পুঁজিবাজারে অনিয়ম রোধ
পুঁজিবাজারে অনিয়ম সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশকারীর প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে যদি অর্থদণ্ড বা জরিমানা আদায় হয়, তাহলে তথ্য প্রকাশকারী সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত প্রণোদনা পেতে পারেন। আর্থিক প্রণোদনার এমন বিধান রেখে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ ও তথ্য প্রকাশকারীর (হুইসেল ব্লোয়ার) সুরক্ষা বিধিমালা, ২০২৬-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
বিধিমালায় আর্থিক প্রণোদনা ও সম্মাননার বিষয়ে বলা হয়েছে, যদি কোনো তথ্য প্রকাশকারীর প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে আরোপিত অর্থদণ্ড বা জরিমানা আদায় হয়, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশকারীকে এই বিধিমালার অধীন স্বীয় বিবেচনায় উপযুক্ত আর্থিক প্রণোদনা বা সম্মাননা দিতে পারবে। আর্থিক প্রণোদনা বা সম্মাননা প্রদানের শর্তাদি, পরিমাণ ও প্রদানের পদ্ধতি সময় সময় আদেশের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে পারবে।
তবে শর্ত হিসেবে বলা হয়েছে, আর্থিক প্রণোদনার পরিমাণ আদায় করা জরিমানা বা অর্থদণ্ডের ২৫ শতাংশের বেশি হবে না। একই সঙ্গে ওই আর্থিক প্রণোদনার পরিমাণ কোনোভাবেই ১০ কোটি টাকার বেশি হবে না।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএসইসির কমিশন সভায় বিধিমালাটির খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। আজ রোববার এটি জনমত যাচাইয়ের জন্য বিএসইসির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করার কথা রয়েছে। ওয়েবসাইটে প্রকাশের পাশাপাশি জাতীয় দৈনিকেও এটি বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করা হবে। প্রকাশের দুই সপ্তাহের মধ্যে বিএসইসির চেয়ারম্যানের কাছে বিধিমালার বিষয়ে মতামত, পরামর্শ বা আপত্তি জানানো যাবে। জনমতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন সাপেক্ষে এটি চূড়ান্ত করার পর গেজেট আকারে প্রকাশিত হলে বিধিমালাটি কার্যকর হবে।
বিএসইসি কর্মকর্তারা জানান, মূলত পুঁজিবাজারে যেসব অনিয়ম হয়ে থাকে সেসব অনিয়মের তথ্য প্রকাশকারীর (হুইসেল ব্লোয়ার) আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিধিমালাটি প্রণয়ন করা হয়েছে। এর ফলে তথ্য প্রকাশকারী ব্যক্তি কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হবেন না। ফলে পুঁজিবাজারে যেসব অনিয়ম হয়ে থাকে, সেসব অনিয়মরোধে বিধিমালাটি সহায়ক হিসেবে কাজ করবে।
বিধিমালায় তথ্য প্রকাশকারীর সুরক্ষার বিষয়ে বলা হয়েছে, তথ্য প্রকাশকারীর সম্মতি ছাড়া এবং আইনি কার্যধারার কারণে অন্যরূপ প্রয়োজন না হলে, তার পরিচিতি প্রকাশ করা হবে না। তথ্য প্রকাশকারী কোনো চাকরিজীবী হলে, এই বিধিমালার আওতায় তথ্য প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা যথা-পদাবনতি, হয়রানিমূলক বদলি, বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরিচ্যুতি, তিরস্কার বা কোনো ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবে না। তথ্য প্রকাশকারীকে কোনো মামলায় সাক্ষী করা যাবে না এবং মামলার কার্যক্রমে এমন কিছু প্রকাশ করা যাবে না, যাতে ওই ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ পায়। মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ সংশ্লিষ্ট কোনো দলিল বা কাগজপত্রে যদি তথ্য প্রকাশকারীর পরিচয় লিপিবদ্ধ থাকে, তাহলে আদালতে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সে অংশ গোপন রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে বিধিমালায়। এ ক্ষেত্রে তথ্য প্রকাশকারীর পরিচয় ও প্রকাশিত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার্থে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯ এর সেকশন ১৯ এর বিধান অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে।
