিডিও কলে হামজা তার মাকে বলেন, ‘মা আমাকে বাঁচাও, বাবা আমাকে বাঁচাও। টাকা না দিলে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে! জায়গাজমি, ঘরবাড়ি বিক্রি করে হলেও আমাকে বাঁচাও।’
হামজার সঙ্গে থাকা জিম্মি বাকি যুবকেরা হলেন নাজিমনগর গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে নিলয় মিয়া (২২), রাশিদ আলীর ছেলে শফিকুল ইসলাম (৩২), এখলাছ মিয়ার ছেলে আমিনুল ইসলাম (২৫), নূরু মিয়ার দুই ছেলে ইয়াছিন মিয়া (৩০) ও জীবন মিয়া (২৫), টুনু মিয়ার ছেলে আব্দুল কাইয়ুম (২৬), রাশিদ মিয়ার ছেলে আতাউর রহমান (২৮), ফয়জুন নূরের ছেলে মনিরুল ইসলাম (২৪), শহিদ মিয়ার ছেলে মামুন মিয়া (২৭), বাচ্চু মিয়ার ছেলে এনামূল হক (২৬), জলিল মিয়ার ছেলে আতাউর রহমান (২৯), জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের নয়াহালট গ্রামের সামছু মিয়ার ছেলে আবুল হামজা (২৫) ও সাচনা কালীবাড়ি গ্রামের ফুল মিয়ার ছেলে আবুল কালাম।
তারা সবাই গত ২৮ জানুয়ারি বাড়ি থেকে বের হয়ে সংযুক্ত আমিরাত, কুয়েত ও মিশর হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান। লিবিয়ায় যাওয়ার পর একটি মাফিয়া চক্র গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তাদের জিম্মি করে রাখে। এর মধ্যে নূরু মিয়ার ছেলে ইয়াছিন মিয়া মাফিয়াদের হাত থেকে পালাতে সক্ষম হলেও লিবিয়ার পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জেলে বন্দি রয়েছেন।
বাকিরা বর্তমানে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে জিম্মি রয়েছেন। তাদের অভিভাবকদের কাছে মুক্তিপণ চাওয়ার জন্য মাফিয়ারা ভিডিও কল দিলে যুবকরা জানান, তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হচ্ছে। মাফিয়াচক্র ভিডিও কলে সেই নির্যাতনের দৃশ্য দেখিয়ে প্রত্যেকের পরিবারের কাছে বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে বলছে।
ইতোমধ্যে কয়েকজনের পরিবার সন্তানের ওপর নির্যাতন না করার জন্য কিছু টাকা বিকাশে পাঠিয়েছেন। অনেকেই জায়গাজমি ও বাড়িঘর বিক্রি করে, আবার অনেকে স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা জোগাড় করছেন। মাফিয়াচক্রের হাত থেকে কীভাবে সন্তানদের উদ্ধার করবেন, তা ভেবে পাচ্ছেন না এসব অভিভাবক।
জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের তেলিয়াপাড়ার বিধবা মায়ের একমাত্র সন্তান হামজা। তিনিও লিবিয়ায় জিম্মি আছেন। জানা যায়, হামজার মা মাফিয়াদের আকুতি করে বলেন, বাবা আমার কাছে টাকা নেই, আমি ভিক্ষা করে তোমাদের টাকা দেব। আমার হামজারে আর মাইরো না।
হামজার পরিবারের মতো বাকি যুবকদের মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনরাও আহাজারি করছেন। আবার অনেক অভিভাবক সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তাদের ভয়, সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললে যদি মাফিয়া চক্র জেনে যায়, তাহলে তাদের সন্তানদের ওপর নাকি আরো বেশি নির্যাতন করা হবে।
কয়েকজন অভিভাবক জানান, সম্প্রতি আমার দেশ-এর অনলাইনে এ ঘটনা নিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশের পর মাফিয়াচক্র ওই যুবকদের ওপর আরো বেশি নির্যাতন করেছে। এছাড়া সাংবাদিকদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা না বলতে জিম্মিদের অভিভাবকদের হুমকি দিয়েছে তারা।
এ বিষয়ে জামালগঞ্জ থানার ওসি বন্দে আলী মিয়া বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে এ বিষয়ে জানতে পেরেছি। এখন পর্যন্ত কেউ অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে দালালচক্রের বিরুদ্ধে আইনত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।