বিধিমালায় তথ্য প্রকাশকারী হিসেবে বিএসইসির নিবন্ধিত কোনো বাজার মধ্যস্থতাকারী বা কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি, ইস্যুয়ার, নিবন্ধিত কোনো ফান্ড বা স্পেশাল পারপাস ভেহিকেলের (এসপিভি) কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী বা পরিচালনা পর্ষদের কোনো সদস্য বা ট্রাস্টি বোর্ডের কোনো সদস্য বা নিরীক্ষক বা এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো ব্যক্তিকে বোঝাবে।
তথ্য প্রকাশের পদ্ধতি হিসেবে বলা হয়েছে, বিধিমালায় বর্ণিত একটি ছক (ফরম-১) পূরণ করে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য প্রকাশ করবে। তথ্য প্রকাশের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়েছে, যুক্তিসংগত কারণে যদি তথ্য প্রকাশকারীর বিশ্বাস যে প্রকাশিত তথ্যটি সত্য বা যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই বিশ্বাস করেন যে, প্রকাশিত তথ্যটি সত্য হতে পারে এবং তথ্যের গুরুত্ব বিবেচনা করে তথ্যের সত্যতা যাচাই করা সমীচীন।
যেসব বিষয়ে তথ্য প্রকাশকারী তথ্য দেবেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে— সিকিউরিটিজ আইন ও বিধিবিধান ইত্যাদির লঙ্ঘন, প্রতারণামূলক কার্যক্রম, সুবিধাভোগী ব্যবসা, বাজার কারসাজি, অর্থ আত্মসাৎ, অর্থের অপব্যবহার, অর্থ পাচার ইত্যাদি।
তথ্য প্রকাশকারীর পরিচয় যাতে প্রকাশ না পায়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে কমিশন কর্তৃক মনোনীত কর্মকর্তার কাছে সংরক্ষিত রেজিস্টারে নির্দিষ্ট ছক (ফরম-২) অনুযায়ী তথ্য লিপিবদ্ধ করা হবে। প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান বা তদন্তের জন্য গৃহীত হলে বা না হলে তার কারণ রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ থাকবে।
বিধিমালায় আরো বলা হয়েছে, অপর একটি নির্দিষ্ট ছকে (ফরম-৩) নির্দিষ্ট কর্মকর্তার কাছে তথ্যের একটি রেজিস্ট্রার থাকবে। সেখানে তথ্য প্রকাশকারীর গোপনীয়তার স্বার্থে তার নামের পরিবর্তে সাংকেতিক নাম বা কোড নম্বর ব্যবহার করা হবে।
খসড়া বিধিমালায় বলা হয়েছে, তথ্য প্রকাশকারীর তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান বা তদন্তকালে কিংবা অনুসন্ধান বা তদন্তের পর যদি দেখা যায়, প্রকৃত ঘটনা ও অভিযোগ তুচ্ছ প্রকৃতির, বিরক্তিকর এবং ভিত্তিহীন কিংবা অনুসন্ধান বা তদন্ত পরিচালনার মতো যথেষ্ট কারণ ও উপাদান বিদ্যমান না থাকে, তাহলে তৎক্ষণাৎ অনুসন্ধান বা তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপযুক্ত কারণসহ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে কার্যক্রম বন্ধ করতে পারবে।
খসড়া বিধিমালায় আরো বলা হয়েছে, তথ্য প্রকাশকারীর তথ্যের ভিত্তিতে কোনো ধরনের সহায়তা চাইলে তিনি সেটা দেবেন। তবে শর্ত থাকে যে, যদি এ ক্ষেত্রে তথ্য প্রকাশকারীর পরিচয় প্রকাশ বা তার জীবন ও শারীরিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত বা অন্য কোনোভাবে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, সে ক্ষেত্রে তাকে বাধ্য করা যাবে না।